সেনাবাহিনীতে যৌন হয়রানি

Jan 30, 2018 05:18 pm
এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত' আছে

ছবি : প্রতীকী, কুর্দি নারী সৈন্য 


 ডয়েচে ভেলে


মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে জার্মান সামরিক বাহিনী বুন্ডেসভেরে ২৩৪টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করা হয়েছে৷ দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, অনেক অভিযোগই সন্দেহের বশে করা হয়েছে৷জার্মানির ফুংকে মিডিয়া গ্রুপের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো এ রিপোর্ট করেছে৷ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ধর্ষণ অথবা ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ এসেছে ১৪টি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ৷ ২০১৬ সালে সংখ্যাটি ছিল পাঁচ৷


২০১৬ সালে ১২৮টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এসেছিল৷ ২০১৭-তে তা বেড়ে হয়েছে ২৩৪টি৷ ফুংকে মিডিয়ার রিপোর্ট বলছে, অভিযোগের সংখ্যা বাড়ার কারণ প্রথমত সদস্যদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়া, এবং দ্বিতীয়ত, সন্দেহ বেড়ে যাওয়া৷ এছাড়া পুরোনো কিছু অভিযোগের তদন্ত পুণরায় শুরু হওয়াও একটি কারণ৷


প্রতিরক্ষা মন্ত্রী উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন গত বছর বলেছিলেন যে, সংখ্যা বেড়েছে মানে ঘটনা বেড়েছে তা নয়৷ বিষয়টি হচ্ছে আগের চেয়ে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে গেছে৷
সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন যে, যেসব অভিযোগে এসেছে তার মধ্যে ‘অপ্রত্যাশিতভাবে চুমু খাওয়া থেকে শুরু করে কাঁধ বা রানে হাত রাখা, এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত' আছে৷
গত নভেম্বরে হ্যামবুর্গে ২৯ বছর বয়সি এক কর্পোরালের বিরুদ্ধে দুই নারীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ খবরের শিরোনাম হয়েছে৷ জার্মান সংবাদপত্র ডেয়ার স্পিগেলের মতে, আরেক সেনা সদস্য ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করছিলেন, কিন্তু প্রতিরোধ করেননি৷ ফেব্রুয়ারি নাগাদ এ ঘটনার তদন্ত শেষ হবে বলে জানিয়েছে ফুংকে রিপোর্ট৷


এই প্রথম জার্মান সামরিক বাহিনী পরিপূর্ণভাবে সন্দেহভাজন অভিযোগগুলোকে লিপিবদ্ধ করল৷ আগের বছরগুলোতে কীভাবে পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়৷
জার্মান সামরিক বাহিনীতে ৬০,০০০ সেনাসদস্য আছেন৷
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অবস্থা আরো খারাপ৷ সেখানে ২০১৬ সালে মোট ৬ হাজার ১৭২টি ও ২০১৭ সালে ৬ হাজার ৮২টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পড়েছে৷


জার্মান সেনাবাহিনীর যত কেলেঙ্কারি
এক ভুয়া শরণার্থী
সিরীয় শরণার্থী সেজে এক জার্মান সেনা কর্মকর্তা সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল৷ সমান্তরাল এক দ্বিতীয় জীবন শুরু করেছিলেন ফ্রাংকো৷ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সিরীয় শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত হন তিনি৷ তার লক্ষ্য ছিল শরণার্থীদের উপর হামলার দোষ চাপানো৷ ২০১৪ সাল থেকেই ফ্রাংকো’র ডানপন্থি আচরণের কথা জানতেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা৷ এাই ফ্রাংকো ধরা পড়ার থেকে জার্মান সেনাবাহিনিকে শুরু হয় বিতর্ক৷


বাড রাইশেনহাল পর্বতে রেঞ্জার ইউনিটে হয়রানি
ডানপন্থি সন্ত্রাসী আচরণের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য সেনাবাহিনী বর্তমানে ২৭৫ টি মামলার তদন্ত করছে৷ চলতি বছরের মার্চে জনগণ একজন ল্যান্স করপোরালের কথা জানতে পারেন, যিনি কয়েক মাস ধরে বাভেরিয়া পর্বতের রেঞ্জার ইউনিটে হয়রানির শিকার হয়েছেন৷ নির্যাতিত ব্যক্তি জানিয়েছেন, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে যৌন নীপিড়ন করা হয়েছে৷ এ ঘটনার জন্য ১৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে৷


নারীদের পোল ড্যান্সে বাধ্য করা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী সবচেয়ে বড় যে কেলেঙ্কারির কথা বলেছেন তাহলো, ফুলেনডর্ফে স্টাওফের সেনাঘাঁটির ভয়াবহ ঘটনা৷ জানুয়ারিতে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের নগ্ন করা ও যৌনতা প্রকাশ পায় এমন আচরণ করতে বাধ্য করেছিলেন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সেগুলো ভিডিও করা হয়েছিল৷ সদ্য নিয়োগ পাওয়া নারীদের ‘এনট্র্যান্স পরীক্ষা’র অংশ হিসেবে পোল ড্যান্সে বাধ্য করা হয়েছিল৷ একারণে সেনাবাহিনীর শীর্ষ প্রশিক্ষক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়৷


ডানপন্থি সন্ত্রাসবাদের অনেক ঘটনার তদন্ত চলছে
জার্মান সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি কমিশনারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সাল জার্মান সেনাবাহিনীর জন্য মোটেই ভালো বছর ছিল না৷ ডানপন্থি সন্ত্রাসবাদ বা ‘জার্মানির মুক্ত গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক চেতনার লঙ্ঘন’ এর মোট ৬০টি অভিযোগের ঘটনা পাওয়া গেছে৷ এমনকি সেনারা নিজেদের নাৎসি চেতনা নিয়ে একে অপরের সাথে আলোচনা করে, নাৎসি সংগীত শোনে ও নাৎসি স্যালুটও দেয়৷


জাহাজে মৃত্যু
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত এসব কেলেঙ্কারি নিয়ে কোনো মাথা ঘামায়নি সেনাবাহিনী৷ ২০১০ সালের একটি ঘটনা জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করে, তা হলো, গর্ক ফক-এ নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণের সময় ২৫ বছরের এক সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা৷ প্রশিক্ষণের সময় ঐ নারী জাহাজের পাল থেকে নীচে পড়ে মারা যান৷ ফলে অন্যান্য ক্যাডেটরা পালে উঠতে আর রাজি হননি৷ পরে ঐ প্রশিক্ষণ বাতিল করা হয়৷


জার্মান সেনাবাহিনীর জন্ম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি সেনাবাহিনী রাখার পক্ষে ছিল না৷ পশ্চিম জার্মানিতে সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে৷ পুনরেকত্রীকরণের পর পূর্ব জামানির সেনাবাহিনী থেকে ২০ হাজার সদস্য নেয় কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী৷ ১৯৯৯ সালে যখন জার্মান সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক সংঘাতে (কসোভো যুদ্ধ) জড়িয়ে পড়ে, তখন এতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়৷ এর আগ পর্যন্ত কেবল বিদেশে শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল৷


বাধ্যতামূলক সেবা নয়
বর্তমানে জার্মান সেনাবাহিনীতে সেনা সংখ্যা ১ লাখ ৭৮ হাজার ২০০৷ ২০১৭ সালের মার্চের হিসেব অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর মোট সদস্যের ১১.৪ শতাংশ নারী৷ ২০১১ সাল পর্যন্ত জার্মান সেনাবাহিনীতে পুরুষদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল৷ এই মেয়াদকাল ছিল ৯ থেকে ১৮ মাস৷ বর্তমানে তরুণদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়৷ তবে সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারির কারণে এই আবেদনে তাদের সাড়া দেয়াটা সত্যিই কঠিন৷