প্রতিবেশি দেশগুলোতে ভারত যেভাবে প্রভাব হারাচ্ছে

Feb 27, 2018 05:06 pm
আব্দুল্লাহ ইয়ামিন- কে পি শর্মা ওলি


আলফাজ আনাম

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তিধর দেশ ভারতের সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক কখনো মধুর ও স্থিতিশীল ছিল না। নানা ইস্যুতে ছোট দেশগুলোর সাথে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এর অন্যতম কারণ, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটলেও প্রতিবেশী দেশগুলোতে গণতন্ত্রায়নে ভারতের ভূমিকা খুবই সামান্য। প্রতিবেশী দেশ বা জনগোষ্ঠীর চেয়ে বিশেষ দলের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকে ভারত সব সময় গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ফলে এসব দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে ভারত নানাভাবে কলকাঠি নাড়ে। ফলে এসব দেশে যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন হচ্ছে; তখন ভারত নানাভাবে চাপের মুখে পড়ছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর চীন গুরুত্ব দেয়ায় নয়াদিল্লির মধ্যে এক ধরনের চীনভীতি কাজ করছে।


ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ অনেক পুরনো। এই দেশটিতে এক সময় ভারত সেনা পাঠিয়েছিল। এখন দেশটিতে চীনের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। শ্রীলঙ্কায় স্বেচ্ছানির্বাসিত, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ সম্প্রতি দেশটির রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সরাসরি ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এরপর মালদ্বীপ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। অপর দিকে, ভারত মহাসাগরে চীনের যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন চীনের জোরালো সমর্থন পাচ্ছেন।


বিচার বিভাগের মাধ্যমে মজলিস বা সংসদে তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি প্রচেষ্টা ঠেকিয়েছেন ইয়ামিন। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বিচারপতিদের পদচ্যুত করা হয় সে দেশে। এখন তদন্তে বেরিয়ে আসছে, মোহাম্মদ নাশিদ কয়েকজন বিচারপতিকে উৎকোচ দিয়ে পার্লামেন্টের সদস্যপদ হারানো তার রাজনৈতিক সহযোগীদের সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়ার রায় নিয়েছিলেন। বিচারপতিদের মধ্যে একজনের কাছে দুই লাখ ২০ হাজার ডলার বেহিসাবি অর্থ রয়েছে। আর একজন বিচারপতির কাছে একটি প্রাইভেট ফার্ম থেকে ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারপতিদের পদচ্যুত করা হয়। শুধু তাই নয়; আব্দুল্লাহ ইয়ামিন জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় দফা জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়ানের পর নয়াদিল্লি উদ্বেগ প্রকাশ করে। এরপর মালদ্বীপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এর প্রতিবাদ জানানো হয়। জরুরি অবস্থার পক্ষে বলা হয় “মালদ্বীপের নাগরিকেরা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এটা গুরুত্বপূর্ণ যে দেশটির চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, এমন যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ থেকে ভারতসহ বিশ্বের বন্ধু ও সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর বিরত থাকা।” এই বিবৃতি ছিল স্পষ্টভাবে মালদ্বীপের পক্ষ থেকে ভারতকে সতর্কবার্তা।


চীনের সাথে মালদ্বীপের সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদ। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং যখন মালদ্বীপ সফরে ছিলেন, তখন তিনি চীনা দূতাবাস উদ্বোধন করেন। চীনের সাথে তার মাখামাখি সম্পর্কে ভারত উদ্বিগ্ন ছিল। তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ভারত নানাভাবে কলকাঠি নাড়তে থাকে। আদালতের মাধ্যমে নাশিদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। তাকে হটিয়ে ২০১৩ সালের শেষ দিকে যখন ইয়ামিন ক্ষমতাগ্রহণ করেন, তখন তিনি ভারতের সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু ইয়ামিন দেশের স্বার্থে হোক বা ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে হোক, নাশিদের চীনঘেঁষা নীতি থেকে সরে না এসে চীনের দিকে আরো বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে চীন সরকারও কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়া ইয়ামিনের পাশে দাঁড়িয়েছে। আর ভারতীয় গণমাধ্যম এখন মালদ্বীপকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলছে। দেশটিতে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে। চীনের প্রস্তাবিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপ্রকল্পে যোগ দিয়েছে মালদ্বীপ। এমনকি, বেশ কয়েকটি দ্বীপ ইজারা নিয়ে চীনের নৌঘাঁটি স্থাপনের শঙ্কায় আছে ভারত। অর্থাৎ মালদ্বীপ এখন ভারতের প্রভাব বলয়ের কোনো দেশ নয়। মালদ্বীপে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার দাবি করছে ভারত এবং পশ্চিমা দেশগুলো; কিন্তু তা এখন অনেকটা বেসুরো শোনা যাচ্ছে। আর তেমন কথা কানেই তুলছেন না প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন।


মালদ্বীপ ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে নেপালে ভারতের প্রভাব খর্ব হয়েছে। গত বছরের শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোর জোট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) চেয়ারম্যান কে পি শর্মা ওলি। নয়াদিল্লির সাথে ওলির সম্পর্ক আগে থেকেই ভালো নয়। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৬ সালের আগস্টে তার সরকারের পতনের পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল ভারত। এরপর ক্ষমতায় এসেছিলেন ভারতপন্থী নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দেউবা।


কে পি শর্মা ওলি ২০১৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নেপালের নতুন সংবিধান প্রশ্নে ভারতের সাথে তার তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল। ভারত সীমান্তসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাধেসিদের প্রতি নতুন সংবিধানে বৈষম্য করা হয়েছে বলে নয়াদিল্লি অভিযোগ করছিল। এরপর ওলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নেপালের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়। তিনি তখন সঙ্কট কাটাতে চীনের দ্বারস্থ হলো এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেন। চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি ভারত থেকে দূরে অবস্থানের নীতি গ্রহণ করেন। ভারতের অবরোধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেপালের রাষ্ট্রপতির ভারত সফর বাতিল করা হয় এবং দিল্লির রাষ্ট্রদূতকে নেপালে ডেকে আনেন। কার্যত, ভারতের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ওলি রুখে দাঁড়ান। এবারের নির্বাচনে ওলির দল ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে ১২১টিতে বিজয়ী হয়েছে। তার দলের এই বিজয়কে ভারতের ব্যাপারে তার নীতির প্রতি সাধারণ নেপালিদের সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে।


নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর ভারতের ব্যাপারে আগের নীতি থেকে যে তিনি সরে আসবেন না, তা স্পষ্ট। ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন ‘সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে’ ভারতের সাথে সম্পর্ক ‘হালনাগাদ’ করতে চান। তিনি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে নেপালি সেনাদের দায়িত্ব পালনের বিধানসহ ভারত-নেপাল সম্পর্কের সব বিশেষ ধারা পর্যালোচনা করার কথাও বলেছেন। যা ভারত-নেপাল সম্পর্কের ঐতিহাসিক গতিধারা বদলে দিতে পারে। ১৯৫০ সালের নেপাল-ভারত চুক্তি ‘নতুন করে পর্যালোচনা’ করা হবে বলে জানিয়েছেন ওলি।


এ ছাড়া তিনি ঘোষণা করেছেন, চীনের প্রস্তাবিত ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প আবার চালু করবেন। ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে বিবেচিত নেপালি কংগ্রেস সরকার ওই প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়েছিল। ওলি ভারতের প্রতি তার দেশের নির্ভরশীলতা কমাতে চীনের সাথে কানেকটিভিটি বাড়াতে চান বলেও জানিয়েছেন। নেপাল ইতোমধ্যে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যোগ দিয়েছে।


নেপালের নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে ভারত আগের অবস্থান পর্যালোচনা করছে বলে মনে হচ্ছে। ওলি জয়লাভ করার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে তিনবার ফোন করেছেন, সহযোগিতার বার্তা দিয়ে তিনি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে পাঠিয়েছেন নেপালে। অপর দিকে ওলি সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ভারতের সাথে আমাদের সবসময়ই চমৎকার সম্পর্ক ছিল। ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টে থাকা কিছু উপাদান ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছিল। তবে ভারতীয় নেতারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, তারা ভবিষ্যতে হস্তক্ষেপ করবেন না। আমরা একে অন্যের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’ আসলে চীন ফ্যাক্টরের কারণে এখন নেপালে হস্তক্ষেপের নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে ভারত।

আরেক প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কাতেও আগামী নির্বাচনে ভারতের অপছন্দের ব্যক্তি রাজাপাকসের ক্ষমতায় ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন মাইথ্রিপালা সিরিসেনার দল স্থানীয় নির্বাচনে খুবই খারাপ ফল করেছে সম্প্রতি।শ্রীলঙ্কায় ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) দলের বড় ধরনের বিজয়ের পর দলের প্রধান সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তার দল ৪৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৯টি আসন জিতেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর স্পষ্ট হয়েছে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা এবং প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংয়ের সরকার ২০১৫ সালে যে জনসমর্থন পেয়েছিল, তা আর নেই। আগামী নির্বাচন যে, সিরিসেনা সরকারের জন্য বিপর্যয়কর হবে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব বাড়ানোর জন্য ভারত রাজাপাকসের সরকারের ওপর বিরক্ত ছিল। ২০১৫ সালের নির্বাচনে সিরিসেনা যাতে বিজয়ী হন সে উদ্দেশ্যে ভারত প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করে। রাজাপাকসের সময় শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করেছিল চীন। এ সময় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কাতে সর্বাধিক বিনিয়োগ করেছে চীন। এখন শ্রীলঙ্কায় আগাম নির্বাচন হোক বা না হোক পরবর্তী নির্বাচনে নেপালের মতো ফল যে আসবে, তা স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে কে পি শর্মা ওলির মতো রাজাপাকসের সরকারের সাথে ভারতকে কাজ করতে হবে।


ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপ ও নেপালের ব্যাপারে দেশটির নীতি যে ভুল ছিল; তা অত্যন্ত স্পষ্ট। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কলকাঠি নেড়ে এবং বিশেষ দলের সাথে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, ভারতের নিরপেক্ষতার মুখোশটিও আর থাকে না। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আমরা এমন অবস্থা দেখেছি। বিরোধী দলের বর্জনের ঘোষণা দেয়া এই নির্বাচনে অংশ নিতে বিভিন্ন দলকে চাপ দেয়ার লক্ষ্যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকা এসেছিলেন। চলতি বছরের শেষে বাংলাদেশে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাব এ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশে কতটা পড়ে তা এখন দেখার বিষয়। তবে এ কথা বলা যায়, ভারত যদি প্রতিবেশী দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা না করে বিশেষ দলের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, সময়ের ব্যবধানে নেপাল-মালদ্বীপের মতো পরিস্থিতিতে দেশটিকে পড়তে হবে।