মুসলিম বিশ্বের গুরত্বপূর্ন যে দেশটি সর্ম্পকে আমরা কম জানি

May 18, 2018 09:24 am
পশ্চিম এশিয়ার একটি দেশ জর্ডান

মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ জর্ডান। বিশাল মরুভূমিকে বুকে ধারণ করে চার পাশে ইরাক, ইসরাইল, সিরিয়া, লেবাননের মতো দেশকে পাশে নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে জর্ডান। জর্ডানকে নিয়েই এবার লিখেছেন মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ

পশ্চিম এশিয়ার একটি দেশ জর্ডান। অফিসিয়াল নাম হাশেমি কিংডম অব জর্ডান। সৗদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ঘিরে আছে জর্ডানকে চার দিক থেকে। আকাবা উপসাগরে দেশের একমাত্র বন্দর। আরব মরুভূমি জর্ডানের অনেকটা অংশজুড়ে রয়েছে। দেশটির রাজধানী আম্মান।

সপ্তম শতাব্দী থেকেই জর্ডান মুসলিম সাম্রাজ্যের অধীন। তবে মাঝখানে কিছুটা সময় ক্রুসেডার ও ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকে দেশটি। এর আগে মেসিডোনিয়া, রোমান, বাইজেন্টাইন, তুর্কি সাম্রাজ্যেরও স্বাদ গ্রহণ করে জর্ডান।

জর্ডানে বর্তমানে সাংবিধানিক বাদশাহসহ প্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। বাদশাহ দেশের প্রধান নির্বাহী এবং দেশের সামরিক বাহিনীরও প্রধান। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে বাদশাহ তার মতা প্রয়োগ করে থাকেন। দেশের বিচার বিভাগ অন্য বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

জর্ডানকে বলা হয় আধুনিক আরব রাষ্ট্র। দেশটির বেশির ভাগ মানুষই সুন্নি মুসলমান। খ্রিষ্টানরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। জর্ডান বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়নশীল বাজার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করাচ্ছে। আরব বিশ্বের অনেক দেশের সাথেই অবাধ বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তার আন্তর্জাতিক ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকে। ইসরাইলের সাথে যে দু-একটি আরব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে জর্ডান তার একটি।

ইতিহাস
জর্ডান অনেক সাম্রাজ্যকে নিজের ওপর দিয়ে পার হয়ে যেতে দেখেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য। জর্ডান ইসলামি সাম্রাজ্যের অধীনে আসার পর খোলাফায়ে রাশেদিন, উমাইয়া, আব্বাসীয় শাসনামল, পরবর্তী সময়ে মঙ্গোলীয়, ক্রুসেডার, আইয়ুবী, মামলুকদের অধীনেও থাকে জর্ডান। তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগ পর্যন্ত একের পর এক পরিবর্তন আসতে থাকে জর্ডান সাম্রাজ্যে।

আধুনিক জর্ডান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কি সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পর লিগ অব নেশন্স ও দখলদার শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ করে। সাইক-পিকট চুক্তি অনুযায়ী ফ্রেঞ্চ ম্যান্ডেটের আওতায় সিরিয়া ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের আওতায় প্যালেস্টাইন সীমান্তের জন্ম হয়। জর্ডান নদীর পূর্ব দিকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অংশের ৭৬ শতাংশ এলাকা পরিচিত হয় ‘ট্রান্সজর্ডান’ হিসেবে। এই অংশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ব্রিটেনের অধীনে থাকে। এরপর ১৯৪৬ সালে ট্রান্স-জর্ডানের ওপর থেকে ম্যান্ডেট শেষ করে দেয়ার ব্রিটিশ অনুরোধ জাতিসঙ্ঘ মেনে নেয়। এরপর এ দেশটির শাসনভার হাতে নেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। ১৯৫১ সালে গুপ্তহত্যায় নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রটি শাসন করেন। ১৯৪৮ সালে ডিসেম্বরে এ রাষ্ট্রের নাম পাল্টে রাখা হয় হাশেমি কিংডম অব জর্ডান। ১৯৪৯ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান একই সাথে ইসরাইল ও জর্ডানকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তাদের যুক্তি ছিল বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু হয়ে থাকা ইহুদি ও আরব বিশ্বের উদ্বাস্তু বিশেষ করে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের জন্য পৃথক পৃথক দু’টি দেশের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৫৮ সালে ইরাক ও জর্ডান একত্র হয়ে একটি আরব ফেডারেশন অব ইরাক গঠন করতে উদ্যোগী হয়। কিন্তু কিছু দিন পরই এক অভ্যুত্থানের কারণে সে প্রচেষ্টা বাতিল করতে হয়।

এক নজরে

দেশের নাম- জর্ডান
অফিসিয়াল নাম- হাশেমি কিংডম অব জর্ডান
রাজধানী- আম্মান
ভাষা- আরবি
সরকারব্যবস্থা- প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের সাথে শাসনতান্ত্রিক রাজতন্ত্র
আয়তন- ৯২,৩০০ বর্গকিলোমিটার
জলভাগের আয়তন-
০.৮ শতাংশ
লোকসংখ্যা- ৬,৪০৭,০৫৮ জন (২০১০ সালের জুলাইয়ের শুমারি অনুযায়ী)
জনসংখ্যার ঘনত্ব - প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৬৮.২ জন।
শিার হার- ৯১.১ শতাংশ
স্বাধীনতা- ২৫ মে ১৯৪৬ লিগ অব নেশন্স থেকে।
মাথাপিছু আয়- ৫,৬২০ ডলার (২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী)
মুদ্রার নাম- জর্ডানিয়ান দিনার,


১৯৬৫ সালে জর্ডান সৌদি আরবের সাথে তার কিছু ভূমির বদল করে। জর্ডান তার বিস্তৃত মরুভূমির বদলে আকাবার উপকূলের সামান্য অংশ নিজের করে নেয়। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে মিসরের ওপর ইসরাইলি বিমান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জর্ডান মিসরের সাথে একটি সামরিক চুক্তিতে স্বার করে। মিসর, সিরিয়া, ইরাক ও জর্ডান ইসরাইলের বিরুদ্ধে ছয় দিনের যুদ্ধে অংশ নেয়। সে যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। ১৯৮৮ সালে জর্ডান ইসরাইলের দখলকৃত জায়গা থেকে তার দাবি প্রত্যাহার করে। তবে ১৯৯৪ সালের চুক্তি অনুসারে ইসরাইল জেরুসালেমে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থানগুলোর ওপর জর্ডানের কিছু কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়।


১৯৬৭ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনিরা জর্ডানের ভেতরে অবস্থান করে ইসরাইলের ওপর হামলা চালাতে শুরু করে। ১৯৭০ সালে তাদের তৎপরতা দেশটির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালে তৎকালীন জর্ডানের বাদশাহ হোসাইনের সামরিক বাহিনী তাদের পরাভূত করে দেশ থেকে বের করে দেয়। সে সময় জর্ডানের উত্তরাঞ্চলে ও আম্মানে কড়া যুদ্ধ হয়। এ সময় ফিলিস্তিনিদের সহায়তা করতে সিরিয়ার ট্রান্স-জর্ডানে প্রবেশ করলে বাদশাহ হোসাইন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কাছে সিরিয়ার বিরুদ্ধে হামলা চালানোর আহ্বান জানায়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইসরাইল সিরিয়ার ওপর বিমান হামলা চালায়। এর পরিপ্রেেিত ২২ সেপ্টেম্বর আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কায়রোর এক বৈঠকে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত দেন। এরপর ইরাকি বাহিনীর সহায়তায় হাবিস মাজালির নেতৃত্বে পিএলও’র বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিজয় লাভ করে জর্ডান। এ সময় ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাতকেও জর্ডান থেকে বহিষ্কার করা হয়।


১৯৭৩ সালে আরব লিগ ইসরাইলের ওপর আক্রমণ করলে জর্ডান সিরিয়ায় একটি ব্রিগেড পাঠায়। কিন্তু নিজ ভূমি থেকে জর্ডান কোনো প্রকার যুদ্ধে অংশ নেয়নি। ১৯৭৪ সালে রাবাত সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, জর্ডান নয়, ফিলিস্তিনিদের একমাত্র প্রতিনিধি হচ্ছে পিএলও। আরব লিগের এমন ঘোষণায় ুব্ধ হয় জর্ডান। ১৯৮৫ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি পিএলও ও জর্ডান একটি ফেডারেল স্টেট তৈরির চেষ্টা চালায়। কিন্তু ১৯৮৮ সালে বাদশাহ হোসাইন পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং পশ্চিমতীরের ওপর থেকে তার দাবি তুলে নেন। সে সময় পিএলও ফিলিস্তিনের সাময়িক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।


১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে জর্ডান সরাসরি কোনো পে অংশ না নিলেও কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনকে সরে আসার আহ্বানের উদ্যোগ নেয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলো জর্ডানের প্রতি আর্থিক সাহায্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং এসব দেশে থাকা জর্ডানের সাত লাখ নাগরিককে জর্ডানে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। তার সাথে ইরাক থেকে আসা কয়েক লাখ উদ্বাস্তু এসে আশ্রয় নেয় জর্ডানে।
১৯৯৪ সালে পশ্চিমা বিশ্বের চাপে জর্ডান ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তিতে স্বার করলে পাশ্চাত্য দেশগুলো জর্ডানকে কেবল আর্থিক সাহায্য দিয়েই ান্ত হয়নি, বরং সেসব দেশে জর্ডানের জন্য অবাধ বাণিজ্যের রাস্তাও খুলে দেয়।


১৯৯৭ সালের এক ঘটনায় ইসরাইলের সাথে জর্ডানের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। সে সময় ইসরাইলের দুই নাগরিক কানাডার পাসপোর্ট ব্যবহার করে জর্ডানে ঢুকে ফিলিস্তিনি নেতা খালেদ মিশালকে বিষ প্রয়োগ করে। এর পরিপ্রেেিত সম্পর্ক ছিন্নের হুমকি দিয়ে বাদশা হোসাইন ইসরাইলের আটক থাকা ফিলিস্তিনের ধর্মীয় নেতা শেখ আহমদ ইয়াসিনসহ ফিলিস্তিন ও জর্ডানের কয়েক ডজন বন্দীকে মুক্তি করাতে সক্ষম হন।


১৯৯৯ সালে বাদশাহ হোসাইনের মৃত্যুর পর তার ছেলে দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বাদশাহ হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ২০০০ সালে ফিলিস্তিন-ইসরাইলের দ্বিতীয় ইনতিফাদা লড়াইয়ে উভয়কে তার দেশে অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। জর্ডান বর্তমানে তার প্রতিবেশী সব দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপনে কাজ করে যাচ্ছে।

 


ভূপ্রকৃতি
জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ। দণি-পূর্বে আছে সৌদি আরব , পূর্বে ইরাক, উত্তরে সিরিয়া, পশ্চিম দিকে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল। সব মিলিয়ে অন্য দেশের সাথে তার সীমান্তের মোট আয়তন ১,৬১৯ কিলোমিটার। ডেড সি ও আকাবা উপসাগরে তার উপকূলের পরিমাণ ২৬ কিলোমিটার। আকাবা উপসাগরে দেশের একমাত্র বন্দর। আরব মরুভূমি জর্ডানের অনেকটা অংশজুড়ে রয়েছে।
জর্ডানের পূর্ব দিকে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে গড়ে উঠেছে শুষ্ক বনমালভূমি। তবে দেশের পশ্চিম দিকে রয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় চিরসবুজ বনভূমি। জর্ডান নদীর গ্রেট রিফ ভ্যালি জর্ডান, পশ্চিম তীর ও ইসরাইলকে পৃথক করে দিয়েছে। দেশটির ভূমির সর্বোচ্চ স্থান হচ্ছে উম আল দামি। একটি সমুদ্রস্তর থেকে ১,৮৫৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এর চূড়া সব সময় বরফাচ্ছাদিত থাকে। আর সর্বনিম্ন স্থানটি সমুদ্রস্তর থেকে ৪২০ মিটার নিম্নে অবস্থিত।
রাজধানী আম্মানের অবস্থান দেশটির উত্তর-পশ্চিমে। উল্লেখযোগ্য শহর ইরবিড, জেরাশ ও ঝারকা উত্তরে এবং মাডাবা ও আকাবা রয়েছে দেশটির দক্ষিনে।

জলবায়ু
জর্ডানের আবহাওয়া কিছুটা শুষ্ক। গ্রীষ্মকালে এর গড় তাপমাত্রা থাকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে তা দাঁড়ায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দেশটির পশ্চিমাংশে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতকাল বিরাজ করে। এ সময় আম্মানে তুষারপাত হয়।
জর্ডানের বেশির ভাগ এলাকাতেই ৬২০ মিলিমিটারের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়, যা দেশটিকে একটি প্রায় শুষ্ক রাষ্ট্রের কাতারে নিয়ে গেছে। তবে দেশের উঁচু স্থানগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কখনো কখনো ৫০০ মিলিমিটার থেকে ৩০০ মিলিমিটারেও নেমে যায়। ডেড সি বা মৃতসাগরের কাছে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১২০ মিলিমিটারে। তবে দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সামান্য বেশি। সেখানে বার্ষিক ৯০০ মিলিমিটারের মতো বৃষ্টিপাত হয়।


আগস্টে দেশটির গ্রীষ্মকাল চরমে পৌঁছে। জানুয়ারি সবচেয়ে শীতল মাস হিসেবে পরিচিত। গ্রীষ্মের সময় তাপমাত্রা ওঠে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা শীতের সময় নেমে আসে ৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শীতকালে দেশের কিছু কিছু অংশে তুষারপাত হয়। গ্রীষ্মের এক মাস বা তারও আগ থেকে এবং গ্রীষ্মের পরে দেশটিতে দণি ও দক্ষিন-পূর্ব দিক থেকে প্রবল ঝড় বয়ে থাকে। বেশির ভাগ সময় এসব ঝড় দেশটির শস্য ধ্বংসসহ আরো অনেক প্রকার তির সম্মুখীন করে থাকে।


প্রশাসনিক বিভাগ
প্রশাসনিক কাজের জন্য জর্ডানকে ১২টি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেক প্রদেশের প্রধান হলেন এক একজন গভর্নর, যাকে নিযুক্ত করে থাকেন দেশের বাদশাহ। গভর্নর তার প্রদেশের সব সরকারি বিভাগ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের একমাত্র কর্তৃপ হিসেবে গণ্য হন।


জনপ্রকৃতি
জুলাই ২০১০ সালের জর্ডানের হিসাব অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ৬৪ লাখ সাত হাজার ৫৮ জন। জর্ডানের জনসংখ্যার ৯৫-৯৮ শতাংশই আরব। তাদের বেশির ভাগই মুসলিম। তবে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও সেখানে বিদ্যমান। দেশটির ২ থেকে ৫ শতাংশ অনারবীয় লোকদের মধ্যে রয়েছে চেচেন, আর্মেনিয়া, তুর্কমেনিস্তানের জনগণ ও বেদুইনরা। তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ নৃতাত্ত্বিক পরিচয় রয়েছে। তবে তারা জর্ডান ও আরব মূল সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে সে দেশের অনেক খ্রিষ্টান স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে জর্ডানে বসবাস করতে শুরু করে। জরিপ অনুযায়ী দেখা গেছে, ২০০৪-০৭ সময়ের মধ্যে ইরাক থেকে জর্ডানে আগত উদ্বাস্তুর সংখ্যা সাত লাখ থেকে ১০ লাখ। ফলে এ সময়ের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, মিসর, আর্মেনিয়া, চেচনিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ থেকে জর্ডানে আগমন করে। ফলে দেশটিতে উদ্বাস্তুর সংখা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ।


ধর্ম
জর্ডানের প্রধান ধর্ম হলো ইসলাম। আরব ও অনারব উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই ইসলাম প্রধান ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত। দেশটির রাষ্ট্রীয় ধর্মও ইসলাম। এর কারণও যৌক্তিক। দেশের ৯২ শতাংশ লোক মুসলিম। আর মুসলমানদের মধ্যে সুন্নিরাই এখানে প্রবল। আরব ও অনারব উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই রয়েছে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান। জর্ডানের ৬ শতাংশ জনগণ খ্রিষ্টান। সংসদেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। ১৯৫০ সালে দেশটিতে ৩০ শতাংশের অধিক খ্রিষ্টান ছিল। কিন্তু ইউরোপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া এবং মুসলমানদের চেয়ে নিম্ন জন্মহারের কারণে তাদের জনসংখ্যার অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। জর্ডানে অবস্থিত সব সম্প্রদায়ই যার যার নিজের বিশ্বাস, আদর্শ নিয়ে চললেও সবাই জর্ডানের ভাষা, সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে থাকে।


মুসলিম ও খ্রিষ্টান ছাড়া উল্লেখযোগ্য যে গ্র“পগুলো জর্ডানে রয়েছে তাদের মধ্যে দ্রুজ ও বাহাইয়ের নাম উল্লেখ করা যায়। দ্রুজরা মূলত পূর্বাঞ্চলীয় শহর আজরাক ও জারকাতে থাকে। আর বাহাই সম্প্রদায় জর্ডান উপত্যকার অ্যাদেসসিয়াতে বসবাস করে থাকে।


ভাষা
জর্ডানের সরকারি ভাষা আরবি। কিন্তু ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষিত লোকদের মধ্যে ইংরেজি ব্যাপকভাবে চর্চা হয়। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলক আরবি ও ইংরেজি শিা দেয়া হয়। জর্ডানের রেডিও আরবি, ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে।


রাজনীতি
জর্ডানের বেশির ভাগ নির্বাহী মতা বাদশাহর হাতে ন্যস্ত। সেই সাথে সংবিধান অনুযায়ী একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারও রয়েছে। বাদশাহ দেশের ঐতিহ্যগতভাবেই প্রচুর মতা ভোগ করে থাকেন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি পার্লামেন্ট দেশ পরিচালনা করে থাকে। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সামির রিফাই।


জর্ডানের বাদশাহ ও রাজনৈতিক অবস্থা
ব্রিটেনের কবল থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দেশটি শাসন করে বাদশাহ প্রথম আবদুল্লাহ। ১৯৫১ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর তার ছেলে বাদশাহ তালাল সংপ্তি সময়ের জন্য জর্ডানের শাসনভার হাতে নেন। ১৯৫২ সালে তার মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। সে সময় তার সন্তান হুসাইনের বয়স কম থাকায় একটি কমিটির মাধ্যমে দেশটি পরিচালিত হয়। যখন হুসাইন ১৮ বছর বয়সে পৌঁছেন তখন তিনি মতায় আরোহণ করেন। ফলে ১৯৫৩ সালে মতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি দেশ পরিচালনা করেন ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। তিনি জর্ডানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি ১৯৯১ সালে মার্শাল ল’র সমাপ্তি ঘটান এবং ১৯৯২ সালে রাজনৈতিক দলের অনুমোদন দেন।


১৯৯৯ সালের ফেব্র“য়ারিতে তার মৃত্যুর পর বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ মতায় আসেন। তিনি মতায় এসে দ্রুত ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জর্ডানের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করেন। মতায় আসার প্রথম বছরেই তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেন।


পার্লামেন্ট
জর্ডানের পার্লামেন্ট মজলিসে উম্মাহ নামে পরিচিত। এটি দুই কবিশিষ্ট। এর একটি হচ্ছে দ্য চেম্বার অব ডেপুটি বা মজলিসে নওয়াব আরেকটি হচ্ছে সিনেট বা মজলিসে আয়ান। সিনেটের ৫৫ সিনেটরের সবাই বাদশাহ কর্তৃক মনোনীত। দ্য চেম্বার অব ডেপুটির সদস্য ৮০ জন। ১২টি প্রদেশ থেকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত এই ৮০ জনের মধ্যে ৭১ জন হবেন মুসলমান এবং বাকি নয়জন হবেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকে। উভয় করে সদস্যরাই চার বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। চেম্বার অব ডেপুটির সদস্যরা কোনোভাবেই বাদশাহর আত্মীয় হতে পারবেন না এবং সরকারের আর্থিক কোনো ব্যবস্থাপনা থেকে উপকারভোগী হতে পারবেন না।


দেশের পার্লামেন্ট কখনো শূন্য হয়ে গেলে তখন বাদশাহই দেশ পরিচালনা করে থাকেন। ২০০১-২০০৩ সালে জর্ডানের পার্র্লামেন্ট শূন্য থাকাকালে তিনি ১১০টি অস্থায়ী আইনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছিলেন।


সংবিধান
১৯৫২ সালে প্রণীত জর্ডানের সংবিধানে বাদশাহকে প্রচুর মতা দেয়া হয়েছে। দেশটির নির্বাহী মতা বাদশাহ ও তার মন্ত্রিপরিষদের মধ্যেই বিস্তৃত। বাদশাহই সব আইনকে চূড়ান্ত রূপ দেন। তিনিই বিচারকদের নিয়োগ, চুক্তি অনুমোদন, যুদ্ধ ঘোষণা, সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ দেন। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত, আদালতের রায় ও জাতীয় মুদ্রা তার নামেই ইস্যু করা হয়। দেশের মন্ত্রিপরিষদের নেতৃত্ব দেন একজন প্রধানমন্ত্রী, যাকে নিয়োগ দেন বাদশাহ। সংবিধান অনুযায়ী দেশটিতে তিন ধরনের আদালত রয়েছে। বেসামরিক, ধর্মীয় এবং বিশেষ আদালত। বেসামরিক আদালত বেসামরিক, অপরাধ এবং সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার করে থাকে। ধর্মীয় আদালত সাধারণত বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার, সন্তানের ভরণপোষণ ইত্যাদি বিষয়ে বিচারকাজ সম্পন্ন করে থাকে। মুসলমান ও খ্রিষ্টান উভয় সম্প্রদায়ের জন্যই এ ধর্মীয় আদালত রয়েছে। আর বিশেষ আদালতে দেশটির বিশেষ ঘটনার েেত্র বিচার সম্পাদন করে থাকে।
রাজনৈতিক দল
১৯৮৯ সালে রাজনৈতিক দল এবং বিরোধী কার্যক্রম বৈধ করা হয়। এর পরিপ্রেেিত ৩০টির মতো দল বর্তমানে বিদ্যমান জর্ডানে। দেশটিতে চার ধরনের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল রয়েছে ইসলামিক, বামপন্থী, আরব জাতীয়তাবাদী ও উদারনৈতিক। এ ছাড়া স্বতন্ত্রধারার কিছু রাজনৈতিক দল থাকলেও অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে অস্পষ্ট অবস্থান ও পরিষ্কার প্লাটফর্মের অভাবে তারা দেশের রাজনীতিতে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।


অর্থনীতি
জর্ডানের প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ খুব বেশি নয়। এর পানির ঘাটতি ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের অপর্যাপ্ততা একে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। ১৯৯০ সাল থেকে এটি তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ইরাক ও প্রতিবেশী অন্যান্য দেশ থেকে সংগ্রহ করত। ২০০৩ থেকে গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল সদস্যরাষ্ট্রগুলো জর্ডানকে তেল সরবরাহ করতে শুরু করে। সেই সাথে মিসর থেকে গ্যাস আনার জন্য পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ করে ২০০৩ সালে। আগামীতে এটিকে দেশের আরো বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।


যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আরব দেশগুলোর সাথে এমন দ্বিপীয় সম্পর্কের মাধ্যমে জর্ডান অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে সম হয়। ফসফেট ও পটাশ রফতানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক সাহায্য ইত্যাদি দেশটির উল্লেখযোগ্য আয়ের খাত হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ ছাড়া আইটি ও প্রযুক্তি খাতও ধীরে ধীরে দেশটিকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছে।
অনেক ইরাকি ও ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠান জর্ডানে তাদের অফিস স্থাপন করেছে। রাষ্ট্র দুটোর অস্থিতিশীলতার কারণে তারা জর্ডানে তাদের ব্যবসা চালাচ্ছে। এ ছাড়াও অনেক ইরাকি ও ফিলিস্তিনি জর্ডানে কাজ করছে। ফলে জর্ডান ইরাক ও ফিলিস্তিনের ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।


তবে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ ও এ অঞ্চলের অন্য লড়াইগুলোর কারণে জর্ডানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। এসব যুদ্ধের ফলে জর্ডানে উদ্বাস্তু হয়ে আসে ফিলিস্তিনি, লেবাননিসহ আশপাশের অনেক দেশের জনগণ। এর ফলে কোনো কোনো দিক দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হলেও এটি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানে।


সামরিক বাহিনী :

জাতিসঙ্ঘ, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সহযোগিতায় জর্ডানের রয়েছে একটি শক্তিশালী প্রতিরা বাহিনী। ইসরাইল, পশ্চিম তীর, সিরিয়া, ইরাক ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করায় স্বভাবতই জর্ডানকে শক্তিশালী প্রতিরা বাহিনী গড়তে হয়েছে। জর্ডানের প্রশিতি পুলিশ ও সামরিক বাহিনী যেকোনো আকস্মিক ঘটনা সামাল দেয়ার মতা রাখে। জর্ডানের স্পেশাল ফোর্সের প্রধান দেশটির শাসক বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ নিজেই। দেশটির একটি রাজকীয় নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী রয়েছে। জর্ডানের ৫০ হাজার সৈন্য এখন জাতিসঙ্ঘের অধীনে বিভিন্ন দেশে শান্তিরার কাজে নিয়োজিত। তারা প্রতিরা, প্রশিণ, চিকিৎসা সেবা এবং অন্যান্য সাহায্য প্রদান করে থাকে।
জীবনযাত্রার মান : ২০০৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী জর্ডান আরব বিশ্বে সর্বোচ্চ মানের। শহর ও গ্রামপর্যায়ে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসুবিধা, উচ্চশিার সুবিধা, কম অপরাধ সংঘটন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়ে জীবনযাত্রার মানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা দেশ হিসেবে জর্ডান নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে।
২০১০ সালের ইন্টারন্যাশনাল লিভিং ম্যাগাজিনের দেয়া তথ্যানুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয়, সংস্কৃতি, অবসর, অর্থনৈতিক অবস্থা, পরিবেশ, স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আবহাওয়া ইত্যাদি দিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে অন্যতম শীর্ষস্থানের দাবিদার জর্ডান। আগে জর্ডানের উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হিসেবে অর্থনৈতিক কারণকে ধরা হতো। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কার জর্ডানকে সে অসুবিধা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।


শিক্ষা ব্যবস্থা
জর্ডানে সাক্ষরতার হার ৯১.১ শতাংশ। জর্ডানের শিাব্যবস্থা আরব বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থানের দাবিদার এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে শীর্ষ তালিকায় থাকা এক শিাব্যবস্থা। জর্ডানের বার্ষিক বাজেটের ২০.৫ শতাংশ বরাদ্দ শিা খাতে, যেখানে তুরস্ক ও সিরিয়ার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে ২.৫ শতাংশ ও ৩.৮৬ শতাংশ। জর্ডানের বর্তমান শিাব্যবস্থায় বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিকে বেশি নজর দেয়া হচ্ছে।