বোরকা বিহীন সৌদি আরব

Feb 13, 2018 03:57 pm
'আবায়া' বা বোরকা পরতেই হবে এমন কোন ব্যাপার নেই

 

সৌদি আরবের একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা বলেছেন, সেদেশে মেয়েদের 'আবায়া' বা বোরকা পরতেই হবে এমন কোন ব্যাপার নেই। মেয়েদের আব্রু বজায় রেখে পোশাক পরতে হবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের আবায়া পরতে হবে।


সৌদি আরবে মেয়েরা পা পর্যন্ত পুরো শরীর ঢেকে রাখা যে ঢিলেঢালা আচ্ছাদন ব্যবহার করে, তাকে আবায়া বলে। সেখানে আবায়া না পরে বাইরে যেতে দেখা যায় কম মহিলাকেই। সেখানে এটি পরা আইনত বাধ্যতামূলক।


কিন্তু সৌদি আরবের 'কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলারস' বা সবচেয়ে বয়েজ্যোষ্ঠ ধর্মীয় চিন্তাবিদদের কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ আল মুতলাক বলেছেন, এটার দরকার নেই।
সৌদি সমাজে যখন নানা রকম সংস্কারের চেষ্টা চলছে, তখনই একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা এ ধরণের একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা হাজির করলেন।


শেখ আবদুল্লাহ আল মুতলাক বলেন, "মুসলিম বিশ্বের ৯০ শতাংশ মহিলাই 'আবায়া' পরেন না। কাজেই আমাদেরও উচিৎ হবে না মেয়েদের এটা পরতে বাধ্য করা।"
সৌদি আরবে এই প্রথম এরকম উচ্চ পদের কোন ধর্মীয় নেতার মুখে এরকম কথা শোনা গেল।


প্রতিক্রিয়া
তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে ইতোমধ্যে অনলাইনে তীব্র বিতর্ক এবং আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তার সমর্থনে কথা বলছেন। বিরোধিতাও করছেন অনেকে।
টুইটারে মাশারি ঘামদি নামে একজন লিখেছেন, "আবায়া আমাদের অঞ্চলের একটা ঐতিহ্য। এটি োন ধর্মীয় ব্যাপার নয়।"
তবে আরেকজন তীব্র বিরোধিতা করে লিখেছেন, "যদি একশো ফতোয়াও জারি করা হয় তারপরও আমি আামার আবায়া ছাড়বো না। মরলেও না। হে মেয়েরা, তোমরা এই ফতোয়ায় কান দিও না।"
সৌদি আরবে মেয়েরা যখন আবায়া না পরে বাইরে যায়, তখন অনেক সময় ধর্মীয় পুলিশ তাদের এসে ভর্ৎসনা করে।


২০১৬ সালে রিয়াদের রাস্তায় এক মহিলা তার আবায়া খুলে ফেলার পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সৌদি আরবে মেয়েদের কেবলমাত্র কালো রঙের আবায়ার পরিবর্তে আর বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের আবায়া পরতে দেখা যায়।
লম্বা স্কার্ট বা জিন্সের সঙ্গে খোলা আবায়া পরাও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আধুনিক তরুণীদের মধ্যে।
সৌদি আরবে গত কিছুদিন ধরেই পরিবর্তনের হাওয়া বইছে।
গত বছর সেখানে বাণিজ্যিক সিনেমার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। এ বছরের মার্চে সেখানে প্রথম সিনেমা হল খুলবে।


গত ডিসেম্বরে সেখানে প্রথম কোন গানের কনসার্টে মহিলা সঙ্গীত শিল্পীকে গান গাইতে দেখা গেছে।
সৌদি আরবে স্টেডিয়ামে গিয়ে মেয়েদের খেলার দেখারও অনুমতি দেয়া হয়েছে।
জানুয়ারি মাসে সৌদি আরবের মেয়েরা প্রথম বারের মতো স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখার সুযোগ পেয়েছেন।


কেমন অভিজ্ঞতা ছিল সেটা?
সৌদি আরবে এখন নানা রকমের পরিবর্তন আসছে - মেয়েরা গাড়ি চালানোর অধিকার পাচ্ছেন এ বছরই জুন থেকে। আর ইতিমধ্যেই মেয়েরা পেয়ে গেছেন স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল খেলার অনুমতি।
এর পর রাজধানী রিয়াদ. দাম্মাম আর জেদ্দায় তিনটি ফুটবল ম্যাচে প্রথম সৌদি আরবের মেয়েরা ফুটবল খেলা দেখতে যান। রাজধানীয় রিয়াদে সৌদি প্রো লিগের ম্যাচ ছিল আল-হিলাল বনাম আল-ইতিহাদের মধ্যে। আর জেদ্দার ম্যাচটি ছিল আল-আলি আর আল-বাতিনের মধ্যে যাতে আল-আলি ৫-০ গোলে জেতে।


ফুটবল থেকেই কি সৌদি আরবে একটা আগামী দিনে একটা বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে?
জেদ্দার এই ম্যাচটিতে একজন স্টুয়ার্ড হিসেবে মেয়েদের গ্যালারিতে কাজ করেছিলেন ১৮-বছর বয়স্কা ছাত্রী সারা আল-গাশকারি।
তিনি বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন সৌদি আরবে প্রথম মেয়েদের স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা।


"এ ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা, মেয়েরা উত্তেজিতভাবে তাদের যারা যার পছন্দের দলকে উৎসাহ দিচ্ছিল। তাদের জন্য এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক এবং আনন্দের মুহুর্ত - যে তারা কোন পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই খেলা দেখতে আসতে পেরেছে।"
"মেয়েদের জন্য এখানে আলাদা কোন নিয়ম ছিল না । পুরুষের জন্য যে নিয়ম - মেয়েদের জন্যও তাই। ফলে তাদের মধ্যে ছিল এক আনন্দের উচ্ছাস ।"
"সৌদি মেয়েরা সব সময়ই সরাসরি মাঠে বসে খেলা দেখতে চেয়েছে - কিন্তু এতদিন পর্যন্ত তাদের খেলা দেখতো হতো শুধু টিভির পর্দায়।"


"আমি একজন স্টুয়ার্ড হিসেবে কাজ করেছি। তাই আমাকে খেলা শুরুর ছয় ঘন্টা আগে স্টেডিয়ামে ঢুকতে হয়েছে - আর বের হয়েছি খেলা শেষ হবার তিন ঘন্টা পর। অনেক পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু আমার কখনো ক্লান্তি লাগে নি। "


"তা ছাড়া খেলা দেখাটাও ছিল একটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার - আমি খেলোয়াড়দের চোখের সামনে খেলতে দেখছি, গোল করতে দেখছি - এটা যেস বিশ্বাসই হচ্ছিল না। "
"আমার মনে হচ্ছিল এ যেন এক নতুন সৌদি আরব। আমি মনে করি, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি - আমাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল। আমরা ফুটবল খেলা দেখতে যেতে পারছি, সামনের বছর আমরা গাড়িও চালাতে পারবো।"


"আইনের পরিবর্তনের আগে আমরা শুধু আমাদের প্রিয় দল কি করছে তার খোঁজখবর রাখতাম। খেলা দেখতাম শুধু টিভিতে। তবে এখন ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী।"
মেয়েরা মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখবে - এর বিরোধিতা কি কেউ করে নি?


আল-গাশকারি বলছিলেন, "এর পুরোপুরি বিরুদ্ধে ছিল - এরকম কাউকে আমি চিনি না। তবে কেউ কেউ বলেছেন, তারা নিশ্চিত নয় যে এটা উচিত হচ্ছে কিনা। তাদের ধারণা, সমাজ এখনো এর জন্য তৈরি হয় নি, মানুষও তৈরি নয়। বয়স্করা বলছিলেন, আগে কখনো মেয়েরা খেলা দেখতে যায় নি। তারা ভয় পাচ্ছিলেন যে এখানে গোলমাল হতে পারে।"
"কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমরা আয়োজকদের অংশ, কোন গোলমাল হবে না - হয়ও নি। প্রায় আড়াইশো সউদি মেয়ে শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করেছে, দর্শকরাও আমাদের সহযোগিতা করেছে।"


"স্টেডিয়ামের অভিজ্ঞতা - আমি বলবো, আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতেও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। দর্শকরা গান গাইছিল, যার যার দলকে উৎসাহ দিচ্ছিল। আমি নিজেকে মনে করছি এই ইতিহাসের অংশ।"
"আমি দেখেছি, একজন লোক তার মেয়েকে ফুটবলের নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিচ্ছেন, মেয়েদের দেখেছি প্রাণ খুলে তাদের দলকে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে, কে কি ভাবলো তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।"
"আমি মনে করি, এই অভিজ্ঞতা আমার মধ্যেও একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছে" - বলছিলেন জেদ্দা থেকে সারা আল-গাশকারি।

 

 

বিবিসি বাংলা