হুমায়ূন আহমেদের নুহাশ পল্লীতে যা দেখলাম

Jun 29, 2018 03:24 pm
নুহাশ পল্লী


হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

আসলে প্লান-প্রোগ্রাম করে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, সেটা এই নাগরিক জীবনে ঠিক হয়ে ওঠে না। তার ওপর ওই মানুষটি যদি হোন মিডিয়াকর্মী অর্থাৎ সাংবাদিক, তাহলে তো আর কথাই নেই।


আমার হয়েছে সেই দশা। বাসায় কতবার আলোচনা করেছি, ‘নুহাশপল্লী’তে একবার বেড়াতে যাওয়া দরকার, একবার অবশ্যই যেতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু জীবনের ক্রিকেটমাঠে ব্যাটে-বলে কি আর সহজে মেলে! কাজেই ‘যাব-যাই-যাচ্ছি’ করেই কেটে গেল অনেক অনেকগুলো দিন-মাস-বছর।


এর মধ্যে গত ১৭ ডিসেম্বর (২০১৬) বল এসে আঘাত হানলো উইকেটে। ঘটনাটি এ রকম : ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে যখন অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত (পাঠক লক্ষ করুন, সেদিন কিন্তু বিজয় দিবস অথচ ছুটি নেই), বউ এসে জানাল, পরদিন ছেলে-মেয়ে দু’জনের কারোই কোচিং নেই। মেয়েটা অনেক দিন ধরে বলছে নুহাশপল্লী দেখবে। কাল কি যাওয়া যাবে?


অনুজপ্রতিম (শাহ মুহাম্মদ) মোশাহিদকে ফোন করলাম নুহাশপল্লী পর্যন্ত যাওয়ার সুলুকসন্ধান পেতে। মোশাহিদ শুধু সাংবাদিক-ছড়াকারই নয়, জনাদুই বন্ধুকে নিয়ে ছোটখাটো একজন ট্যুর অপারেটরও। মোশাহিদ জানালো, মতিঝিল থেকে ঢাকা পরিবহনে চড়ে বসলেই হবে। ওরা সব চেনে।


কিন্তু পরদিন সকালে সকালে মতিঝিল গিয়ে দেখলাম, ওরা আসলে কিছুই চেনে না। কী করা! অবশেষে ঢাকা পরিবহনের একজন হোতাপাড়া এলাকাটি চিনল।


এমন সকালেও যানজট। তার মধ্য দিয়েই রিকশার গতিতে চলছে আমাদের বাস। টঙ্গি গিয়ে কেমন যেন সন্দেহ হলো। হোতাপাড়া চিনতে পারা সেই কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা তো মনে হয় হোতাপাড়া যাও না। আমাদের কোথায় নামাবে?


কন্ডাক্টর এবার আসল কথা বলল। আমাদের নামতে হবে গাজীপুর চৌরাস্তা। সেখান থেকে হোতাপাড়া যাওয়ার অনেক গাড়ি মিলবে।
তা-ই হলো। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে হোতাপাড়া ১২ কিলোমিটার দূরে। যেতে হলো লেগুনায়। হোতাপাড়া থেকে পিরুজালি গ্রাম অর্থাৎ নুহাশপল্লীর দূরত্ব আরো আট কিলোমিটার। যেতে হবে রিকশা, অটোরিকশা অথবা অটোবাইকে। পেলাম একটা অটোবাইক। ভাড়া হাঁকল দুই শ’ টাকা। আপত্তি জানাতেই বাইকঅলা বিনয়ের অবতার : ‘আপনারা যদি না দেন...’


অবশেষে দেড় শ’ টাকায় রফা করে চলতে শুরু করল অটোবাইক। চলছে তো চলছেই। এ পথ যেন ফুরোবার নয়। গ্রামীণ রাস্তা। লোক চলাচল বলতে গেলে নেইই। দু’পাশে বিরান ক্ষেত, মাঝে মাঝে দু-একটা জীর্ণ বাড়ি, একটা-দু’টো টিনের বাড়িও আছে। বোঝাই যায়, সেই চিরকালীন গ্রামবাংলা; দারিদ্র্য যার অঙ্গের ভূষণ।


অনেক পথ পেরিয়ে, অনেক সময় কাটিয়ে আমরা এসে নামলাম নুহাশপল্লীর গেটে। ঢুকতে হয় টিকিট কেটে। টিকিটের দাম শুনে দ্বিতীয় দফা ভিরমি খেলাম মাথাপিছু দুই শ’ টাকা! কী আর করা। পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।


এত কিছু সেরে নুহাশপল্লীতে ঢুকতেই মনটা জুড়িয়ে গেল। প্রিয় লেখকের স্বপ্ন ও স্মৃতিমাখা নন্দনকানন এটাই! কত যতœ করে হুমায়ূন আহমেদ সাজিয়েছিলেন এই সবুজ স্বর্গ! তিনি আজ কোথায়! ভাবতেই বিষাদে ছেয়ে গেল মনটা।


পল্লীর মূল ফটক পেরোলেই চোখে পড়ে সবুজ ঘাসের গালিচা। হাঁটতে লাগলাম। ১৯৯৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ গড়ে তোলেন নুহাশপল্লী। ৪০ বিঘার এ বাগানবাড়িতে আছে আড়াই শ’ প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ওষধি গাছ। প্রতিটি গাছের গায়ে সেঁটে দেয়া আছে পরিচিতি ফলক।
খোলা মাঠের মাঝখান ধরে হাঁটছি। একটু এগোতেই গাছের ওপর ছোট একটি ঘর। উঠতে হবে মই বেয়ে। কৌতূহলী দর্শকদের ভিড় ওখানে। সবার চোখেমুখে অব্যক্ত জিজ্ঞাসা, কী আছে ওখানে? বিচিত্রস্বভাব হুমায়ূন আহমেদের কাণ্ড। তিনি নিজেও নাকি মাঝে মধ্যে ওই বৃক্ষবাড়িতে উঠে বসে থাকতেন।


পল্লীতে ঢুকেই হাতের ডানে হুমায়ূন আহমেদের পাথরে আঁকা প্রতিকৃতি, যেন আগত মানুষদের একমনে দেখে চলেছেন তিনি। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথকে : দিনের পথিক মনে রেখো আমি এসেছিলাম রাতে/সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে।


অল্প কিছু দূর যেতেই বৃষ্টিবিলাস। এই বাড়ির খোলা আঙিনায় বসে বৃষ্টি উপভোগ করতেন হুমায়ূন আহমেদ।
ভেষজ বাগানকে বামে রেখে ডানে তাকাতেই ছোট একটি পুকুর, তাতে এক মৎস্যকন্যা। আবার সামনে যাই। ডানে ডাইনোসরের ভাস্কর্য, বাঁয়ে গ্রামীণ বাড়ি। তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হলো।


পল্লীর শেষ প্রান্তে দীঘি লীলাবতী। সেই দীঘির একেবারে মধ্যিখানে একটি টঙঘর। হুমায়ূন আহমেদ নৌকায় করে ওই টঙঘরে গিয়ে একা বসে থাকতেন। কী ভাবতেন, কে জানে!


দীঘির সুন্দর ঘাটে, তার চার পাশে দর্শনার্থী একেবারে কম নয়। তারা হুমায়ূন আহমেদের হাতে গড়া নন্দনকাননে আছে, কিন্তু কারো চিন্তাচেতনায় হুমায়ূন আহমেদ নামের অসম্ভব মেধাবী ও সৃষ্টিশীল মানুষটি আছেন বলে মনে হলো না। সবাই হাসছে, কলকল করছে, ছবি তুলছে।


হুমায়ূন আহমেদের সমাধিস্থলে গিয়েও একই দৃশ্য। দু’জনকে দেখা গেল সেলফি তোলায় ব্যস্ত। কী অদ্ভুত এই জেনারেশন!
অল্পক্ষণ পরে শুনি এক মহিলা বলছেন, কী দেখার আছে এখানে। এসব তো আমাদের গ্রামেও আছে। কাকে বলি, কিভাবে বলি যে, এখানে কিছুই নেই। আছেন শুধু হুমায়ূন আহমেদ; অদৃশ্যে যদিও।


অবশ্য মহিলাকেই বা দোষ দেই কী করে! নুহাশপল্লী দেখাশোনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তারা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু দুই শ’ টাকা ফি আদায় করেই খালাস বলে মনে হলো। তারা নুহাশপল্লীকে শতভাগ ট্যুরিস্ট স্পট বানিয়ে ফেলেছে। এটা যে তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি কিছু, কে বোঝাবে?


যদি তারা তা বুঝত তাহলে ওখানে থাকত হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংগ্রহশালা ও বিক্রয়কেন্দ্র, হুমায়ূন আহমেদ জাদুঘর, তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ইত্যাদি অনেক কিছু।


তা না থাক, হুমায়ূন আহমেদ তো আছেন! যারা শুধুই সময় কাটাতে বা ‘নতুন কিছু’ দেখতে নুহাশপল্লী যাবেন, তারা পল্লীটি দেখে খুশি বা হতাশ দু’টোই হতে পারেন, কিন্তু হুমায়ূনপ্রেমী মানুষ এই প্রাকৃতিক নন্দনকাননে এসে মোটেই হতাশ হবেন না, এটা নিশ্চিত বলা যায়। কেননা, এই পল্লীর ঘাসে, গাছে, মাটি ও পানিতে যে মিশে আছেন প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ!