খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন

Feb 08, 2018 04:52 pm
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড


আলফাজ আনাম 

বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে চড়াই -অতিক্রম করেছেন। সংগ্রাম আর নানা মুখী বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে তার জীবন অতিক্রান্ত হয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান-পতনে গ্রেফতারের ঘটনাও নতুন নয়। এরশাদের স্বৈরশাসনামলে তিনি তিনবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া প্রথম গ্রেফতার হন ১৯৮৩ সালের ২৭ নভেম্বর। দ্বিতীয়বার তাকে গ্রেফতার করা হয় ১৯৮৪ সালের ৩ মে। এ ছাড়া ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর পূর্বাণী হোটেলে খালেদা জিয়া আশ্রয় নেয়ার পর পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে অন্তরীণ করে রাখে। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার গ্রেফতার করে। মোট এক বছর এক সপ্তাহ জেলবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। গতকাল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। মামলাটিও সেনাসমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা হয়েছিল।


জানুয়ারি ২০০৭-এ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে খালেদা জিয়া, তার পরিবার ও বিএনপির ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসে তার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। ২০০৮-এ তার দুই ছেলেই সপরিবারে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। নভেম্বর ২০১০-এ আদালতের এক রায়ের পর খালেদা জিয়াকে ৪০ বছরের বাসভবন ছেড়ে চলে যেতে হয়। রাজনৈতিক আন্দোলনে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থার মধ্যে ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান মালয়শিয়ায় নির্বাসনে থাকা অবস্থায় মারা যান।
ব্যক্তিগত জীবনে নানামুখী বিপর্যয়ের মধ্যে তিনি আবার জেলে গেলেন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের (১৯৮২-১৯৯০) বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া প্রথমবার দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সফল হয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ অকালবিধবা এক গৃহিণী নিজেকে রূপান্তরিত করেছিলেন সফল নেত্রী রূপে। ১৯৯১-এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা তিনি বাস্তবায়ন করেছিলেন। ১৯৯৬-এ তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক ব্যবস্থা করেছিলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে সসম্মানে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। বিরোধী দলের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও মাত্র পাঁচ বছর পরই ২০০১ তার দল বিএনপি বিপুলভাবে ভোট দিয়ে তাকে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী করে।


খালেদা জিয়ার জন্ম হয়েছিল ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে একটি সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারে। তার পিতা ছিলেন ইস্কান্দার মজুমদার। মাতা ছিলেন তৈয়বা মজুমদার। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসার জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। ৩০ মে ১৯৮১-এর রাতে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। তিনি তখন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন। খালেদা জিয়া তার দুই শিশু ছেলেসহ ছিলেন ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে তাদের বাসভবনে। আগস্ট ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও খালেদা গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (ডাকনাম পিনো) এবং আরাফাত (ডাকনাম কোকো)-কে নিয়ে ছিলো গৃহবধুর জীবন।


রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তদানীন্তন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসন হন।২৪ মার্চ ১৯৮২ সালের ভোরে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি সামরিক ক্যুর মাধ্যমে বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর দলীয় রাজনীতিতে বিচারপতি সাত্তার প্রভাবহীন হয়ে পড়েন। তখন থেকে বিএনপির মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয় খালেদা জিয়াকে রাজনীতিমুখী করতে। বিচারপতি সাত্তার রাজনীতি থেকে অবসর নিলে ১২ জানুয়ারি ১৯৮৪-তে খালেদা জিয়া হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন। ১ মে ১৯৮৪-তে তিনি হন বিএনপির চেয়ারপারসন।
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এবং এরশাদের স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। খালেদা জিয়া ৯ বছরব্যাপী আন্দোলনে এরশাদের অগণতান্ত্রিক সরকারের সাথে আপস করেননি। তিনি আপোসহীন নেত্রী হিসাবে পরিচিতি পান। এরশাদের পতনের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তম দলরূপে বিএনপি আবির্ভূত হয়। খালেদা জিয়া পাচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং পাচটি আসনেই বিজয়ী হন। এই অসাধারণ সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে পরবর্তী সব নির্বাচনে।


৬ আগস্ট ১৯৯১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের দ্বাদশ সংবিধানের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন বয়কট করেছিল। খালেদা জিয়া পরপর দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। এই সংসদের আয়ু ছিল অল্প এবং এই সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আইন পাস হয়। ২৫ মার্চ ১৯৯৬ সালে এই আইন কার্যকর হয়। ১২ জুন ১৯৯৬-এ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। ১১৬টি আসনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি হয় দেশের সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল। ১ অক্টোবর ২০০১-এর নির্বাচনে এই জোট সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে বিজয়ী হয়। খালেদা জিয়া তৃতীয়বার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।


নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্টানে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ১১ জানুয়ারি ২০০৭-এ সেনাসমর্থিত একটি সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহন করে। ফখরুদ্দীন-মইন সরকার ৭ মার্চ ২০০৭ সালে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ১৬ এপ্রিল ২০০৭-এ ছোট ছেলে আরাফাত রহমান গ্রেফতার হন। ২ সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও সেনাসমর্থিত সরকার দুর্নীতির দায়ে একটি মামলা করে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয় এবং দ্বিতীয় সাব-জেলে বন্দী করা হয়। সবশেষে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়া হয় ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ। মোট এক বছর এক সপ্তাহ তিনি জেলবন্দি ছিলেন।


২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে একটি বিধ্বস্ত দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। এ বছর অনুষ্টিত নির্বাচনে খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে তিনটি আসন থেকে নির্বাচিত হলেও তার দল বিএনপির শোচনীয় পরাজয় হয়। ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পায় বিএনপি। আওয়ামী লীগ ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়। ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নেন। খালেদা জিয়া হন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা।


একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি নিয়ে খালেদা জিয়া আন্দোলন শুরু করেন। এর অংশ হিসেবে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৩ মার্চ ফর ডেমক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির আগে ২৭ তারিখ রাত থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে তার বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তিনি অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দেন। ৫ শতাংশের কম মানুষ এই নির্বাচনে ভোট দেয়। এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী না থাকার কারণে ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এই নির্বাচনের পর ৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বাসার সামনে থেকে অবরোধ তুলে নেয়া হয়।


পরের বছর ৫ জানুয়ারির দিন একতরফা নির্বাচন উপলক্ষে ঢাকায় সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। ৩ জানুয়ারি থেকে খালেদা জিয়ার চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এ দিন সন্ধ্যায় তিনি তার গুলশান কার্যালয়ে আসেন। এর পর থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করেন। অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে খালেদা জিয়ার জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ তার ছোট ছেলে মালয়শিয়ায় নির্বাসনে থাকা তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যান। ২৭ তারিখ তার লাশ ঢাকা এসে পৌঁছে। ৯২ দিন তিনি গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন।


খালেদা জিয়া বিভিন্ন নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। জানুয়ারি ১৯৯১, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, জুন ১৯৯৬ এবং অক্টোবর ২০০১-এর সাধারণ নির্বাচনের সময়ে এমপি পদের জন্য পাঁচটি নির্বাচনী আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যেত। এই চারটি নির্বাচনেই খালেদা জিয়া পাঁচটি বিভিন্ন আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওয়ান-ইলেভেনে (১১.০১.২০০৭) সামরিক ক্যুর পর নির্বাচনী আইন বদলে সর্বোচ্চ তিনটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিধান করা হয়। এরপর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচনে খালেদা জিয়া তিনটি আসনে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই বিজয়ী হয়। অর্থাৎ জানুয়ারি ১৯৯১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৮ সালে সুদীর্ঘ ১৮ বছরে মোট পাঁচটি সাধারণ নির্বাচনে যে সর্বোচ্চ ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব ছিল তার সব কয়টিতেই খালেদা জিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সব ক’টিতেই বিজয়ী হন। বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনীতিক এই সাফল্যে পাননি। মোট ২৩টি আসনে তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা পঁচিশ লাখের বেশি। সম্ভবত এটি সংসদীয় নির্বাচনে একটি বিরল রেকর্ড। সন্দেহ নেই খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেত্রী। তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে নির্বাচনে, ভোটের রাজনীতির মাধ্যমে। আবার রাজনৈতিক কারনে বিপর্যয়ের মুখেও পড়তে হয়েছে।