elektrik fatura ödeme doğalgaz fatura ödeme কাশ্মিরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত : অন্য দিগন্ত


কাশ্মিরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত

Feb 26, 2018 03:14 pm
কাশ্মিরের শিশুরা এ মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে  দখলদার শাসনের অধীনে আছে


আদিবা শাইয়ারা

কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানি হত্যার পর যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল তা আর থামছে না। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তো বটেই, নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিরা জানেন না কিভাবে এ বিক্ষোভের অবসান ঘটবে। এত দিন কাশ্মিরে অস্থিরতার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে সব সময় অভিযোগের আঙুল তোলা হতো পাকিস্তানের দিকে। প্রচারণার ধরন ছিল অনেকটা এমন যে কাশ্মিরিদের আন্দোলনে পাকিস্তানের মদদদান বন্ধ হলে যেন কাশ্মির শান্ত নিরাপদ হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, কাশ্মিরে পাকিস্তানের সংযোগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতির অনমনীয় স্বাধীনতার মনোভাব।


কাশ্মিরের শিশুরা যেন জন্মের পর থেকে এ মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে তারা একটি দখলদার শাসনের অধীনে আছে। এই দখলদারির অবসান তার জীবনের একটি অন্যতম লক্ষ। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কাশ্মিরের গণবিক্ষোভে লক্ষণীয়ভাবে নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়ে গেছে। ফলে কাশ্মিরের আন্দোলনকে পাকিস্তান সমর্থিত কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভারতবিরোধী তৎপরতা হিসেবে হাজির করা যাচ্ছে না।


স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ভারতের চোখে সন্ত্রাসী হলেও কাশ্মিরের সাধারণ মানুষের চোখে তারা বীর। স্বাধীনতাকামী তরুণ বুরহান ওয়ানিকে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। ২২ বছরের এ তরুণ কাশ্মিরিদের মনে আগুন এভাবে জ্বালিয়ে দেবেন তা সম্ভবত ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারও অনুধাবন করতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর থেকে কাশ্মির উপত্যকায় আর শান্তি ফিরে আসেনি। এর মধ্যে নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে সশস্ত্র যোদ্ধাদের অসংখ্য খণ্ডযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। সেনাক্যাম্পে একাধিক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। উড়ি সেনাক্যাম্পে হামলার ঘটনায় মারা গেছে ১৯ জন ভারতীয় সৈন্য। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাক-ভারত সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। ভারত দাবি করেছে এর প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকও চালানো হয়েছিল। কাশ্মিরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ভারত দ্রুত পাকিস্তানকে সম্পৃক্ত করে। কূটনৈতিক দিক দিয়ে পাকিস্তানকে চাপে রাখার অস্ত্র হিসেবে কাশ্মিরকে ভারত ব্যবহার করার চেষ্টা করে আসছে। এর আড়ালে চলছে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর নানা ধরনের নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।


কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত এক বছরে কাশ্মিরে সশস্ত্র যোদ্ধাদের তৎপরতা যেমন বেড়ে গেছে তেমনি প্রতিদিন হাজার হাজার নারী-শিশু বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। এমনকি স্কুল ও কলেজের ছাত্ররাও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। বিক্ষোভের ব্যতিক্রমী দিক হচ্ছে স্কুল-কলেজের ছাত্রীরাও এবার সেনাবাহিনীর দিকে পাথর ছুড়ে মারছে। এ ধরনের গণবিক্ষোভকে এখন ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিপজ্জনক দিক হিসেবে দেখছেন। গত মাসে কাশ্মিরে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ নির্বাচনে ৭ শতাংশের কম ভোট পড়ে, যা কাশ্মিরের ইতিহাসে কোনো নির্বাচনে সবচেয়ে কমসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ। নির্বাচনে সহিংসতা ও বিক্ষোভ এতটাই তীব্র রূপ নেয় যে, এক দিনে আটজন মানুষ মারা যায়। আহত হয় প্রায় ২০০ জন। অন্তত ৭০টির বেশি ভোটকেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত কারফিউ জারি করতে হয়। এ ছাড়া ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে যখনই কোনো কাশ্মিরের সাধারণ নাগরিক মারা যাচ্ছে বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একেকটি জানাজা হয়ে উঠেছে বিশাল আকারের বিক্ষোভ মিছিল। একই স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযান চালানোর পরও তাদের গেরিলা হামলা বন্ধ করা যাচ্ছে না।


কাশ্মিরের পরিস্থিতি এখন নয়াদিল্লির মধ্যে বড় ধরনের হতাশার সৃষ্টি করেছে। ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ র-এর সাবেক প্রধান অমরজিত সিং দুলাত বলেছেন, জম্মু-কাশ্মিরের পরিস্থিতি আগে কখনোই এখনকার মতো এতটা ভীতিকর ছিল না। এমনকি ১৯৯০-এর দশকে সশস্ত্র সংগ্রাম তুঙ্গে উঠেছিল তখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তার মতে, কাশ্মিরে তরুণদের মধ্যে নৈরাশ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তারা জীবন দিতে ভয় পাচ্ছে না। গ্রামের মানুষ, ছাত্র, এমনকি মেয়েরাও রাস্তায় নেমে এসেছে। অতীতে কখনোই এমন হয়নি। এখন তারা ইটপাটকেল ছুড়তে পেরে গর্ববোধ করছে।


সাবেক ‘র’ প্রধানকে জিজ্ঞেস করা হয়, স্বল্পমেয়াদে কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ কী? জবাবে তিনি বলেন, ভালো মনে হচ্ছে না। কাশ্মিরের খারাপ দিক, উদ্বেগজনক দিক এবং সত্যিকারের ভীতিকর দিক হলো সেখানকার অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা হাতে পাথর তুলে নিতে গিয়ে তাদের বাবা-মায়ের তোয়াক্কা করছে না। কাশ্মিরিদের মধ্যে এমন অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে বাবা জানছে না তার সন্তান কি করছে; বাবা কি মনে করছে সন্তান তার তোয়াক্কা করছে না।


বুরহান ওয়ানির হত্যাকাণ্ডের পর কাশ্মিরের মানুষ যেভাবে ফুঁসে ওঠে তা পাকিস্তানকেও অবাক করে বলে দুলাত মনে করেন। গত পাঁচ বছর ধরে পাকিস্তান সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও হুরিয়াতের সবগুলো উপদলকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি। কিন্তু এখন তারা এক হয়েছে। কারণ, তাদের কারো দিকেই ভারত সরকারের কোনো দৃষ্টি নেই। ওয়ানিকে হত্যা করলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াতে পারে তার কোনো ধারণা ভারত সরকারের ছিল না বলেও সাবেক ‘র’ প্রধান মনে করেন। তিনি আরো মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পাকিস্তানকে ফের কাশ্মির উপত্যকায় ডেকে আনা হয়েছে।


কাশ্মিরে কিশোর-তরুণদের পাথর নিয়ে সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়ানোর শক্তি দিল্লির হিন্দুত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী উপলব্ধি করতে পারছে না বলে অনেক ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন। ভারতের এই পাথর ছোড়া কিশোর তরুণদের মোকাবেলার জন্য হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীদের একটি দল সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের কয়েক শ’ সদস্য কাশ্মিরে গিয়ে যারা সেনাবাহিনীকে পাথর ছুড়বে তাদের মোকাবেলা করবে এবং বিক্ষোভকারীদের পাথর ছোড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ ধরনের হাস্যকর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকেরা যে কাশ্মিরের প্রকৃত সমস্যা অনুধাবন করতে পারছেন না তার প্রমাণ দিচ্ছে।


এবারের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরে ভারতের নিয়ন্ত্রণ যে কতটা শিথিল হয়ে পড়ছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ৭০ লাখ মানুষের এ উপত্যাকায় এখন সাড়ে ছয় লাখ সৈন্য মোতায়েন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম যেভাবে ভারতের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেছে তাতে অদূরভবিষ্যতে এ উপত্যকা নিয়ন্ত্রণ করা ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এবারের গণ-অভ্যুত্থানের অবসান কিভাবে হবে তা যেমন নয়াদিল্লি জানে না, তেমনি আগামী দিনে কিভাবে কাশ্মির নিয়ন্ত্রণ করা হবে সে প্রশ্নেরও কোনো জবাব নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভারত এখন অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।