elektrik fatura ödeme doğalgaz fatura ödeme জঙ্গিবিমানের শেষ পাইলট যা বলেন : অন্য দিগন্ত


জঙ্গিবিমানের শেষ পাইলট যা বলেন

Feb 23, 2018 06:35 pm
এফ-৩৫  একটি জঙ্গি জেট বিমান


বিশ্বের কোটি মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে থাকলেও অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই ধনী দেশগুলো। তারা উদ্ভাবন করেছে এফ-৩৫ নামে এমন একটি জঙ্গি জেট বিমান, যা এত উন্নত, স্বয়ংক্রিয় ও সমন্বিত যে, প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে জঙ্গিবিমানে কি আর পাইলটের প্রয়োজন আছে? বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


ফনিক্স শহরের উপকণ্ঠ থেকে ২০ মাইল দূরে একটি ধূলিধূসর টারমাকে দাঁড়িয়ে আছেন ক্যাপ্টেন জোসেফ স্টেনজার। জঙ্গিবিমানের পাইলট তিনি। বয়স ৩২। প্রায় ছয় ফুট লম্বা মানুষটির পরণে সবুজ ফ্লাইট স্যুট। মসৃণভাবে পেছন দিকে আঁচড়ানো চুল। চোখ দুটো স্থির। সুগঠিত বাহু। সব মিলিয়ে সিনেমার পোস্টারে দেখা মানুষটি যেন।


ক্যাপ্টেন স্টেনজার দাঁড়িয়ে আছেন ১০৯ ডিগ্রি তাপমাত্রার পরিবেশে। এত গরম, কিন্তু ঘামছেন না তিনি। তার স্থির দৃষ্টি একটি চমৎকার বিমানের দিকে নিবদ্ধ : এফ-৩৫ লাইটনিং সেকেন্ড ফাইটার। জঙ্গিবিমানটির প্রায় নাকঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তার কাজ হলো এটি যুদ্ধের সময় কী কী কাজ করতে পারবে সেসব খুঁজে বের করা এবং অন্য জঙ্গিবিমানগুলোর কয়েক শ’ পাইলটকে তা শেখানো।


এফ-৩৫ হচ্ছে সর্বকালের সর্বাধুনিক জঙ্গি জেট বিমান। এই বিমান নিজেকে শত্রুর রাডার থেকে লুকিয়ে ফেলতে সক্ষম। শত্রুর রাডারে যদি এর উপস্থিতি ধরা পড়েও, দেখা যাবে একটি গলফ বলের আকৃতিতে। এটি শত্রুর রাডার জ্যাম করতেও পারে। আবার এমনও করতে পারে যে, দেখা যাবে আকাশে এক শ’ গলফ বল ভেসে বেড়াচ্ছে, শত্রু বুঝতেই পারবে না, এর মধ্যে তার টার্গেট অর্থাৎ এফ-৩৫ কোনটি। এটা শব্দের গতিতে ছুটতে পারে। বহন করতে পারে একটি ২৫ এমএম কামান, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, দুই হাজার পাউন্ড ওজনের দু’টি গাইডেড বোমা এবং চারটি এক্সটারনাল লেজার গাইডেড বোমা। তবে এফ-৩৫ জঙ্গি জেট বিমানের বিশিষ্টতা এসবে নয়, এর শ্রেষ্ঠত্ব এর ব্রেন বা বুদ্ধিমত্তায়। এই বিমানের আছে ৮০ লাখ লাইনের সফটওয়্যার কোড, যা এ যাবৎকালে নির্মিত কোনো জঙ্গিবিমানে নেই। এর সাহায্যে বিমানটি সবরকম যোগাযোগ ব্যবস্থা, নৌ চলাচল ও টার্গেটিং সিস্টেমকে অকেজো করে দিতে পারে।


স্টেনজার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে : পুরনো জেটগুলোতে রাডারজাতীয় জিনিসগুলোকে ম্যানুয়ালি চালাতে হতো (যেমন তার দিকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে কি না জানার জন্য রাডারের মুখ ভূপৃষ্ঠের দিকে ঘুরিয়ে রাখতে হতো অথবা শত্রুবিমানের খোঁজে ঘোরাতে হতো আকাশের দিকে)। বিমান থেকে বিমানে যোগাযোগের জন্য একটি উচ্চগতির ড্যাটা লিংক এবং ভূপৃষ্ঠে মোতায়েন সৈন্যদের কাছ থেকে পাওয়া লিখিত ভাষ্যও (টেক্সট) মনিটর করতে হতো। পাইলট অথবা তার পেছনে বসা সহযোগীকে হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও হামলার জন্য অবশ্যই কিছু উপাত্ত পেতে হতো। এসব করতে গিয়ে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হতো।
এক আসনবিশিষ্ট এফ-৩৫ জঙ্গি জেট বিমানে এসবের বালাই নেই। এই বিমানে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় অসংখ্য সেন্সরই সব কাজ সেরে ফেলবে। যেমন এর হিট সেন্সরে যদি ধরা পড়ে যে, শত্রুর নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র তার দিকে ধেয়ে আসছে তাহলে তাতে ডোরবেলের শব্দের মতো একটি আওয়াজ হবে এবং একটি কম্পিউটার বলবে, ‘বাম দিকে মিসাইল, ৯টায় ছোঁড়া হয়েছে।’ পাইলট সেদিকে তাকালেই তার হেলমেটের ফেস শিল্ডে একটি সবুজ বৃত্ত জ্বলে উঠবে। তাতেই নির্দিষ্ট করে দেখানো হবে ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎক্ষেপণস্থল, এর গতি এবং আঘাত হানার সময়। কাজেই সবুজ বৃত্তটি দেখেই পাইলট তার নিশানা ঠিক করে নিতে এবং শত্রুর প্রতি আঘাত হানতে অর্থাৎ ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রটিকে বেপথু করে ফেলতে পারবেন। বিমানের বাইরে লাগানো আছে ছয়টি ক্যামেরা। এগুলো বাইরের ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য ধারণ করে তা পাইলটের হেলমেটের ফেস শিল্ডে পাঠিয়ে দেয়। এ ছাড়া পাইলট ইচ্ছে করলে বিমানের ককপিটের মেঝে থেকে ভূপৃষ্ঠের দৃশ্যও দেখতে পারেন।


প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা কোম্পানি লকহিড মার্টিন এই এফ-৩৫ জঙ্গি জেট বিমান বানাচ্ছে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তারা আমেরিকান নৌবাহিনী, মেরিন ও বিমানবাহিনীকে এ ধরনের কয়েক হাজার জেট বিমান সরবরাহ করবে। মার্কিন সশস্ত্রবাহিনী এরকম এক হাজার ৭৬৩টি বিমান নেবে এবং বিমানগুলোর পাইলট হতে ইচ্ছুকদের প্রশিক্ষণ দেবেন স্টেনজার। তার রয়েছে ২ শ’ ঘণ্টারও বেশি এফ-৩৫ চালানোর অভিজ্ঞতা। ফলে বিমানবাহিনীর যে কোনো পাইলটের চেয়ে এই জেট সম্বন্ধে তার বেশি ধারণা আছে। স্টেনজার যখন ফ্লাইট লাইনে থাকেন না, তখন তিনি সময় কাটান ক্লাসিফায়েড ব্রিফিং রুমগুলোতে এবং এফ-৩৫ এর ক্ষমতা সম্পর্কিত ট্যাকটিকাল ম্যানুয়েলগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েন। স্টেনজার এবং মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যই এই বিমানকে দেখেন ‘আমেরিকার অব্যাহত বিমান-শ্রেষ্ঠত্বের একটি হাতিয়ার’ হিসেবে। তবে একই সাথে এর মধ্য দিয়ে আমেরিকার একটি গৌরবদীপ্ত পেশার সমাপ্তির সূচনা হতে যাচ্ছে বলেও মনে করা হয়। কেননা এফ-৩৫ এত উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন, এত স্বয়ংক্রিয়, এত চটপটে, এত সমন্বিত যে, গত মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব নেভি রে মাবুস ঘোষণা দেন : ‘এফ-৩৫ জঙ্গিবিমানের হওয়া উচিত পাইলটচালিত শেষ জঙ্গিবিমান এবং নিশ্চিতভাবে সেটাই হবে। মার্কিন নৌবাহিনী আর কোনো মনুষ্যচালিত বিমান কিনবেও না, উড়াবেও না।’


নাবুস এবং তার মতো অন্যরা মনে করেন, সময়ের পরিক্রমায় জঙ্গিবিমানের পাইলটের কাজের ধরন বদলে গেছে। তারা এখন আর শত্রু পাইলটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন না, সহকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেন না, গোলাও নিক্ষেপ করেন না। তার বদলে তারা এখন ‘আইপ্যাডের মতো দেখায়’ এরকম স্ক্রিন অথবা হেলমেট ডিসপ্লে থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। ইলেকট্রনিক সেন্সর, নেটওয়র্কড ওয়ারফেয়ার এবং রাডারচালিত আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে এখন এক শ’ মাইল দূর থেকেও শত্রুবিমানকে ভূপাতিত করা সম্ভব। এখন বেশির ভাগ সময় যুদ্ধরত পাইলটরা একে অন্যকে দেখেনই না। তাই অনেকে যুক্তি দেখান, অবস্থা যদি এ রকমই হয়, তাহলে পাইলটদের কেন গ্রাউন্ডেড (ভূমিতে) করা হবে না। এখানে বসেই তারা একই স্ক্রিন থেকে তথ্য নেবে, একই বাটনে চাপ দেবে। সেটাই বেশি নিরাপদ নয় কি?


বিষয়টি নিয়ে আগেই ভেবেছেন স্টেনজার। পাইলট হিসেবে তিনি আফগানিস্তানে ৩৩০ ঘণ্টারও বেশি বিমান চালিয়েছেন। এ সময় তালিবান যোদ্ধা ও তাদের ঘাঁটির ওপর বোমা ফেলেছেন, মিসাইল লঞ্চার বহন করেছেন এবং সম্মিলিত বাহিনীকে কভার দিয়েছেন। এবং এখনো যখন বিমান বাহিনীতে তার চাকরির বয়স ৯ বছর হয়ে গেছে, তিনি কখনো মুখোমুখি লড়াই করেননি অথবা শত্রুর জঙ্গিবিমান বা অন্য কোনো বিমানের মোকাবেলাও তাকে করতে হয়নি। তাই চালকবিহীন জঙ্গিবিমানের প্রসঙ্গ তোলা হলেই তিনি দার্শনিক লাইনে চলে যান। বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মতামত দেবো না। কারণ, আমি একজন ক্যাপ্টেন। আমার কাজ হলো এফ-৩৫ চালানো এবং আমি সেটাই করে যাচ্ছি। যদি পাইলটচালিত অন্য কোনো জঙ্গিবিমান আসে, খুব ভালো। যদি না আসে, এটা পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাপার। তারা জানবে না যে, জঙ্গিবিমানের পাইলট আসলে কেমন।’

 

লিউক বিমানঘাঁটিটি খুবই ব্যস্ত। মরুভূমিতে অবস্থিত এই বিমানঘাঁটির বাতাসে প্রতি ১৫ মিনিট পরপর একটি করে জেট বিমান ওঠা অথবা নামার শব্দ শোনা যায়। গত ৩২ বছর ধরে এটি এফ-১৬ জঙ্গি ফ্যালকন বিমান চালানোর একটি বড় প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ওখানে গেলেই দেখা যায়, এরকম অসংখ্য বিমানের অন্তহীন সারি। এফ-৩৫ যখন আসতে শুরু করবে তখন বিমানঘাঁটি ও আকাশ দুই জায়গা থেকেই এগুলো চিরকালের মতো অদৃশ্য হয়ে যাবে।


ফ্লাইট ট্রেইনিংকালে স্টেনজার তার ছাত্রদের অনেক দক্ষতা শিক্ষা দেন। এর অন্যতম হচ্ছে ডগফাইট বা দুই বিমানের মুখোমুখি যুদ্ধ। আগেই বলা হয়েছে, লিউক বিমানঘাঁটিটি মরুভূমিতে অবস্থিত। সনোরান নামের এই মরুভূমির ১৭ লাখ একর জায়গা এবং ৫৭ হাজার কিউবিক মাইল আকাশসীমা এই বিমানঘাঁটির আওতাধীন। ফলে ‘টপ গান’ সিনেমায় দেখা ডগফাইটের মতো দৃশ্যের অবতারণা তেমন কঠিন কাজ নয়। স্টেনজার বলেন, ‘এয়ার-টু-এয়ার কমব্যাট ট্রেইনিংয়ের জন্য আমরা এক শ’ মাইল আকাশসীমা ব্যবহার করি।’ প্রশিক্ষণকালে তিনি দু’টি এফ-৩৫ জঙ্গি জেটের বিপক্ষে রাখেন চারটি এ-১৬ এবং ছাত্রদের বলেন, ‘তোমরা এখানে যা শিখবে তা যদি কাজে লাগাতে পারো, তাহলে শত্রু তোমাকে দেখার আগেই তুমি তাকে শেষ করে দিতে পারবে।’


তবে স্টেনজার যা-ই বলুন, চালকবিহীন জঙ্গিবিমান ইস্যুটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে প্রায় প্রতিটি আকাশ থেকে আকাশের যুদ্ধ এভাবেই চলেছে। ফলে আধুনিক সামরিক বাহিনীগুলো অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে নেটওয়ার্ক ওয়ারফেয়ারের প্রতি। নেটওয়ার্ক ওয়ারফেয়ার হলো এমন একটি পদ্ধতি, যা জিপিএস স্যাটেলাইট লোকেটর, ইনফ্রারেড রাডার, স্থল ও আকাশ থেকে আকাশে যোগাযোগ, বোয়িং ই-৩ এর মতো আকাশযানের প্রতি নজরদারি এবং অবশ্যই রাডারচালিত আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইত্যাদি সবকিছুর একটা সমন্বিত রূপ।


নেটওয়ার্ক ওয়ারফেয়ার যতই বাড়ছে, আকাশযুদ্ধ ততই কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড বাজেটারি অ্যাসেসমেন্টের সিনিয়র ফেলো জন স্টিলিয়ন জানান, ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মাত্র ৫৪ জঙ্গি জেট বিমান ভূপাতিত হয়েছে। স্টিলিয়ন মার্কিন বিমানবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা। ১৯৬৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মার্কিনিরা যত আকাশযুদ্ধে জয়ী হয়েছে, সবই তার ডাটাবেসে আছে।


ভূ-রাজনীতি অবশ্যই এ বিষয়টির আংশিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। জঙ্গি জেট বিমান আছে, এমন বেশ ক’টি জাতিরাষ্ট্র ওই সময় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তবে স্টিলিয়নের যুক্তি হলো, প্রযুক্তি সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন নিয়ে আসছে। তিনি বলেন, সেন্সরচালিত উড্ডয়ন এবং দৃষ্টিসীমার আওতায় আসার আগেই শত্রুকে আঘাত হানার ক্ষমতা জেট বিমানের প্রচলিত ক্ষমতায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। উচ্চগতি, ত্বরণ, কৌশল ইত্যাদি আগে যতটা গুরুত্ব পেত, এখন তা পাচ্ছে না। এখন তার বদলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেন্সর, শক্তিশালী ও দূরপাল্লার অস্ত্র, বিমানের ফ্লাইট রেঞ্জ ও নেটওয়ার্ক কানেকটিভিটি। এগুলোই এখন দূরপাল্লার বোমারু বিমানের সাথে যুক্ত। কাজেই আমাদের ভবিষ্যতের জঙ্গি জেট বিমানগুলো এমনভাবে বানানো হতে পারে, যা পাইলট ছাড়াই বহু দূরের লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানতে সক্ষম।


তবে এ ক্ষেত্রে দু’টি মজার ব্যাপার উল্লেখ করার মতো প্রযুক্তিগত ও আর্থিক। প্রথমটি হলো এই যে, ওপরে বর্ণিত কাজগুলো ড্রোন কিন্তু ভালোভাবেই করছে। এ ছাড়া একটি জঙ্গি জেট বিমান বড়জোর কয়েক ঘণ্টা আকাশে থাকতে পারে, বিপরীতে ড্রোন থাকতে পারে ২৪ ঘণ্টা। দ্বিতীয়ত, ড্রোনকে ট্রেইনিং দিতে হয় না। কিন্তু একজন পাইলটের ট্রেইনিং ও রি-ট্রেইনিং লাগে, যাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। যেমন, কেবল একটি এফ-৩৫ এক ঘণ্টা উড়ানোর জন্য বিমানবাহিনীর খরচ ১৪ হাজার ১৮৩ মার্কিন ডলার এবং এটাও যুদ্ধবিহীন সময়ে। এভাবে একজন ক্রু মাসে ১৩ ঘণ্টা বিমান চালাবে। তাদের পেছনে বছরে খরচ দুই কোটি ২০ লাখ ডলার। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এফ-৩৫ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পুরোদমে চালু হয়ে যাবে। তখন লিউক বিমানঘাঁটিতে এই জেট বিমানের সংখ্যা হবে ১৪৪। সেগুলোর জন্য থাকবে কয়েক শ’ কর্মী। এবার অঙ্ক কষতে বসুন, দেখুন খরচের পরিমাণ কত দাঁড়ায়!

 

অনেকেই এ বিষয়ে একমত যে, ভবিষ্যতে জঙ্গিবিমান ও তার পাইলটের ভূমিকা বদলে যাবে। তবে এই পরিবর্তনের চেহারাটি কি রকম হবে, সে বিষয়ে আছে নানা মুণির নানা মত। স্টিলিয়ন যুক্তি দেখান, পরবর্তী প্রজন্মের জঙ্গি জেট বিমানগুলোর আরো বেশি করে বোমারু বিমানের মতো হওয়া উচিত। তার মতে, ওগুলো হবে জঙ্গিবিমানের চেয়ে বড়। সেগুলোতে একজন ক্রু থাকতে পারে, তবে ফাইটার পাইলট অবশ্যই নয়। এসব বিমানে থাকবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি বোমারু বিমান হবে চারটি ড্রোনের পরিপূরক, যার প্রতিটিতে থাকবে উন্নতমানের রাডার এবং মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।


স্টিলিয়ন কল্পনা করেন, ভবিষ্যতে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে ডগফাইট হতে পারে। আর এ জন্য ড্রোনগুলোকে শত্রুদেশের ভূখণ্ডে খুব নিচ দিয়ে চলতে এবং সতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। বোমারু বিমানগুলো প্রায় এক শ’ মাইল পেছন থেকে ড্রোনগুলোকে অনুসরণ করবে। ড্রোনগুলোকে পরিচালনা করবেন ক্রু। তিনি বোমারু বিমানের সেন্সর-ডিটেকশন রেঞ্জ দ্বিগুণ করার ক্ষেত্রে ড্রোনকে কাজে লাগাবেন।


স্টিলিয়নের ভাষ্য অনুযায়ী এটা হবে আটটি জঙ্গি জেট বিমানের মধ্যে মল্লযুদ্ধ। এ পর্যায়ে বোমারু বিমানের বহর থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (যার গতি হতে পারে প্রায় আড়াই শ’ মাইল) ছোঁড়া হতে পারে। এর আঘাতে শত্রুর ছয়টি জেট বিমান একবারেই কুপোকাৎ হবে।


বিমানযুদ্ধ নিয়ে চিন্তাভাবনা কেবল স্টিলিয়ন করছেন তা নয়, করছেন আরো অনেকেই। এমনকি এ নিয়ে কাজও চলছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় লকহিড মার্টিন কোম্পানির একটি প্রকল্পে জনা পঞ্চাশেক প্রকৌশলী কাজ করছেন মানুষবিহীন বিমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় করা নিয়ে। তারা এমন একটি উন্নত ড্রোন বানাতে চান, যা শত্রুর রাডার জ্যাম করতে, জিপিএসচালিত বোমা ফেলতে এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অচল করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ ছুড়তে সক্ষম।


এ দিকে নর্থরাপ গ্রুম্যান কোম্পানির প্রকৌশলীরা পরীক্ষামূলকভাবে বানিয়েছেন এক্স-৪৭বি নামের একটি জঙ্গি জেট। সেটি ইতোমধ্যে বিমানবাহিনী জাহাজ থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করেছে সাফল্যের সাথে। এমনকি মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার কাজটিও করেছে। কোম্পানিটি মনে করছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ডগফাইটিংয়ের উপযুক্ত ড্রোন বানানো সম্ভব হবে।


এসবই তো গেল প্রযুক্তিগত দিক। সংশ্লিষ্টরা এর নৈতিক দিকটি নিয়েও ভাবছেন, বিশেষ করে চালকবিহীন জঙ্গিবিমান প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রসঙ্গটি উঠছেই। এফ-১৬ জঙ্গি জেট বিমানের পাইলট হিদার পেনি বলেন, ‘সত্যি বটে যুদ্ধ কোনো কোনো সময় প্রয়োজনীয়, তবে কোনো কোনো সময় এটি হত্যাকাণ্ড বৈ কিছু নয়, বিশেষ করে চালকবিহীন জঙ্গি জেট বিমানের বেলায় এর আশঙ্কা অনেক বেশি।’ তিনি বলেন, ‘এর সাথে অনেকগুলো প্রযুক্তিগত ‘যদি, কিন্তু’ জড়িয়ে আছে।’ উদাহরণ দিয়ে পেনি বলেন, সাম্প্রতিক অত্যাধুনিক উদ্ভাবন হলো লেজার। এটা আলোর গতিতে ছুটে গিয়ে বিমান এবং নেটওয়ার্ক ডাটা লিংক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনার বিমানবাহিনী যদি ড্রোনসজ্জিত হয় এবং ড্রোনগুলো যদি ডাটা লিংকের ওপর নির্ভরশীল হয়; আর শত্রু যদি কোনো ইলেকট্রিক পালস দিয়ে ওই লিংকগুলো নষ্ট করে ফেলতে পারে, তাহলে? তখন তো আপনার ড্রোন আপনাকে বলবে, ‘আমি আমার পাইলটের সাথে আর কথা বলছি না। আমি এখন আমার ঘাঁটিতে ফিরে যাবো। কারণ, আমাকে সেভাবেই প্রোগ্রাম করা হয়েছে।’
পেনি বলেন, মানুষ পাইলট কিন্তু এমন কথা কখনো বলবেন না। কারণ, তিনি তার মিশন সম্বন্ধে জানেন। কাজেই লক্ষ্য হাসিলের জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।


পেনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন, ড্রোন নয়, কেবল মানুষই জানে কিভাবে শত্রুর মাথাটি হাতের মুঠোয় পেতে হয় এবং কিভাবে তা চূর্ণ করতে হয়। তিনি বলেন, মানুষের সমতুল্য কিছুই নয়, হতে পারে না।
একই কথা বলেন স্টিলিয়নও। তার মতে, মানুষ ছাড়া চলবে না। যা প্রয়োজন তা হলো মানুষ ও যন্ত্রের কার্যকর সহাবস্থান।