ট্রাম্পের গলার কাঁটা

Feb 21, 2018 02:37 pm
যেসব উল্টাপাল্টা কথা বলছেন


মীযানুল করীম

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নানা কারণে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত ও সমালোচিত। প্রথমাবধি তার কর্মকাণ্ড বিস্ময়, বিদ্রপ ও বিরোধিতার কারণ হয়ে উঠেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বড় শক্তির মানমর্যাদা খাটো হচ্ছে। অনেকের ধারণা, ‘ট্রাম্প যেসব উল্টাপাল্টা কথা বলছেন এবং প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তাতে তিনি মেয়াদ পুরো করতে পারবেন না। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রবল বিরোধিতা তো আছেই, এমনকি নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির একটা বিরাট অংশের ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি ও অসন্তোষের মুখে তাকে বিদায় নিতে হবে নির্ধারিত সময়ের আগেই।’


এই প্রেক্ষাপটে এখন মিডিয়ার শিরোনাম ‘মুলারেই আটকে আছে ট্রাম্পের ভাগ্য’। এফবিআইর সাবেক প্রধান ও মার্কিন সরকারের বিশেষ কৌঁসুলি মাইক মুলার ট্রাম্পের নির্বাচনী শিবির ও রাশিয়ার মধ্যকার ‘আঁতাত’-এর ব্যাপারে তদন্ত করছেন। এখন মুলারকে বরখাস্তের উদ্যোগ নিলে উল্টো ট্রাম্পের পতন ঘটবে বলে খ্যাতনামা রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার বক্তব্য, হোয়াইট হাউস এটা ভালো করেই জানে। এর কয়েক দিন আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, গত জুন মাসে মুলারকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ জন্য তার নির্দেশ না মেনে পদত্যাগের হুমকি দিলে ট্রাম্প মুলারকে বাদ দেয়া থেকে বিরত হন। নিয়মমাফিক ওই কর্মকর্তাকে বলা হয়েছিলো যাতে তিনি জাস্টিস ডিপার্টমেন্টকে বলেন মুলারকে বরখাস্ত করার পদক্ষেপ নিতে।


ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এক বছর পার হয়ে গেছে ২০ জানুয়ারি। নির্বাচন হয়েছিল আগের বছর নভেম্বরের প্রথম দিকে। অথচ এত দিন পরে আজো ট্রাম্প তার নির্বাচনী কার্যক্রমে রাশিয়ার যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগের জের টেনে চলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রতিপক্ষ বা ‘শত্রুরাষ্ট্র’, সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি আজকের রাশিয়া। আয়তনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই দেশ আজো মার্কিন পরাশক্তির প্রবল প্রতিপক্ষ এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মস্কোর যোগসাজশের ব্যাপার যে বড় অঘটন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ট্রাম্পের আগে আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাচনে রুশ কানেকশনের কথা শোনা যায়নি। সেটাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘মারাত্মক বিষয়’ এবং একই সাথে ‘কার্যত অসম্ভব’ মনে করা হতো। ট্রাম্প এমনিতেই সাংঘাতিক রকম বিতর্কিত অভিবাসন, মুসলিম সম্প্রদায়, সন্ত্রাসবাদ, ইউরোপের সাথে সম্পর্ক, বিশ্বায়ন, জলবায়ু ইস্যু, চীনের ভূমিকা প্রভৃতি বিষয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক অবস্থানের দরুন। এর সাথে প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে রাশিয়ান কানেকশনের অব্যাহত অভিযোগ তাকে আরো বেশি বিতর্কিত করে তুলেছে।


এ প্রেক্ষাপটে অন্তত আমেরিকার মুখ ও মান রক্ষার জন্য পাল্টা ব্যবস্থা না নিলে ওয়াশিংটনের চলে না। তাই ‘নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের শাস্তি’ হিসেবে গত বছর আগস্ট মাসে মার্কিন কংগ্রেসে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল।


সর্বশেষ খবর, ট্রাম্প প্রশাসন ১১৪ জন রুশ রাজনীতিক ও ৯৬ জন ব্যবসায়ীর তালিকা বানিয়ে তা প্রকাশ করেছে। যদিও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের এই তালিকাকে কোনো নিষেধাজ্ঞা বলা হয়নি, তবু মস্কো এতে অপমানবোধ করে ক্ষোভের সাথে প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, এমন একটি তালিকা করা দুই দেশের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরানোর সমতুল্য। তদুপরি, ক্রেমলিনের দাবি, ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য রুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (পুতিন এর একজন প্রার্থী) মার্কিন হস্তক্ষেপ হতে পারে। এদিকে, মার্কিন অর্থ দফতরের মতেÑ উল্লিখিত তালিকার সব রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীর প্রত্যেকের এক বিলিয়ন ডলার কিংবা ততোধিক সম্পদ আছে।
অনানুষ্ঠানিকভাবে পুতিন লিস্ট বা ক্রেমলিন লিস্টরূপে আখ্যায়িত, আলোচ্য তালিকায় রুশ সরকারের ঊর্ধ্বতন প্রায় সবাই অন্তর্ভুক্ত। তারা হলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ, প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ইগর শুভালভ, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু, ফেডারেল নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান আলেক্সান্দর বোৎনিকভ, ন্যাশনাল গার্ড প্রধান ভিক্টর জোলোতভ, পুতিনের ‘প্রশাসনিক প্রধান’ আন্তন ভাইনো প্রমুখ। তালিকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী আলিশার ওসমানভ এবং রোমান আব্রামোভিচ। শেষোক্ত ব্যক্তি বিশ্বের এক শ’ সেরা ধনীর একজন এবং ‘ফোবর্স’ বলেছে, তার ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ রয়েছে। পুতিনের সাথে বিশেষ সম্পর্কের সুবাদে যারা ক্ষমতা বা সম্পদ অর্জন করেছেন, তারাই প্রধানত এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত।


যখন রাশিয়া বলছে, আমেরিকা তার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে, একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনপর্যায় থেকেও একই রকম অভিযোগ তোলা হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সোভিয়েত আমলে ‘যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়া’ কাদা ছোড়াছুড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে কে কার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চেয়েছে, তা নিরপেক্ষ সূত্র থেকে প্রামাণ্যভাবে জানা হবে না বলে ধরে নেয়া যেতে পারে।


২৯ জানুয়ারি সিআইএ প্রধান মাইক পম্পেও বলেছেন, ‘মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনেও রুশ হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে।’ স্মর্তব্য, ২০১৬ সালের শেষে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপের বিষয়ে ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই দিন ট্রাম্পের দল, রিপাবলিকান পার্টি নিয়ন্ত্রিত মার্কিন কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ব্যাপারে এফবিআইর ভূমিকার সমালোচনা করে এ দলের প্রস্তুতকৃত গোপন নথি প্রকাশ করা হবে।

এই তদন্ত সংস্থা ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়। তবে ‘অতিগোপনীয়’ গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর বিধায় এটা প্রকাশের ঘোর বিরোধিতা করেছে বিচার বিভাগ এবং এফবিআই। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহু দিন ধরে বলছেন, রাশিয়া ইস্যুর তদন্ত আসলে ডেমোক্র্যাটদের একটা ষড়যন্ত্র। অপর দিকে, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধাদানের অভিযোগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি চায় ট্রাম্পের অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট।