কেমন দেশ কিউবা

May 03, 2018 05:18 pm
ক্যাস্ট্রো আর কিউবা দু’টি নাম সমার্থক হয়ে গেছে


সাকিব ফারহান


আমেরিকার মিয়ামি অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে ক্যারিবীয় সাগর ও মেক্সিকো উপসাগরের সংযোগস্থলে দ্বীপদেশ কিউবার অবস্থান। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ঠিক মাঝখানটাকে ক্যারিবীয় অঞ্চল বলা হয়। এখানে বিশাল-বিস্তৃত জলরাশির মাঝে রয়েছে কিছুসংখ্যক দ্বীপ। ক্যারিবীয় দ্বীপগুলো বিমান থেকে মটরদানার মতোই ক্ষুদ্র দেখায়। তুলনামূলক কিউবা অনেক বড় কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। কিউবার দক্ষিণে জ্যামাইকা ও দক্ষিণ-পূর্বে হাইতি। আরো পূর্ব দিকে অগ্রসর হলে আটলান্টিক মহাসাগর। পশ্চিমে মেক্সিকো উপসাগর এবং আরো পশ্চিমে বিশাল দেশ মেক্সিকো।


ক্যাস্ট্রো আর কিউবা দু’টি নাম সমার্থক হয়ে গেছে। তার নামটি ছাড়িয়ে গেছে কিউবা নামের দেশটির পরিচিতিকে। ধরতে গেলে এখন কিউবা বিশ্বমঞ্চে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নামেই পরিচিত। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নামক একটি কট্টর দলের সদস্য ফিদেল ক্যাস্ট্রোর আদর্শ ছিল মার্কস আর লেনিন। বিপ্লবের গুরু ছিলেন চে গুয়েভারা। বেঁচে থাকা এ কিংবদন্তির জন্ম ১৩ আগস্ট ১৯২৬ সালে। ফালজেনিসিও বাতিস্তা সরকারের কট্টর সমালোচক ফিদেল ১৯৫৩ সালে প্রথম অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। দলের বেশির ভাগ সদস্য প্রাণ হারান। ক্যাস্ট্রো ধরা পড়েন বাতিস্তা সরকারের কাছে। তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। নির্বাসিত হন মেক্সিকোতে। এখানে বিপ্লবী চের কাছ দীক্ষা নেন তিনি। ১৯৫৯ সালে কিউবায় ফিরে আসেন। তিনি প্রচার করেন সমাজতন্ত্রের সাম্যবাদ। জনগণ তার মতবাদকে স্বাগত জানায়। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাতিস্তা সরকারের পতন হয়। পালিয়ে যান বাতিস্তা। শুরু হয় ক্যাস্ট্রো যুগের। আমেরিকার ঠিক পেটের ভেতরে একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ বেড়ে উঠবে যা কল্পনা করা যায় না ফিদেল ক্যাস্ট্রের নেতৃত্বে যা সম্ভব হয়েছে।

দেশটি বিশ্বের এক নম্বর মোড়ল রাষ্ট্রের চোখরাঙানিকে তুচ্ছজ্ঞান করে সামনের দিকে হাঁটছে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে যখন রাশিয়ার পতন হয় সবাই ধরেই নিয়েছিল এবার ক্যাস্ট্রোকে সমাজতন্ত্র পরিত্যাগ করতে হবে নয়তো ক্ষমতা হারাতে হবে। না, তা হয়নি। আমেরিকা কম চেষ্টা করেনি। এমনকি ক্যাস্ট্রোর প্রাণনাশের চেষ্টা করেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। এ কারণে দেশ কিউবার চেয়ে ক্যাস্ট্রো বিশ্বমঞ্চে অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। কিউবা পরিচিতি পেয়েছে ক্যাস্ট্রোর দেশ হিসেবে।


দেশের নাম
রিপাবলিক অব কিউবা
জনসংখ্যা
১ কোটি ১৩ লাখ
রাজধানী
হাভানা
আয়তন
১ লাখ ১০ হাজার ৮০৩ বর্গ কি.মি.
প্রধান ভাষা
স্পেনিশ
প্রধান ধর্ম
খ্রিষ্টান
গড় আয়ু
৭৬ বছর (পুরুষ), ৮০ বছর (মহিলা)
মুদ্রা
কিউবান পেসো
প্রধান রফতানি
নিকেল, চিনি ও মাছ
চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কফি


কিউবার ইতিহাস রেকর্ড শুরু হয় ১৪৯২ সালে। ওই সালের ১২ অক্টোবর কলম্বাস প্রথম দ্বীপটির দেখা পান। পতাকা ওড়ান স্পেনের। প্রিন্স জোয়ানের নাম অনুসারে এর নাম হয় জোয়ানা উপদ্বীপ। মূলত দ্বীপটির আদি অধিবাসী তাইনো ও চিবনি নামক আদিবাসীরা। তারা উত্তর ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে বসতি গড়ে। কয়েক শ’ বছরে এ অভিবাসন ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে তারা ওই অঞ্চলে জড়ো হয় ৬ থেকে ৮ হাজার বছর আগে। তাইনোরা ছিল কৃষক। চিবনিরা কৃষির পাশাপাশি শিকারও করত। কলম্বাসের আবিষ্কারের পর থেকে স্পেনিশ অভিবাসন শুরু হয়। আসে অন্যান্য ইউরোপীয়। তারা স্থানীয়দের ওপর নানা নিপীড়ন চালায়। ইউরোপীয়দের নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে। এসব রোগাক্রান্ত হয়ে আদিবাসীদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়।


১৫১১ সালে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে কিউবায় উপনিবেশ স্থ্পান করে। তারা দীর্ঘ ৪০০ বছর দেশটি শাসন করে। মাঝখানে ১৭৬২ সালে ব্রিটিশরা রাজধানী হাভানা দখল করে নেয়। তবে পরের বছর থেকেই স্পেনের সাথে তাদের সমঝোতা হয়ে যায়। কিউবার জনসংখ্যা আবার বাড়তে থাকে। প্রতিবেশী দেশ এবং স্পেনের বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে তখন ব্যাপকহারে অভিবাসন ঘটে এ দেশে। ১৮২০-এর দশকে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যখন স্পেনের উপনিবেশ বিদ্রোহের মুখে পড়ে তখনো কিউবা ছিল শান্ত। এ জন্য স্পেনিশ সম্রাট দেশটিকে ‘মোস্ট ফেইথফুল আইল্যান্ড’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরই মধ্যে ১৮৪৮ সালে কিউবাকে কিনে নেয়ার প্রস্তাব দেয় আমেরিকা। তারা এ বাবদ ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার দেয়ার কথা বললেও স্পেন সরকার রাজি হয়নি। যদিও টাকার অঙ্কটা তখনকার বিবেচনায় বিস্মিত হওয়ার মতোই। ১৮৬৮ সালে প্রথম একজন জমিদার আইনজীবীর নেতৃত্বে প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ঔপনিবেশিক সরকারের সাথে টানা ১০ বছর যুদ্ধ চলে। যুদ্ধটি কিউবার ইতিহাসে ‘১০ ছরব্যাপী’ যুদ্ধ নামে পরিচিত। এরপর স্বাধীনতাকামীদের অভ্যুত্থান স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২০ বছর পর আবার তা চাঙা হয় ১৮৯০-এর দশকে। অবশেষে টমাস এস্ত্রাদা পালমার নেতৃত্বে কিউবা স্বাধীনতা পায়। এস্ত্রাদা হন দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট।

স্পেনের সাথে চুক্তি বলে কিউবার অর্থব্যবস্থা এবং বিদেশ নীতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। পরে কিউবার সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা গুয়ানতানামো বে লিজ নেয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নৌঘাঁটি স্থাপন করে। এখন এর ওপর আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কুখ্যাত গুয়ানতানামো কারাগার স্থাপিত হয়েছে অনেক পরে। ১৯০৬ সালে এস্ত্রাদার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয়। চার্লস এডওয়ার্ড মাগনকে যুক্তরাষ্ট্র গভর্নর নিযুক্ত করে। ১৯০৮ সালে স্বায়ত্তশাসন পায় কিউবা। এরপর দীর্ঘ দিন অস্থিতিশীলতার মধ্যে দিয়ে যায়। অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থান আর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা দেখা যায় এ সময়। সবশেষে বাতিস্তা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে একটি স্থিতিশীল সরকার কায়েম হয়। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অর্ধশতাব্দীর শাসনের পর ২০০৬ সালে ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ক্যাস্ট্রো।


সাংবিধানিকভাবে কিউবা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সংবিধানে ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব কিউবা’কে দেশ এবং সমাজের নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কাউন্সিল অব স্টেট এবং কাউন্সিল অব মিনিস্টার নামে দু’টি পরিষদ মূলত দেশ শাসন করে। উভয় পরিষদের সদস্যরা পার্লামেন্ট ‘ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি’ দ্বারা নির্বাচিত হন। এমনকি কিউবার প্রেসিডেন্টও নির্বাচন করে ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি। ৬০৯ সদস্যের ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির হাতে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। এরা প্রতি পাঁচ বছর পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। বছরে দুইবার এর সদস্যরা মিলিত হন। ন্যূনতম ১৬ বছর হয়েছে এবং কোনো অপরাধের সাথে জড়িত নয় এমন প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার রয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য কোনো দল গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনা দেশটিতে নিষিদ্ধ।


দেশের অর্থনীতি সমাজতন্ত্রের নীতি অনুসরণ করে। শিল্প-বাণিজ্যের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরাষ্ট্রীয়করণের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে এবং কঠোরভাবে তা অনুসরণ করা হয়। সাম্যবাদের কথা বলা হলেও যারা সরকারের কর্তাব্যক্তি, যারা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য তারা অধিকতর সরকারি সুবিধা ভোগ করেন।


ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার পর দেশটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠনে আত্মনিয়োগ করে। এ কাজে রাশিয়া তাদের ব্যাপকভাবে সাহায্য করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার সামরিক কর্মকাণ্ড ও বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। ২ লাখ ৩৫ হাজার সদস্যের সামরিক বাহিনী থেকে ৬০ হাজার সদস্য কমিয়ে ফেলা হয়। জাতীয় উৎপাদনের ১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় হয় সামরিক খাতে।


দেশটি ১৪টি প্রদেশ এবং একটি বিশেষ মিউনিসিপ্যালটিতে বিভক্ত। প্রদেশগুলোকে ১৭০টি মিউনিসিপ্যালিটিতে ভাগ করা হয়েছে। কিউবার প্রধান দ্বীপটির নাম কিউবা। এটিকে ঘিরে রেখেছে আরো চারটি দ্বীপমালা। দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলই সমতল। দক্ষিণ-পূর্বাংশে পর্বত শ্রেণী রয়েছে। মে থেকে অক্টোবর বৃষ্টির মৌসুম। নভেম্বর থেকে এপ্রিল শুকনো মৌসুম।


ছয় বছর থেকে স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। ছয় বছর প্রাথমিক শিক্ষা নিতে হয়। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হাভানা ইউনিভার্সিটি ১৭২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষার প্রতি কমিউনিস্ট সরকারের শক্তিশালী প্রতিশ্র“তি রয়েছে। শিক্ষার হার ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ।


১ কোটি ১৩ লাখ জনসংখ্যার মাঝে সাদা চামড়ার মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ। কালোদের সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। মাসটিজোদের সংখ্যা ২৭ লাখ আর চীনা বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। চীনারা মূলত শ্রমিক হিসেবে এ দেশে এসেছিল। রেলপথ নির্মাণ ও খনিশ্রমিক হিসেবে স্পেনিশরা তাদের এখানে নিয়ে আসে। কমিউনিস্ট সরকার ধর্ম পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে ১৯৯১ সালের পার্টি কংগ্রেসে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। জনসাধারণের বেশির ভাগই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী।