খালেদা জিয়াকে নিয়ে আওয়ামীলীগকে আনন্দবাজারের পরামর্শ

Feb 16, 2018 11:34 am
খালেদা জিয়া

গণতন্ত্রের উদ্বেগ

বিরোধী নেত্রী গ্রেফতার হইলেন, এ-দিকে জাতীয় নির্বাচন আর মাত্র কয়েক মাস দূরে। আরও এক বার বাংলাদেশে বিরোধী রাজনীতির পরিসরটি দুর্বল হইয়া পড়িল, হয়তো আবারও বিরোধীহীন নির্বাচনের দিকে হাঁটিতেছে সে-দেশ। বস্তুত, এই মুহূর্তে বিএনপির দলীয় সংগঠন অতি দুর্বল অবস্থায়। খালেদা জিয়ার কারান্তরিন হইবার ও তাঁহার প্রবাসী পুত্র তারেক রহমানসহ চার জন প্রধান নেতার শাস্তির খবর পাইবার পরে বাংলাদেশকে লইয়া বিশ্বময় উদ্বেগ ছড়াইয়া পড়িলেও সংকট ততখানি ঘনীভূত হইল না, আশঙ্কা হইতে আপাতত বাহির হওয়া গেল।

কিন্তু, ওই আপাততই। ছোট আশঙ্কামুক্তি অনেক সময় বড় আশঙ্কাকে আরও বড় করিয়া দেয়। সমাজে ক্ষমতার বিরুদ্ধ জায়গাটি যেহেতু কখনও শূন্য হয় না, এক ভাবে সেই স্থান খালি হইলে অন্য ভাবে তাহা পূর্ণ হইয়া যায়— বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে অসহিষ্ণু ধর্মান্ধ ও পশ্চাৎপদতার কৃষ্ণ মেঘ তাই কমিবার বদলে বাড়িয়া গেল, এমন অনুমান করাই যায়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামি লিগ এই মুহূর্তে বিএনপির দুর্বলতায় স্বস্তি বোধ করিতেছে ঠিকই, কিন্তু তলে তলে আরও বড় প্রতিরোধের আশঙ্কা উড়াইয়া দিতে পারিতেছে না। আওয়ামি লিগ নেতৃবৃন্দ অবগত আছেন যে, বিএনপির সামাজিক সমর্থন যদি নেতৃত্বাভাবে সরিয়া গিয়া কট্টরতর জামাত-এ বা অনুরূপ কোনও পতাকাতলে একত্রিত হয়, তবে কেবল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিবাদী সমাজ বিপন্ন হইবে না, গোটা দুনিয়ার লিবারাল রাষ্ট্রের বিপদও বাড়িয়া যাইবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের তো কথাই নাই। এমনিতেই জামাতকে লইয়া এ-দেশের পূর্ব সীমান্তে অনবরত সমস্যা, তদুপরি তাহারা বৃহত্তর সামাজিক সমর্থন অর্জন করিলে কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা আয়ত্ত করিলে অবস্থা আরও বেশি সংকটময় হইবে। সুতরাং, অন্তত ভারতে বসিয়া খালেদা জিয়ার গ্রেফতার সংবাদকে পূর্ণ আনন্দ-সহকারে গ্রহণ করা কঠিন।

বিরোধী নেত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়াছিল। নেত্রীর দল বলিতেছে, তাঁহার নিরপেক্ষ বিচার হয় নাই, রাজনৈতিক চক্রান্ত ঘটিয়াছে। চাপান-উতোরের মধ্যে না গিয়া কয়েকটি সাবধানবাণী স্মরণ করাইয়া দেওয়া ভাল। গ্রেফতার যত প্রয়োজনীয়ই হউক, ইহার ফলে যদি জাতীয় নির্বাচন বিরোধীহীন হইয়া পড়ে, তবে তাহা কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষে দুঃসংবাদ। গণতন্ত্রের পরিসরটিকে মুক্ত ও প্রতিযোগিতাময় না রাখিলে শাসক সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়া যায়। তাহাদের অধিকার জনমানসে প্রশ্নহীন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ঠিক যেমন ঘটিয়াছিল গত নির্বাচনে। বিরোধী দলগুলি অনুপস্থিত থাকিতে মনস্থ করায় আওয়ামি লিগ সে-বার কার্যত একাই নির্বাচনে লড়ে। এখনও অবধি সেই অনধিকারের কালিমা তাহার পিছু ছাড়ে নাই। তাহার পুনরাবৃত্তি বাঞ্ছনীয় নহে।

 

উপরন্তু, খালেদার মামলাটিকে যে রাজনৈতিক রঙে রাঙানো হইয়াছে, ইহা অভিযোগমাত্র, কিন্তু যখন দেখা যায় শাসকদলের দুর্নীতি মামলাগুলি সমান গুরুত্ব পাইতেছে না, সরকার-ঘনিষ্ঠ অভিযুক্তরা সহজেই মুক্ত হইয়া যাইতেছেন, তখন বিরোধীদের অভিযোগটি এক রকম মান্যতা পাইয়া যায়। সরকারের নিকট আরও অনেক সতর্কতা ও নিরপেক্ষতা প্রত্যাশিত। বিরোধী দলের প্রতি লাগাতার দমন-রীতি প্রয়োগও শাসক দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে নাই। জনমতের একাংশ ইতিমধ্যেই এই অসতর্ক ও প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনীতির কারণে তাঁহাদের প্রতি বিমুখ হইয়া গিয়াছে। সব মিলাইয়া শেখ হাসিনা সরকারের বহু কৃতিত্ব সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক রীতিপদ্ধতির প্রতি তাহার দায়বদ্ধতা প্রশ্নোর্ধ্ব নহে। রাজনৈতিক পটভূমি হইতে বিরোধী নেত্রীর প্রস্থান সেই প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করিয়া দিল।