কেমন দেশ মেক্সিকো

Jul 07, 2018 09:38 pm
মায়া সভ্যতার নাম আমরা কে না শুনেছি

জসিম উদ্দিন

উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকো। এ দেশের উত্তরে বিশ্বের একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চীমে প্রশান্ত মহাসাগরের দীর্ঘ উপকূল। দক্ষিন-পূর্বে ছোট ছোট দু’টি দেশ গুয়েতেমালা, বেলিজ এবং ক্যারবীয় উপসাগর। আর পূর্বে মেক্সিকো উপসাগর। প্রায় ২০ লাখ কিলোমিটারের বিশাল আয়তনের মেক্সিকো বিশ্বের চতুর্দশ বৃহত্তম দেশ।

জনসংখ্যায় ১১তম অবস্থানের দেশটিতে প্রায় ১১ কোটি মানুষের বাস। এখানকার মানুষের ইতিহাস প্রায় ১১ হাজার বছরের পুরনো। এ ইতিহাসের উৎস হচ্ছে মায়া সভ্যতা। উত্তর আর দক্ষিন আমেরিকার মিলনস্থলে সৃষ্ট এ উন্নত সভ্যতা দারুণভাবে প্রভাব রেখেছে দেশটির সমাজ, অর্থনীতি আর আধুনিক জীবনে।


মায়া সভ্যতার নাম আমরা কে না শুনেছি। মধ্য আমেরিকার যে অঞ্চলটিতে খ্রিস্টপূর্ব ১০ হাজার বছর আগে এই সভ্যতার উন্মেষ। ওই অঞ্চলের দেশগুলোর নাম শুনলে আমাদের কাছে অপরিচিতই ঠেকবে। ভাষার উৎকর্ষ, শিল্প সৌকর্য, নয়নাভিরাম স্থাপত্য, গণিত আর জ্যোতিরবিদ্যার অভাবনীয় উন্নতি একবাক্যে আমাদের মায়া সভ্যতাকে পরিচিত করিয়ে দেয়। বিশ্ব পরিসরে কিছুটা অপরিচিত দেশ মেক্সিকো, গুয়েতেমালা আর বেলিজের মিলনকেন্দ্রে এই সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে দীর্ঘ ১১ হাজার বছর ধরে। ২৫০ থেকে ৯০০ শতাব্দী সময়ে এ সভ্যতার সোনালি যুগ। মুধ্যযুগে স্পেনিশ আগ্রাসনের মধ্যে দিয়ে মায়া সভ্যতার চূড়ান্ত অবসান হয়। স্থাপত্য শিল্পে মায়া সভ্যতা অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেন। কোনো ধরনের ধাতব পদার্থ ছাড়াই মনোরম স্থাপনা তৈরি করত তারা। উপাসনালয় রাজপ্রাসাদ আর চন্দ্র-সূর্যের গতিবিধি পর্যবেণ কেন্দ্রের নির্মাণে তাদের নিজস্ব দর্শন আর শিল্পকলার পরিচয় পাওয়া যায়।

কৃষিকাজে তারা উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহার করত। প্রাচীন যুগে তাদের উদ্ভাবিত ভূগর্ভে পানি সংরণ পদ্ধতি ছিল বিস্ময়কর। বৃষ্টির পানিকে তারা কৌশলে ভূগর্ভের একটি স্তরে সংরণ করত। সাধারণত নগরের মানুষের মধ্যে এর সরবরাহের পদ্ধতিও ছিল অনন্য। বিশেষ করে দীর্ঘ খরার সময় ভূগর্ভের পানি ব্যবহার করা হতো। সংরতি পানি দিয়ে কৃষিকাজ আমূল বদলে দেয় তাদের জীবন। এতে করে একটা সময় উদ্বৃত্ত ফসল জান্মাল। প্রয়োজন পড়ল সেগুলো রফতানির। এমনি করে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে মায়া সভ্যতার বিস্তার।

 

এক নজরে মেক্সিকো

দেশের নাম : ইউনাইটেড মেক্সিকান স্টেট
রাজধানী : মেক্সিকো সিটি
জনসংখ্যা : ১০ কোটি ৬৪ লাখ
আয়তন : ১৯ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার
প্রধান ভাষা : স্পেনিশ
প্রধান ধর্ম : খ্রিস্টান
গড় আয়ু : ৭২ বছর (পুরুষ), ৭৭ বছর (মহিলা)
মুদ্রা : পেসো
প্রধান রফতানি দ্রব্য : মেশিনারি ও পরিবহন যন্ত্রপাতি, খনিজ জ্বালানি ও তেল, খাদ্যসামগ্রী ও প্রাণী
মাথাপিছু আয় : ৭৩১০ মার্কিন ডলার


মায়ার মানুষের বিশ্বাস ছিল পৃথিবী সমতল এবং এটি চতুর্ভুজাকৃতির। অন্য দিকে আকাশের রয়েছে অনেক স্তর। আকাশটাকে ধরে রেখেছে চারজন দেবতা। তাদের রয়েছে অসুরের বল। তবে পৃথিবী এবং সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে মায়া সভ্যতার মানুষের মধ্যে আরো ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসেরও প্রচলন ছিল।


খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে সুসংগঠিত একটি সরকার ব্যবস্থা কায়েম করে তারা। রাজা ছিলেন সরকারের প্রাণ। রাজ্য পরিচালনায় সরকারি কর্মকর্তারা সুনিপুণ ছিলেন। মর্যাদা অনুযায়ী সমাজে শ্রেণীবিভক্তি ছিল স্পষ্ট। ১০টির মতো শ্রেণীবিভাজন ছিল তাদের সমাজে। রাজা সুপ্রিম পাওয়ারের মালিক। রাজার অধীন প্রশাসন ছিল দারুণ পেশাদার। শহুরে এবং গ্রামীণ সমাজের আলাদা অস্তিত্ব পাওয়া যায়। গ্রামে যে কৃষিব্যবস্থার প্রচলন ছিল তার মধ্যে একতা এবং সুশৃঙ্খল একটা ব্যবস্থা ছিল। তবে গ্রামের মানুষ অপোকৃত পশ্চাৎপদ ছিল। নবম শতাব্দীতে মায়া সভ্যতার পতন হতে শুরু করে। তাদের অধঃপতনের কারণ রহস্যে ঘেরা। এ ব্যাপারে সবিশেষ জানা যায় না।


মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপ থেকে মায়া সভ্যতার যাত্রা শুরু। প্রথমে একদল যাযাবর এখানে একত্র হয়। পশুপালন ছিল তাদের পেশা। পরে অন্যান্য অঞ্চল থেকে যাযাবররা এখানে আসতে থাকে। এক সময় তারা যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করে। তারা বনজঙ্গল কেটে কৃষিকাজের উপযোগী জমি তৈরি করে। জীবনাচরণের বিভিন্ন েেত্র তারা চরম উৎকর্ষ লাভ করে। আজকের মেক্সিকান সমাজে সে প্রভাব রয়েছে গেছে পুরোদমে।


মেক্সিকো নামের উৎপত্তি নিয়ে নানান মত রয়েছে। একটি উপজাতি নাম থেকে এর উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে মনে করেন এটি যুদ্ধের অবতার এক দেবতার পবিত্র নাম। অথবা মেক্সটিল নামক উপজাতি বা তাদের উপাসনালয় যেখানটায় অবস্থিত তার নাম। তাদের ভাষায় মেটজিলি মানে চাঁদ সেখান থেকে এ নামটি আসতে পারে। মায়া সভ্যতার দান এ দেশটিতে ওলমেক ও আজটেক নামক আরো দু’টি সভ্যতার উন্মেষ ঘটে বিভিন্ন সময়। ১৫১৯ সালে প্রথম ইউরোপীয় আগ্রাসন ঘটে এখানে। তখন পর্যন্ত তিনটি সভ্যতার ছিটেফোঁটা বজায় ছিল। জাতিগত বৈশিষ্ট্যও আলাদা ছিল। স্পেন এ বিভক্তিকে মুছে দিয়ে পুরো অঞ্চলকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করে। সেই থেকে টানা ৩০০ বছর দেশটি ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়। ছোট্ট শহর দালোরস থেকে ১৮১০ সালে দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণা দেন মিগুয়েল হাইডালগো। শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৮২১ সালে দেশটি স্বাধীনতা পায়। এরপরের ইতিহাস নানা উত্থান-পতনের। ক্যু-পাল্টা ক্যুর। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মতারোহণের আগেই নির্মম হত্যা। একনায়কের দীর্ঘ শাসন। ইত্যাদি। দেশটি ফেডারেল সরকার হবে না কেন্দ্রীয় সরকার হবে এ নিয়ে বিভক্তি। বিবদমান রাজনৈতিক দলের বিপরীত মেরুতে অবস্থান দেশটিকে বেশ পিছিয়ে দেয়। যে সময়টাতে পার্শ্ববর্তী দেশ আমেরিকায় নিরবচ্ছিন্ন উন্নতি হয়েছে সে সময়টায় মেক্সিকো সময় নষ্ট করেছে অভ্যন্তরীণ নানা বিবাদ নিয়ে। বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের চারটি দশককে ঐতিহাসিকরা ‘মেক্সিকান মিরাকল’ নামে অভিহিত করে থাকেন। এ সময়ে দেশটিতে প্রভূত উন্নতি হয়। তেলসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদের জাতীয়করণ করে সঠিক ব্যবহার করা হয়। তবে সামাজিক অসমতা দূর করা যায়নি। ধনিক শ্রেণী যেমন বেড়ে গেছে। একটা সংখ্যক মানুষের মধ্যে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। আর দরিদ্রের সংখ্যাও বেড়েছে। এ সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ধনি মানুষটি মেক্সিকোর নাগরিক। মেক্সিকো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশ। সরকারি আয়ের এক-তৃতীয়াংশ আসে এ খাত থেকে। তেল ও আরো নানা প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে সমৃদ্ধি আসেনি। প্রতি বছরই সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকানরা মার্কিন মুলুকে প্রবেশের চেষ্টা চালায়।


আশির দশকে দেশটি নানা রাজনৈতিক টানাপড়েনে পড়ে। এমনকি নব্বইয়ের দশকে দেশটিতে অর্থনৈতিক মান্দা দেখা দেয়। প্রেসিডেন্ট জেডিল্লো কিছুটা সামাল দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিনটন সে দিন তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ফিলিপ ক্যালডরন।


১৯১৭ সালের সংবিধান অনুসারে দেশটিতে তিন স্তরের সরকার কায়েম রয়েছে। ফেডারেল ইউনিয়ন, স্টেট গভর্নমেন্ট এবং মিউনিসিপ্যালিটি প্রত্যেকটি স্তরের কর্মকর্তাই নির্বাচিত প্রতিনিধি। সিনেট ও চেম্বার অব ডেপুটিস নামের দ্বিকবিশিষ্ট আইনসভার সদস্যদের এখতিয়ার ভিন্ন ভিন্ন। নির্বাহী বিভাগের প্রধান প্রেসিডেন্ট। কোনো প্রস্তাবে ভেটো প্রদান মতা রয়েছে তার। প্রেসিডেন্ট ও সিনেটের অনুমোদনে ১১ জন বিচারকের সমন্বয়ে সুপ্রিমকোর্ট গঠিত।


ধনী-গরিব বৈষম্যের পাশাপাশি আদিবাসী সমস্যাও রয়েছে। আদিবাসীরা বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। ১৯৯৪ সালে আন্দোলন-সংগ্রাম চলাকালে ১৫০ আদিবাসী প্রাণ হারান। দেশটি বড় ধরনের ক্রাইম জোন। বিশ্বের সর্বাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটে এখানে। অস্ত্র-মাদক চোরাচালান আর মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য দেশটি।


দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় চারটি স্তর। প্রাথমিক স্তরে রয়েছে ৫ বছর। তিন বছরের মাধ্যমিক শিক্ষা। এরপর তারা তিন বছরের উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে পারে অথবা রয়েছে তিন বছরের টেকনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা। রয়েছে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৪ সালের হিসেবে বয়স্ক শিক্ষার হার ৯১ শতাংশ। একই সময়ে প্রাইমারিতে ছাত্র ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ।


মেক্সিকোর রয়েছে বিশাল সামরিক বাহিনী। তিনটি ভাগে বিভক্ত এবং বারোটি আঞ্চলিক কমান্ডসহ স্থলবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার। তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম। বিমান বাহিনীর আকারও বেশ বড়। রয়েছে ১৮ টি বিমান ঘাঁটি। নৌবাহিনীর জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। এরা দু’টি প্রধান ভাগে বিভক্ত। প্রশান্ত মহাসাগরের অংশকে নাম দেয়া হয়েছে পশ্চিম উপকূলীয় বাহিনী। আর মেক্সিকো উপসাগরে অবস্থিত নৌ কার্যক্রমের নাম দেয়া হয়েছে পূর্ব উপকূলীয় নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর আকার, বিস্তৃতি ও সাজসরঞ্জামও আধুনিক মানের।


মেক্সিকোর উত্তর-দেিণ বিস্তৃত রয়েছে সিয়েরা মাদরে ওরিয়েন্টাল ও সিয়েরা মাদরে অক্সিডেন্টাল পর্বতমালা । এগুলো উত্তর আমেরিকার রকি পর্বতমালার বর্ধিতাংশ। দেশটি সিয়েরা নেভেদা নামক অগ্ন্যুৎপাত বলয়ের মধ্যে অবস্থিত। সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ পিকো ডি ওরিজাবার উচ্চতা ৫ হাজার ৭০০ মিটার। পাহাড় পর্বত সমতল ভূমি আর বনবনানি মিলে প্রকৃতি দেশটিকে অপরূপ সাজে সাজিয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কর্কটক্রান্তি রেখা দেশটির ওপর দিয়ে গেছে। দণিাঞ্চলীয় উপকূল সমুদ্র সমতল থেকে ১ হাজার মিটার উঁচু। এখানকার তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। তবে গ্রীষ্ম এবং শীতকালের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য মাত্র ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মেক্সিকো উপত্যকায় অবস্থিত রাজধানী শহর মেক্সিকো তাপমাত্রা সারা বছরই ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে।


মেক্সিকো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জীব ও প্রাণবৈচিত্র্য সম্পন্ন ১৭টি দেশের একটি। দেশটিতে ২ লাখের বেশি প্রাণী প্রজাতি রয়েছে। ৭০৭ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৪৩৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী নিয়ে দেশটি বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের সংশ্লিষ্ট েেত্র যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। সংবিধান ২ হাজার ৫০০ প্রজাতির প্রাণীকে সংরতি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি যেমন উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্যে ভরপুর তেমনি এ দেশের শাসক ও জনগণ এ অমূল্য সম্পদের প্রতি উদার। ১ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর ভূমিকে সংরতি এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। রয়েছে ৬৪টি জাতীয় পার্ক ও চারটি প্রাকৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ।