রোহিঙ্গাদের রোজা কেমন কাটবে?

May 17, 2018 03:01 pm
খাবারের সঙ্কট তো আছেই


দেশ থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অনেককে এবার অন্যরকম রমজান মাসের মুখোমুখি হতে হবে৷ তীব্র গরম তাদের জন্য সমস্যা হয়ে উঠতে পারে৷ সাথে খাবারের সঙ্কট তো আছেই। 

ফেলে আসা সুখ স্মৃতি
তার নাম মো. হাশিম৷ এএফপির সঙ্গে আলাপকালে ১২ বছরের এই ছেলে দেশে রোজার সয়ম তার সুখের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছে৷ পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে ইফতার করা, মেন্যু হিসেবে মাছ-মাংসের বিশেষ খাবার, যা শুধু রোজার মাসেই রান্না করা হয়, ঈদের সময় উপহার পাওয়া, নামাজের আগে গাছের ছায়ায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, এ সব কথা জানিয়েছে সে৷

নতুন অভিজ্ঞতা
সুখের কথা বলার পরপরই হাশিম বর্তমানে ফিরে আসে৷ এবারের রমজানে যে সেসব সম্ভব হবে না তা বুঝতে পেরে কিছুটা দুঃখিত হয় সে৷ অবশ্য পরক্ষণে অন্যদের কথা ভেবে নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবান ভাবতে শুরু করে সে৷ কারণ সে তো তাও পরিবারের সঙ্গে আছে, এমন অনেক শিশু আছে যাদের সঙ্গে পরিবারের কেউ নেই, একেবারে একা৷

উপার্জন নেই
শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কাজের অনুমতি নেই৷ ফলে তাদের আয়ও নেই৷ তাই ইফতার আর সেহরিতে ভালোমন্দ খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণের উপায় নেই৷ ঈদের সময় কাউকে উপহার দেয়া কিংবা পাওয়া, কোনোটারই সম্ভাবনা নেই৷ ত্রাণ সংস্থার দেয়া খাবার আর জামাকাপড়ই তাদের একমাত্র সম্বল৷

তীব্র গরম
আরেকটি সমস্যার কথা জানিয়েছে হাশিম৷ তীব্র গরম৷ ‘‘আমরা এখানে বার্মার মতো রোজা করতে পারবনা, কারণ খুব গরম৷ এখানে কোনো গাছ নেই৷ ত্রিপলও গরম৷ দিনের বেলায় এটি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে৷ ফলে রোজা রাখা খুব কঠিন হবে৷’’

তবুও...
গরমসহ অন্যান্য সমস্যা থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা রোজা রাখবেন বলে জানিয়েছেন ইমাম মুহাম্মদ ইউসুফ৷ ‘‘সূর্যের প্রচণ্ড তাপ থাকায় কঠিন হবে, তবে তবুও আমরা রোজা রাখব,’’ বলেন তিনি৷

ভুল কারণে স্মরণীয়
শরণার্থী শিবিরে থাকা শিশুদের জন্য এবারের রোজা স্মরণীয় হবে, তবে তা সম্পূর্ণ ভুল কারণে, মনে করেন কক্সবাজারে কর্মরত সেভ দ্য চিলড্রেন কর্মকর্তা রবার্টা বুসিনারো৷ এখানে শিশুদের খেলার জন্য শুধু ময়লা আর কাদা ছাড়া কিছু নেই৷

ধর্ষিত রোহিঙ্গা নারীরা সন্তান জন্ম দিতে শুরু করেছেন
এ বছর বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মোট ৬০ হাজার শিশু জন্ম নিতে পারে৷ যাদের অধিকাংশকেই গোপনে জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করা হবে৷ গত ন'মাসে বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে অন্তত ১৬ হাজার রোহিঙ্গা শিশু৷

সেনা নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী ক্যাম্পে প্রতিদিন ৬০টি করে শিশু জন্ম নিচ্ছে বলে জাতিসংঘের নারী ও শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে৷

ইউনিসেফ বলছে, গত আগস্টে মিয়ানমারে নির্যাতন শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন৷ এ সময়ে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মোট ১৬ হাজার শিশু জন্ম নিয়েছে, যাদের মধ্যে মাত্র ৩ হাজার চিকিৎসা সেবার আওতায় এসেছে, জানাচ্ছে ইউনিসেফ৷

বাংলাদেশে ইউনিসেফ-এর প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেইগবেদার বলেন, ‘‘প্রতিদিন প্রায় ৬০টি শিশু তাদের বাড়ি থেকে দূরে আতঙ্কজনক এক পরিস্থিতিতে প্রথমবারে মতো শ্বাস নিচ্ছে৷ আর তাদের বাস্তুচ্যুত মায়েরা সহিংসতার ভীতি ও ধর্ষণের স্মৃতি নিয়ে আছেন৷''

তবে তিনি বলেন, ‘‘যৌন নিপীড়ণ বা ধর্ষণের কারণে ঠিক কী পরিমাণ শিশু জন্ম নিচ্ছে তা বলা কঠিন৷''

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ধর্ষণের শিকার অন্তঃসত্ত্বা নারীদের খুঁজে বের করতে কাজ করে যাচ্ছেন সেবাকর্মীরা৷

বিশেষজ্ঞ ও সেবাকর্মীরা বলছেন, লজ্জার কারণে অনেক রোহিঙ্গা নারীই চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন না৷ তাঁদের আশঙ্কা, এতে করে অনেক শিশুই জন্মের পর পরিত্যক্ত হতে পারে কিংবা গর্ভপাতের কারণে মা ও শিশু – উভয়েরই মৃত্যু হতে পারে৷

সেবাকর্মী তসমিনারা নিজেও একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী৷ গত কয়েকমাস তিনি পর্দার আড়ালে থাকা ক্যাম্পে ক্যাম্পে 

তল্লাশি চালিয়ে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন৷

তাঁর কথায়, ‘‘আমরা তাঁদের একটি গোপন কোড বলেছি, যাতে তাঁরা হাসপাতাল কিংবা বা চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়ে সেটা বলেন৷ সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা কোড শোনার সাথে সাথে তাঁদেরকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবেন৷''

‘‘তাঁরা বেশিরভাগ সময়ই লজ্জা পাচ্ছেন৷ আবার এগিয়ে আসতে ভয়ও পাচ্ছেন'', জানান তসমিনারা৷

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যন্ড্রিউ গিলমার বলেছেন, গত বছরের আগস্টে জুড়ে চলা ‘উন্মত্ত যৌন সহিংসতা'-র কারণে শিশু জন্মহারে একটি ‘অপ্রতিরোধ্য' বৃদ্ধি আশঙ্কা করা হচ্ছে৷

ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স-এর মার্সেলা ক্রায় বলছেন, এর ফলে প্রচুর গর্ভধারণের ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটবে৷

ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মোট ৬০ হাজার শিশু জন্ম নিতে পারে৷ আর এদের অধিকাংশকেই গোপনে জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করা হবে৷

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৩০০ অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীকে শনাক্ত করা হয়েছে৷ তবে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীর প্রকৃত সংখ্যা ২৫ হাজারের মতো হবে ধারণা৷

রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা আবুদর রহিম জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্যাম্পে থাকা দুই নারীকে চেনেন, যাঁরা মিয়ানমারের সেনাদের ধর্ষণের কারণে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পরেছেন৷

তিনি বলেন, ‘‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এঁদের ধর্ষণ করেছে৷ এবং এটাই তাদের অপরাধের প্রমাণ৷''

এর আগে নভেম্বর মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৫২ জন রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে তারা৷ যাঁদের মধ্যে ২৯ জন ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছিলেন৷

ডয়েচে ভেলে