elektrik fatura ödeme doğalgaz fatura ödeme হাজার শিশুর মা যে নারী : অন্য দিগন্ত


হাজার শিশুর মা যে নারী

Mar 05, 2018 05:02 pm
কম্বোডিয়ার হাজার হাজার শিশুর ‘মা’



অচেনা দেশ কম্বোডিয়ায় পোস্টিং পেয়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন জেরাল্ডিন কক্স। কিন্তু সেই দেশটিই তার জীবনকে আমূল পাল্টে দেয়। সে কাহিনী তিনি বলেছেন হেলেন সিগনিকে। ‘অন্য দিগন্ত’র জন্য সেটি ভাষান্তর করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


বাচ্চাকাচ্চারা প্রথম যখন আমায় দেখে, তখন তাদের মনে একটি কথাই এসেছিল : ‘ও মাগো, কী মোটা! আবার চুলগুলোও কেমন লাল।’ তারা আমাকে তাদের ভাবনার কথা কখনো বলেনি, কিন্তু আমাকে দেখে ওদের যে বিস্ময়, সেটা ওদের নিষ্পাপ চোখে ঠিকই ফুটে উঠেছিল; এমনকি ওদের মধ্যে যে ক’জন বড়, অর্থাৎ পাঁচ-ছয় বছর বয়সী, তাদের চোখেও।


আমাকে ওরা বিশ্বাস করতে পারছে না, আপন ভাবতে পারছে না। ব্যাপারটা সামাল দিতে আমি হাঁটু ভাঁজ করে ওদের সামনে এমনভাবে বসে পড়লাম, যাতে আমার ও ওদের চোখ একই সমতলে এসে যায়। তারপর ওদের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলাম। ওরা এমনভাবে সরে গেল যেন কোনো বেওয়ারিশ কুকুরের হাত থেকে বাঁচতে চাইছে। আমি খুউব নরম গলায় ফিস ফিস করে ওদের বললাম, ‘ঠিক আছে। তোমাদের আর কোনো ভয় নেই।’


কখনো কখনো এমনও হয়েছে, ওদের কাউকে কাউকে আমার কাছে টানতে কয়েক মাসই লেগে গেছে। এক মেয়েশিশুর কথা মনে পড়ছে। তার বয়স যখন নয় বছর, তখন সে ধর্ষিতা হয়। এরপর তাকে আমার কাছে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সে আমার কাছাকাছি আসা দূরে থাক, আমার দিকে তাকাতও না। এভাবে ছয় সপ্তাহ কেটে গেল। একদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটু দিবানিদ্রা দিচ্ছি, হঠাৎ ঘুম টুটে গেল। দেখি কি, আমার পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে সেই মেয়েটি; ঘুমে কাদা হয়ে। বুঝলাম, আমি মেয়েটির মন জয় করতে পেরেছি।


এভাবে গত ২৫ বছরে আমি আক্ষরিক অর্থেই কম্বোডিয়ার হাজার হাজার শিশুর ‘মা’ হয়ে গেছি। ঠিক এই মুহূর্তেও আমি আড়াই হাজার শিশুকে সাহায্য করছি। এদের প্রায় সবাই এসেছে স্থানীয় কৃষক পরিবার থেকে। আমি ওদের দেখাশোনা করি, পড়াশোনা করাই। আমাদের দু’টি আবাসিক কেন্দ্র আছে নমপেন ও সিয়েম রিপে, সেখানে ১২০ জন শিশু থাকে। এদের কেউ প্রতিবন্ধী, কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন। আবার কেউ পাচার হয়ে গিয়েছিল, কাউকে আবার তাদের মা-বাবাই ফেলে দিয়েছে আর আমরা ওদের কুড়িয়ে এনেছি।


নিজেদের জীবনকে নির্দিষ্ট একটা দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তো এই শিশুদের নেই। তারা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক বা কোণঠাসা জনগোষ্ঠী এবং এ অবস্থাটা কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি করে সত্য। কারণ, এ দেশটিতে সমাজকল্যাণমূলক কোনো কর্মসূচি নেই। ফলে শিশুদের কারো কারো জন্য বেঁচে থাকার একটাই মাত্র পথ ছেলেশিশু হলে মাদক বিক্রি, মেয়েশিশু হলে শরীর।


আমাকে সেসব শিশুরই দেখাশোনা করতে হতো যারা অ্যাসিড হামলার শিকার অথবা অগ্নিদগ্ধ। ওদেরকে এভাবে পঙ্গু ও বীভৎস-দর্শন বানানো হতো, যাতে তারা বেশি ভিক্ষা পেতে পারে। আমরা ওদের উদ্ধার করে নিজেদের কাছে রাখতাম। ভালো খাদ্য, সুশিক্ষা ও ভালোবাসা দিতাম। এতে ওদের জীবন বদলে যেত। শিক্ষা ওদের জন্য হতো দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার টিকিট।


কিন্তু সবচেয়ে বড় ‘বদল’ বা পরিবর্তনটি এসেছিল সম্ভবত আমার নিজের জীবনে। ঠিক যেন তালিকাজোড়া দেয়া একটা কাঁথা। এত দিন আমি দেখেছি ভিন্ন এক দুনিয়াকে, যাপন করেছি বিত্তবেসাতে ভরা সম্পন্ন এক জীবন। কিন্তু এখানে এসে আমি শান্তি খুঁজে পেয়েছি।


আমার বয়স যখন ১৫, তখন আমি স্কুল ছাড়ি। ওই সময় আমি একজনের গভীর প্রেমে পড়ে যাই। কিন্তু পরে ওই প্রেম আর পরিণয় পর্যন্ত গড়ায় না, যখন আমরা উভয়েই জেনে যাই যে আমি কখনো সন্তানের মা হতে পারব না। এখন আমরা দু’জনই খুব কাছাকাছি। কিন্তু একসময় আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম এবং জানতামও না যে জীবন নিয়ে আমাকে কী করতে হবে।


যা হোক, একপর্যায়ে আমি ডিপার্টমেন্ট অব ফরেইন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডে (ডিএফএটি) যোগ দিই। আমি ভেবেছিলাম, গ্ল্যামারাস একটা চাকরি; দেশ-বিদেশ খুব ঘোরা যাবে। ঘুরতে পাবো প্যারিস, রোম, কায়রো। কিন্তু আমার পোস্টিং মিটিং শেষে জানানো হলো আমাকে যেতে হবে নমপেন। নমপেন! সে আবার কোথায়। জীবনে তো নামও শুনিনি!


১৯৭০ সালের কোনো এক দিন উড়োজাহাজের প্রথম শ্রেণীতে চড়ে আমি কম্বোডিয়া যাত্রা করলাম। পথে আমাদের ফরাসি শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হলো। উড়োজাহাজটি যে বিমানবন্দরে অবতরণ করল সেটার টারমাকে দেখতে পেলাম কয়েকটি ভাঙাচোরা বিমান। এক দিন আগেই এ বিমানবন্দরে প্রচণ্ড বোমা হামলা হয়েছে। আমাদেরটিই ছিল এ বিমানবন্দরে আসা শেষ উড়োজাহাজ।


এবার আমাদের স্থলযাত্রা শুরু। চলতে চলতে রাস্তার দু’পাশের মানুষজন দেখে আমার ভিরমি খাওয়ার অবস্থা অসংখ্য লোক ভিক্ষা করছে। তাদের কারো হাত নেই, কারো বা পা। গ্রামগুলো দেখলাম জনমানবশূন্য। তারা তাদের গরু-ছাগল সব নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের নির্দেশে যেভাবে কার্পেট বম্বিং (বোমাবর্ষণ) হয়েছে, তাতে গ্রামবাসীর আর কী-ই বা করার ছিল!


আমি দেখতাম, প্রতিদিন রণাঙ্গন থেকে ট্রাক আসত শহরে, তাতে থাকত নিহতদের লাশ, পাশে আহত অনেকে। তাদের আর্তধ্বনি ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠত শহরের বাতাস। এখানে বেঁচে থাকতে হতো শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে; আশপাশে মোটেই নয়। এমনভাবে যেন পায়ের কাছে কী পড়ে আছে, তা আমি দেখতেই পাচ্ছি না।


তবে এর মধ্যেও দূতাবাসের জীবন ছিল একেবারে অন্য রকম। ওখানে প্রতি সপ্তাহান্তে ঠিকই ককটেইল পার্টি হতো। মনে পড়ে, লম্বা হাতার ইভনিং গাউন পরে, শ্যাম্পেনের বোতল হাতে আমাকেও যেতে হতো ওসব পার্টিতে। কিন্তু পথের দিকে তাকিয়ে লজ্জার সীমা থাকত না আমার।


এত সব বৈপরীত্যের মাঝেও একটি সন্তান পাওয়ার আশা ও চেষ্টায় ক্ষান্ত দেইনি আমি। সন্তানহীনতার শূন্যতা পূরণে বিভিন্ন এতিমখানায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে থাকি আমি। এ রকম এক এতিমখানায় এক এতিম বালক একদিন আমাকে জানাল, রাস্তার পাশে ফেলে রাখা একটি কার্ডবোর্ডের বাক্সে এক সৈনিক একটি বাচ্চা খুঁজে পেয়েছে। বাচ্চাটির বয়স সাত মাসের মতো হবে। রাস্তার কুত্তাগুলো বাচ্চাটিকে কামড়ে খেয়ে ফেলছিল।


আমি বাচ্চাটিকে নিয়ে এলাম এবং ওকে দত্তক নেয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করলাম। ওর নাম দেয়া হলো লিসা।
দুই মাসের মাথায় আমি অবাক হয়ে দেখলাম, লিসা কানে শুনতে পায় না এবং সে ঠিক স্বাভাবিকভাবে বেড়েও উঠছে না। আমি তাকে এক আমেরিকান ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। জানা গেল, সে সেরেব্রাল প্যালসি রোগে আক্রান্ত। ডাক্তার জানিয়ে দিলেন, ‘সে কোনো দিন কথা শুনতে, বলতে, হাঁটতে এবং স্কুলে যেতে পারবে না।’ আমি ওকে বুকে জড়িয়ে বাসায় ফিরে এলাম।


আমি ছিলাম সিঙ্গল। তাই আমি ওকে দত্তক নেয়ার এবং অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেলাম না। সবচেয়ে বড় কষ্ট হতো লোকজনের কথায়। তারা বলত, তুমি ওটাকে নিয়ে পড়ে আছো কেন, তুমি কি ওকে সুস্থ করতে পারবে? আমি চুপচাপ সব সহ্য করতাম। এভাবে লিসা আমার সাথে সাত বছর কাটায়।

এবার ফিলিপিন্সে

১৯৭৩ সালে আমরা কম্বোডিয়া ছাড়ি। এবার আমাদের গন্তব্য ফিলিপিন্স। এর মধ্যে মেয়েটি গ্র্যান্ড ম্যাল সিজারে আক্রান্ত হলো। এখন তাকে সার্বক্ষণিক পরিচর্যা দেয়া দরকার। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না, আমার নিজেরই তো যন্ত্রণার শেষ নেই। একদিন আমি বাইরে গিয়ে দু’জনের জন্য একই ধরনের নাইটি কিনে আনি, আর আনি ঘুমের ওষুধ। চাইছিলাম, এ জীবন আর রাখব না, দু’জনই মরে যাবো। কিন্তু পারলাম না।


এরপর আমি মেয়েটিকে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার একটি পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে রাখি। সে এখনো সেখানে আছে। তার বয়স এখন ৪০। কিন্তু তাকে ওখানে রেখে আসার অপরাধবোধটা আমার মন থেকে এখনো মুছে যায়নি।


ডিএফটিতে ১৮ বছরের কর্মজীবনে আমি থেকেছি কম্বোডিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, ইরান ও ওয়াশিংটন ডিসিতে। এ সময়ে আমি বিয়ে করেছি আবার সেই বিয়ে ভেঙেও গেছে। আমার বয়স পৌঁছে গেছে পঞ্চাশের কোটায় আর ওজন ১২৪ কেজি।


যখন আমি সিডনিতে চেজ ম্যানহাটন ব্যাংকে কাজ করছিলাম তখন কেন যেন নিজের জীবনের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা চলে আসে। বেতন যা পাই সব গয়নাগাটি কিনে, ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করে এবং বাড়িতে জমকালো ডিনার পার্টি দিয়ে উড়াতে থাকি। আমার ধারণা হয়ে যায়, কোনো নারীর যদি একটি মিংক কোট না থাকে তো সে কেমন নারী! একবার ফেরিতে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আমার কানের এমারেল্ডের দুলের সাথে একটি রুবি ব্রেসলেট না হলে মানায়ই না! ব্যস, পরের স্টপেজেই আমি ফেরি থেকে নেমে পড়লাম, যাতে মানানসই গয়না কিনতে পারি।


এত বিলাসবসন করলেও আমি কিন্তু দানখয়রাতের বেলায় ছিলাম কিপ্টের রাজা। আমি সবসময় ভিখারিদের পেছনে থাকতাম, সামনে গেলে যদি ওদের ৫০ সেন্ট দিতে হয়! এরপরই কিন্তু কোনো বান্ধবীকে নিয়ে সিডনি অপেরা হাউসে যেতাম এবং ১৫০ মার্কিন ডলার খরচ করে ডিনার সারতাম আর বলতাম, ‘দেখো দেখো, কী সুন্দর দৃশ্য!’ কিন্তু আমার মাথার ভেতর কে যেন মৃদু গলায় বলত, যা দেখছো সব কি ওখানে আছে?

আবার কম্বোডিয়ায়

১৯৯০ সালের আমার বিয়ে ভেঙে যায়। এ সময় আমি ছুটি কাটাতে কম্বোডিয়ার অ্যাংকর ওয়াটে যাই। ১৯৯৩ সালে আবারো যাই।


সেবার সেখানে কম্বোডিয়ার তৎকালীন ফার্স্ট প্রাইম মিনিস্টার প্রিন্স নরোদম রনরিধের পতœী প্রিন্সেস মেরির সাক্ষাৎ পাই। প্রিন্সেস তখন একটি এতিমখানা চালাতেন। এ সময় তার সাথে আমার বেশ যোগাযোগ হতে থাকে। তিনি তার প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই আমাকে ফ্যাক্স করতেন। এদিকে কেন যেন চাকরি থেকে আমার মন উঠে গিয়েছিল। ফলে একদিন আমার চাকরি চলে যায়।


এখন যদি আমাকে চাকরিচ্যুতকারী মানুষটিকে সামনে পাই, তবে এ কাজটির জন্য তাকে ধন্যবাদই দেবো। কারণ, এ ঘটনা না ঘটলে আমি কখনোই কম্বোডিয়ায় ফিরে আসার সাহস করতে পারতাম না।
আমার ৫০তম জন্মদিনের তিন সপ্তাহ আগে আমি সিডনি ছাড়ি। ওখানে আমার কোনো পিছুটান ছিল না। এদিকে প্রিন্স রনরিধ জানতেন আমি তার পতœীর এতিমখানাকে সাহায্য করেছি, কাজেই আমার বেকারত্বের খবর পেয়ে তিনি আমাকে একটি চাকরির প্রস্তাব দিলেন। তারই ছোট প্রশাসনিক মন্ত্রিসভার এক্সিকিউটিভ অ্যাসিসট্যান্ট পদ। আমার তার বক্তৃতা লিখে দিতে এবং তাদের সিকিউরিটি ও প্রটোকল ম্যানুয়ালগুলো ডিজাইন করতে হবে। বেতন মাসে ১০০ ডলার। সাথে একটি সরকারি অতিথিশালায় একটি কক্ষে থাকার সুবিধা, মাসে এক বস্তা চাল ও নয়টি কোমল পানীয়র বোতল ফ্রি।


কাজ শুরু করলাম। আমার রুমটিতে কোনো এয়ারকন্ডিশনার ছিল না। ফলে কাজ করতে করতে আমি ঘেমে যেতাম এবং ঘামের ফোঁটা কাগজের ওপর পড়ত। তা দেখে আমাকে বেশ কিছু কার্ডবোর্ড দেয়া হয়, যাতে মাঝে মধ্যে ওগুলোকে আমি পাখা হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। ভাবলাম, ঠিক আছে। নিজেকে বললাম, ‘তুমি রাজপরিবারের জন্য কাজ করছো। রাজনীতির পেছনের অনেক ঘটনা দেখেশুনে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হচ্ছো আর ছুটির দিনে শিশুদের সাথে কাটাতে পারছো। খারাপ কী?’


খারাপ নয়। খারাপ ছিল এটা যে, প্রিন্স রনরিধ ছিলেন কোয়ালিশন সরকারের ফার্স্ট প্রাইম মিনিস্টার। সেকেন্ড প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন এক সামরিক নেতা হুন সেন। দু’জনের মধ্যে প্রায়ই খটোমটো লেগে থাকত। ফলে কোনো কাজই এগোতো না।


১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে একটা কিছু গণ্ডগোলের গন্ধ নাকে এসে লাগে। মন্ত্রীদের অনেকেই আমার কাছে আসতে থাকেন এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার ভিসা ফর্ম পূরণ করে দিতে বলেন। ৪ জুলাই আমি ছিলাম মন্ত্রিসভার প্রতিনিধি। সবাই আমার কাছে জানতে চাইছিল প্রিন্স রনরিধ কোথায়। আমার খুব রাগ হতে লাগল। আরে, প্রিন্স কোথায় আমি কী করে জানব?


পরদিন সকালে রাস্তাঘাটে কোনো হৈ-হট্টগোল শুনতে পেলাম না। আমি অফিসের উদ্দেশে পথে বেরোতেই দেখি, অস্ত্রধারীরা লোকজন দেখলেই গুলি করছে। বুঝলাম, ঘটনা ঘটে গেছে। আসলেই তাই। হুন সেন সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন, প্রিন্স রনরিধ বিদেশে নির্বাসনে গেছেন।


সবগুলো দূতাবাস তখন কম্বোডিয়া ছাড়তে ব্যস্ত। রাস্তাঘাটেও একই অবস্থা। সবার মুখে একটিই কথা : ‘বাসে ওঠো, বাসে ওঠো!’ আমি ‘বাসে’ উঠলাম না। আমি এমনিতেই আমার একটি কম্বোডিয়ান মেয়েকে পরিত্যাগ করেছি। এখন আবার যদি ‘বাসে উঠি’ তাহলে বাকি জীবনের একটা মুহূর্তও আমি শান্তিতে কাটাতে পারব না।


আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ‘বাসে’ উঠব না, এতিমখানাতেই যাবো। এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি। বাচ্চারা ইতোমধ্যে ঘটনা কিছু কিছু জেনে গিয়েছিল। তারা উড়োজাহাজ দেখেছিল এবং ভেবেছিল যে আমিও তাদের ছেড়ে চলে গেছি। আমি গাড়ি নিয়ে গেটের ভেতর ঢুকতেই ওরা দৌড়ে আসে এবং উল্লাসে ফেটে পড়ে। ওরা বারবার বলতে থাকে, ‘মা এসেছে! মা যায়নি। মা সত্যিই এসেছে। মা আমাদের অনেক ভালোবাসে।’


আমার মনে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব রইল না যে, এটাই হতে যাচ্ছে আমার জীবন। সেদিন থেকে এই শিশুরাই হয়ে গেল আমার সব কিছু।

এখন আমি

আমি এখন যে বাড়িতে বাস করি সেটি এতিমখানারই সম্পদ। আমার কোনো গাড়ি নেই, সম্পত্তি নেই, নেই কোনো লগ্নি করা অর্থ। আমি কোনো অবসরভাতা পাই না। কেননা, আমি তো অস্ট্রেলিয়ায় থাকি না। এত ‘না’ ও ‘নাই’ সত্ত্বেও সারা জীবনে এতটা ধনী আমি কখনো ছিলাম না।


যখন ব্যাংকে কাজ করতাম তখন লাখ লাখ ডলারের বিনিয়োগ আমার হাত দিয়ে হতো। কম্বোডিয়ায় শিশুরা বায়না ধরত নতুন জামা কিনে দেয়ার জন্য। কত দাম? মাত্র আড়াই ডলার। জীবনে বস্তুগত পণ্য না পাওয়াও একধরনের স্বাধীনতা। তবে কম্বোডিয়া আমাকে শিখিয়েছে, ঘুমানোর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ স্থান, খাদ্য, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ এবং সবার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এর বাইরে তোমার আর কিছুরই দরকার নেই। এর অতিরিক্ত সব কিছুকেই কম্বোডিয়ানরা বিলাসিতা বলেই মনে করে।


আমার ধনী হওয়াটা একটু অন্য রকম। আমি ৭০টি এতিম শিশুর সাথে থাকি। তারা সবাই আমার অতি আপন। আমার বাড়িটা তাদেরই বাড়ি। আমরা প্যানকেক বানাই, ইউটিউব দেখি। শিশুরা তাদের মায়ের সাথে যেসব কথা বলে, সে রকম সব কথাই আমাদের মধ্যে হয়। আমি চেষ্টা করি ওরা যেন ভোকেশনাল ট্রেইনিং কিংবা ইউনিভারসিটির স্কলারশিপ পেতে পারে। তাহলে একদিন ওরা নিজেরাই কোনো কাজ শুরু করতে পারবে এবং সেভাবেই এতিম হওয়ার দুর্ভাগ্য থেকে মুক্ত হতে পারবে।


দুই বছর আগে আমার ৭০তম জন্মদিনে আমার এক বয়স্ক ছেলে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে আসে ৮০ জনেরও বেশি আমার সাবেক শিশু। তারা আসে তাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে। এত সন্তানকে একসাথে কাছে পেয়ে আমার চোখের পানি আর বাঁধ মানে না।


এতিমখানা চালাতে টাকা জোগাড় করা একটা সার্বক্ষণিক মাথাব্যথা। আমাদের প্রতি বছর ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের মতো লাগে। এ টাকা জোগাড়ে আমি অনেকটা সময় বিভিন্ন রকম সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে থাকি, লোকজনকে বোঝাই আমরা কী করছি। তবে আমার ভবিষ্যৎ রয়ে গেছে কম্বোডিয়ায়। কারণ, খেমার রুজদের কারণে প্রবীণদের একটা প্রজন্মই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আর আমার শিশুরা কখনোই সাদা চুলের মানুষ দেখেনি। তবে আমি জানি, এই শিশুরা এবং এ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই সবসময় আমাকে দেখে রাখবে।