ডিজিটাল প্রজন্ম যেভাবে জেগে উঠছে

Apr 10, 2018 05:26 pm
ডিজিটাল প্রজন্ম রাজপথে

আলফাজ আনাম 

দিনভর ফেসবুকে ব্যস্ত ছেলেটি রোববার রাতভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন। ফেসবুক ছেড়ে শেষ পর্যন্ত প্রথাগত আন্দোলনের পথে রাজপথে নেমে আসতে হয়েছে। কারণ, এই ছেলেরা দেখতে পাচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তারা চাকরির সুযোগ না-ও পেতে পারেন। এ অবস্থা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ভবিষ্যতের চাকরির ন্যায্য হিস্যার জন্য আন্দোলনে নেমেছেন। কোটা সংস্কারের উত্তাল আন্দোলনের পেছনে রয়েছে লাখ লাখ তরুণের চাকরি না পাওয়ার স্বাভাবিক শঙ্কা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের আন্দোলন যেভাবে দমন করা হয়েছে ক্ষমতাসীনেরা গায়ের জোরে একই কায়দায় অরাজনৈতিক এ আন্দোলনও দমন করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ আর ছাত্রলীগকে মাঠে নামানো হয়েছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক ধরপাকড়ের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতির মধ্যে ভিসির বাসভবনে রহস্যময় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। অথচ কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা ‘সম্ভব হলো না’। এর মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর মতো একজন সিনিয়র রাজনীতিক ও মন্ত্রী সংসদে উসকানিমূলক ভাষায় বললেন, ‘পরিষ্কার বলতে চাইÑ মুক্তিযুদ্ধ করেছি, মুক্তিযুদ্ধ চলছে ও চলবে। এই রাজাকারের বাচ্চাদের অবশ্যই আমরা দেখে নেবো।’


এই মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য যারা আন্দোলন করছেন, তারা যেন মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেভাবে ক্ষমতাসীন দল ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে, এখন ২০-২৫ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সরকার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে একই বিশেষণে আখ্যা দিয়ে। অথচ এ আন্দোলনের প্রধান দাবি হচ্ছে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে যে অন্যায় বৈষম্য তা দূর করা। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য; প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ এবং নারী ও জেলা কোটা ১০ শতাংশ করে। সব মিলিয়ে কোটার জন্য বরাদ্দ ৫৬ শতাংশ। বাকি ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ অর্ধেকের কম নিয়োগ হচ্ছে মেধার ভিত্তিতে। ফলে মেধার চেয়ে নানা ধরনের কোটায় বেশিসংখ্যক লোক চাকরি পাচ্ছে। সোজা কথা, মেধাবীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


যে ছাত্রছাত্রীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছেন তারা পাঁচটি দাবি তুলেছেন, তা হলো সরকারি নিয়োগে কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, কোটার যোগ্য প্রার্থী না পেলে শূন্য পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেয়া, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অভিন্ন বয়সসীমা এবং নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার না করা। বৈষম্যহীনভাবে মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থীদের এ দাবি কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। তারা সমাজের অনগ্রসর অংশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ১০ শতাংশ কোটার যে প্রস্তাব করছে তা যথেষ্ট।


দেশের স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সবার জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ওই সময় ৪০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ যুদ্ধবিধস্ত নারী কোটা এবং ২০ শতাংশ মেধা কোটা ছিল। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ ছিল স্বাভাবিক। যৌক্তিকভাবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু ২৬ বছর পরে ১৯৯৭ সালে এসেও এই ৩০ শতাংশ কোটা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের একটি ধারার উল্লেখ করা হচ্ছে। সংবিধানের ২৯ ধারার ৩(ক) উপধারায় বলা আছে, ‘নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা হইতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’


প্রশ্ন হলোÑ মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে যাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, তারা কতজন সমাজের অনগ্রসর অংশ? নিঃসন্দেহে মুক্তিযোদ্ধারা এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা এ দেশের মুক্তির জন্য বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তারা নিশ্চয় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সময় এই আশায় যাননি যে, দেশ স্বাধীন হলে তার সন্তান বা নাতিরা সরকারি চাকরির সুযোগ পাবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেখানো ও তারা যাতে মর্যাদার সাথে বাস করতে পারে, সে ব্যাপারে অবশ্যই রাষ্ট্রের কর্তব্য আছে। সে জন্য সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। তাদের আরো বিবিধ সুযোগ-সুবিধা দেয়া যেতে পারে। কিন্তু একই ধরনের সুযোগ বা তার চেয়ে বেশি সুযোগ তার সন্তানেরা বা বংশধররা পাবেন, তা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।


এ ছাড়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের নামে চালু করা কোটা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক কোনো তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। যে সরকার আসে তারা নতুন করে এই তালিকা প্রণয়ন করে। এমনকি সরকারের একাধিক সচিবের বিরুদ্ধে, এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের বিরুদ্ধেও মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সনদ নিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ আছে। সেখানে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে সুবিধাভোগী লোকদের অযোগ্য সন্তানদের চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না; তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছেÑ যারা মুক্তিযুদ্ধের সন্তান হিসেবে সরকারি চাকরি প্রতিযোগিতা ছাড়াই পেয়ে যাচ্ছে, তারা সমাজে বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে স্থান করে নিচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া আর সবাই স্বাধীনতাযুদ্ধে কোনো-না-কোনোভাবে অংশ নিয়েছেন। তা না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। আজকে তরুণেরা দেখছেন, বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিল বা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট থাকার কারণে একটি অযোগ্য ছেলে চাকরি পাচ্ছেন। অপর দিকে, ভালো ফলাফল থাকা বা মেধাবী হওয়ার পরও তারা চাকরি পাচ্ছেন না। এর মাধ্যমে নিজেকে শুধু বৈষম্যের শিকার নয়, অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হিসেবেও ভাবছেন।


ক্ষমতাসীনদের ভাবতে হবে, হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন কোটা সংস্কারের দাবিতে এবং তাদের এ বিক্ষোভ সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়, এর পেছনে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র কিংবা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের উসকানি আবিষ্কার করা হাস্যকর ও অর্থহীন। এ আন্দোলনের জন্ম হয়েছে সমাজে এখন যে বঞ্চনার সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে। এই তরুণেরা দেখছেন, গত এক দশকে একটি শ্রেণী আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত তার সহপাঠী হয়তো লাখ লাখ টাকার মালিক এবং শিক্ষাজীবন শেষ না হতেও গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে গেছে। হয়তো ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটি কোটায় চাকরি পেয়ে পুলিশের কর্মকর্তা হয়ে গেছেন। কেউ বা বিরোধী দলের এমপি পিটিয়ে পদোন্নতি পাচ্ছেন। বাসের হেলপার ও ডিমের ব্যাপারি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কী ভবিষ্যৎ আছে এ দেশে? ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে তরুণদের বিরাট অংশ এখন বিক্ষুব্ধ। এত দিন তাদের ডিজিটাল স্বপ্ন দেখিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। সেই স্বপ্ন তাদের ভাঙতে শুরু করেছে।


ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে একটি দেশের বেশির ভাগ তরুণ যদি নিজেকে বঞ্চিতভাবে কিংবা বৈষম্যের শিকার বলে মনে করেন, তখন তাদের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে ঘটতে পারে। ৮ বছর আগে এমন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায়। হতাশা থেকে বিক্ষোভ একটি অঞ্চলকে তছনছ করে দিয়েছে। সেই আরব বসন্তের কথা মনে আছে? ২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর। তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে হঠাৎ জ্বলে উঠল আগুন, আর তাতে আত্মাহুতি দিলো এক তরুণ। তার নাম মোহাম্মদ বুআজিজি। তিনি রাস্তায় ফল বিক্রি করতেন; কিন্তু পুলিশ তাকে আর রাস্তায় বসতে দেবে না। হকারের এই সামান্য ব্যবসায় করতে না পারলে সে ও পরিবার খাবে কী? প্রতিবাদী তরুণ বুআজিজি চরম সিদ্ধান্ত নিলো, না খেয়ে মরার চাইতে আগুনে পুড়ে মরাই ভালো। তা-ই হলো। আত্মাহুতি দিলেন ক্ষোভে।


ঘটনাটি ওখানেই শেষ হতে পারত; কিন্তু শেষ হলো না, বরং শুরু হলো। বুআজিজিকে পোড়াল যে আগুন, সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে। তিউনিসিয়া নামের দেশটির লাখো লাখো প্রতিবাদী তরুণ রাস্তায় নেমে এলেন। তারা আর দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসক জাইন আল-আবেদিন বেন আলীকে শাসন ক্ষমতায় দেখতে চান না। তাকে এবার সরতেই হবে।


বেন আলীকে সরতেই হলো, জয় হলো সংগ্রামী জনতার। পশ্চিমা বিশ্ব এর নাম দিলো ‘আরব বসন্ত’। তারপর আরব বসন্তের তপ্ত হাওয়া ছড়িয়ে পড়ল আরব দুনিয়ার দেশে দেশে। সেই দমকা হাওয়ার তোড়ে উড়ে গেল ওসব দেশের অনেক কিছু। মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেন তারই জ্বলন্ত নজির। ‘বসন্ত’ এসব দেশে মরুঝড়ে রূপ নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে পুরো দেশ ও জাতিকে। বুআজিজির আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। যেমন এর আগে ‘ভ্যাট দেবো না গুলি করো’ বলে এ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না।


আজকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা যেভাবে চাকরির নিশ্চয়তার জন্য রাস্তায় নেমে আসছেন, তাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ যেন একজন বুআজিজির অপেক্ষায় আছে। না আমরা এ দেশে কোনো মরুঝড় বা কথিত বসন্ত চাই না। সাম্য, ন্যায়বিচার, সামাজিক মর্যাদা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের মানুষ যে মুক্তিযুদ্ধ করেছে আমরা চাই তার প্রতিষ্ঠা। আজ কোটা ব্যবস্থার নামে সমাজে ও রাষ্ট্রে যে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে তা কখনোই রাষ্ট্রকে উপকৃত বা স্থিতিশীল করবে না। বেন আলীরা একদলীয় শাসন কায়েমের জন্য তিউনিসিয়ায় এমন সুবিধাভোগী শ্রেণী গড়ে তুলেছিলেন; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তাই সরকারের উচিত হবে আন্দোলনরত তরুণদের ক্ষোভের মাত্রা না বাড়িয়ে দাবি মেনে নেয়া। পুলিশ বা ছাত্রলীগ দিয়ে হয়তো আপাতত এ আন্দোলন দমন করা যাবে; কিন্তু মানুষের মন থেকে বঞ্চনার আগুন নেভানো যাবে না। নতুন করে তা আবার জ্বলে উঠবেই। 


alfazanambd@yahoo.com