ইউরোপের মুসলিম শরনার্থী শিশুরা যেভাবে জীবন কাটাচ্ছে

Feb 26, 2018 12:46 pm
শরনার্থী শিশু



রানিয়া আবু জেইদ
অনুবাদ : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

সবুজ চোখের ছেলেটির বয়স সবে ১২। সাদ্দাম এমাল নামে ছেলেটিকে এই বসন্তের গোড়ার দিকে দেখা গেল সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তের এক জংলা ভূমিতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ওরা আছে সেখানে। রাতে ঘুমায় তাঁবুতে, বড় বড় গাছের ডালপালা জড়াজড়ি করে আছে যেখানে ওদের মাথার ওপর, তার সাথেই বাঁধা তাঁবুটি।


এমাল নামে এই শিশুটির বাড়ি আফগানিস্তান। সেখান থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সে এখানে এসেছে চোরাচালানিদের সাথে। একা। পরিবারের কেউ তার সাথে নেই। যে বয়সে একটা শিশুকে একা বাড়ির বাইরেই তেমন যেতে দেয়া হয় না, সেই বয়সে এমাল নামে এই শিশুটি আফগানিস্তানের যুদ্ধপীড়িত নানগারহার প্রদেশ থেকে পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক পাড়ি দিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ বুলগেরিয়া থেকে নিষ্ঠুরভাবে বহিষ্কৃত হয়ে আরো অনেক শরণার্থীর সাথে এসেছে এখানেÑ সার্বিয়ায়।
সাদ্দাম এমাল নামে এই শিশুটি একা নয়, সে তার মতো আরো প্রায় তিন লাখ শরণার্থী শিশুর একজন। এই শরণার্থীরা এসেছে ২০১৫ থেকে ২০১৬ এ দু’বছরে। শরণার্থীদের এ সংখ্যা পূর্ববর্তী কয়েক বছরের পাঁচ গুণ। অভাব-অনটন ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বিশ্বব্যাপী পলায়নপর মানুষের স্রোতে ভেসেছে ওরাও। এই শিশুদের মধ্যে এক লাখ ৭০ হাজারের মতো ইউরোপে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছে। সাদ্দাম এমাল স্বপ্ন দেখছে, একদিন-না-একদিন সে জার্মানিতে আশ্রয় পাবে।


এমাল ও তার সাথীরা এখন যেখানে লুকিয়ে আছে, তার কাছ দিয়ে চলে যাওয়া রেলপথটি ধরেই তারা ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। পথটি যুক্ত করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যদেশ ক্রোয়েশিয়ার সাথে সার্বিয়াকে, যারা ইইউর সদস্য নয়। এমাল ও তার সাথীরা কয়েকবারই এ রেলপথ ধরে পালানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তরক্ষীরা ওদের ধরে ফেলেছে। কখনো-কখনো ওদের পিটুনি দিয়েছে, কখনো আবার সবচেয়ে দরকারি জিনিসটাই খুলে নিয়ে রেখে দিয়েছে জুতা।
শিশুরা কাছের সার্বিয়া সীমান্তে একজোড়া লাল বাতি জ্বলতে দেখে। বাতি দুটো যেন ওদের বলতে চাইছে : থামো। দূরে থাকো। ইউরোপ তোমাদের চায় না।


আর ইউরোপ ওদের চায় না বলেই হাজার হাজার শরণার্থী ২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে সার্বিয়ার সীমান্তে আটকা পড়ে আছে। ওরা যাতে কিছুতেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত কোনো দেশে ঢুকে পড়তে না পারে, সে জন্য বিভিন্ন বলকান দেশের মাঝখান দিয়ে ইইউ অভিমুখী সব রুটে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
সার্বিয়ায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি মাইকেল সেইন্ট-লট জানান, সার্বিয়ায় থাকা কমবেশি সাত হাজার শরণার্থীর ৪৬ শতাংশই শিশু। বেশির ভাগ শরণার্থী শিশুই এসেছে আফগানিস্তান থেকে এবং তাদের প্রতি তিনজনের একজনের সাথেই বয়স্ক কেউ নেই। সাদ্দাম এমালের মতো যেসব শিশু অভিভাবকহীন অবস্থায় দেশ ছাড়ার ঝুঁকি নিয়েছে তারা প্রায়ই শিকার হয়েছে চোর, যৌন নির্যাতনকারী ও চোরাচালানিদের।
সেইন্ট-লট বলেন, ‘আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এখানকার চেয়ে তোমরা আগে যে-যেখানে ছিলে সেখানেই তো আরো ভালো ছিলে, তাই না?’ ওরা মেনেছে, ঠিক তাই। তবে এখন তারা এখানে অর্থাৎ সার্বিয়ায় থাকতে চায় না, তারা চায় ইইউতে চলে যেতে।’


তাদের এই চাওয়া নিয়ে উদ্বেগ আছে সেইন্ট-লটের। কারণ তিনি জানতে পেরেছেন যে, এর মধ্যে যেসব শিশু লুকিয়ে-চুরিয়ে কোনো-না-কোনো ইইউভুক্ত দেশে ঢুকতে পেরেছে, তাদেরকেই আটক করা, পিটুনি দেয়া এবং গৃহীত কনভেনশন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
সেইন্ট-লটের মতে, বেশির ভাগ শরণার্থী শিশুই সার্বিয়ায় থাকতে রাজি নয় এবং তাদের মধ্যে কেউ-কেউ মানসিকভাবে ভেঙেও পড়েছে। কারণ তারা জানে না, এরপর কী। তারা নিজেদের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না।


অন্য তরুণ শরণার্থীদের সাথে সাদ্দাম এমালও এ পর্যন্ত ১৮ বার ‘খেলতে’ নেমেছে এবং প্রতিবারই হেরেছে। ‘খেলা’টা আর কিছু নয়, কড়া পাহারাকে ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে সীমান্ত পার হয়ে ইউরোপীয় দেশ হাঙ্গেরি অথবা ক্রোয়েশিয়ায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা। এটাকেই শরণার্থী শিশুরা ‘খেলা’ বলে। এ খেলায় জিতলে, তাদের ধারণা, জীবনটা কিছুটা হলেও বদলে যাবে। তবে ১৮ বার ব্যর্থ হয়েও হতোদ্যম নয় সাদ্দাম এমাল। সে তার পায়ের নোংরা হয়ে যাওয়া জুতা দেখিয়ে বলে, ‘সাইজ ৪২’। এ রকম একজোড়া নতুন জুতা যেদিন পাবো, সেদিন আমাকে কেউ আর দৌড়ে ধরতে পারবে না।


দিনের আলো ম্লান হয়ে আসছে। সাদ্দাম এমাল ও তার তরুণ বন্ধু ফয়সাল সালিম (১৬) তাদের শেল্টারে রাতের খানা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। এমালের ছিল তিন হাজার সার্বিয়ান দিনারের (২৭ মার্কিন ডলার) একটি ওয়ান-টাইম ভাউচার। বিভিন্ন এনজিওর দেয়া এসব ভাউচার শরণার্থীশিবিরে বিতরণ করা হয়েছে। এমাল এর দুই-তৃতীয়াংশ খরচ করে কয়েক টুকরো মুরগির মাংস, কিছু রান্নার তেল, সবজি ও তিনটি পাউরুটি কিনেছে।


চুলায় মুরগির মাংস চাপাতে-চাপাতে এমাল বলতে থাকে, ‘আর পারি না। খুব কষ্ট।’ একটু থেমে ফের বলে, ‘বুলগেরিয়ায় মাইর। ইরানেও মাইর। সার্বিয়ায় আটকা। এই তিন সপ্তাহে একবার মাত্র গোসল করেছি। অথচ দেশে থাকতে প্রতিদিন গোসল করতাম।’


যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের তাড়া খাওয়া, অভিবাসনের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সাঁতার কাটতে থাকা এই দুই শিশু রান্নাবান্নার কাজ শুরু করল। যদিও শরণার্থীদের জন্য সার্বিয়া সরকার ১৮টি শিবির বানিয়েছে, সেখানে থাকা-খাওয়ার মোটামুটি ব্যবস্থাও আছে; কিন্তু এমাল ও তার বন্ধুটি সেখানে থাকার চেয়ে সীমান্তের যথাসম্ভব কাছাকাছি থাকাই ভালো মনে করে। তারা ভাবে, রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার ‘খেলায়’ একদিন-না-একদিন ঠিকই জিতে যাবে তারা।


এ খেলার বিপদ সম্বন্ধেও ছেলেদের জানা আছে। তাদের কত বন্ধুকে সার্বরা ছুরি মেরেছে, কতজনের টাকা-পয়সা, জিনিসপত্র চুরি করেছে। এই তো কিছু দিন আগে এক পাকিস্তানি কিশোরকে মেরেও ফেলেছে।
কথা বলতে-বলতে চোখে পানি আসা ধোঁয়ার মধ্যেই মুরগির টুকরোগুলোকে উনুনে পুড়িয়ে বাদামি করে নিলো এমাল। তারপর ওতে কী একটা তরল পদার্থ ও মিষ্টি মরিচ মাখিয়ে নিলো। সে বাড়ির বড় ছেলে। তার বাবা নেই। আগে মোবাইল ফোনে সে তার বিধবা মায়ের সাথে কথা বলত। কিন্তু তিন মাস আগে তার ফোনটি চুরি হয়ে যায়। তার বন্ধু সালিম নিজের ফোনটি দিয়ে মায়ের সাথে কথা বলতে বলে এমালকে। কিন্তু সে আফগানিস্তানে মায়ের ফোন নাম্বারটি কিছুতেই মনে করতে পারে না। তাই বিষণœ হাসি হেসে বলে, ‘আমি মায়ের জন্য দোয়া করি। তার কথা আমার খুব মনে পড়ে। আমার মায়ের হাতের মুরগি রান্না খুব মজাদার হতো।’ তারপর আবার বলে, ‘আল্লাহ আজ আমাদের খাবার দিয়েছেন, আবার অন্য দিন...’।

আরেক কিশোর

সেন্ট্রাল বেলগ্রেডে এক টুকরো জংলা এলাকা, শরণার্থী ও ত্রাণকর্মীরা যাকে বলে ‘আফগান পার্ক’, সেখানে একটি বেঞ্চে অন্য শরণার্থীদের পাশে বসে ছিল ১৫ বছর বয়সী কিশোর ইনামুল্লাহ মোহাম্মদ। ওরা সবাই বসেছে কিভাবে ইউরোপে ঢোকা যায়, সে বিষয়ে কিছু টিপস পাওয়ার আশায়।
এমালের মতো ইনামুল্লাহও এসেছে আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশ থেকে। সেও বাড়ির বড় ছেলে। সে দেশ ছেড়েছে ১৮ মাস আগে। কারণ, তালিবান ওকে ওদের দলে যোগ দিতে বলেছিল।
দেশ ছাড়ার ১৮ মাসের অর্ধেক সময় ইনামুল্লাহর কেটেছে সার্বিয়ায়। কিন্তু তবুও এদেশকে সে তার অস্থায়ী আবাস ছাড়া কিছুই ভাবে না। এখন সে একটি সরকারি আশ্রয়শিবিরে থাকলেও প্রথমে থাকত একটি পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউসে। বেলগ্রেডের সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন ওয়্যারহাউসটিতে তার সাথে আরো কিছু শিশু-কিশোর থাকত। সেখানে না ছিল শোয়ার ভালো ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, ঘর গরম করার ব্যবস্থা কিংবা পয়ঃব্যবস্থা।


মে মাসে ওয়্যারহাউসটি ভেঙে ফেলা হয়। পুরো এলাকাটা হয়ে যায় রণক্ষেত্রের মতো। শিশুরা সব পালিয়ে যায়। শোনা যাচ্ছে, সেখানে নতুন ভবন বানানো হবে। তবে এখনো হয়নি, আর তাই শরণার্থী শিশুদের ব্যবহৃত নানা জিনিস ধূসর কম্বল, টুথব্রাশ, টুনা মাছের খালি ক্যান পড়ে থাকতে দেখা যায়। আর দেখা যায় কাছের অব্যবহৃত ট্রেন প্ল্যাটফর্মের দেয়ালে ইংরেজিতে লেখা কিছু মানবিক আর্তি : ‘আমাকে সাহায্য করো। সীমান্ত খুলে দাও’। আরেকটি দেয়ালে লেখা : ‘আমিও মানুষ’।


এই বিলুপ্ত ওয়্যারহাউসেই ‘বড়’ হয়ে উঠেছে আফগানিস্তানের কৃষকপুত্র ইনামুল্লাহ। যখন সে দেশ ছাড়ে তখন তার মুখে দাড়িগোঁফ ছিল না, এখন তার ঠোঁটের ওপর ভারী গোঁফ। কিন্তু বড় হতে থাকলেও তার কিছু ভালো লাগে না, একা-একা লাগে। তার একমাত্র আলাপ হয় মোবাইল ফোনে; যে চোরাচালানির সাহায্যে সে এ দেশে এসেছে। অবশ্য এ আফগান মানুষটিকে সে কখনো সামনাসামনি দেখেনি। জমি বিক্রি করে তার বাবা এ লোকটিকেই আট হাজার মার্কিন ডলার দিয়েছেন এবং এখানে তার চলার খরচ পাঠানোর জন্য ঋণ করেছেন বেশ কিছু টাকা। এসব কথা ভেবে ইনামুল্লাহর নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হয়। সে চায় রোজগার করে বাবাকে টাকা পাঠাতে, যাতে তিনি ঋণ শোধ করতে এবং সম্ভব হলে বিক্রি করে দেয়া জমিটি ফের কিনে নিতে পারেন। তবে এখন সে অপেক্ষা করছে বাড়ি থেকে টাকা এলে একজোড়া জুতা কিনবে বলে। এমালের মতো তার জুতাজোড়াও সীমান্তরক্ষীরা বাজেয়াপ্ত করেছে।


এই দীর্ঘ ১৮ মাসের পথ চলায় যে স্বপ্নটি ইনামুল্লাহকে রাতে ঘুমাতে দেয়নি, সে কথাও বলে সে। তার স্বপ্ন হলো, ‘আমি কি আমার মা-বাবাকে আবার দেখতে পাবো? আমাকে যদি কোনো জন্তু খেয়ে ফেলে, কোনো গাড়ির ধাক্কায় যদি আমি মরে যাই অথবা কেউ যদি আমাকে গুলি করে অথবা খুন করে, তাহলে আমার পরিবারের কী হবে? তালিবানরা আমার স্বজনদের কী করবে?’


এসবের কোনো জবাবই জানা নেই ইনামুল্লাহর। তবে একটা বিষয় সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, সে কিছুতেই সার্বিয়ায় থাকতে চায় না, থাকবে না। কেন? ইনামুল্লাহর সাফ জবাব, ‘এ দেশের মানুষ তো আমাদের চেয়েও গরিব। আফগানরা এদের চেয়ে ধনী (সার্বিয়ার জিডিপি আফগানিস্তানের ১০ গুণ। কিন্তু ইনামুল্লাহর মতে, এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই)। তাই সে কৃতসংকল্প, ইইউর কোনো দেশে সে ঢুকবেই। সে বলে, আমি ২৭ বার চেষ্টা করেছি। চারবার আমাকে স্লোভেনিয়া থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমি ভালো মানুষ হতে চাই। একটা কিছু শিখতে ও দক্ষ হতে চাই। সেটার পথ যদি না পাই, তাহলে বাধ্য হয়ে আফগানিস্তানেই ফিরে যেতে হবে। সেখানে গেলে তালিবানরা জোর করে ওদের দলে ঢুকিয়ে নেবে।

অভিজ্ঞতায় ‘বয়স্ক’ এক শিশু

শিশুটির নাম দেলাঘা কানদাঘা। বয়স আট বছর। লাজুক শিশুটি অ্যাডাসেভচি শরণার্থীশিবিরের বাইরে এলোমেলো হাঁটছিল। ওটি আগে ছিল মোটেল, এখন বানানো হয়েছে শরণার্থীশিবির। এটি সাদ্দাম এমালদের সেই লুকিয়ে থাকার জায়গা এবং ক্রোয়েশিয়া সীমান্তের কাছাকাছি। এখানে একেকটি পরিবার একেকটি কামরায় গাদাগাদি করে থাকে আর অবিবাহিত পুরুষ ও বালকদের জন্য বাইরে ক্যানভাসে মোড়ানো হ্যাঙ্গার বানিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে আছে দোতলা-তিনতলা বিছানা।


একদল শরণার্থী কিশোর এবং একজন ত্রাণকর্মীকে দেখা গেল মাঠে ভলিবল খেলছে। একসময় যেটা মোটেলের লবি ছিল, সেখানে ওয়াইফাই থাকায় কিছু লোক ভিড় করেছে। তাদের পাশ দিয়ে লাজুক একটি মেয়ে হেঁটে গেল। তার হাতে একটি প্লাস্টিকের ঝুড়ি, তাতে ধোয়ার জন্য কিছু কাপড়। সার্বিয়ায় আসা বেশির ভাগ মেয়ে-শরণার্থীর মতো এই মেয়েটিও এসেছে পরিবারের সাথে। ইউনিসেফের সেইন্ট-লট বলেন, এরা দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ থেকে এসেছে, সেসব দেশের রক্ষণশীল সংস্কৃতির কারণে মেয়েদের শারীরিক নিপীড়ন বা যৌননিগ্রহের ঘটনা নেই বললেই চলে।


কানদাঘার দিকে ফিরে যাওয়া যাক। দেখা যাচ্ছে, সে হ্যাঙ্গারের দিকে যাচ্ছে। ওখানেই সে থাকে। তার গায়ে ধূসর রঙের একটি টি শার্ট, ঘাড়ে জড়ানো মাফলার। এতে সকালের তীব্র শীত মানছে না, তা বোঝাই যায়।
এক বছর আগে নানগারহার ছেড়েছিল কানদাঘা। সাথে ছিল এক বছর বয়সী কাজিন এবং ১৫ বছর বয়সী চাচা। বাড়ির কিছুই সাথে আনেনি সে, কেবল কিছু স্মৃতি ছাড়া। তার মনে পড়ে মর্টার বিস্ফোরণ, লড়াই ও তালিবান দস্যুদের কথা। একই সাথে তার স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলা এবং মা-বাবা ও ছোট চার ভাইবোনের সাথে বসে খানাপিনার কথা। সে বলে, কী সুখের দিন! আমার খুব খারাপ লাগে। এখানে কিছুই নেই।


কানদাঘা স্বপ্ন দেখে ফ্রান্সে চলে যাওয়ার। কারণ, সে শুনেছে ওই দেশে বহু আফগান বাস করে এবং দেশটিতে শান্তি আছে।
কিন্তু শান্তি তো সার্বিয়ায়ও আছে। তা থাক, সার্বিয়া তো তার স্বপ্নের ইউরোপ নয়!
কানদাঘা তার কিশোর আত্মীয়দের সাথে নিয়ে ইরান ও তুরস্ক হয়ে প্রথমে বুলগেরিয়া এবং সবশেষে সার্বিয়ায় আসার আগে জানতই না যে, ইউরোপ আসলে কোথায়। বিদেশ বলতে তার দেখা ছিল কেবল পাকিস্তান। তার বাবা পাকিস্তানে কম্বল বিক্রি করতেন, তিনিই একবার ছেলেকে সাথে নিয়ে দেশটি দেখিয়ে আনেন।


আট বয়সী কানদাঘা তার মা-বাবাকে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় একবারও জানায়নি যে, ইরানে ‘তালিবানের মতো দেখতে, হাতে মেশিনগানঅলা’ একদল লোক তারা তিনজনকে পিটিয়ে, আটকে রেখে সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। বলেনি যে, তার ১৫ বছর বয়সী চাচা টাকা-পয়সা সব লুকিয়ে রাখে কানদাঘার আন্ডারওয়্যারে। কারণ, দস্যুরা এই ছোট লাজুক ছেলেটিকে তল্লাশি করবে না বলেই তার ধারণা। এমনকি ফোনে বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার সময় কাঁদেও না কানদাঘা। কাঁদলে বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তা করবে না!
বেলগ্রেডে যখন ছিল তখন কানদাঘাকে থাকতে হয়েছে ইনামুল্লাহদের মতো একই রকম নোংরা ও পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউসে। সেখানে শীত তাড়াতে সারা রাত আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হতো। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে দেখত ধোঁয়ার কালি জমে সবার চেহারা কালো হয়ে গেছে।


সাদ্দাম এমাল চায় সীমান্তরক্ষীদের চোখকে ফাঁকি দেয়ার ‘খেলা’ খেলে ইউরোপের মাটিতে পা রাখতে। কানদাঘা কিন্তু এ রকম কোনো ‘খেলায়’ আগ্রহী নয়। সে বলে, ‘সব রাস্তা বন্ধ। কেউ সীমান্ত পার হতে পারছে না।’ মাঝে মাঝে তার মন চায় দেশে ফিরে যেতে। সামনের দিনগুলোতে কী আছে, তাও জানে না সে। তার পরিকল্পনা কী, জানতে চাইলে কানদাঘা বলে, ‘কিচ্ছু না। এখন আমার কিছুই করার নেই।’
এমাল-ইনামুল্লাহ-কানদাঘার মতো লাখো শিশু আজ আশ্রয়প্রার্থী হয়ে ইউরোপের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের এই মুহূর্তে অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কিন্তু ইউরোপেরও কি করার কিছুই নেই?