ইরানে সরকার চলে কিভাবে

May 28, 2018 01:08 pm
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ চার বছর

 


সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে কেন্দ্র করেই বিপ্লবের পর এই পদটি সংবিধানে সৃষ্টি করা হয়। তিনি ইরানের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বা কাঠামোর সর্বোচ্চে বা শীর্ষে অবস্থান করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার আসনে বসেছেন। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বিচার বিভাগের প্রধান, অভিভাবক পরিষদের ছয়জন সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীগুলোর কমান্ডার, জুমার নামাজের ও খুতবার ইমাম এবং রাষ্ট্রীয় টিভি ও রেডিও’র প্রধানদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। ইরানের রাজনীতি ও প্রশাসনে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত তার মতের বাইরে যাওয়ার সাহস সাধারণত কেউ দেখান না। সাবেক সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সময়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাথে নানা বিষয় নিয়ে বিশেষ করে অধিকতর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করা নিয়ে সঙ্ঘাত দেখা দিয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট
ইরানের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ চার বছর এবং দুই মেয়াদের বেশি কেউ এ পদে থাকতে পারেন না। ক্ষমতার সীমার দিক থেকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পরেই প্রেসিডেন্টের অবস্থান। তিনি নির্বাহী বিভাগের প্রধান এবং সংবিধান কার্যকর করার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের ওপরই বর্তায়। কিন্তু বাস্তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট দেশের শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পরামর্শ ও নির্দেশাবলি ছাড়া কিছুই করতে পারেন না। প্রেসিডেন্ট নন, মূলত শীর্ষ ধর্মীয় নেতাই সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন। দেশের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাই নিয়ে থাকেন।


মন্ত্রিসভা
মন্ত্রিসভার সদস্যদের বাছাই ও নিয়োগ দিয়ে থাকেন প্রেসিডেন্ট। তবে পার্লামেন্টে তাদের নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদন করাতে হয়। অপছন্দ হলে পার্লামেন্ট যেকোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের প্রথম মন্ত্রিসভার চারজন সদস্যের ব্যাপারে পার্লামেন্ট আপত্তি জানানোর পর তাদের পরিবর্তে অন্যদের নিতে হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট কিংবা ভাইস প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করে থাকেন।


পার্লামেন্ট
ইরানের পার্লামেন্টের নাম মজলিশ। সদস্যসংখ্যা ২৯০ জন। প্রতি চার বছর অন্তর পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন ও পাস করা ছাড়াও প্রয়োজনে মন্ত্রিসভার সদস্য এমনকি প্রেসিডেন্টকেও তলব করতে পারে। এমনকি তাদের ইমপিচও করতে পারে। পার্লামেন্টে পাসকৃত যেকোনো আইন গার্ডিয়ান কাউন্সিল বা অভিভাবক পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।


অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞ সভা
অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞ সভার কাজ বা দায়িত্ব হচ্ছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নিয়োগ দানের পর তার ভূমিকা বা দায়িত্ব পালনকে মনিটর করা। তিনি যদি দায়িত্ব পালনে অক্ষম বা ব্যর্থ হন তাহলে বিশেষজ্ঞ সভা তাকে অপসারণ করতে পারে। ৮৬ সদস্যের এই সভার সদস্যরা আট বছরের জন্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। ইরানের পবিত্র নগরী কোমে বিশেষজ্ঞ সভার দফতর হলেও তেহরান এবং মাখাদেও এর বৈঠক হয়ে থাকে। কেবল ধর্মীয় নেতারাই বিশেষজ্ঞ সভার সদস্যপদে নির্বাচন করতে পারেন।


অভিভাবক পরিষদ বা গার্ডিয়ান কাউন্সিল
ইরানে ক্ষমতার বিন্যাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে অভিভাবক পরিষদ। এর সদস্যসংখ্যা হচ্ছে ১২ জন। এর মধ্যে ছয়জনকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা যাদের সবাই বড় আলেম এবং গভীর ধর্মীয় জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য রয়েছে। বাকি ছয়জন সদস্য নিয়োগ দিয়ে থাকে আইন বিভাগ। এই ছয়জনের সবাই আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী। অভিভাবক পরিষদের সদস্যদের নিয়োগ পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। পার্লামেন্টে পাস করা বিল ও আইনগুলো অভিভাবক পরিষদকে অনুমোদন করতে হয়। কোনো আইন সংবিধান ও ইসলামি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তাতে ভেটো দিতে পারে পরিষদ। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্ট ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যপদে নির্বাচনে প্রার্থীদের অনুমোদন দিয়ে থাকে অভিভাবক পরিষদ। মার্কিন সিনেটের মতো অভিভাবক পরিষদের সদস্যরা পর্যায়ক্রমিকভাবে ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ফলে প্রতি তিন বছর অন্তর পরিষদের অর্ধেক সদস্য পরিবর্তন হয়ে থাকে। সংস্কারপন্থীরা অভিভাবক পরিষদের ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য অনেক চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। 


এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল
এই কাউন্সিল সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উপদেষ্টা পরিষদ হিসেবে কাজ করে থাকে। কোনো আইন নিয়ে পার্লামেন্ট ও অভিভাবক পরিষদের মধ্যে বিরোধ বা সঙ্ঘাত দেখা দিলে তা মীমাংসা করার ক্ষেত্রে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয়। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বিশিষ্ট ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে এই পরিষদের বা কাউন্সিলের সদস্য নিয়োগ দিয়ে থাকেন। ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে খোমেনি এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলকে সরকারের সব বিভাগ বা শাখার কার্যক্রম নজরদারি করার কিছু ক্ষমতা প্রদান করেন।


একনজরে ইরান

নাম
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান
রাজধানী
তেহরান
জনসংখ্যা
সাত কোটি ২২ লাখ
আয়তন
ছয় লাখ ৩৬ হাজার ৩১৩ বর্গমাইল
প্রধান ভাষা
ফার্সি
প্রধান ধর্ম
ইসলাম
গড় আয়ু
৬৯ (পুরুষ), ৭৩ (নারী)
মুদ্রার একক
রিয়াল (১০ রিয়াল=১ তুমান)
মাথাপিছু আয়
৩,৪৭০ মার্কিন ডলার (২০০৭)
প্রধান রফতানিপণ্য
পেট্রোলিয়াম, কার্পেট, কৃষিপণ্য