মায়ের দুধ না খাওয়ানোয় নীরবে মারা যাচ্ছে শিশুরা

Jan 28, 2018 12:51 pm
মায়ের দুধ ছাড়া বাচ্চাকে আর কিছু খাওয়াতে মানা করেন চিকিৎসকেরা


আরশিয়া

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর বিষয়ে এই দুটি প্রতিষ্টান যে নিয়ম নীতি ঠিক করে দিয়েছে, তা প্রায় কোনও দেশই মেনে চলছে না। এমনটা করার কারণে বাচ্চারা তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যে কারণে একাধির রোগ ছোট থেকেই তাদের ঘিরে ধরছে। ফলে বাড়ছে মৃত্যু। আমাদের দেশের অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর। এমন পরিস্থিতিতে যদি এখনই কিছু করা না হয়, তাহলে আগামী দিনে যে কী হবে, তা ভগবানই জানেন।
বাচ্চার জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে তাকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হয়। এটাই নিয়ম। কারণ জন্মের পর এই দুধই হল তার শরীরের গঠনের প্রথম দাওয়াই। এর পর টানা ছ মাস বাচ্চা শুধু এই খেয়েই বেঁচে থাকে।

এই সময় মায়ের দুধ ছাড়া বাচ্চাকে আর কিছু খাওয়াতে মানা করেন চিকিৎসকেরা। কারণ মায়ের দুধে উপস্থিত একাধিক পুষ্টিকর উপাদান বাচ্চার শরীরকে জীবন যুদ্ধের জন্য তৈরি করতে থাকে। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তুলতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এক কথায় মায়ের দুধ হল বাচ্চার জন্য ভ্যাকসিনের সমান। আর এই ওষুধ, বাচ্চার মুখে তুলে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না মায়েরা। বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের চাকরি জীবন। এই কারণে পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তা সম্প্রতি গ্লোবাল ব্রেস্টফিডিং স্কোরকার্ডের দিকে চোখ ফেরালেইই বুঝতে পারা যায়।
এই রিপোর্ট অনুসারে সারা বিশ্বে প্রায় ৪৪ শতাংশ মা তাদের বাচ্চাকে জন্মের প্রথম ঘন্টায় দুধ খাওয়ান না। এখানেই শেষ নয়, এই নীল গ্রহে মাত্র ২৩ টি দেশ আছে যেখানে বাচ্চাদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর দুর্ভাগ্যের বিষয় এই ২৩ টি দেশের মধ্যে নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার নাম থাকলেও দূর দূরান্ত পর্যন্ত ভারতের দেখা নেই। এই অবস্থায় বিশ্বের মানচিত্রের যেখানে যেখানে ভারতীয়রা বসবাস করেন, তাদের সকলকেই এই প্রবন্ধে চোখ রাখতেই হবে। কারণ প্রত্যেকেরই জানা উচিত মায়ের দুধ বাচ্চার জন্য কতটা জরুরি। আর তা পেলে কী হতে পারে!
জন্মের পর থেকে টানা ৬ মাস মায়ের দুধ বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করলে কী কী হতে পারে জেনে নিন।

১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি ঘটে:
ব্রেস্ট মিল্কে উপস্থিত ভিটামিন, প্রোটিন, উপকারি ফ্যাট এবং প্রকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করার কারণে ধীরে ধীরে নবজাতকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মারাত্মক উন্নতি ঘটে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষতিকর জীবাণু ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। সেই সঙ্গে বারে বারে নিউমোনিয়া এবং ঠান্ডা লাগার মতো শারীরিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।

২. ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে:
মায়ের দুধে উপস্থিত উপকারি উপাদান ছোট থেকেই বাচ্চার শরীরকে এতটাই মজবুত করে দেয় যে বড় হয় ডায়াবেটিস বা হার্টের রোগের মতো মারণ ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে। এবার নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন আমাদের দেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বে কম বয়সে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনা কেন ঘটছে। তাই মায়েরা, জন্মের পর থেকে ৬ মাস পর্যন্ত আপনার বাচ্ছারা যাতে মায়ের দুধ পান কারার সুযোগ পায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন দয়া করে।

৩. হাড় শক্ত হয়:
ব্রেস্ট ফিডিং করালে যে শুধু বাচ্চারই উপকার হয়, এমন নয় কিন্তু! বাচ্চার সঙ্গে সঙ্গে মায়েদেরও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে থাকে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে দুধ খাওয়ানোকালীন বাচ্চার যেমন হাড় শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে, তেমনি মায়েদের পোস্টমেনোপোজাল অস্টিওপোরোসিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।

৪. হঠাৎ মৃত্যুর আশঙ্কা কমে:
গবেষণা বলছে জন্মের পর পরই যদি নবজাতককে মায়ের দুধ খাওয়া শুরু করা যায়, তাহলে হঠাৎ করে বাচ্চার মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক কমে যায়। প্রসঙ্গত, গত এক দশকে আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই ইনফ্যান্ট ডেথ লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পয়েছে। এক্ষেত্রে অনেকাংশে বাচ্চাকে মায়ের দুধ না খাওয়ানোকেই দায়ি করছেন চিকিৎসকেরা।

৫. ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে না:
ব্রেস্ট ফিড করালে মায়ের যেমন ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা হ্রাস পায়, তেমনি বাচ্চারও বড় হয়ে মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। প্রসঙ্গত, আজকাল যেখানে ওবেসিটির কারণে ইয়ং জেনারেশনের গড় আয়ু চোখে পরার মতো কমছে, সেখানে ব্রেস্ট ফিডিং-এর গুরুত্ব আরও যে বেড়ে গেছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

৬.ক্যান্সার দূরে থাকে:
টানা ছয় মাস ব্রেস্ট ফিডিং করালে একদিকে বাচ্চার যেমন ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে, তেমনি মায়েরও ওভারিয়ান ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। প্রসঙ্গত, সারা বিশ্বেই এখন যেভাবে ওভারিয়ান ক্যান্সারের প্রকোপ চোখে পরার মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে এই পরিস্থিতিতে ব্রেস্ট ফিড করা কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে, তা নিশ্চয় আর বলে দিতে হবে না।

৭. মায়ের উপকার হয়:
একাধিক কেস স্টিড করে দেখা গেছে নিয়মিত ব্রেস্ট ফিড করলে মায়ের ইউটেরাস স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। সেই সঙ্গে ইউটেরাইন ব্লিডিং-ও বন্ধ হয়ে যায়।