জাহান্নামের দিনলিপি

May 15, 2018 10:33 pm
পৃথিবীতে আলোয় চোখ মেলে ফিলিস্তিনি শিশু আহমদ

ফিলিস্তিনের গাজা এলাকা এক সময় ছিল গাজাবাসীর চোখে স্বর্গতুল্য। ইসরাইলি হামলায় আজ তা পরিণত হয়েছে ‘দুনিয়ার জাহান্নামে’। সেই জাহান্নাম থেকে লিখেছেন জুলিয়া অ্যামালিয়া হেইয়ার।জার্মান ভাষা থেকে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ক্রিস্টোফার সুলতান। তার সংক্ষেপিত বাংলা রূপান্তর করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

ইসরাইলি ট্যাংক যে রাতে গাজা সীমান্তের দিকে এগিয়ে আসছিল, সে রাতেই পৃথিবীতে আলোয় চোখ মেলে ফিলিস্তিনি শিশু আহমদ। আর জন্মের ১০ দিনের মাথায় সে হারায় তার পিতাকে, দাদা-দাদীকে এবং পৈতৃক বাড়িটিকেও। ১০ দিনের শিশু হিসেবে তার জানার কথাও নয় তাদের বাড়িটি কী অবস্থায় আছে। কিন্তু তার মায়ের তো জানার কথা।


কিন্তু না, তার তরুণী মা মারওয়াত আল-আসামারও জানা নেই। তার শুধু মনে পড়ে ধ্বংসস্তূপের ধুলো ও ধোঁয়ার কথা। তবে সে কথাও ভাবতে চান না তিনি।


আসামা তার পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতেন গাজার পূর্ব দিকের শহরতলি শেজাইয়ায়। সেখানে এখন আর কেউ থাকে না। ইসরাইলি হামলায় ধূলিসাত হয়ে গেছে শহরটি। কেননা ইসরাইলের চোখে ওই এলাকা ছিল হামাসের শক্ত ঘাঁটি, প্রতিরোধের কেন্দ্র। তাই ট্যাংকবহর ঢুকে গুঁড়িয়ে দেয় তারা এলাকাটিকে। কমপক্ষে এক শ’ ফিলিস্তিনি ওই রাতেই নিহত হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। তবে নিহতের সংখ্যাটি আসলে কত, সেটি অজানাই রয়ে গেছে। রেডক্রসের ধারণা, অনেক বেশি। কেননা অনেকে আগুনে পুড়ে মারা গেছে, অনেকে চাপা পড়েছে বিধ্বস্ত ভবনের তলায়। যুদ্ধ শেষ না হলে তাদের লাশও তো উদ্ধার করা যাবে না।


এই হলো শেজাইয়া শহরতলির অবস্থা। এটি যখন গাজাবাসীর কাছে ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক হয়ে গেছে। কেননা, ইসরাইলি হামলা থেকে এখানকার খুব কম লোকই বাঁচতে পেরেছে। অবশ্য অবরুদ্ধ গাজায় কোন জায়গাটাই বা নিরাপদ, মৃত্যু কোথায় হানা দেয়নি?
দিয়েছে। সর্বত্রই দিয়েছে। তবে আশ্চর্যের কথা হলো, ইসরাইলি হামলার গোড়ার দিকে অনেক মানুষ ‘নিরাপদ’ ভেবে অন্যখান থেকে পালিয়ে এসেছিল শেজাইয়ায়, যদিও শহরতলিটি ইসরাইল সীমান্তের কাছেই অবস্থিত। কিন্তু পরে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, ওখান থেকেই লোকজন পালিয়ে চলে গেল মূল গাজা শহরে, যেখানে আছে উঁচু উঁচু ভবন আর সরু রাস্তা। সেই শহরের লোকসংখ্যা এখন জাতিসঙ্ঘের হিসাব মতেই প্রায় দ্বিগুণ। আগে ছিল ছয় লাখ, এখন কমবেশি দশ লাখ।

গাজার প্রায় এক লাখ মানুষ এবারের হামলায় তাদের বাড়িঘর হারিয়েছে; কেউ আংশিক, কেউ পুরোপুরি। এসব গৃহহীন লোকজন এখন কোনো অক্ষত বাড়ির সদর দরজায়, নতুবা গাড়িবারান্দায় কিংবা স্কুল প্রাঙ্গণে কোনোমতে থাকছে। সেখানেও কি তারা নিরাপদ? জার্মান-প্যালেস্টিনিয়ান কিলানি পরিবারের পরিণতি দেখে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, ‘না’। ইসরাইলি সতর্কবাণী উপেক্ষা করে পরিবারটি উত্তরাঞ্চল থেকে গাজা সিটির একটি অ্যাপার্টমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিল। এর অল্পক্ষণ পরই ইসরাইলের নিক্ষেপ করা রকেটের আঘাতে ভবনটি গুঁড়িয়ে যায়।


এ ঘটনার অল্পক্ষণ পরের কথা। লেখার শুরুতে যে তরুণী মায়ের কথা আছে, সেই আসামা তখনো প্রসবজনিত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু পাশের ভবন গুঁড়িয়ে গেছে, এই ভবনের আর ভরসা কী। আতঙ্কে তারা ছুটতে চাইলেন অন্য কোথাও। কিন্তু আসামা তো হাঁটতে পারেন না। তার বোন নূরা ওই নবজাত শিশুটিকে নিলেন পিঠের সাথে বেঁধে। আসামা ও নিজের শিশুকন্যাটিকে তুললেন একটি ঠেলাগাড়িতে। তারপর ধ্বংসস্তূপ ঠেলে এগিয়ে যেতে থাকলেন দুই মাইল দূরের এক গির্জার দিকে।


দুই বোন এবং তাদের দুই শিশু এখনো সেখানেই আছেন। কিভাবে আছেন তারা? আছেন ৩০ বর্গমিটার (৩২৩ বর্গফুট) আয়তনের একটি ছোট কক্ষে। কক্ষটিতে দরজা একটি আছে বটে, কিন্তু কোনো জানালা নেই। সেখানেই গাদাগাদি করে থাকেন ২০ নারী ও শিশু। মেঝেতে বিছানো ম্যাট্রেসে সবার জায়গা হয় না। সবচেয়ে ছোট বাসিন্দাটির জায়গা হয়েছে কার্ডবোর্ডের বাক্সে। এক দিন পাশের গোরস্থানে বোমা পড়ল। দুই বোনের একজন আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘এখানেও থাকা যাবে না, কোন দিন বোমা পড়ে।’ অপর বোন বলল, ‘কোথায় যাবো, বলো! কোথাও শান্তি নেই।’


শুধু শান্তি নেই, তা নয়। স্বস্তিও নেই। আসামার বোনের পাঁচ বছর বয়সী মেয়েটি যখন উঠানের ওপাশে টয়লেটে যায়, এখানে বসে দুই বোন উৎকণ্ঠায় বাঁচে না। তাদের আতঙ্ক, এই বুঝি ইসরাইলি রকেট হামলা হলো।


গির্জার ওই গাদাগাদি করা রুমে বসে তারা ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করে একটি ঘোষণার জন্য : যুদ্ধবিরতি। তারা বলে, ‘এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার। আমরা বাঁচতে চাই।’ হামাসের সমালোচনা করতেও কুণ্ঠিত হয় না তারা। বলে, ‘ইসমরাইল হানিয়া (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) ও খালেদ মিশাল (হামাস নেতা) যদি আমাদের মতো এই অবস্থায় থাকতেন, তাহলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অন্তত দু’বার ভাবতেন। কিন্তু তারা তো এখন ধনী দেশ কাতারে নিরাপদ প্রবাসে আছেন।’


মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও এই দুই বোন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। সম্প্রতি গাজায় ফাতাহ ও হামাস ঐকমত্যের সরকার গড়লে লাখো লাখো ফিলিস্তিনির মতো তাদের আশাবাদও তুঙ্গে ওঠে যে, এবার গাজার পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। গাজাবাসীর বিশ্বাস, ফিলিস্তিনিদের নিরাপদ বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নস্যাতে করতেই ইসরাইল এই হামলা শুরু করেছে।
অথচ এমন নয় যে, এই যুদ্ধে শুধু ফিলিস্তিনিরাই মরছে। তারা মরছে সংখ্যায় অনেক বেশি, তবে প্রাণহানি ইসরাইলেরও ঘটছে। ফিলিস্তিনে নিহতের সংখ্যা যখন ১১ শ’, তখন ইসরাইলও তার ৫৩ সৈনিককে হারিয়েছে। নিহত ফিলিস্তিনিদের বেশির ভাগই অসামরিক নাগরিক, তাদেরও অনেকেই শিশু। কিন্তু শিগগিরই এ যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।


এভাবে যুদ্ধ যখন তৃতীয় সপ্তাহে উপনীত হলো, তখন দেখা গেল, শুধু ধ্বংস ও মৃত্যুই নয়, যুদ্ধের আরো ‘উপাত’ আছে। ফিলিস্তিনবাসী দেখল, এফ-১৬ জঙ্গি জেট বিমানে প্রচণ্ড শব্দ, বোমা ও ট্যাংকের শব্দ, গোলাবর্ষণের শব্দ তাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে। এর ওপর আছে ড্রোনের ঝিঁঝিঁ শব্দ।


অন্তত একটা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি যাতে হয়, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব সম্প্রদায়। কিন্তু ইসরাইল অনমনীয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বরং এক টেলিভিশন ভাষণে সাফ বলে দিয়েছেন, যতদিন ফিলিস্তিনিদের পালিয়ে থাকার এবং লুকিয়ে ইসরাইলে রকেট হামলা চালানোর টানেলগুলো বন্ধ না হবে, ততদিন হামলা চলতেই থাকবে। তিনি আরো বলেন, এখন আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া।


তারপরও যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে গেলেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং ব্যর্থ হলেন। তারা চেয়েছিলেন কয়েক দিনের একটা সাময়িক যুদ্ধবিরতি, যাতে এই সময় আলোচনায় বসে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা যায়। এ লক্ষ্যে হামাসকে বলা হয় ইসরাইল অভিমুখে রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করতে এবং ইসরাইলকে বলা হয় গাজা থেকে তার সৈন্য ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু ইসরাইল সরকার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়। ইসরাইলি মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদস্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং গাজায় হামলা আরো তীব্র করার পক্ষে মত দেয়। এদিকে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় উচ্চপর্যায়ের মধ্যপ্রাচ্য সম্মেলন, যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও যোগ দেন। সেখানেও কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয় না।


তবে দৃশ্যত মনে হয়, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে লাভ দেখছে দু’পক্ষই। হামাস বাজি ধরছে প্রতিরোধের ওপর একেকটি শিশুর লাশ যেন আলোচনার টেবিলে তাদের মূল্য অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। তা ছাড়া প্রতিদিন ইসরাইলেল বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর অভিমুখী ফাইট বাতিল কিংবা তেল আবিবের জীবনযাত্রায় খানিকটা হলেও স্থবিরতা নেমে আসাটাকে হামাস তার বিজয় হিসেবেই দেখছে। অপর দিকে ইসরাইলও নিজেকে ‘বিজয়ী’ ভাবছে এ কারণে যে, এবার মন্ত্রিসভার উদারপন্থী সদস্য, বিচারমন্ত্রী জিপি লিবনি পর্যন্ত ‘হামাস নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা গেছে, ইসরাইলিরা গাজায় অভিযান আরো জোরদার করার পক্ষপাতী। অথচ এবারের যুদ্ধে ইসরাইলের ক্ষতি ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের চেয়েও বেশি।

তবে ইসরাইলি মন্ত্রিসভা ও জনমতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের জনমত। সেখানকার সোস্যাল নেটওয়ার্কগুলো এত নিরপরাধ মানুষ ও শিশুর হত্যাকাণ্ডে তীব্র ুব্ধ। এ-ও এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের সরকার যখন ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষার অধিকারের’ কথা বলে তাদের সমর্থন দিচ্ছে, ওসব দেশের সাধারণ মানুষই তখন দৃঢ়ভাবে ফিলিস্তিনি মজলুম মানুষের পক্ষ নিয়েছে। টুইটার ও ফেসবুক খুললেই দেখা যায় মৃত ফিলিস্তিনি শিশুর ছবি কিংবা যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু মানুষের কাছে গাজার ‘বাস্তবতা’ দর্শন এটাই প্রথম। কেননা পশ্চিমা সংবাদপত্রগুলো এই নিষ্ঠুরতার খবর ও ছবি এতটা নিখুঁতভাবে কখনো ছাপে না। কিন্তু গাজাবাসীর পোস্ট করা ছবি ও ভিডিওগুলো তো ‘সম্পাদিত’ নয়। আর এগুলোর বেশির ভাগই যুদ্ধের শিকার মানুষদের পাঠানো। ফলে পাশ্চাত্যবাসীর কাছে এ এক নতুন বাস্তবতা।


এ ক্ষেত্রে একটি মোবাইল ফোন ভিডিওর কথা বলা যায়। ইউটিউবে এই ভিডিওটি প্রায় ২০ লাখ মানুষ দেখেছে। এতে দেখা যায়, ফিরোজা রঙের টি-শার্ট পরিহিত এক তরুণ শোজায়া শহরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তার স্বজনদের লাশ খুঁজে ফিরছে। এমন সময় ইসরাইলি সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে।


সত্যি বটে, সন্তান হারানোর বেদনা ইসরাইলের তেল আবিবে যেমন, ফিলিস্তিনের বেইত হানুনেও তেমনই। কিন্তু এই যুদ্ধে দু’পক্ষের ভোগান্তি সমান নয় এবং এতটা অসমান যে, তুলনা করাটাও বোকামি। ইসরাইলে লোকজন এখনো কর্মস্থলে যাচ্ছে, সমুদ্রসৈকতে অবসর কাটাতেও যেতে পারছে। অপর দিকে গাজায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বলতে কিছু নেই। গাজাবাসী বেঁচে আছে গুলি-বোমা-রকেটের ‘দয়ার’ ওপর। সেখানকার রাস্তাঘাট জনশূন্য। মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ছোট ছোট খুপরিতে। নিরাপদ ভেবে অনেকে আশ্রয় নিয়েছে হাসপাতাল, স্কুল কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সেখানেও হামলা চালাতে দ্বিধা করছে না ইসরাইল। গাজার জাতিসঙ্ঘ স্কুলে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মারা গেছে ১৬ জন, আহত হয়েছে দুই শ’রও বেশি আশ্রিত মানুষ। এরপর ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয় গাজায় একমাত্র বিদ্যু কেন্দ্রটিও।

বিদেশীদের কথা
গাজায় অবস্থিত ইউনিসেফ অফিসটি চালান কানাডীয় নারী পারনিল আয়রনসাইড (৪০)। তিনি বলেন, ‘এখানে যা ঘটছে তা একেবারেই মেনে নেয়া যায় না। ইসরাইলি বাহিনী শুধু হামাসের টানেল ও অস্ত্র ধ্বংস করছে তা নয়, তারা অসামরিক অবকাঠামোও গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।’


এই নারী এর আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইস্টার্ন কঙ্গো ও ইয়েমেনেও কাজ করেছেন। কিন্তু গাজার অবস্থা, তার ভাষায় সবচেয়ে খারাপ। তিনি ধারণা করেন, এই যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা হবে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার। আর পরোক্ষ ক্ষতির শিকার অসংখ্য।
এরই মধ্যে এক দিন ইসরাইল হুঁশিয়ার করে দেয় যে, গাজার আল-শিফা হাসপাতালে হামলা চালানো হবে। যথারীতি হামলা তারা চালায়ও। তাদের ‘যুক্তি’ : এই হাসপাতালের ভূগর্ভে হামাসের গোপন কমান্ড সেন্টার রয়েছে। তারা এই কথা বলে হামলা চালালেও এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।


এ কথা সত্য, গাজার আবাসিক এলাকা থেকেই ইসরাইলে রকেট হামলা চালানো হয়ে থাকে এবং এ হামলা চালানোর জন্য যেসব টানেল ব্যবহার করা হয়, সেসব টানেলের অনেকগুলোর শুরুটাও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাড়ি থেকেই। এ কারণেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, হামাস অসামরিক লোকজনকে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
তবে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক আইনের কথা অর্ধেকই বলেন, বাকি অর্ধেক চেপে যান। সেই অর্ধেকে আছে, শত্রু যদি বেসামরিক স্থাপনায় লুকিয়েও থাকে, তবুও তাতে হামলা করা চলবে না।


আন্তর্জাতিক আইনের অর্ধেক চেপে গিয়ে আল-শিফা হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। নরওয়ে থেকে তিন সপ্তাহ আগে এই হাসপাতালে আসা ইমার্জেন্সি মেডিসিনের প্রফেসর ম্যাডস গিলবার্ট (৬৭) বলেন, ‘হাসপাতালে হামলা! এ তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার।’
প্রফেসর গিলবার্ট যখন কথা বলছিলেন তখনো সাইরেনের আওয়াজ, মাইকে নানা ঘোষণা এবং আহত মানুষের কাতর ধ্বনিতে তার কণ্ঠ চাপা পড়ে যাচ্ছিল। তিনি জানান, তাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে কোনো কোনো দিন টানা ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। অথচ এমন অবস্থা, এখানে গোসলের পানি পর্যন্ত নেই।


এর আগে দু’টি যুদ্ধকালেও (২০১২ ও ২০০৮-২০০৯) গাজায় কাজ করেছেন প্রফেসর গিলবার্ট। তবে এবারের মতো খারাপ পরিস্থিতি দেখেননি আগে। তিনি বলেন, এবার গুরুতর আহতদের বেশির ভাগই শিশু।

তিলে তিলে মৃত্যু
আল-শিফা হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই ওয়ার্ডে, আঙ্গিনায় এমনকি পার্কিং লটে। ওয়ার্ড ও বারান্দা আহত মানুষে ভর্তি, আর পার্কিং লটে আশ্রয় নিয়েছে গৃহহারা মানুষ। তাদের একজন উম আবুল আতা। তিনি থাকতেন শেজাইয়ায়। সেখান থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেন দাদার বাড়িতে। সেখানে বোমা হামলা হলে চলে যান খালার বাড়ি। এভাবে চার দিনে তিন বার জায়গা বদল করে তার ঠাঁই মিলেছে আল-শিফা হাসপাতালের পার্কিং লটে। এক টুকরো ফোমের ম্যাট্রেস বিছিয়ে থাকছেন তিনি। তার ধারণা, এখানে কিছুটা নিরাপদ তিনি। এখন তার একটাই চাওয়া : এক দিন আবার এমন একটা বাড়িতে তিনি থাকতে পারবেন, যেখানে পানি সরবরাহ থাকবে এবং এখনকার মতো প্রতিদিন ভোরে সমুদ্রে গোসল করতে যেতে হবে না।


খুব বড় আশা কি? না, একেবারেই নয়। বরং খুব স্বাভাবিক ও ছোট একটি চাওয়া। কিন্তু এই ছোট চাওয়াটিও ‘পাওয়া’ হতে বেশ কিছুদিন লাগবে গাজাবাসীর। কারণ ইসরাইলি বোমায় ধ্বংস হয়ে গেছে গাজার মেইন ওয়াটার পাইপলাইন। ফলে ৭০ শতাংশ গাজাবাসী এখন পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত।


গাজায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ফের চালু করার দায়িত্বটি মাহির সালিমের। জার্মানির হ্যানোভার ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসা এই প্রকৌশলী বলেন, কাজটি সহজ নয়। কারণ ক্ষতিটা অনেক ব্যাপক। সত্যি বলছি, কী যে করব, সেটাই আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারছি না।


মাহির সালিমের উদ্বেগ একেবারে ভিত্তিহীন নয়। যে ছয়টি জলাধার থেকে গাজায় পানি সরবরাহ করা হয়, তার চারটিতে এখন যাওয়াই যাচ্ছে না। কারণ ওগুলো সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। এর আগে ওখানে কাজ করার সময় মাহিরের তিন সহকর্মীকে গুলি করে মেরেছে ইসরাইলি সৈন্যরা। ওই তিন কর্মীর পাইপ নিয়ে কাজ করাকে ইসরাইলি সৈন্যরা ভেবেছিল, ওরা বুঝি রকেট রিপ্লেস করছে। যে-ই ভাবা সে-ই গুলি। তাতে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায় তিন ফিলিস্তিনি।


সালিম বিনয়ী মানুষ। তার সমালোচনার মধ্যেও থাকে বিনয়ের আভাস। তিনি বলেন, ‘ওরা এখানকার সবকিছু ধ্বংস করছে কেন, আমরা যাতে এখানে আর না থাকি সে জন্য?’ তিনি বলেন, ‘আগে গাজা ছিল স্বর্গতুল্য। আর এখন? এখন এটা দুনিয়ার জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। আমরা আটকা পড়েছি এই জাহান্নামে।’


বিদ্যু কেন্দ্রে বোমা ফেলে ধ্বংস করার আগেও গাজায় দিনে গড়ে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যু থাকত না। কিন্তু স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তো বিদ্যু ছাড়া অচল। সালিমের জিজ্ঞাসা, ‘ইসরাইলিরা বলছে তারা সন্ত্রাসবাদী খুঁজছে। তা-ই যদি হয়, তবে তারা বেশির ভাগ বেসামরিক স্থাপনায় বোমা ফেলছে কেন?’


সালিমের শঙ্কা, গাজাবাসী শিগগিরই পানির জন্য লড়াই করবে। তিনি বলেন, কল্পনা করুন তো, একটা শিশু যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেল, কিন্তু বিশুদ্ধ পানি না পেয়ে ডায়রিয়ায় মরতে হলো তাকে। এই যুদ্ধ একদিন শেষ হবে, তখন শুরু হবে তিলে তিলে মরার পালা।


humayunsc@yahoo.com