মাথা ব্যাথা ও বমি বমি ভাব থেকে যা হলো

Feb 26, 2018 12:52 pm
বমি বমি ভাবটা বেড়ে গেল

 

রোগী : এলিস
উপসর্গ : মাথাব্যথা, কাশি ও বমি বমি ভাব
চিকিৎসক : ড. স্টুয়ার্ট হোয়াইটল
কনসালট্যান্ট সার্জন, ডামফ্রিজ অ্যান্ড গ্যালওয়ে রয়েল ইনফার্মারি
স্কটল্যান্ড।

গত বছরের অক্টোবরের এক দিন। স্কুল থেকে মাথাব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরল এলিস। পরদিন সকালে ঘুম থেকে ঊঠল শুকনো কাশি নিয়ে। গলা খুশ খুশ করে। চোখ লালচে। আলোর দিকে তাকাতে অসুবিধা হচ্ছে। পায়ে চুলকানি। এলিসের বাবা-মা ধরে নেন, তার ফ্লু সমস্যা হয়েছে। এরা সিদ্ধান্ত নেন, অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এক সপ্তাহ পর দেখা গেল, তার এসব উপসর্গের কোনো উন্নতি হয়নি। এলিসের বমি বমি ভাবটা বেড়ে গেল এবং বমি করতে শুরু করল। তার পরিবার তাকে স্থানীয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেল।


সেখানকার ডাক্তার দেখলেন, তার নাড়ির স্পন্দন বেড়ে গেছে, প্রতি মিনিটে ১২০ বারের মতো। গায়ে জ্বর, ৩৮.৫ সেন্টিগ্রেড। যখন ডাক্তারেরা তার পায়ের ডিম বা গুল (পধষভ) স্পর্শ করলেন, সাথে সাথে এলিস ব্যথায় চিৎকার শুরু করে দিলো।


ডাক্তারেরা মনে করলেন, হয়তো তার মেনিনজাইটিস বা ঝিল্লিপ্রদাহ দেখা দিয়ছে। এরা তাকে ইন্টারভেনাস ফ্লুইড দিলেন, অর্থাৎ শিরার ভেতরে তরল ওষুধ প্রয়োগ করলেন। সেই সাথে প্রয়োগ করেন ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক। তখন তার পিঠে ও পেটে লাল রঙের ফুসকুড়ি দেখা দেয়। পেশাবের সাথে রক্ত যেতেও দেখা যায়। তার এই উপসর্গ দেখা দেয়ার পর ৯ দিন পার হয়ে যায়। এলিসের মেনিনজাইটিস, ভাইরাল হেপাটাইটিস ও টাইফয়েড জ্বরের পরীক্ষা করা হলো। পরীক্ষায় এসব রোগ ধরা পড়ল না।


তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার চার দিন পর তার মাঝে সেপটিক শকের নমুনা দেখা যেতে শুরু করল : তার হৃদস্পন্দন ও গায়ের তাপমাত্রা আরো বেড়ে গেল। রক্তচাপ নিচে নেমে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। পেশাব হচ্ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। এমতাবস্থায় তাকে অক্সিজেন দেয়া শুরু করা হয়। ডাক্তারদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিলো : তাকে হয়তো বাঁচানো যাবে না। তখনো তাদের কোনো ধারণা নেই, এসব উপসর্গের পেছনে কারণটা কী।


এরই মধ্যে, বালকটির মধ্যে বিকারগ্রস্ততা দেখা দিলো। সে তীব্র আর্তনাদ করে কাঁদতে শুরু করল। একজন নার্স তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন। বালকটি তখন নার্সকে বলল, তাকে এক্ষুনি বাসায় নিয়ে যেতে হবে। কারণ ‘টবি’ তাকে মিস করছে। নার্স তাকে জিজ্ঞেস করলেন, টবি কে? বালকটি জবাবে জানায় : ‘টবি হচ্ছে আমার পোষা ইঁদুর। এটি কখনো কখনো আমাকে কামড় দেয়, কামড়ানোর ওই সময়টি ছাড়া টবি আমার সেরা বন্ধু। এখন টবির দেখাশোনা কেউ করছে না।’

বাসায় গিয়েও নার্স ভাবতে লাগলেন, বালকটি তাকে এ কী বলছে। সারাক্ষণ শুধু এটিই ভাবছেন। পরে একসময় এ রাতেই তিনি ওয়ার্ডে ফিরে এলেন। বালকটির কাছে জানতে চাইলেন, টবি কি সম্প্রতি তাকে কামড় দিয়েছে? এলিস জানাল, হ্যাঁ কামড়িয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে যখন এলিস এই ইঁদুরের খাঁচা পরিষ্কার করছিল, তখন কামড় দিয়েছে। এলিস জানাল, একথা সে আগেই ডাক্তারকে জানিয়েছে। তার ডান হাতে ইঁদুর এই কামড় দেয়। এর কয়েক ঘণ্টার মাধ্যমে মাইক্রোবায়োলজিস্ট তথা অণুজীববিজ্ঞানী এলিসের রক্তের ও পেশাবের নমুনা পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে, এলিস Weils desease-এ আক্রান্ত।


উইল’স ডিজিজ হয় লেপটোসপিরা নামে একধরনের ব্যাকটেরিয়ামের সংক্রমণের কারণে। এই বাকটেরিয়ামের সবচেয়ে সাধারণ বাহক হচ্ছে ইঁদুর। তবে প্যাথোজেনস পাওয়া যায় ছাগল, অন্যান্য পশু ও কুকুরের মাঝেও। এলিসের চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার স্টুয়ার্ট হোয়াইটল’ বলেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়ামের সংক্রমণ ঘটে হালকা ধরনের ফ্লুয়ের অসুস্থতার মাধ্যমে। এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। এর সংক্রমণে ১০ শতাংশ রোগীর বেশ কয়েকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যেতে পারে।
এলিসের ঘটনা থেকে দেখা যায়, এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে শুধু পুরো মেডিক্যাল হিস্ট্রি বিবেচনায় নেয়াই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অনেক অসংশ্লিষ্ট বিষয়ও বিবেচনায় আনা দরকার। রোগীর জীবন বাঁচাতে অসংশ্লিষ্ট ও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হয়ে উঠতে পারে চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


স্টুয়ার্ট হোয়াইটল’ বলেন লেপটোসপিরা ব্যাকটেরিয়াম সংক্রমণের প্রথম ৭ থেকে ১০ দিনের ভেতরেই কেবল রক্তে ধরা পড়ে। এর থেকে এক দিন বেশি হলে পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে না। তখন ডায়াগনোসিস কোনো কাজে আসবে না। এলিসের অবস্থা যদি আরো খারাপের দিকে যেত, তবে তখন তার চিকিৎসা করতে হতো ডায়ালাইসিস মেশিন দিয়ে এবং তাকে রাখতে হতো আর্টিফিসিয়াল ভেন্টিলেশনে। সে নার্সকে বলতেও পারত না, তাকে ইঁদুরে কামড়িয়েছে।


যখন ডাক্তার বুঝতে পারলেন এলিস উইল’স ডিজিজে আক্রান্ত, তার অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা নিয়ে যাওয়া হলো হাই ডোজের পেনিসিলিনে, এবং সাথে সাথে তার অবস্থার উন্নতি ঘটল। কয়েক দিনের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। সে বাড়ি যেতে পারল তার টবির যতœ নেয়ার জন্য। এখন সে সারাজীবন জন্য এ ধরনের সংক্রমণ থেকে মুক্ত। তবে সে শিকার হতে পারে অন্য কোনো ধরনের সংক্রমণের।