চীন যেভাবে ধনী দেশ হলো

Jun 27, 2018 04:53 pm
সাংহাই সিটি

বিল ম্যাককিবেন
ভাষান্তর : হায়দার জুলফিকার

চায়না ডেইলিতে মজার একটা রিপোর্ট পড়লাম। বেইজিংয়ে অনেক এয়ারকন্ডিশনার কর্মী মারা গেছেন। গরম বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে এয়ারকন্ডিশনের ব্যবসা। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে এয়ারকন্ডিশনার কর্মীরা। অফিসগুলো হয়ে পড়েছে কর্মিশূন্য। অনেকে সাময়িকভাবে নবিস কর্মচারী নিয়োগ দিচ্ছে। তাদের অনেকে খরচ বাঁচাতে এমনকি সেফটি গ্লাভসও ব্যবহার করেন না।

ছড়িয়ে পড়ছে শহর। বাড়ছে এয়ারকন্ডিশনার কর্মচারীর চাহিদা। দৃশ্যটা চীন সম্পর্কে আমার ধারণার কাছাকাছি। রিপোর্টটা তাই কেটে ফাইলবন্দী করলাম। কাজটা অবশ্য অনেক দিন ধরেই করছি। এই রিপোর্টগুলো থেকে অন্যরকম একটা চীনের ছবি ভেসে ওঠে। আকাশে-বাতাসে ধোঁয়া, কারখানাগুলোতে শ্রমিক অব্যবস্থাপনা। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে একটা কনজুমার শ্রেণী। তাদের প্রতিযোগিতা গাড়ি কেনার দিকে। পরিবেশের দিকে কারোর কোনো খেয়াল নেই। পুরো ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখার ইচ্ছা হলো আমার। হঠাৎ প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকলে পরিবেশের কী বারোটা বাজে তার আরেকটা উদাহরণ দেখবÑ এ রকমটাই ধারণা ছিল তখন।

একটা রিপোর্টে আসলে কোনো জায়গা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া কঠিন। রিপোর্টের বক্তব্য যে ভুল তাও নয়। কারখানার দুরবস্থা নিয়ে অসংখ্য রিপোর্ট আছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি বা পরিবেশ বিপর্যয় নিয়েও রয়েছে অসংখ্য রিপোর্ট। কিন্তু সেগুলো থেকে চীনের সঠিক চিত্রটি কল্পনা করা কঠিন।

তিন দিন হয়েছে চীনে এসেছি। একটা ভক্সওয়াগন জেটা কারে জিনিসপত্র গাদা করেছি। ড্রাইভিং করছেন একজন সফটওয়্যার ডিজাইনার। নাম ওয়েন জাই। পরিচয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। আমাদের গন্তব্য রংচেঙ বাণিজ্যিক এলাকা। জায়গাটা বেইজিংয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। রংচেঙ গ্রাম্য এলাকা। কিন্তু অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে এখানে। হাইওয়ে তৈরি হয়েছে তিয়ানজিন পর্যন্ত। তিয়ানজিন হলো চীনের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম বন্দর। কথা হলো ‘হেবেই রংচেঙ লি জিয়া’ কোম্পানির মালিক বাও-জি-জুনের সাথে। শাওয়ার-পর্দা তৈরি করেন তিনি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। লম্বা গড়ন, পেটা শরীর। বছর তিন আগে বেইজিংয়ের এক ফ্লাটে ব্যাবসা শুরু করেছিলেন। এক বছরের মাথায় এই জায়গাটা লিজ নেন। এখন তার কর্মচারীর সংখ্যা একশ’। ঘরে ঘরে ঘুরে দেখলাম আমরা। অধিকাংশ কর্মচারীর বয়স ১৮ থেকে ২২-এর মধ্যে। বিরাট টেবিলের ওপর মোটা পলিয়েস্টারের রোল। কেউ সেলাই করছে, কেউ রিঙ লাগাচ্ছে, অন্যরা পর্দাগুলো প্যাকেট করছে।

গ্রীষ্মে কাজ চলে সকালে সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১১টা, আবার ওদিকে বিকেল ৩টা থেকে ৭টা পর্যন্ত। খুব অল্প সময়ই সেখানে ছিলাম। এর মধ্যেই কাজের বিরতি হলো। সব কর্মচারীই লাঞ্চের জন্য ভিড় জমাচ্ছিল ক্যাফেটরিয়ায়। ভাত, সবুজ সিম, বেগুনের স্টু, একটা ফলের ডেজার্ট আর বড় এক বাটি স্যুপ। দাম ১.৭ ইয়ান; ডলারের হিসাবে ২০ সেন্টের মতো।

খাওয়ার সময়টাতে মেয়েদের ডরমিটরিটা ঘুরে দেখলাম। প্রত্যেক রুমে চারটে করে বাঙ্কার বিছানা। একটাতে স্যুটকেস আর কাপড়-চোপড় রাখার ব্যবস্থা। অন্যগুলো বিশ্রামের জন্য। একটা রুম চার থেকে পাঁচজনের জন্য। প্রত্যেক রুমে একটা ডেস্ক রয়েছে ব্যবহারের জন্য। সিলিং ফ্যানও রয়েছে একটা। ডরমিটরির সাথেই লাউঞ্জ। সেখানে বিশাল সাইজের একটা টিভি। পাশের রুমেই রয়েছে পিংপং খেলার সরঞ্জাম। কারখানার মালিক বাও বলল, খেলায় কোনো কর্মচারী তাকে হারাতে পারলে তাকে একটা বিয়ার পুরস্কার দেয়া হয়।

কর্মচারীদের অধিকাংশই বাওয়ের নিজের রাজ্যের লোক। যত খুশি শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নেয়ার অনুমতি দিল বাও। ডু পিটাংয়ের বয়স ২০-এর মতো। উজ্জ্বল চোখ, মুখে বোকা বোকা হাসি। তার মাসিক রোজগার ১ হাজার ইয়ান। দুই বছরও হয়নি, এরই মধ্যে ১২ হাজার ইয়ান জমিয়েছে সে। আর বছর দু-এক বা তার কিছু বেশি কাজ করে একটা বাড়ি বানানোর অর্থ জমলেই বিয়ে করার ইচ্ছা তার। ১৮ বছরের লিউ জিয়া কাজ করছেন তার ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার টাকা জোগাতে। অবশ্য এরই মধ্যে তার ভাই শানডং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে।

এই কারখানাটি কি ব্যতিক্রম? কারণ রিপোর্টে দেখা গেছে চীনের হাজার হাজার কারখানা শ্রমিক প্রতি বছর দুর্ঘটনায় হাত হারাচ্ছে, আঙুল হারাচ্ছে। কিন্তু বাওয়ের হিসাব মতে চীনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কারখানার সুযোগ-সুবিধা এই কারখানার মতোই। অবশ্য বাওয়ের ব্যক্তিত্বটাও তার কারখানার সুনামের একটা কারণ। বেশ ভদ্র একজন মানুষ বাও। আরেকটা কারণ আছে। তার কারখানায় তৈরি পর্দার একটা অংশ বিক্রি হয় আইকা কোম্পানির কাছে। আইকা কোনো ঘোষণা ছাড়াই তাদের প্রতিনিধি পাঠায় এখানে। বছরে বেশ কয়েকবার আসেন তারা। এসে কাজের পরিবেশ দেখেন, সুযোগ-সুবিধা যাচাই করেন। এখানকার ক্রমোন্নতিটা তাদের চোখেও বেশ পরিষ্কার। ‘এসব সুযোগ-সুবিধা দিতে গিয়ে খরচ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু আমার কারখানার পরিবেশ উন্নত দেশের কারখানাগুলোর মতোই এটা ভাবতেই ভালো লাগে আমার’, বলল বাও।
বাওয়ের কারখানাটির মতো আরো কিছু কারখানা পরিদর্শনের ভেতর দিয়ে আমার শিক্ষা শুরু হলো। কিন্তু চীন সফরের শেষভাগে ইউই শহর পরিদর্শন করার পরেই আমি বুঝতে পারলাম চীনের শিল্পবিস্তারের মাহাত্ম্য।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সিটিটি এই ইউই শহরেই। এই শহরের প্রত্যেকটি জিনিসই যেন চীনের প্রাচীরের মতোই অসাধারণ। জায়গাটির পাঁচ ভাগের মাত্র দুই ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু যে দু’টি বিশালকায় বিল্ডিং এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে, ও দু’টি ঘুরে দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় পৃথিবীর যেকোনো জিনিসই চীনে কত সস্তায় তৈরি করা সম্ভব।

স্যুটকেস, ব্যাগ আর স্কুলব্যাগ তৈরির স্টলগুলো একটি উদাহরণ। ৩ মিটার বাই ৪ মিটার দৈর্ঘ্য-প্রস্থের ৮০০টি স্টল রয়েছে সেখানে। প্রত্যেকটিই একটি ছোট কারখানা। ক্রেতাদের নিজেদের তৈরি পণ্য দেখাচ্ছে সবাই। ১০-২০ থেকে শুরু করে ৩০ হাজার ব্যাগেরও অর্ডার পায় এক একটি কারখানা। এই স্যুটকেস আর ব্যাগ তৈরির কারখানাগুলো আছে একটা ফ্লোরের মাত্র অর্ধেকটা জুড়ে। এর উপরের তলার পুরোটা জুড়ে হার্ডওয়্যার যন্ত্রপাতি আর ফিটিংসের স্টল। এই তলায় বলতে গেলে পৃথিবীর সব জিনিসই পাওয়া যায়। কারের জ্যাক থেকে নিয়ে পনির তৈরির মেশিন সবই মিলবে এখানে।

এক নম্বর বিল্ডিংটার শত শত দোকান জুড়ে রয়েছে খেলনার পসরা। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর আপনি পৌঁছবেন ইলেকট্রিক খেলনার স্টলগুলোতে। এরপরই বাতাসে ফুলানো রাবারের খেলনার সম্ভার। আর সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ফাইবার আর ফোমে তৈরি খেলনা। এর উপরের তলায় কৃত্রিম ফুল আর অলঙ্কারের দোকান। তারও উপরে পর্যটকদের জন্য বিশেষ উপহারের বিশাল সমাহার। পৃথিবীর সবরকম উপহারসামগ্রীই বোধকরি এখানে আছে।

ইউই পরিদর্শনের পর আগে দেখা কারখানাগুলোর ব্যাপার আরো পরিষ্কার হলো। সিচুয়ান পার্বত্য এলাকার একটি গ্রামপ্রধান জায়গা চানমিঙ। এখানকার অধিকাংশ লোকই স্থানীয় কয়লাখনিতে কাজ করে। খনির ভেতরে বেশি সময় থাকে না এরা। বিস্ফোরণ যাতে না ঘটে সে ব্যাপারেও যথেষ্ট সাবধান সবাই। কারণ খনি দুর্ঘটনা থেকেই চীনে প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার খনিশ্রমিক মারা যায়। জায়গাটা কিছুটা ভীতিকর বটে।

সঙ্গী দোভাষীকে সাথে নিয়ে আঙিনায় ছড়ানো-ছিটানো দেয়ালঘেরা ঘরগুলো ঘুরে দেখলাম। সাত থেকে আটটি পরিবারের বাস ওই জায়গাটিতে। রান্নাঘরের পাশের ঘরটাতে কতগুলো শূকরছানা রাখা। সেখানে কথা হলো ১২ বছরের ঝাও লিনতাওয়ের সাথে। গর্বিত ভঙ্গিতে ইংরেজি বলছিল মেয়েটা। ইংরেজিটা শিখেছে গ্রামের স্কুল থেকে। কিভাবে দিন কাটে জানতে চাইলে জলে চোখ ভিজে উঠল তার। মা শহরে গেছে কারখানায় কাজ করতে। আর ছোট বোনসহ তাকে রেখে গেছে বাবার কাছে। কিন্তু বাবা তাদের মারধর করে। সে জন্যই কান্না। নবম গ্রেড পর্যন্ত এদের পড়াশোনার খরচ দেয় সরকার। কিন্তু তারপর পড়াশোনা করার আর সামর্থ্য থাকে না।

এ রকম ঘটনা লাখো-কোটি। এগুলো শুনলে বোঝা যায় কেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিবাসন ঘটতে চলেছে চীনে। প্রতি বছর কোটি কোটি পরিবার দরিদ্র খামার ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে কারখানায় কাজের আশায়। এদের পরিশ্রমেই সচল রয়েছে ইউই শহরের কারখানাগুলো।

এত কিছুর পরও গ্রামাঞ্চল কিন্তু থেমে নেই। শহরের জৌলুশের চেয়ে চীনা গ্রামাঞ্চলের প্রাণবন্ত রূপটাই বেশি আকর্ষণ করেছে আমাকে। গ্রাম্য এলাকার খামারগুলো আকারে গড়ে ৬৭০ বর্গমিটারের মতো। একটা ফুটবল মাঠের ১০ ভাগের এক ভাগ হবে। প্রায় ৮০০ মিলিয়নের মতো মানুষ বাস করে এই গ্রাম্য খামারগুলোতে। এই জনসংখ্যা চীনের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ। গড়ে এদের আয় শহুরেদের এক-তৃতীয়াংশের সমান। এসব দেখলে সহজেই বোঝা যায় আমেরিকা কেন বলছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশ চীনা বাস করবে শহরাঞ্চলে। শহরমুখী মানুষের এই স্রোত থামাতে হলে গ্রাম্য এলাকার মানুষদের আয়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। সে চেষ্টাও অবশ্য শুরু হয়েছে। এদেরই একজন রেন জুপিং। সিচুয়ান প্রদেশের রাজধানী চেংডু এলাকার কাছাকাছি তার বাস। আর ১০ জনের মতোই দরিদ্র জীবনযাপন করত সে। ১৯৮৪ সালে মার্কিন গ্রামোন্নয়ন সংস্থা হেইফার ইন্টারন্যাশনাল তাকে ৪৮টি খরগোশ দেয়। সেই সাথে শিখিয়ে দেয় কিভাবে ওগুলোর ব্রিডিং করতে হয়। ‘এটা যে বিনামূল্যের জিনিস, সেটা প্রথমে বুঝতেই পারিনি’, সে বলল। ‘মনে হয় এটা যেন আকাশ থেকে নেমে আসা উপহার।’

কয়েক বছরের মধ্যে খরগোশ উৎপাদন করে কোটিপতি হয়ে গেল রেন। কিন্তু সম্পদ বিনিয়োগ-বণ্টনের হেইফারের থিওরিটি মাথায় ঢুকে গেছে তার। খুব দ্রুত প্রকল্পের সব খামারির জন্য ২০টি করে খরগোশ বরাদ্দ করে সে। আর ব্রিডিংয়ে প্রশিক্ষণ দিতে গড়ে তোলে একটা স্কুল। হেইফারের হিসাব বলছে এরই মধ্যে তিন লাখ খামারিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে সে। তার হিসাব মতে এই বিদ্যা দিয়ে এক বছরের মাথায় বার্ষিক ১০ হাজার ইয়ান আয় করা সম্ভব।

কিন্তু হেইফারের মতো প্রকল্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সেই তুলনায় শহরমুখী মানুষের স্রোত অনেক প্রখর। এক স্যাঁতসেঁতে রাতে বেইজিং থেকে গ্রাম্য এলাকায় ঘুরতে গেলাম। এক সময়কার গ্রাম, এখন চারদিকে শহর দিয়ে ঘেরা। হাজার হাজার অভিবাসীর বসবাসের জায়গা এখন এই গ্রাম। অন্ধকার গলিপথ ধরে ৫৭ বছর বয়সী কাউ ঝংলঙের বাড়িতে হাজির হলাম আমরা। জিয়াংজি প্রদেশ থেকে ১৯৮৭ সালে এখানে এসেছে সে। ‘আমাদের এখানে খাবারের অভাব’, বলল সে। ‘গোশত তো পাওয়াই যায় না।’

কাউয়ের আত্মীয়রা একটা দল গড়েছে। এরা নানান জিনিস তৈরি করে। কাউ এই জিনিসগুলো তিন চাকার সাইকেলে নিয়ে ফেরি করে বেড়ায় ব্যস্ত এলাকাগুলোয়। অনেক আগে সিরামিক টাইলিং শিখেছিল কাউ। প্লাস্টারিং আর পেইন্টিংও শিখেছিল। এসব নিয়ে তার নিজের ব্যবসাও আছে। জমানো টাকায় দু’টি বাড়ি নির্মাণ করেছে সে। একটিতে তার মা থাকে। আরেকটি ভাড়া দেয়া। তার দ্বিতীয় মেয়ে গেল বসন্তে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে। মাসিক ২ হাজার ৪০০ ইয়ান বেতনে এক ফার্মাসিউটিক্যালসে এখন কাজ করছে সে। কাউকে জিজ্ঞেস করলাম মেয়েটার জন্মের সময় তার কি মনে হয়েছিল তার মেয়েটা কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে! আমার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল কাউ।

বেইজিংয়ে অল্প কয়েক দিন ছিলাম। পরিবেশবাদী সাংবাদিকদের আমন্ত্রণে সেখানে তাদের মাসিক মিটিংয়ে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। ৪০-এর বেশি সদস্য একটা স্যাঁতসেঁতে কনফারেন্স রুমে একত্র হয়েছিল। হুবেই প্রদেশের অবসরপ্রাপ্ত এক সিভিল সার্ভেন্ট ইয়ান জিয়ানলি। তিনি কিছু ছবি দেখালেন। সঙ্গী-সাথী মিলে হান নদীর উপকূলে ২০০ কিলোমিটার হেঁটেছেন তারা। ছোট ছোট কারখানাগুলো থেকে নিষ্কাশিত দুর্গন্ধ বাষ্পে ভয়াবহ দূষিত হয়ে পড়েছে হান নদীর পানি। ছবিতে দেখলাম ইয়ান আর তার সঙ্গীরা বড় বড় সবুজ পতাকা দোলাচ্ছেন। পতাকায় চীনা ভাষাতে লেখা : ‘নদী-মাতাকে বাঁচতে দাও’। একটা ছবিতে দেখলাম প্রায় ৩ হাজার মানুষের এক সমাবেশে কথা বলছেন ইয়ান। এদের মধ্যে ১১০ জনের ক্যান্সার, জানালেন ইয়ান। গ্রামের লোকেরা অভিযোগ করার পরে নতুন একটি কূপ খননের জন্য অর্থ দিয়েছে প্রাদেশিক গভর্নর, যাতে গ্রামের লোকেরা অন্তত বিশুদ্ধ খাবার পানি পায়।

কয়েকটি হিসাবে দেখা গেছে, চীনে বছরে প্রায় ৭০ হাজার প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। এগুলোর অনেকটাই হয় কারখানাগুলোর বর্জ্য নির্গমনের প্রতিবাদে। চীনা কর্তৃপক্ষও সচেতন হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টি যেমন প্রতিজ্ঞা করছে একটা ‘গতিশীল’ অর্থনীতির জন্য কাজ করবে তারা। দলটি ইউরোপীয় পরিবেশবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত। ডেনমার্কে এ ব্যাপারটা আছে। ওখানে বিদ্যুৎ অফিস, ওষুধ কোম্পানি, হার্ডবোর্ড তৈরির কারখানা আর তেল পরিশোধনের কারখানাগুলো পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে এক কারখানার বর্জ্য আরেক কারখানা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। চীনে ব্যাপারটা অতটা এগোয়নি এখনো। পুরো ব্যাপারটা এখনো কনফারেন্স আর বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণার মধ্যেই রয়েছে। এসব প্রকল্পে সালফার বর্জ্য থেকে সার তৈরি করা হবে।

দূষণের কথা বাদ দিলেও চীনের বড় সমস্যাটি অন্য জায়গায়। এখানকার সব প্রক্রিয়ার পেছনেই রয়েছে হাজার বছর ধরে চলে আসা রীতি আর ব্যবস্থা। বিশেষ করে গত অর্ধ শতকে যেসব অপব্যবহার হয়েছে সেগুলো আদর্শিকভাবেও প্রভাবিত ছিল।

চীনের বিপর্যস্ত চেহারাটা আরেকটু ভালো করে দেখার জন্য চাও নদী দেখতে গেলাম। বেইজিংয়ের পুরাতন জলাধারের প্রধান উৎস এই চাও নদী। দেখলাম নিচু জমিতে ফসল থাকলেও পাহাড়গুলো গাছপালাবিহীন। ১৯৫৮ তে চীনের মহান ত্রাতা এক অগ্রযাত্রার ডাক দিয়েছিলেন। জনগণ তাদের বাড়ির পেছনে স্টিল উৎপাদন শুরু করেছিল। স্টিল তৈরিতে আগুন দরকার। আগুনের জন্য দরকার কাঠ। স্বাভাবিকভাবেই গাছশূন্য হয়ে পড়ে পাহাড়গুলো।

বনের মতো তৃণভূমিও উধাও হয়েছে। শহুরে মার্কেটগুলোতে গোশতের বাজার জমে ওঠার সাথে সাথে বাড়ছে গ্রামাঞ্চলের পশুর সংখ্যাও। আমেরিকান পরিবেশবাদী লেস্টার ব্রাউন দীর্ঘদিন পড়াশোনা করছেন চীনে। তার হিসাব বলছে চীনে প্রায় ৩৩৯ মিলিয়ন ছাগল আর ভেড়া রয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে এদের সংখ্যা মাত্র ৭ মিলিয়ন। ‘এমন জায়গাতেও ছিলাম যেখানে খামার মালিকরা তাদের গবাদিপশুর মাথায় কাপড় পরিয়ে দিত যাতে সেগুলো অন্যের পশুর সাথে মিশে না যায়’, জানাল লেস্টার।

গাছ নেই। মাটি ধরে রাখার মতো শেকড়ও নেই। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকা তাই মরুভূমি হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর মরুভূমি লম্বা হচ্ছে শত শত কিলোমিটার। এপ্রিল-মে’র ধূলিঝড়ও এখন চীনা আবহাওয়ার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। যেমন স্বাভাবিক বসন্ত কিংবা হেমন্ত।
বৃক্ষরোপণ প্রচারণায় সচেতন হচ্ছে সরকারও। চাও নদী দেখতে যাওয়ার পথে অনেক বাদামি রঙের পাহাড় চোখে পড়ল। মনে হচ্ছে যেন পুড়ে গেছে পাহাড়গুলো। মাঝে মাঝে চর্মরোগীর মতো সাদা সাদা স্পট। কাছাকাছি হতেই বুঝতে পারলাম ওগুলো সাদা পাথরেঘেরা ছোট ছোট কূপ। চারাগাছে পানি দেয়ার জন্য ওগুলোতে পানি জমানো হয়। এরকম কূপ রয়েছে হাজার হাজার। কত মানুষকে এ জন্য কাজ করতে হয়েছে সেটা কল্পনা করা কঠিন।

তবে এসব করেও চাও নদীর চেহারার অবশ্য তেমন পরিবর্তন করা যায়নি। তবু যত নদীর উজানের দিকে যাচ্ছিলাম, সবুজের পরিমাণ ততই বাড়ছিল। গহিন গ্রামের এক বৃদ্ধের সাথে কথা হলো আমাদের। সাত বছর আগেও এ জায়গার অবস্থা ছিল অনেক খারাপ। তখন সরকার তাদের ৪ হাজার ইয়ান দিয়েছিল জমিতে বেড়া দিয়ে সংরক্ষণের জন্য। এখন এখানে ঘাসের সমুদ্র।

দক্ষিণে বৃষ্টি-বাদল কিছু থাকলেও উত্তরাঞ্চল শুকিয়ে গেছে। চাও নদী বেইজিং পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। চলতি পথের শহরগুলো চুষে নেয় এর পানি। ফলে বেইজিংয়ের পানির চাহিদা মেটাতে তুলতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি। এতে খরার সময় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় অনেক নিচে। ‘চায়না’জ ওয়াটার ক্রাইসিস’ বইয়ের লেখক মা জুন। তিনি জানালেন আট থেকে দশ বছরের মধ্যে পানিশূন্য হয়ে পড়বে কিছু কিছু উত্তরাঞ্চলীয় শহর। সমস্যা সমাধানে বিরাট প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ইয়াংজি নদী আর এর উপশাখাগুলোর পানি শুকনো এলাকায় সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে। কিন্তু এতে উল্টো আরো বাড়ছে পরিবেশগত আর সামাজিক জটিলতা।

চাও নদীর উৎসমুখে পৌঁছে কতগুলো উপত্যকা পেরিয়ে আবার শুকনো সাদা নদীর কূল ধরে বেইজিং ফিরে এলাম। ফিরতি পথে চোখে পড়ল একাধিক নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের টাওয়ার। এসব প্রকাণ্ড স্টিলের টাওয়ার আর বিদ্যুতের তারগুলো চীনের প্রাচীরের মতোই পর্বতের পর পর্বত ঘিরে রেখেছে। ২০০৪ সালে বৈদ্যুতিক গ্রিডে ৫০ গিগাওয়াট যোগ করেছে তারা। ২০০৫ সালে করেছে ৭০ গিগাওয়াট। হিসাব করে দেখুন বছরে তারা যেটুকু বিদ্যুৎ অতিরিক্ত উৎপাদন করছে তা ভারতের পুরো উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেক! পৃথিবীর কোথাও এত দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির রেকর্ড নেই।

চীনের নতুন সব ক’টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রই চলছে কয়লা দিয়ে। কয়লা আছেও তাদের প্রচুর। নীতিনির্ধারকরা ঘোষণা করেছেন এখন থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দুটি করে পারমাণবিক রিয়্যাক্টর তৈরি করা হবে। এটা করতে পারলেও চাহিদার মাত্র ৪ শতাংশ বিদ্যুৎ আসবে এই পারমাণবিক রিয়্যাক্টরগুলো থেকে। দরকারেই বলা যায় চীনকে কয়লা পোড়াতে হবে। চলতি হিসাবে বছরে ২ বিলিয়ন টন কয়লা পোড়াচ্ছে তারা। কয়লার পর্যাপ্ত উৎপাদন আর সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ঘাটতি হচ্ছে বিদ্যুতের। ২০০৪ সালে ৩১টি রাজ্যের ২৩টিতেই বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল। কয়েকটি রাজ্যের বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো সপ্তাহে মাত্র তিন-চার দিন চালু থাকে। এ তথ্য জানালেন বেইজিংভিত্তিক এনার্জি ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াং ফুকিয়াং।

গ্রামের যে খামারিরা সারি বেঁধে শহরে ঢুকছে, তাদের জন্যই বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। ইয়াং বললেন, প্রত্যেক বছর ২০ মিলিয়নের মতো মানুষ শহরে আসছে। ছোট একটা রেফ্রিজারেটর বা এয়ারকন্ডিশনার কেনার অর্থ এরা খুব সহজেই উপার্জন করতে পারে। শাওয়ার পর্দা বা স্যুটকেস বানিয়ে তারা রোজগার করছে। এগুলো তৈরিতেও বিদ্যুৎ দরকার। আর বিল্ডিং তো আছেই। কনক্রিটের সামান্য একটা কুঁড়েঘর তৈরিতেও পরোক্ষ বিদ্যুৎ দরকার। চীনের ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ খরচ হয় শুধু সিমেন্ট উৎপাদনে।

আর হ্যাঁ, কার তো আছেই। বছর দশেক আগে হাতে গোনা যেত গাড়ির সংখ্যা। অথচ চীনে আজ বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ কার মার্কেট। ২০০৫ সালের প্রথম অর্ধেকে কার বিক্রি বেড়েছে ১০ শতাংশ। আর অটোমোবাইল নির্মাতারা এক বছরে গাড়ি বিক্রি করেছে ৫.৬ মিলিয়ন।

প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে যে সমস্যাও বাড়ছে এটা চীনারাও জানে। চীনের ডেপুটি পরিবেশমন্ত্রী প্যান ইউ বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক চমক খুব শিগগিরই থেমে যাবে, কারণ পরিবেশ প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দূষিত শহরের পাঁচটিই চীনে। এখানকার এক-তৃতীয়াংশ ভূমিতে এসিড বৃষ্টি হচ্ছে। চীনের সাতটি বড় বড় নদীর পানির অর্ধেকই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক এই প্রবৃদ্ধি ছাড়া শহরমুখী মানুষের স্রোত সামাল দেয়াও কঠিন। গ্রামের একজন যখন শুনবে যে শহরের মানুষ গোশত খাচ্ছে, তখন কিভাবে তাদেরকে গ্রামের ওই ৬৭০ বর্গমিটার জায়গায় আটকে রাখবেন?
সে জন্যই শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছে চীন। এক দিকে বিশাল শ্রমশক্তিকে কাজও দিতে হবে, আবার সম্পদ ব্যবহারেও সাবধান হতে হবে, যাতে চীন একেবারে ধ্বংস হয়ে না যায়।

চীনের লক্ষ্য হলো বর্তমানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দ্বিগুণ ব্যবহার করে ২০২০ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে চারগুণ বড় করা। কিন্তু গত দুই বছরে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে সেই লক্ষ্য সম্ভবত অর্জন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু কাগজে কলমে অন্তত নতুন বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করেছে সরকার। এতে আগের তুলনায় এপার্টমেন্টগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরো ৫০ শতাংশ বাড়বে। পাশাপাশি ভারী শিল্পগুলোর জন্য বিদ্যুতের ভর্তুকি দেয়াও বন্ধ হবে।

চীনের শেষ রাতে বান্ড এলাকায় হাঁটাহাঁটি করছিলাম। হুয়াংপু নদীর তীর ঘেঁষা পুরান ইউরোপীয় কিছু বাড়ি নিয়ে এই বান্ড এলাকা। নদীর ওপারে পুডং জেলা। চীনের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ শহর গড়ে উঠছে ওখানে। দাঁড়িয়ে আছে নিওন সাইনে ঝলমল জিন মাও টাওয়ার। এই টাওয়ারের শীর্ষ ৩৪ তলা নিয়ে পৃথিবীর উচ্চতম হোটেল। আরো দাঁড়িয়ে আছে ওরিয়েন্টাল পার্ল টিভি টাওয়ার। টাওয়ারের গ্লোবগুলো লাল আভা ছড়াচ্ছে আকাশের গায়ে। রয়েছে অডোরা বিল্ডিং। এর বাইরে বিরাট টিভি স্ক্রিন। বিজ্ঞাপনের পর বিজ্ঞাপন চলছে সেখানে। হাজার হাজার লোক রয়েছে যারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এই আলোকসজ্জা দেখে। এদের অনেকেই গ্রাম থেকে আসা খামারি। অনেকেরই পোশাক মলিন, চেহারা রোদে পোড়া, তামাটে।

ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিপর্যয় থেকে চীন বের হতে পারবে কি না জানি না। তবে হুয়াংপু নদীর ওপারের যে আলোকিত দৃশ্যপট তাতে আশার আলো রয়েছে সে সব অসংখ্য মানুষের জন্য যারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখছেন এই আলোকসজ্জা।