কেমন দেশ মরোক্ক

Mar 14, 2018 04:48 pm
টেটোয়ান মরক্কোর একেবারে উত্তরে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে


আবু এন এম ওয়াহিদ

দুই হাজার পনরো সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার দুপুরের দিকে টেটোয়ান গিয়ে পৌঁছাই। একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন উপলক্ষে সেখানে তিন দিন ছিলাম। টেটোয়ান মরক্কোর একেবারে উত্তরে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে রিফ পর্বতমালার ওপর গড়ে ওঠা এক পুরনো বন্দর নগরী। এর লোকসংখ্যা পাঁচ লাখের একটু কম। ‘বারবার’ ভাষার শব্দ ‘টেটোয়ান’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘চোখ’ হলেও আলঙ্কারিক অর্থে ‘টেটোয়ান’ বলতে বোঝায় ‘পানির ফোয়ারা’। যে অর্থেই ধরুন না কেন, টেটোয়ান যে একটা চোখজুড়ানো, মনমাতানো ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যমণ্ডিত আরব জনপদ, এতে কোনো সন্দেহ নেই! এর ইতিহাস বারো শ’ বছরেরও বেশি। স্পেনে মুসলমানি আমলে অষ্টম শতক পরবর্তী সময়ে টেটোয়ানের গুরুত্ব ছিল তুঙ্গে, কারণ তখন এ শহরই মরক্কো ও আন্দালুসিয়ার একমাত্র যোগসূত্র হিসেবে কাজ করত। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে টেটোয়ানের ভাষা ও সংস্কৃতিতে ফরাসির চেয়ে স্প্যানিশ প্রভাব অনেক বেশি।


মরক্কো কোনো তেল বা গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ নয়, আবার খুব ধনীও নয়। তবু এখানে কেউ মাটির ঘরে থাকে না, কুঁড়েঘরে থাকে না, টিনের ঘরেও না। সবাই পাকা দালানের বাসিন্দা। ঘরগুলো সব সাদা রঙের। দূর থেকে টেটোয়ানকে দেখলে মনে হয় সাদা কংক্রিটের চাদরে ঢাকা পাহাড়, যেন এক বিশাল তাঁবু। মরক্কো কোনো গণতান্ত্রিক দেশ নয়, এখানকার শাসনভার রাজার হাতে। এই রাজপরিবারের রয়েছে শত শত বছরের বাদশাহী ঐতিহ্য। রাজতন্ত্র হলেও সে দেশের শাসক স্বৈরতান্ত্রিক নয়, জনগণ নির্যাতিত নয়। নিজ চোখে না দেখলে হয়তো বা বিশ্বাস করতাম না, মরক্কোর রাজার সমালোচনা করলেও পেছনে গোয়েন্দা লাগে না, র‌্যাব-পুলিশ তাড়া করে না। হোটেলের ডেস্ক ক্লার্ককে দেয়ালের ছবি দেখিয়ে বললাম, ""Who is this man?'' "He is our King?'' "He is MY King!" না বলে অত্যন্ত মহব্বতের সাথে গর্বভরে বলল, "Our King" ‘‘our King" যে ‘‘MY King"-এর চেয়ে অনেক আপন তা তার কথায় স্পষ্ট ফুটে উঠল। টেটোয়ানের পাহাড়ের গায়ে গাছপালা তেমন নেই, মাটি বা পাথর যা-ই বলুন দেখতে সাদা সাদা, চুনাপাথরের মতো। এই নগরীর পাহাড়ের মাটি সাদা, পাথর সাদা, দালানকোঠা সাদা, অল্প দিনে টেটোয়ানবাসীর যেটুকু পরিচয়ই পেয়েছি, তাতে মনে হয় তারা সাদা মনের মানুষও বটে!


হোটেলে চেকইন করে রুমে গেলাম, গোসল সেরে নামাজ পড়ে খেতে এলাম হোটেলের রেস্তোরাঁয়। তখনো সন্ধ্যা নামেনি। দেখতে পেলাম ওয়েটার কাম শেফ বসে ঝিমোচ্ছেন। ডিনারে আমিই প্রথম কাস্টমার। বিমানে এক তরুণ মরক্কান সহযাত্রী আগেই বলে দিয়েছেন টেটোয়ান গিয়ে কী কী খেতে হবে। তার কথামতো আমিও ঠিক করেছি প্রথম দিন খাবো মরক্কান ডেলিকেসি ‘তাজিন’, পরদিন ‘পাস্টেলো’ এবং শেষ দিন ‘কুসকুস’। মরক্কোর সুস্বাদু খাবারের মধ্যে তিনি প্রথমেই ‘কুসকুস’-এর কথা বলেছিলেন। আমি ভুরু কুঁচকে জবাব দিয়েছিলাম, ‘কুসকুস’ তো অনেক খেয়েছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় খেয়েছ?’ আমার উত্তর কানাডায় খেয়েছি, আমেরিকায় খেয়েছি, আরব বন্ধুদের বাড়িতে খেয়েছি, মসজিদে খেয়েছি, রেস্তোরাঁয়ও খেয়েছি। অত্যন্ত আস্থা ও গর্বের সাথে এবার তিনি জানালেন, “ওই ‘কুসকুস’ আর এই ‘কুসকুস’ এক হবে না। তুমি এখানে একবার খেয়ে যাও, তফাতটা বুঝতে পারবে!’’ পরিকল্পনামাফিক প্রথম দিন অর্ডার করলাম ‘তাজিন’। খেয়ে মনে হলো টেটোয়ানের ‘তাজিন’ নয়, যেন দিল্লিকা লাড্ডু! বুঝতেই পারছেনÑ হতাশ হলাম, মনে মনে বললাম, ঠকা খেলাম, ‘কুসকুস’ নিলেই বুঝি ভালো করতাম! স্বাদে আহামরি কিছু না হলেও ‘তাজিন’ দিয়ে পেট ভরাতে সেদিন আমার কোনো অসুবিধা হয়নি, কারণ খিদে ছিল যে! টেটোয়ানে আরো দুই দিন থাকলেও, আফসোস, এ যাত্রা আমার কিন্তু পাস্টেলো ও কুসকুস খাওয়া হয়নি! কেন হয়নি, সে দুঃখের কথা বলতে গেলে এর চেয়ে মজার কাহিনী বাদ পড়ে যাবে। তাই সে দিকে আজ আর না-ই বা গেলাম। গরম পানিয়ের মধ্যে টার্কিশ কফি ও মরক্কান টি দুটোই বিখ্যাত। টার্কিশ কফি সার্ভ করা হয় ছোট্ট চায়ের পেয়ালায়, আর চা-রসিকেরা মরক্কান টি এস্তেমাল করে থাকেন ছোট্ট পুরু কাচের গ্লাসে। একটা যেমনই ঘন আরেকটা তেমনই পাতলা। টার্কিশ কফি ঘন কালো রঙের, ওপরে বাদামি ফেনা ওঠা, মরক্কান টি পাতলা। দুটোর রঙ ভিন্ন, স্বাদও ভিন্ন, তবে দুটোই খেতে আচ্ছা মজাদার!


ডিনারের পালা চুকিয়ে লবি এরিয়ায় একটু ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে। ফজরে ওয়েকআপ কলের জন্য ফ্রন্ট ডেস্কে অনুরোধ করে রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। বিছানা বদলে সব সময়ই আমার ঘুমের অসুবিধা হয়, কিন্তু সে রাতে ঘুম হলো খুব ভালো। ওয়েকআপ কলের একটু আগেই ঘুম পুরো হয়ে গেল। উঠে জানালার ভারী পর্দা সরিয়ে দেখতে পেলাম সামনেই ‘ড্রিমস’ হোটেল। দুই হোটেলের মাঝখানে সবুজ ঘাসে ঢাকা তিন-চার একরের একটা খোলা ময়দান। নিরিবিলি দশ-বারোটা গরু ঘাস খাচ্ছে, আলো-আঁধারির মাঝে লাঠি হাতে একজন রাখালও হাঁটাহাঁটি করছে। রীতিমতো অন্ধকার! এত ভোরবেলা রাখাল গরু নিয়ে বেরিয়েছে, তাও আবার শহরের ভেতরে। আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ অবাক লাগছিল! ভাবছিলাম, ‘বাহ! বেশ মজার দেশ তো!’


এমন সময় মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে এলো আজানের ধ্বনি, ফজরের আজান ‘আল্লাহু আকবার...’। এক মুয়াজ্জিনের আজান শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেল বহু মুয়াজ্জিনের আহ্বান, বিস্ময়ের আর শেষ রইল না! যেটা ঢাকায় শোনা যায়, আপনারা নিশ্চয়ই তাই ভাবছেন? অর্থাৎ একসাথে অনেকগুলো মসজিদ থেকে মাইকে ভেসে আসা আজানের আওয়াজ। না, তা কিন্তু নয়! ঘটনা সম্পূর্ণরূপে অন্য! আমার কাছে মনে হলো, আমি যেন আমার গ্রামের বাড়ি গলগজা অথবা নানার বাড়ি বাদেপাশায় শুয়ে আছি, আর ফজরের আগে মোরগের ডাকে ঘুম থেকে জেগে উঠছি। গল্প নয়, সত্যি, ইটপাথরের নগর টেটোয়ানের মাঝখানে ফজরের সময় মোরগের ডাক, একটা দুটো নয়, অনেকগুলো, আসছে একই দিক থেকে, ‘কুকুরুক্কু..., কুকুরুক্কু...’ একটা থেকে আরেকটার গলায় তেজ বেশি! কান খাড়া করে কতক্ষণ শুনলাম, উপভোগ করলাম! গত চল্লিশ বছরে এমন প্রাণকাড়া মোরগের ডাক আমি আর কোথাও শুনিনি। মনে মনে ভাবলাম, ‘শুধু আধুনিক জমানার ইন্টারনেটই বিশ্বায়নের জন্ম দেয়নি, বিশ্বায়ন তো সার্বজনীন, সর্বকালের! সব দেশের মোরগ একই সময়, একইভাবে ডাকে, একই ফ্রিকোয়েন্সি এবং একই ওয়েভলেংথে আজান দেয়, নামাজের জন্য মানুষকে আহ্বান করে, কেউ শোনে, কেউ শোনে না, কেউ সাড়া দেয়, কেউ দেয় না! সৃষ্টির শুরুতে সব কিছুর মাঝেই আল্লাহ তায়ালা বিশ্বায়নের বীজ ছড়িয়ে রেখেছেন। কখন কোন বীজ কিভাবে অঙ্কুরিত হয়, তা সব সময় আমরা বুঝতেও পারি না, আর বোঝার কোশেশই বা করে ক’জন?


নামাজ পড়ে নিচে নামলাম, রেস্তোরাঁ খুলেছে কিন্তু নাশতা তৈরি হয়নি। লবিতে গেলাম ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে। যা দেখতে চাইনি তাই দেখলাম, যা পড়তে চাইনি তাই পড়লাম। প্যারিসের খুনখারাবির কথা জেনে মনটা খারাপ হয়ে গেল! দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম, নিরাপদে সহিসালামতে সময়মতো বাড়ি ফিরে আসতে পারব তো! নাশতার পর করফারেন্স শুরু হলো। দুই দিনের কনফারেন্স এক দিনেই শেষ হয়ে গেল, তবে এর সাথে প্যারিসের রক্তগঙ্গার কোনো সম্পর্ক নেই। কনফারেন্স শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গতানুগতিকই গেল। পরদিন রোববার কিছু করার নেই। সারা দিন শুয়ে-বসে হোটেলেই কাটালাম।


বিকেলের দিকে আর সময় কাটছিল না। তাই রাস্তায় বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে বাঁ দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। এক দিকে হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, কার ডিলারশিপ, অন্য দিকে আবাসিক এলাকা। চার লেনের চওড়া রাস্তা। মাঝখানে আয়ল্যান্ড আছে। আমি রাস্তা পেরিয়ে মানুষের বাড়িগুলো দেখছিলাম। চার দিকে দেয়াল ঘেরা ভিলা টাইপের বড় বড় বাড়ি। বড়লোকদের বাস, ঢাকার শুলশান-বারিধারার সমতুল্য। উঁচা উঁচা দেয়াল আর বন্ধ গেটের কারণে ভেতরে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছিল না। তবে সবার ঘরের সামনে যে ফুলের বাগান আছে তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। অনেকের দেয়ালের বাইরেও আছে সাজানো ফুলবাগিচা। কত জাতের বাহারি ফুল দেখলাম! একমাত্র জবা ছাড়া আর কোনোটাই চিনলাম না। আরেকটা ফুল দেখলাম বেলি আর শিউলির মাঝামাঝি ছোট ছোট সাদা সাদা ফুল, গাছে ফুটে আছে থরে থরে, মাটিতে ঝরে পড়েও আছে। খুশবুতে ম-ম করছে গাছতলা, কিন্তু ফুলের নামধাম কিছুই জানা হলো না। মৌমাছির গুন গুন, প্রজাপতির ওড়াউড়ি!


যেমনটা দেখেছি বাংলাদেশে, কানাডায়, আমেরিকায়, সবই তো এক! এর মাঝে তফাত তো কিছুই ধরতে পারলাম না! মনে হলো সারাটা পৃথিবী যেন হাজার, লাখো, কোটি ফুলে গাঁথা একই মালা, একই আল্লাহ্র অপূর্ব মাখলুক! আরেকটু সামনে গেলাম, ট্র্যাফিক সার্কেল ঘুরে রাস্তা পেরিয়ে বাণিজ্যিক এলাকার দিকে এলাম। সামনে কোরিয়ান কার কোম্পানি হিউন্দাইয়ের ডিলারশিপ। পাশে একটা বড় রেস্তোরাঁ। অনেক মানুষ গম গম করছে। পেছনে ছোট্ট খেলার জায়গা, মহিলারা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিনোদনের জন্য নিয়ে আসছেন। বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, ‘সি সো’ খেলছে, আর মায়েরা বাইরে বসে চা-কফি খাচ্ছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। দেখতে পেলাম ঘরে-বাইরে বারান্দায়, দেয়ালে ও খাম্বার সাথে বড় বড় চ্যাপ্টা পর্দার টিভি ঝুলছে, মানুষজন চা-কফিতে মশগুল হয়ে মনের সুখে ফুটবল খেলা দেখছে। আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল ওই আসরে বসে তাদের আনন্দে শরিক হই, কিন্তু অন্ধকার হয়ে আসছে বলে ও-বেলা পদযাত্রায় ইতি টেনে হোটেলে ফিরে এলাম।


ট্যাক্সি ঠিক করে রেখেছি আগেই। কোনো রকম রাতটা পোহালেই বাড়ি ফেরার পালা। টেটোয়ান থেকে গাড়িতে রওনা দেবো তানজিয়ার, সেখান থেকে বিমানে মাদ্রিদ, তারপর মায়ামি হয়ে ন্যাশভিল ফিরে আসার কথা। সোমবার সকাল আটটা বাজতেই ট্যাক্সি এসে হাজির। আমিও খেয়েদেয়ে চেকআউট করে লবিতে তৈরি। গাড়িতে উঠলাম, শুরু হলো আমার ফেরত যাত্রা। টেটোয়ান থেকে তানজিয়ার, ষাট-সত্তর মাইলের মতো পাহাড়ি পথ। আসার সময় শহর বাইপাস করে হাইওয়ে ধরে এসেছিলাম। এবার শহরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কর্মচঞ্চল দিন শুরু হয়ে গেছে। মানুষ জীবিকার সন্ধানে এদিক-ওদিক ছুটছে। বাংলাদেশের মতো রাস্তায় নানান জাতের যানবাহন দেখছি। রাস্তাঘাটে হাঁটা চলায় প্রতি তিন কি চারজন নারী দেখলে একজন পুরুষ চোখে পড়ে। শহর পার হওয়ার পর উল্লেখ করার মতো বেশ কিছু দৃশ্য দেখলাম। রাস্তাটা একটু উঁচানিচা আঁকাবাঁকা, রিফ পর্বতমালা হলেও খুব উঁচা পাহাড় ও ঘন বন নয়। ছোট, বড়, মাঝারি আকারের টিলা ও খোলা প্রান্তর আধা মরুভূমি আধা শ্যামলিমায় ঢাকা রাস্তার দুই পাশ, কিন্তু কোথাও ডোবা-নালা নেই, খাল-নদী নেই, জলাভূমি নেই, এমনকি একটা পুকুরও নজরে পড়ল না। তা থাকবে কেন? এ যে উত্তর আফ্রিকা, সাহারা মরুভূমির দেশ! চাষিরা মাঠ চাষ করছে, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ইত্যাদি দিয়ে। কোথাও হালের বলদ ও লাঙ্গলের দেখা পেলাম না। চাষ দেয়া মাঠে সারস পাখির মতো এক জাতের সাদা সাদা বড় বড় পাখি হাঁটছে আর পোকা-মাকড় খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে।


কিছু দূর পরপর রাস্তার পাশে বিরাট বিরাট পটারির দোকান। পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানিরা। হাজারো জাতের পোড়া মাটির লাল লাল বাসন। এত মাটির বাসন দিয়ে এরা কী করে? ট্যাক্সি ড্রাইভার ইংরেজি তেমন জানে না, তাই খুব একটা জানা সম্ভব হয়নি। টিলার পাদদেশে আনাচে-কানাচে দলে দলে মেষ চরে খাচ্ছে, কোনো দলে রাখাল নেই, কোনো দলে আছে। সব পালেই দেখলাম ভেড়া বেশি, সাথে দু-চারটা বকরিও দেখা যায়। এক মেষরাখাল বিশেষভাবে আমার নজর কাড়ল। তার পরনে জোব্বা, বাঁ বগলে এক মাঝারি আকারের গাট্টি এবং ডান হাতে লাঠি। সাথে সাথে আমার মনে একটা ছবি ভেসে উঠল। সাড়ে চৌদ্দ শ’ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে আমাদের প্রিয় নবী (সা:) তাঁর বালক বয়সে তো এভাবেই মেষ চরাতেন! ভেবে ভেবে আবেগে আপ্লুত হলাম! পাশে দেখতে পেলাম এক কুকুর। কুকুরটা রাখালের সহকারী, নাকি নেড়িকুত্তা বুঝতে পারলাম না। চার লেনের ডিভাইডেড হাইওয়ে। লোকজনকে ব্রাশ দিয়ে মহাসড়কের ধুলোবালি পরিষ্কার করতে দেখে বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছি। তানজিয়ারের ঠিক প্রবেশমুখে ছোট্ট পুলিশ ফাঁড়ি। সেখানে দেখলাম এক লোক হাইওয়েতে ধুলা ঝাড় দিচ্ছে, ব্রাশ দিয়ে নয়, তাজা সবুজ খেজুরের ডাল দিয়ে।


টেটোয়ান থেকে তানজিয়ারের পুরো যাত্রাপথে যে বিষয়টি আমাকে নস্টালজিক করে তুলেছিল তা হলো কিছু দূর পরপর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাসযাত্রীদের দৃশ্য। কোনো কোনো জায়গায় বাসের ডেজিগনেটেড স্টপ আছে, শেল্টারও আছে, কিন্তু বেশির ভাগ লোকজনকে যত্রতত্র রাস্তার ধারে বাসের জন্য বসে থাকতে দেখেছি, দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। কোনো নারী বোরখা পরা, কেউ বোরখা ছাড়া ছাতা মাথায়, তবে কোনো মহিলাকেই পুরুষবিহীন দেখলাম না। নিদেনপক্ষে একটা দশ-বারো বছরের ছেলে হলেও সাথে আছে, (সিলেটি ভাষায় যাকে বলে শায়বালা)। কোনো জায়গায় দেখেছি নবদম্পতি বাসের অপেক্ষায় আছেন, হয়তো শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন অথবা বেড়ানো শেষে বাড়ি ফিরে আসছেন।


কোনো জায়গায় দেখেছি মা-বাবা ছেলেমেয়েসহ দাঁড়িয়ে আছেন গাছতলায়। তরুণ বয়সে আমি যখন সিলেট কলেজে পড়তাম তখন কুলাউড়া থেকে বড়লেখা অথবা মোকামবাজার থেকে সিলেট যাওয়ার পথে এসব দৃশ্য সব সময় দেখতে পেতাম এবং খুব উপভোগ করতাম। মরক্কোর গ্রামের মানুষ পাকা ঘরে থাকে কিন্তু তাদের গ্রামীণ সমাজে নারীদের চলাফেরার সাথে আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীদের চলাফেরায় এক অপূর্ব মিল দেখতে পেলাম!


এভাবে রাস্তার দুই পাশে নানান দৃশ্য দেখে দেখে তানজিায়ার বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। শহর ও জনসংখ্যার আন্দাজ মনে হলো, এয়ারপোর্টটা বেশ ছোট, বোর্ডিং ব্রিজ নেই, হেঁটে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠতে হয়। বিমানবন্দরে ব্যাগেজ চেকইন করে সিকিউরিটি পার হয়ে গেটে ওয়েটিং এরিয়ায় বসে আছি। সেখানে একটা মজার ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম। এর বয়ান দিয়েই আজকের মতো আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেবো। আমার উল্টো দিকে বসে আছেন এক ভদ্রলোক, তার বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। সাথে একটা ছোট্ট ছেলে, বয়স চার হবে, তার নাম আনোয়ার। আনোয়ারের পাশে বসে আছে দুই বোন, আমার ঠিক সামনে। বড়টার নাম জামিলা, বয়স বারো কি তেরো, ছোটটার নাম আমিনা, সে হবে বড়জোর দশ। একটু দূরে অন্য বেঞ্চে বসে আছে তাদের মা, হিজাব পরা মাঝবয়সী মহিলা। পাশে জামিলার ভাই বয়স সাত কি আট। তার ছোট আরেকটা বোন, সে হয়তো বা পাঁচ হবে শুধু লাফাচ্ছে আর এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে, মায়ের এতে কোনো পেরেশানি দেখলাম না।


জামিলা ও আমিনা ফুলের মতো সুন্দর ফুটফুটে দুটো মেয়ে। বড় বোন স্মার্টফোনে খেলছে, আর আমিনা বোনের ঘাড়ে মাথা কাত করে আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছে। আমি আনোয়ারের মা ও জামিলার বাবার হিসেব মেলাতে পারলাম না, অর্থাৎ তাদেরকে অশেপাশে কোথাও দেখলাম না। আনোয়ার বাবাকে বলছে, তার পিপাসা পেয়েছে, বাবা এক বোতল কমলার রস এনে দিলেন, সে এক চুমুক খেয়ে আর খেলো না। আমিনা হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে মায়ের কাছে গেল, হাতের ব্যাগ থেকে দুটো ক্যান্ডি আনল। একটা বোনকে দিলো আরেকটা নিজে খাবে বলে খুলতে লাগল। এমন সময় আনোয়ারের করুণ চাহনি আমিনার চোখে পড়ল, সে ক্যান্ডিটি নিজে না খেয়ে আনোয়ারের হাতে গুঁজে দিলো। আনোয়ার হাতে নিয়েই ক্যান্ডিটি লুকিয়ে ফেলল, হয়তো বা বাবার ভয়ে! নিশ্চয়ই অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু খেতে বাবার মানা। এমন সময় আনোয়ারের বাবা ছেলের হাতে ক্যান্ডি দেখে তার দিকে কটমট করে তাকালেন। ভয়ে ও অপরাধবোধে আনোয়ারের কাঁদো কাঁদো চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না! আনোয়ারের এ অবস্থা দেখে আমিনার অবস্থা আরো খারাপ! তার চঞ্চল দুটো চোখ স্থির হয়ে এলো, ভয়ে চোখে পানি টলমল করছে, আর ফুলের মতো নিষ্পাপ দুধে-আলতা বদনখানা মুহূর্তের মধ্যে মলিন হয়ে গেল। তার ভয়, ভদ্রলোক যদি তাকে কিছু বলে ফেলেন! আমিনার চেহারা দেখে আনোয়ারের বাবার মন গলে গেল। আনোয়ারের হাতের ক্যান্ডি এখন মুখে যেতে আর কোনো বাধা রইল না। আনোয়ার খুশি, আমিনার মুখে স্বর্গীয় হাসি ঝিলিক মেরে উঠল। নিয়মনীতি আর শৃঙ্খলার ওপর অবশেষে জয় হলো নিষ্পাপ শিশুর প্রতি শিশুর মায়া ও তার মমতামাখা হাত বাড়ানো। আমি খুব কাছে বসে সব দেখছি। ইচ্ছে হচ্ছিল উঠে গিয়ে আমিনাকে আদর করে বলি, Whats your name? You are indeed a wonderful girl!''
এমন সময় আমার ডাক পড়ে গেল। মাদ্রিদ ফ্লাইটের বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে। আমিনাদেরও এবার ওঠার পালা, মাত্র বোর্ডি অ্যানাউন্সমেন্ট হয়েছে। তার বাবা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলেন, লাইন ধরে তারা সবাই গিয়ে উঠল এয়ার অ্যারাবিয়ার ব্রাসেলস ফ্লাইটে। জামিলা আর আমিনার মুখে যতখানি হাসি তাদের মা-বাবার বুকে ততখানি ভয়, কারণ প্যারিসের নারকীয় ঘটনার পর ব্রাসেলসে মুসলমানদের ঘরে ঘরে পুলিশি তল্লাশি চলছে, বুটের আঘাতে কড় কড় তালা ভাঙছে, দরজা খুলছে, মানবতা পদদলিত হচ্ছে! (নামগুলো আমার দেয়া, আসল নাম জানার সময় পাইনি, আর আগে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বা ঘটনাগুলো এভাবে প্রবাহিত হতো না।)


লেখক : আবু এন এম ওয়াহিদ; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, টেনেশি স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
এডিটর - জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ।