ড্রোন যেভাবে দুনিয়া বদলে দিচ্ছে

May 16, 2018 10:45 am
 সুদিন এলো ড্রোনের

 

রেডিও টেলিভিশন কম্পিউটার মোবাইল ফোন প্রযুক্তির যাত্রায় এবার যোগ হয়েছে ড্রোন বা চালকবিহীন বিমান। কিছু দিন আগেও এটা ছিল সামরিক বাহিনীর হাতিয়ার। এখন তা আসছে বেসামরিক মানুষের হাতের নাগালে। এই প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে তা নিয়ে লিখেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

কলোরাডোর ডেপুটি শেরিফ ডেরেক জনসন দাঁড়িয়ে আছেন গ্র্যান্ড জংশনের বাইরে একটি ছোট মাঠে। ছোট করে ছাঁটা চুল, বেঁটেখাটো, গাট্টাগোট্টা মানুষটির নজর আশপাশের কোনো দিকে নেই, তিনি তীক্ষন চোখে তাকিয়ে আছেন ধোঁয়াটে আকাশে উড়ন্ত একটি পাখির দিকে। কী পাখি ওটা শকুন নাকি কাক? না, কাক-শকুন কিছুই নয়, এমনকি পাখিও নয়। আকাশের ওই বিন্দুটি হচ্ছে ফ্যালকন। নতুন উদ্ভাবিত একটি চালকবিহীন আকাশযান অর্থাৎ ড্রোন। যে যান চালককে বসে চালাতে হয় না। রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে বহু দূরে বসেই কোনো চালক সেটি চালাতে পারেন। ডেপুটি শেরিফ জনসন এই মুহূর্তে তা-ই করছেন।


জনসনের অফিস মেসা কাউন্টিতে। এখানে আছে অসংখ্য পর্বত আর তার ধার ঘেঁষে অগণিত পশুখামার ও র‌্যান্চ। এখানে পর্বতসারিতে অনেক হাইকার হারিয়ে যান, আবার অন্যখান থেকে এসে দুর্বৃত্তরা র‌্যানচে গা ঢাকা দেয়। এই সব হারানো লোকজনকে খুঁজে বের করতে কিংবা পলাতক অপরাধীদের পাকড়াও করতে ফ্যালকনের মতো একটি জিনিসের প্রয়োজন অনুভব করছিল শেরিফের অফিস।


জনসনের সামনে একটি টেবিল, তার ওপর রাখা ল্যাপটপ কম্পিউটারে তখন ড্রোনটি নিকটস্থ একটি হাইওয়ের ছবি দেখাচ্ছিল। জনসনের পেছনে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন এক লোক। কঠিন চেহারার মানুষটির হাত-দুটো বুকে ক্রস করা। সানগ্লাসজোড়া তার কামানো মাথায় তোলা। তার নাম ক্রিস মাইজার। ফ্যালকনের ডিজাইনটি তারই করা।


এর আগে বিমান বাহিনীর ক্যাপটেন ছিলেন মাইজার। কাজ করেছেন মিলিটারি ড্রোন নিয়ে। ২০০৭ সালে চাকরি ছেড়ে কলরাডো এসে প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব কোম্পানি অরোরা। তার ডিজাইনে নির্মিত ফ্যালকনের পাখার দৈর্ঘ আট ফুট, কিন্তু সব মিলিয়ে এর ওজন মাত্র সাড়ে ৯ পাউন্ড। চলে একটি বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে। এতে রয়েছে ভিজিবল ও ইনফ্রারেড এ দুই ধরনের ক্যামেরা এবং জিপিএস-চালিত অটোপাইলট।ফ্যালকন এতই উন্নতমানের যে, সরকার তার অনুমতি ছাড়া এটির রফতানি নিষিদ্ধ করেছে।


মাইজার বলেন, বর্তমান অবস্থায় ফ্যালকনকে র‌্যাভেনের সাথে তুলনা করা যায়। তবে র‌্যাভেনের চেয়ে দামে এটি সস্তা (উল্লেখ্য, র‌্যাভেন হচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর চালকবিহীন বিমান, যা কিনা হাত দিয়েই আকাশে ছুঁড়ে দেয়া যায়)। মাইজার পরিকল্পনা করছেন, একটি স্কোয়াড কারের (আমেরিকান পুলিশের টহল গাড়ি) প্রায় সমান দামে তিনি দু’টি ড্রোন ও এর কিছু যন্ত্রাংশ বিক্রি করবেন।


প্রেসিডেন্ট ওবামা ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি আইন অনুমোদন করেন। আইনে ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (এফএএ) নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন ২০১৫ সালের মধ্যে আমেরিকার আকাশ ড্রোন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। বর্তমানে আমেরিকার যে দুয়েকটি স্থানের আকাশে ড্রোন চালানোর অনুমতি এফএএ দিয়েছে, মেসা কাউন্টি তারই একটি। বর্তমানে এখানকার শেরিফ অফিসের রয়েছে তিন ফুট লম্বা একটি চালকবিহীন হেলিকপ্টার। ড্রাগনফ্লাইয়ার নামে এই ড্রোন কপ্টারটি একনাগাড়ে মাত্র ২০ মিনিট উড়তে পারে।


পক্ষান্তরে ফ্যালকন টানা এক ঘণ্টা উড়তে পারে এবং এটি চালানোও সহজ। যেমন ফ্যালকনকে চালানোর আগে জনসন তার ল্যাপটপে কাক্সিক্ষত উচ্চতা ও গতি টাইপ করেন। তারপর একটি ডিজিটাল মানচিত্রে গন্তব্যের ওপর ক্লিক করেন। ব্যস, এরপর যা করার অটোপাইলটই করে। ফ্যালকনকে চালু করার জন্য বাতাসে ছুড়ে দিলেই হলো, সাথে সাথে এর প্রপেলারে লাগানো অ্যাকসেলারোমিটার (গতি নিয়ন্ত্রক) চালু হয়ে যায়। ফলে নিক্ষেপকারীর হাতেও কোনো আঘাত লাগে না।

 

যে মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ড্রোনটি চালাচ্ছিলেন জনসন, তার কাছেই একটি মুরগি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। সেখান থেকে আসা দুর্গন্ধে ভুর ভুর করছিল মাঠটি। জনসনকে মাইজার বললেন, ‘চলুন তো একটু সামনে, ড্রোনটিকে ল্যান্ড করতে বলি।’ জনসন ল্যাপটপে ক্লিক করলেন, আর তখনই ফ্যালকন নিচের দিকে মোড় নিলো, কমলা রঙের আলো ছড়াতে ছড়াতে খুব শান্তভাবে মাটি স্পর্শ করল; জনসন যে জায়গাটা চিহ্নিত করেছিলেন তার কয়েক গজের মধ্যেই। মাইজারের মুখে বিজয়গর্বের হাসি ‘র‌্যাভেন এ রকম পারে না।’

 সুদিন এলো ড্রোনের


বছর বারো আগেও দুই শ্রেণীর মানুষ ড্রোন নিয়ে কারবার করত। প্রথম দলটি হচ্ছে, কিছু শৌখিন মানুষ। এরা খেলাচ্ছলে রেডিও-নিয়ন্ত্রিত বিমান ও হেলিকপ্টার ওড়াত। অপর দলটি হলো, সেনাবাহিনী। এরা জেনারেল অ্যাটমিকস প্রিডেটর-এর মতো মানুষবিহীন বিমানের সাহায্যে নজরদারির কাজ চালাত।

এরপর এলো ৯/১১। অবশ্য তারও আগে আফগানিস্তান ও ইরাক গ্রাস করে আমেরিকা এবং আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ড্রোন দ্রুত একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদানে পরিণত হয়। প্রিডেটর এবং তার চেয়েও বড় একটি মানুষবিহীন পাহারাদার বিমানকে অস্ত্রসজ্জিত করল পেন্টাগন। ওতে বসানো হলো ক্ষেপণাস্ত্র, যাতে নেভাদা বা নিউ ইয়র্কের মতো কোনো জায়গায় বসে এসব বিমানের পরিচালক হাজার মাইল দূরের কোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে কিংবা তার ওপর নজরদারি করতে পারেন।এ সময় বিমান কোম্পানিগুলো গাদা গাদা ড্রোন বানানোর মচ্ছব শুরু করে দেয়। এসব ড্রোন আরো ছোট। তাতে থাকল আরো আরো ‘বুদ্ধিমান’ কম্পিউটার, আরো স্পর্শকাতর সেন্সর, ক্যামেরা।


২০০২ সালে আমেরিকার মোতায়েন করা সামরিক ড্রোনের সংখ্যা ছিল দুই শ’রও কম, আর এখন তা ১১ হাজারেরও বেশি। এগুলোর সাহায্যে তারা নানা ধরনের ‘মিশন’ চালাচ্ছে। থিংকট্যাংক গ্লোবালসিকিউরিটিডটঅর্গ-এর প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ জন পাইক বলেন, এক জেনারেশনের মধ্যেই তারা বেশির ভাগ মানুষচালিত সামরিক বিমান সরিয়ে ফেলতে পারবে বলে মনে হয়। তার ধারণা, লকহিড মার্টিন কোম্পানি এখন যে এফ-৩৫ লাইটনিং-টু বিমানটি তৈরি করছে, সম্ভবত সেটিই হবে চালকের আসনযুক্ত শেষ বিমান। হয়তো এটিকেও ড্রোনে রূপান্তর করা হবে।


আমেরিকা ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ৫০টি দেশের হাতে ড্রোন রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দেশ, যেমন চীন, ইসরাইল ও ইরান, নিজেরাই ড্রোন তৈরিতে সক্ষম। বিমাননির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা পরবর্তী প্রজন্মের ড্রোনের গাদা গাদা ডিজাইন করছেন নানা আকৃতি ও চেহারার। কোনোটি দেখতে পোকার মতো, কোনোটি হামিংবার্ডের মতো কিংবা বোয়িংয়ের ফ্যান্টম আই যেন। ফ্যান্টম আই চলে হাইড্রোজেন জ্বালানি দিয়ে। এর পাখার দৈর্ঘ্য দেড় শ’ ফুট। এটি ৬৫ হাজার ফুট ওপরে গিয়ে চার দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।


মোটের ওপর ড্রোন হুজুগ এখন চরমে। বড় বড় কম্পানি থেকে শুরু করে মাইজারের (যার কথা শুরুতে বলা হয়েছে) মতো ছোট উদ্যোক্তাও এখন ড্রোন ব্যবসায় নেমে পড়েছে। এই উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ চেষ্টা করছে বেসামরিক অঙ্গনেও ড্রোন চালু করতে। প্রিডেটরগুলো সীমান্ত রক্ষা, চোরাচালান দমন ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কাস্টমকে সহায়তা করে চলেছে। নাসা পরিচালিত ড্রোন গ্লোবাল হক আবহাওয়া ও হারিকেনের তথ্য রেকর্ড করছে। এ ছাড়া ড্রোনের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা কোস্টা রিকার অগ্ন্যুৎপাত, রাশিয়া ও পেরুর প্রত্যন্তস্থল এবং নর্থ ডাকোটার বন্যার তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন।


এ পর্যন্ত আমেরিকার ডজনখানেক অঙ্গরাজ্যের পুলিশ বিভাগ ড্রোন চালানোর পারমিট চেয়ে এফএএ’র কাছে আবেদন জানিয়েছে। তবে ব্যাপক ভিত্তিতে ড্রোন প্রচলনের পক্ষাবলম্বনকারীদের (এরা ড্রোনকে বলে আন-আর্মড অ্যারিয়াল ভেহিকল বা ইউএভি) মতে, দেশের ১৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই আজ হোক কাল হোক ইউএভি কিনতে হবে। তাদের ধারণা, কিছু দিনের মধ্যেই কৃষি, সাংবাদিকতা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান ও যানজট নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হবে ইউএভি।


ইউএভি’র প্রবক্তারা এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে প্রবর্তনের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করছেন এফএএ বিধিকে, যা কিনা বেসরকারি কোম্পানি ও সরকারি সংস্থাগুলোর ড্রোন চালানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে রেখেছে (অথচ শৌখিন ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে এ কড়াকড়ি প্রযোজ্য নয়!)। এমনকি যারা ড্রোন চালানোর জন্য এফএএ’র পারমিট পেয়েছে, তাদের বেলায়ও নিয়মকানুনের সীমা-সরহদ নেই। যেমন কোনো অবস্থাতেই ইউএভি-কে ৪০০ ফুটের বেশি ওপরে নেয়া যাবে না। বিমান চলাচল বেশি এমন কোনো বিমানবন্দর কিংবা অন্য কোনো জোনে ইউএভি চালানো যাবে না। ইউএভি কিছুতেই পরিচালকের দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে পারবে না ইত্যাদি।


সাবেক মহাকাশচারী এবং বর্তমানে মহাকাশযান-বিষয়ক পরামর্শক মার্ক ব্রাউন এ বিষয়ে বলেন, যদি এফএএ’র এসব কড়াকড়ি শিথিল হয়, তাহলে বিশেষ করে ছোট ও কম মূল্যের কৌশলগত ড্রোনের বিক্রি মিলিটারি ড্রোনের বিক্রিকে অনেক পেছনে ফেলে দেবে। তার ভাষায়, সামরিক কাজে ব্যবহৃত ইউএভি’র সাফল্য আরো অনেক কিছু করার ক্ষুধা তৈরি করেছে।

 

ডেটনে স্বপ্নরাজ্য
একটু আগেই বলা হয়েছে, ওহিয়ো অঙ্গরাজ্যের ডেটনে মহাকাশযান বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন মার্ক ব্রাউন। এ কাজের জন্য তার ডেটনকে বেছে নেয়ারও একটি বড় কারণ রয়েছে। এমনিতেই ডেটন হলো বিমান চলাচলব্যবস্থার সূতিকাগার। বিশ্বের প্রথম বিমাননির্মাতা রাইট ভ্রাতাদের জন্মভূমি এই ডেটন। তার ওপর এখন এখানে আছে রাইট-প্যাটারসন এয়ারফোর্স বেস। ফলে সব মিলিয়ে আমেরিকায় ড্রোন জ্বরের যে কাঁপুনি, তা ডেটনেই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এমনিতে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার আগে থেকেই ধুঁকছিল ডেটন। কয়েক দশক ধরে বেশ কিছু বড় কোম্পানি এই শহর থেকে তাদের ব্যবসায় গুটিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যেও ডেটন বিমানবন্দরে চোখে পড়ে অসংখ্য বিজ্ঞাপন ‘ড্রোন চালানো শেখানো হয়’। বস্তুত ডেটন এখন ড্রোন নির্মাতাদের নগরী রূপে পরিচিতি পেয়ে গেছে।


এ রকম একজন নির্মাতার কথাই বলা যাক। তার নাম ডোনাল্ড স্মিথ। কাঠখোট্টা চেহারা। ধূসর চুল, মুখে একগোছা দাড়ি। আগে কাজ করতেন নৌবাহিনীতে; এয়ারক্রাফট টেকনিশিয়ান। এখন নিজেই একটা কোম্পানি বানিয়েছেন। ইউএ ভিশন নামে এই কোম্পানিও স্পিয়ার নামে একধরনের ড্রোন বানায়। কয়েক রকম আকৃতির স্পিয়ার বানায় তারা। সবচেয়ে ছোটটির পাখার আকৃতি চার ফুট এবং ওজন চার পাউন্ডেরও কম। দেখলে মনে হবে খেলনা বি-১ বোমারু বিমান। স্মিথ আশা করছেন, এই ড্রোনটি পোষা প্রাণী, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি, বন্যপ্রাণী এমনকি আলঝেইমার রোগীদের চলাচল মনিটর করতে সহায়তা করবে। যেকোনো ব্যক্তি বা বস্তুতে বেতার তরঙ্গ চিহ্নিতকরণ ট্যাগ লাগানো থাকলেই এটা তা দূর থেকে পড়ে তাকে শনাক্ত করতে পারবে।


স্মিথের ফ্যাক্টরির পাশের রাস্তায় দেখা গেল এই দৃশ্যটি : একজন কর্মী হাওয়ায় একটি ড্রোন ছুড়ে দিচ্ছে, আর স্মিথ নিজে তার হাতের একটি ডিভাইস দিয়ে ড্রোনটির গতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। একসময় ড্রোনটি উড়তে উড়তে চোখের প্রায় আড়ালে চলে গেল। আবার ফিরে এলো; একেবারে মাথার ওপর এসে স্থির হলো। এবার দাঁত বের করে হাসলেন স্মিথ : এই বিমানটি অনেক ‘খেইল’ দেখাতে পারে।
ওখান থেকে মাইল কয়েক দূরে রাইট-প্যাটারসন বিমানঘাঁটিতে রয়েছে এয়ারফোর্স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। এটি মূলত মিলিটারি ড্রোন গবেষণা কেন্দ্র। কেন্দ্রের সামনেই ইকারুসের মূর্তি, যিনি প্রথম উড়তে চেয়েছিলেন এবং দুর্ঘটনায় মারা যান। কেন্দ্রের ভেতরে একটি ল্যাবে কাজ করছেন জন র‌্যাকুয়েট। চশমা পরা এই সিভিলিয়ান মানুষটি ড্রোনের জন্য একটি নতুন চলাচলপথের ডিজাইন করছেন।
নতুন পথ কেন? র‌্যাকুয়েট ব্যাখ্যা দেন, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) শতভাগ সুরক্ষিত নয়। অনেকগুলো ভবনের মাঝখানে পড়ে গেলে এর সিগন্যাল কাজ করে না। এ ছাড়া এর সিগন্যাল জ্যাম করাও যায়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ইরানে সিআইএ’র একটি ড্রোন ভূপাতিত হয়। ইরান সরকার পরে দাবি করে, ড্রোনটির জিপিএস হ্যাক করে তারাই ওটির গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল। এ কারণেই র‌্যাকুয়েটের টিম এমন একটা সিস্টেম উদ্ভাবনের জন্য কাজ করছে, যার মাধ্যমে একটি ড্রোন নিজেই নিজের পথ দেখতে পারে, যেমন দেখতে পান কোনো মানুষ পাইলট। এর জন্য প্যাটার্ন-রিকগনিশন সফটওয়্যারযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। র‌্যাকুয়েট আত্মবিশ্বাসী গলায় বলেন, আমরা এমন একটি সিস্টেম উদ্ভাবন করতে চাই, যার ওপর আপনি আস্থা রাখতে পারেন।

 রিকুয়েট আরো বলেন, ভিজুয়াল নেভিগেশন সিস্টেমযুক্ত একটি ড্রোন হয়তো এমনকি বিদ্যুতের লাইনও চিনতে পারবে এবং ওই লাইন থেকে ব্যাট হুকের সাহায্যে নিজের ব্যাটারির জ্বালানি হিসেবে বিদ্যুৎ টেনে নিতে পারবে (তবে ব্যাপারটি হয়ে যাবে চুরি, তাই রিকুয়েট এ প্রযুক্তি বেসামরিক লোকদের দেবেন না)।


র‌্যাকুয়েটের ল্যাবের কাছেই আরেকটি কক্ষে গবেষণা করছেন রিচার্ড কব। তার গবেষণার বিষয় : ‘অদৃশ্য ড্রোন’। না, একেবারে অদৃশ্য নয়, চলার পথে প্রয়োজন পড়লে হঠাৎ অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন। ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি তাদের এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছে। বলা হয়েছে, ড্রোনটি হবে ছারপোকা কিংবা পাখির মতো, যারা কিনা মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যাওয়ার বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে। জবাবে কব বানিয়ে দিয়েছেন একটি ক্ষুদ্রাকৃতির রোবোটিক বাজপাখি, যার পাখাগুলো কার্বন ফাইবার ও মাইলার দিয়ে তৈরি। বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে এই পাখাগুলোকে এক সেকেন্ডে ৩০ বার নাড়ানো যায়, যা তাকে দ্রুত ‘অদৃশ্য’ করে ফেলে। তবে এটা নেহাৎই পরীক্ষাগারের ব্যাপার। কব মনে করেন, বাস্তবে এ রকম ছারপোকা আকৃতির ড্রোন, যা কয়েক মিনিট ‘অদৃশ্য’ হয়ে থাকতে পারবে, তৈরি করতে হলে ব্যাটারি প্রযুক্তির আরো অনেক উন্নয়ন দরকার। কবের ধারণা, ব্যাটারি প্রযুক্তিকে এতটা এগিয়ে নিতে আরো এক যুগেরও বেশি লেগে যেতে পারে।


রিচার্ড কব যা-ই বলুন, আমেরিকান বিমানবাহিনী কিন্তু ক্ষুদ্রাকৃতির ড্রোনের ফ্লাইট টেস্টিং করার জন্য রাইট-প্যাটারসন বিমানঘাঁটিতে একটি পরীক্ষাগার তৈরি করে নিয়েছে। চার হাজার বর্গমিটার জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত পরীক্ষাগারটির ছাদ ৩৫ ফুট উঁচুতে। এর দেয়ালগুলো প্যাডযুক্ত। এখানকার গবেষকেরা বিশেষ ধরনের কাজ করে থাকেন। তারা বাইরের কাউকে সরাসরি ফ্লাইট টেস্ট দেখতে দেন না। তবে একটি অ্যানিমেটেড ভিডিওচিত্রে কিছুটা দেখার সুযোগ পাওয়া গেল। দেখা গেল, অসংখ্য ছারপোকা আকৃতির ড্রোন এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে করিডোরে, জানালায়, এমনকি বিদ্যুৎ লাইনের ওপরও। বন্দুক কাঁধে হামাগুড়ি দিতে দিতে এগিয়ে আসছিল একটি মানুষ। একটি ড্রোন থেকে তার মাথায় গুলি করে মেরে ফেলা হলো। ভিডিওচিত্রটি শেষ হলো এ রকম একটা লাইন দেখিয়ে : ‘অপ্রতিরোধ্য, সর্বত্রগামী, প্রাণঘাতী : ক্ষুদ্র বায়ুপোত’।


প্রাণঘাতী যে তাতে আর সন্দেহ কী? যেকেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এই ধরনের প্রাণঘাতী ড্রোন সন্ত্রাসবাদী বা দুর্বৃত্ত চক্রের হাতে পড়লে তাকে ঠেকানো হবে কী দিয়ে? আমেরিকান কর্মকর্তারা যদিও এই প্রশ্নটি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে চান না, তবে তার অর্থ এই নয় যে, তারা প্রশ্নটিকে গুরুত্বহীন ভাবছেন। লেবাননের কট্টরপন্থী হিজবুল্লাহ দল বলেছে যে, ইরানের কাছ থেকে তারা ড্রোন পেয়েছে। এ ছাড়া গত নভেম্বরেই ম্যাসাচুসেটসের এক লোককে ১৭ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। লোকটি সি-৪ বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন দিয়ে ওয়াশিংটনে হামলার পরিকল্পনা করছিল।


এই উদ্বেগের জবাব দিয়েছেন কিছু ইঞ্জিনিয়ার। বলেছেন, ড্রোন হামলার জবাব হচ্ছে আরো ড্রোন। কাউন্টার ড্রোন। সে কী রকম? উটাহয় অবস্থিত বিমানবিষয়ক সংস্থা প্রসিরাস টেকনোলজিস-এর প্রকৌশলী স্টিফেন গ্রিফিথস বলেন, চাই এমন ইউএভি (ড্রোন), যা অন্য ড্রোনের অবস্থান নির্ণয় এবং তাকে ধ্বংস করতে, গতিপথ বদলে দিতে কিংবা ভূপাতিত করতে সক্ষম। গ্রিফিথসের ভাষায়, ইচ্ছা করলে এ রকম ড্রোনও বানানো সম্ভব। সম্ভব এমন স্মার্ট ড্রোন নির্মাণ করাও, যা কি না স্বাধীনভাবে উড়তে পারবে, মানুষের তত্ত্বাবধান বলতে গেলে নামেমাত্রই লাগবে। তবে গ্রিফিথস বিশ্বাস করেন, হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেবে মানুষই; অন্য কেউ নয়।

 

স্বপ্নের পাশে দুঃস্বপ্ন
দক্ষ ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই চালাবে ড্রোন এ রকম কল্পনা সত্ত্বেও ড্রোন নিয়ে দুঃস্বপ্নের শেষ নেই। খোদ ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনই (এফএএ) এ দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্ত নয়। কারণ, মিলিটারি ড্রোনের নিরাপত্তার রেকর্ডটিও এখন পর্যন্ত ভালো নয়। আমেরিকান বিমানবাহিনীর হিসাবমতে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তাদের তিনটি প্রধান মডেলের ড্রোন (প্রিডেটর, গ্লোবাল হক ও রিপার) কমপক্ষে ১২০ বার ‘দুর্ঘটনায়’ পতিত হয়েছে; এর মধ্যে ৭৬ বার ড্রোনটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে সশস্ত্রবাহিনীর অন্যান্য শাখা ও সিআইএ’র ড্রোনের হিসাব ধরা হয়নি, ধরা হয়নি সেসব ড্রোন হামলার কথাও, যাতে ‘দুর্ঘটনাক্রমে’ বেসামরিক নাগরিক কিংবা আমেরিকান বা যৌথ বাহিনীর সৈন্য হতাহত হয়েছে।


তাই কথা উঠছে, আমেরিকার আকাশে বিপুল সংখ্যায় ওড়ার অনুমতি দেয়ার আগে অবশ্যই ড্রোনকে হতে হবে আরো নির্ভরযোগ্য। নিজ বাড়ির উঠানে ক্রীড়ারত শিশুর ওপর ভূপাতিত হওয়ার মতো একটি ভয়াল দুর্ঘটনা এই শিল্পকে অনেক বছর পিছিয়ে দেবে। এই প্রযুক্তিকে এখনই মুক্ত করে দেয়া হলে তা সত্যি সত্যিই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


সম্ভাব্য সেই বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে কাজ করে চলেছে ডেটনে অবস্থিত ডিফেন্স রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস (ডিআরএ)। তারা এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনে কাজ করছে, যা রেডারের চেয়েও সস্তা অথচ কার্যকর। প্রকল্পটির পরিচালক অ্যান্ড্রু হোয়াইট বলেন, ব্যাপারটা খুবই সোজা। ড্রোনে বসানো ক্যামেরা যখন দেখবে দূরে একটি বস্তু ক্রমেই বড় হচ্ছে, তখন তা অটোপাইলটকে সিগন্যাল পাঠাবে। আর সিগন্যাল পেয়েই ড্রোন অন্য দিকে বাঁক নেবে। তিনি বলেন, প্রযুক্তিটি কার্যকর হলো ২০১১ সালে আফগানিস্তানে যে রকম দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সে রকম দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানের ওই ঘটনায় ৪০০ পাউন্ড ওজনের একট ড্রোন একটি সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমানের ওপর আছড়ে পড়ে। বিমানটি সে যাত্রায় নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হলেও ড্রোনটির পাখাগুলো ভেঙে যায়।


এ তো গেল নিরাপত্তার দিক, ড্রোনের বিপুল বিস্তার আমেরিকানদের প্রাইভেসিতে (ব্যক্তিগত গোপনীয়তা) হানা দেবে এমন উদ্বেগও ছড়িয়ে পড়েছে। মিলিটারি ড্রোনে বসানো অতি বেগুনি ও রেডিওব্যান্ড সেন্সর মেঘমালা ও পত্ররাজি ভেদ করে যেতে পারে, এ তো জানা কথাই। কিন্তু অনেকে বলছেন, এর সাহায্যে কোনো ভবনের ভেতর অবস্থানরত কাউকেও খুঁজে বের করা সম্ভব। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত সেন্সরগুলোও অতি মাত্রায় স্পর্শকাতর।


ইরাকে আমেরিকান দখলদারিত্বের শেষ কয়েক বছর মানুষবিহীন বিমান গোটা বাগদাদকে নজরদারিতে রাখত। যখনই কোথাও কোনো বোমা হামলা হতো, তখনই আমেরিকান সেনাকর্মকর্তারা ড্রোনে স্থাপিত ভিডিও ক্যামেরা চালু করে দিত। এভাবে তারা হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ও ধরে ফেলতে সক্ষম হতো। একে বলা হয়, ‘বিরতিহীন নজরদারি’। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) এখন এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, ড্রোন যে রকম সস্তা ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে, তাতে না আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো আমেরিকান নাগরিকদের ওপর ‘বিরতিহীন নজরদারি’ করতে ব্যাগ্র হয়ে ওঠে। অথচ আমেরিকান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ‘অযৌক্তিক তল্লাশি ও গ্রেফতার’ থেকে নাগরিকদের রেহাই দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদালত এই বিধানটি ড্রোনের ব্যাপারে কিভাবে প্রয়োগ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

 

কার হাতে ড্রোন
এত সব উদ্বেগের মধ্যেও ড্রোন নির্মাতারা আশাবাদী। যেমন মেসা কাউন্টির শেরিফ অফিসের বেনজামিন মিলার বলেন যে, অস্ত্রবাহী ড্রোন নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। তার কথা, ‘আমি জীবন বাঁচাতে চাই, নিতে নয়’। একই অনুভূতি ব্যক্ত করেন ক্রিস মাইজারও। বিমানবাহিনীতে থাকাকালে মাইজার ঘাতক ড্রোনের ডিজাইন করা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে সহায়তা করতেন। এ ধরনের একটি ড্রোনের নাম সুইসব্লেড। ড্রোনটি পিঠে বহনক্ষম ঝোলায় পুরে নেয়া যায়, যাতে থাকতে পারে গ্রেনেডের ওপর সমপরিমাণ বিস্ফোরক। বিমানবাহিনী থেকে বেরিয়ে সেই মাইজার এখন বানিয়েছেন ফ্যালকন, যার কাজ হচ্ছে জীবনরক্ষা। যেমন উদাহরণ দিলেন মাইজার, একটি শিশু ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেল। ফ্যালকন তাকে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলবে। এ রকম আরো অনেক কাজই বলে দেবে ফ্যালকনের মূল্যটা কী।


হয়তো মাইজারের আশাবাদ ঠিক। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের উদ্বেগও ভুল নয়। এই আশা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে ড্রোন গবেষণা, নির্মাণ ও প্রবর্তনের ভাবনা। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ড্রোন একের পর এক নব নব প্রযুক্তির অন্তর্জালে নিজেকে বেঁধে ফেলছে স্বাধীন মানুষ। প্রযুক্তি মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে, কে বলবে?