বৈকাল হ্রদ কেন বিখ্যাত

Apr 29, 2018 02:55 pm
বৈকাল সবচেয়ে পুরনো হ্রদ



সাকিব ফারহান

ভূ-ঐতিহাসিকদের বিবেচনায় বৈকাল সবচেয়ে পুরনো হ্রদ। প্রায় আড়াই থেকে ৩ কোটি বছর আগে এর উৎপত্তি বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। ব্যাপক ভূমিকম্প আর ওলট-পালট থেকে সৃষ্ট ভূ-পৃষ্ঠের ফাটলের ফলে এর জন্ম।


রাশিয়ার বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি সাইবেরিয়ান তৈগা এগিয়ে গেছে মঙ্গোলিয়ার দিকে। ভূমির উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। ভূমিরূপের বৈচিত্র্য অন্য রকম। মঙ্গোলিয়া ও সাইবেরিয়াকে আলাদা করতে কোনো বেড়া নির্মাণ করতে হয়নি। শিলা-কঙ্কর গঠিত পাহাড়-পর্বত। পাহাড়ের খাঁজে গড়ে ওঠা তৃণাচ্ছাদিত এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের ভূখণ্ড গড়িয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। এরই মাঝে সাগরসদৃশ খাড়ি। ৬৫০ কিলোমিটার লম্বা ৮০ কিলোমিটার প্রস্থের প্রকাণ্ড একটি হ্রদ। নাম তার বৈকাল। সাইবেরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলব্যাপী এর অবস্থান। একদিকে রয়েছে রাশিয়ার ইরকুটস্ক অবলাস্ট অন্যদিকে ব্যুরিয়াত প্রদেশ। বৈকাল নামক হ্রদের কথা প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় চীনা ভাষায় লিখিত বইতে।

নামটির উৎপত্তি মঙ্গোলিয়ান শব্দ ‘প্রকৃতি’ থেকে। এর অপভ্রংশ বাইগাল থেকে বৈকাল নামটি এসেছে। অন্য ব্যাখ্যায় পাওয়া যায় বৈকাল শব্দটি এসছে তুর্কি শব্দ ‘বাই’ ও ‘কুল’ থেকে। শব্দ দুটির অর্থ যথাক্রমে সম্পদশালী ও হ্রদ। এর অর্থ দাঁড়ায় সমৃদ্ধ হ্রদ। স্বচ্ছতার জন্য ‘ব্লু আই অব সাইবেরিয়া’ নামে অত্র অঞ্চলে এটি সমধিক প্রসিদ্ধ। স্থানীয়দের ‘পবিত্র সাগর’ নামে ডাকা হ্রদটির উৎপত্তি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের অবসান হয়নি এ যাবৎ। ভূ-ঐতিহাসিকদের বিবেচনায় বৈকাল সবচেয়ে পুরনো হ্রদ। প্রায় আড়াই থেকে ৩ কোটি বছর আগে এর উৎপত্তি বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। ব্যাপক ভূমিকম্প আর ওলট-পালট থেকে সৃষ্ট ভূ-পৃষ্ঠের ফাটলের ফলে এর জন্ম। জাতিসঙ্ঘের অন্যতম সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৬ সালে বৈকালকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত করে।


অফুরন্ত প্রাণ-বৈচিত্র্য : বৈকালের পানিসীমা ছুঁয়ে আছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূমি। পানি আর ভিন্ন প্রকৃতির ভূমিরূপের মধ্যে গড়ে উঠেছে উদ্ভিদ আর প্রাণীদের এক বিচিত্র জগৎ। হ্রদে প্রায় ১ হাজার ২০০ প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর বাস। রয়েছে ১ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের ৮০ শতাংশই বৈকালের বাইরে কোথাও পাওয়া যায় না। ৫২ প্রজাতির মাছের মধ্যে ২৭টি প্রজাতিই বিশ্বের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এখানকার আজব প্রাণী বিশেষ ধরনের সিল। নারপা নামে এটি পরিচিত। এটি লেকের একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী। পাওয়া যায় না পৃথিবীর অন্য কোথাও। বিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যের সন্ধানে এটি ধীরে ধীরে বেশি মাত্রায় ভূমিতে উঠে আসে। প্রায় ২ কোটি বছর আগে এ হ্রদে তাদের বসবাস শুরু হয়।

বৈকালের পানি স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো। মাইক্রো অর্গানিক এক বিশেষ জৈবিক প্রক্রিয়ায় হ্রদের পানি বিশুদ্ধ হয়। এর পেছনে রয়েছে ছোট্ট ‘ইপিসুরা জু প্লাঙ্কটন’র ভূমিকা। ব্যাকটেরিয়াসহ পানি ঘোলাকারী সব ধরনের জীবাণু খেয়ে ফেলে এটি। পাহাড়ি ছাগল, তুষার মেষ, আলপাইন ইঁদুর আর কাঠবিড়ালীর বিচিত্র জগৎ লেকের পাহাড় আর সমভূমিঘেরা বনাঞ্চলে। বাস করে প্রায় ৩০০ কেজি ওজনের এক ধরনের ভল্লুক। সাপের মতো এরাও কয়েক মাসের জন্য শীতনিদ্রায় যায়। এ সময় তারা ওজনের ৬০ শতাংশ হারায়। এ সময় তাদের হৃদকম্পন, শ্বাসপ্রশ্বাস ও তাপমাত্রা খুব কমে যায়, যা শরীরের সংরক্ষিত জ্বালানিকে ক্ষয় থেকে বাঁচায়। ওমুল নামের মাছটি ট্যুরিস্ট ও স্থানীয়দের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। বৈকালেই একমাত্র আবাস এ মাছটি বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেন জেলেরা। এখানে বাস যত সব লোমওয়ালা জীবের। বিশেষ প্রকৃতির নেকড়ের জীবন প্রণালী আকর্ষণীয়। তারা অত্যন্ত সামাজিক ও সংগঠিত। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ভালো বিবেচনাবোধ রয়েছে। যেনতেনভাবে প্রাণীদের হত্যা করে না এরা। বয়স্ক ও অসুস্থদের প্রতি এরা বেশ দয়াপরবশ। তারা পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে পছন্দ করে। অন্য প্রাণীদের সঙ্গে প্রায়ই তারা এ নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। হ্রদকে ঘিরে বনাঞ্চলে ২৯ প্রজাতির লোমশ প্রাণী পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতক থেকে এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার লোমা ও উলের ব্যবসা জমে ওঠে। সেই থেকে বিশ্ববণিজ্যে লোমের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য রাশিয়ানদের।


বৈকালের তীরে জনবসতি
এস্কিমোদের আদি বাসস্থান বৈকালের তীরে (এস্কিমোদের বাসস্থান এখন আলাস্কায়)। নবম শতকে তাদের সাথে যোগ দেয় মঙ্গোলীয়রা। চেঙ্গিস খান ১৩ শতাব্দীতে এটি জয় করেন। বৈকালের পূর্ব তীরে ব্যুরিয়াত রিপাবলিকে মিলেমিশে বাস করে তারা। ১৬ শতকে রাশিয়ান লোম ব্যবসায়ীরা সেখানে কলোনি প্রতিষ্ঠা করে। শত বছরে মঙ্গল আর রাশিয়ানরা মিশে একাকার হয়ে গেছে। মঙ্গোলীয়দের বৌদ্ধ আর রাশানদের অর্থোডস্ক ক্রিষ্টিয়ানিটির সহবস্থান লক্ষণীয়। আশপাশের পাহাড়-পর্বত আর নদী হলো তাদের স্বর্গীয় প্রেরণার উৎস। এগুলোকে পূজা করেন তারা। রাজধানী উলান-উদের শিল্প-সহিত্য চর্চায় বৈকালের প্রভাব প্রত্যক্ষ। প্রায় ৪ লাখ জনসংখ্যার দেশটির অর্থনীতি বৈকালকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সমৃদ্ধ কৃষি আর রমরমা পর্যটন ব্যবসার পাশাপাশি মেশিনারিজ শিল্পও এখানে বিকাশলাভ করেছে। চালচলনে একটু উদ্ভট তারা। জনবসতিতে ঢোকার আগে আপনার ব্যাগ ও ব্যাগেজ বাইরে রেখে আসতে হবে। প্রচলিত নিয়মগুলো মেনে চলতে পারলে তবেই কেবল তাদের জনবসতিতে ঢুকতে পারবেন। তারা যদি কোনো কিছু দেয়ার সময় দুই হাত ব্যবহার করে তাহলে আগন্তুককেও দুই হাত ব্যবহার করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, সব ব্যাপারে তাদের রীতিকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। সেখানকার সামা সম্প্রদায়ের সাথে সাবধানে মিশতে হয়। তাদের ছবি তোলা যাবে না। অনুমতি না দিলে তাদের ছোঁয়া যাবে না। ঘন অরণ্যে কাঠনির্মিত কুটির রয়েছে। এগুলোকে স্থানীয় ভাষায় ‘জিমোভিয়া’ বলা হয়। শিকারিরা এগুলো ব্যবহার করে। এর দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ রাতযাপন করতে পারবে এসব কুটিরে। তবে ছেড়ে আসার সময় পরিষ্কার করে রেখে আসার একটি ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। তার সাথে জ্বালানি কাঠ, আগুন ধরানোর কাঠি ও লবণ রেখে আসা হয়।


অন্য তীরে ইরকুটস্ক অবলাস্ট। ইরকুটস্ক শহর পুরো সাইবেরিয়ার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। ষোড়শ শতকে এখানে মানব বসতি গড়ে। সাবেক সোভিয়েত আমলে এটি বেশ গুরুত্ব পায়।
বৈকালের তীরে এশিয়ান ব্যুরিয়াত আর সাইবেরিয়ান রাশিয়ান দুটি সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছে। প্রকৃতির প্রতি পবিত্র অনুভূতি সম্পন্ন ব্যুরিয়াতের প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্গে রাশিয়ান ক্রিশ্চিয়ানদের মিলন ঘটে ১৭ শতকে।


রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ব্যবসার দ্বার উন্মোচিত হলে সংযোগপথ হিসেবে বৈকাল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯০২ সালে ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ নির্মাণের আগে এ হ্রদের ব্যাপারে সবিশেষ কিছু জানা যায়নি। এফ কে ড্রেজেনকোর নেতৃত্বে এটির প্রথম বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা হয়।


হিমশীতল আবহাওয়া : আবহাওয়ার বড় বেশি বৈচিত্র্যের কারণে বৈকালকে জলবায়ু জাদুঘর বলা হয়। গ্রীষ্মের উঞ্চ আবহাওয়া চমৎকার। পুরো শীতকালই তাপমাত্রা শূন্যের নিচে থাকে। বৈকাল পরিণত হয় বরফের সাগরে। এ সময় পর্যটকরা বরফের ওপর নানা ধরনের খেলাধুলা করতে পারেন। বেশ ক’টি সংস্থা স্কি, ডগ স্লেজিং, বরফে মাছ শিকার ও ডাইভিংয়ের মতো প্রমোদের আয়োজন করে থাকে পর্যটকদের জন্য। বরফের ওপর দিয়ে ঘোড়া ও বন্য কুকুরবাহিত বিশেষ গাড়ি চালানো যায়।


বিস্তৃত বরফপাত এতটা স্বচ্ছ যে, এর ভেতর দিয়ে পানির গভীরে বসবাসকারী প্রাণী দেখা যায়। সবচেয়ে শীতল মাস জানুয়ারিতে তাপমাত্রা মাইনাস ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে। বরফের স্তর ৭০ থেকে ১১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পুরো হয়। এপ্রিলে তাপমাত্রা শূন্যতে উন্নীত হয়। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস জুলাইতে। উত্তর বৈকালে বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত পরিমাণ ২০০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার। তবে দক্ষিণে এর পরিমাণ দ্বিগুণের চেয়ে বেশি।


যতসব বৈচিত্র্য
পৃথিবীর গভীরতম এ হ্রদটি এশিয়া-ইউরোপের মাঝে সর্ববৃহৎও। বিস্ময়কর সৃষ্টির দিক দিয়ে এটি অদ্বিতীয়। ৬৩৬ কিলোমিটার লম্বা আর ৮০ কিলোমিটার প্রস্থের এই হ্রদে পৃথিবীর মোট সুপেয় পানির এক-চতুর্থাংশ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সুপেয় পানির উৎস এটি। সর্বোচ্চ গভীরতা ১ হাজার ৬২০ মিটার। গড় গভীরতা ৭৩০ মিটার। সমুদ্র সমতল থেকে এর তলানি ১ হাজার ২৮৫ মিটার গভীরে। উপকূল রেখার দৈর্ঘ্য ২১ হাজার কিলোমিটার। পানি রয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কিউবিক কিলোমিটার।

চারদিকে পর্বতবেষ্টিত হ্রদের অভ্যন্তরে আবার ২২টি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। বৃহৎ দ্বীপ ওইখোন ৭২ কিলোমিটার লম্বা। ছোট-বড় ৩০০টি নদী এসে পড়েছে হ্রদে। বিশালতার অনুমান করা যায় এর জলরাশির পরিমাণ থেকে। পৃথিবীর সব নদী হ্রদটিকে পরিপূর্ণ করতে এক বছর সময় লেগে যাবে। অন্যদিকে হ্রদে পতিত নদীগুলো খালি হ্রদকে পরিপূর্ণ করতে একনাগাড়ে ৪০০ বছর প্রবাহিত হতে হবে। গ্রীষ্মে শান্ত হ্রদে ৪০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খালি চোখে দেখা যায়। লেকের পানির বিশুদ্ধতার জন্য এটি প্রাচীনকাল থেকে প্রসিদ্ধ। অতল গভীরের পানিতেও প্রয়োজনীয় মাত্রায় অক্সিজেন রয়েছে। অন্যান্য হ্রদের গভীর তলানিতে অক্সিজেনের মাত্রা যেখানে শূন্য, সেখানে বৈকালের গভীর পানিতে তার পরিমাণ বিস্ময়কর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হ্রদটি বাৎসরিক গড়ে দুই সেন্টিমিটার করে বিস্তৃত হচ্ছে। এ ধারা প্রাচীনকাল থেকে অব্যাহত রয়েছে।


হুমকির মুখে বৈকাল
বৈকালের প্রধান শত্রু পরিবেশ দূষণ। বৈকালকে ঘিরে শিল্পায়ন হয়েছে। জনসংখ্যা বেড়ে গেছে। প্রকৃতির বিশাল ভাণ্ডারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। দূষণের প্রধান কারণ বৈকাল পাল্প অ্যান্ড পেপার প্লান্ট। সম্প্রতি বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে রাশিয়া এগিয়ে এসেছে । নতুন আইন প্রণীত হয়েছে এখানে কোনো প্রকার শিল্পবর্জ্য ফেলা যাবে না। তবে ক্ষতি যা হওয়ার ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। সরকার অনেকগুলো এলাকাকে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈকাল অত্যন্ত ভূমিকম্প স্পর্শকাতর এলাকা। যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে ভূ-বৈচিত্র্যে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে, যা হ্রদটির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও মানুষের জন্য সুখকর হবে না। মানুষের অপরিমিত আগ্রাসন এ ধরনের ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করতে পারে।