বৃটিশ নারীরা কেন ভারতে পাত্র খুঁজতে আসতো

Jan 22, 2018 02:48 pm
পাণিপ্রার্থনাকারীদের ভিড় সামলানো হয়ে পড়ত খুবই কঠিন

হাসান শরীফ


উনিশ শতকে বিশাল ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের মতো। উপমহাদেশ ছিল ব্রিটেনের সাফল্যের সূতিকাগার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরুণ কর্মীরা এখানকার রোগ-বালাই আর নানা দুর্বিপাক থেকে যদি বেঁচে যেত, একেকজন পরিণত হতো ‘ইন্ডিয়ান নেবাব’। ইংল্যান্ডবাসীর জন্য কোম্পানির চাকরি হয়ে পড়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

বিশেষ করে বাংলায় একটি পদ পাওয়া ইংল্যান্ডবাসীর কাছে ছিল স্বর্গের চাবি লাভ। এ কারণে মাসিক ১০ টাকা বেতনের রাইটার (কেরানি) পদটির জন্য যে-কেউ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিতেও প্রস্তুত ছিল। বেতন কম থাকলেও ‘বখশিশ’, ব্যক্তিগত বাণিজ্যসহ নানা সুবিধা ছিল। আর ব্রিটিশ মেয়েদের কাছে ভারতবর্ষ পরিণত হয়েছিল ‘বিয়ের বাজারে’। বিশেষ করে যেসব মেয়ে খুব একটা সুন্দরী ছিল না, অর্থবিত্ত বা বংশমর্যাদায় খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না, তারা দেশে ‘ভালো সম্বন্ধ’ যা ছিল ওই সময়ের সব সম্মানিত তরুণীর প্রধান লক্ষ্য পেত না। ভারতবর্ষে ইউরোপিয়ান নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষদের চেয়ে অনেক কম (১:৪)। ফলে পাণিপ্রার্থনাকারীদের ভিড় সামলানো হয়ে পড়ত খুবই কঠিন।

সুযোগটা লুফে নিয়ে অনেকে ইংল্যান্ডে যে মানের বর পাওয়ার আশা করতে পারত, তার চেয়ে অনেক বেশি ধনী বা সম্ভাবনাময় তরুণকে স্বামী হিসেবে বরণ করত। যেসব তরুণী স্বামী খোঁজার জন্য জাহাজে চেপে ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে পাড়ি দিত তাদের পরিচিতি ছিল ‘ফিশিং ফ্লিট’ বর নামক মাছ শিকারের বহর।


রেওয়াজটি চালু হয়েছিল ১৬৭১ সালে বেশ ছোট আকারে, অব্যাহত থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু পর্যন্ত। ওই সময়ে যারা কোম্পানিতে চাকরি করত, তারা ছুটিছাটা পেত খুবই কম। সাধারণত উপমহাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে যেতে হতো উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে, কয়েক মাস তো বটেই, অনেক সময় বছরও লেগে যেত। ছিল আরো নানা জটিলতা। ফলে কোম্পানির কর্মীরা অবসর গ্রহণের আগে মাত্র একবারই দেশে যাওয়ার কথা ভাবতে পারত। আর এ কারণেই ব্রিটিশ কনে পাওয়া তাদের জন্য ছিল আরো কঠিন।


তবে কাজটি সহজ করে দেয়ার জন্য কোম্পানিই মাঝে মধ্যে ইচ্ছুক নারীদের ভারতবর্ষে নিয়ে আসার বিশেষ ব্যবস্থা করত। জাহাজবোঝাই সম্ভাবনাময় কনেদের দুই ভাগে ভাগ করা হতো : ‘সদ্বংশজাত নারী’ এবং ‘অন্যরা’। কোম্পানি তাদের প্রত্যেককে এক সেট করে পোশাক দিত এবং সঙ্গী খোঁজার সুযোগ দিতে এক বছর পর্যন্ত ভরণপোষণের ব্যবস্থা করত। তাদের হুঁশিয়ার করে দেয়া হতো এই বলে যে, তারা যদি অসদাচরণ করে, তবে তাদের কেবল রুটি আর পানি খাওয়ানো হবে এবং ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হবে। কোম্পানির সবচেয়ে দুর্বিনীত কেউ যদি কোনো নারীকে মেনে নিতে অস্বীকার করত, সে ক্ষেত্রেও তাকে দেশে ফিরতে হতো এবং তাদের পরিচিতি হতো ‘রিটার্নড ইম্পটিস’।


‘বরের বাজার’ হিসেবে ভারতবর্ষের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকায় এমনকি সবচেয়ে সাদামাটা মেয়েও ভালো সঙ্গী পেয়ে যেত, স্বামী খোঁজার জন্য তরুণীদের আগমন বাড়তে থাকে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ ফিশিং ফ্লিটগুলোতে কেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই মেয়ে বোঝাই করে পাঠাত না, ভালো সম্বন্ধের আশায় অনেক পরিবারও (প্রায়ই সংশ্লিষ্ট তরুণীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে) তাদের কন্যাদের ভারতবর্ষে পাঠাত। ইংল্যান্ডে তখন তরুণদের চেয়ে তরুণীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ফলে সৌন্দর্য, অর্থ বা অভিজাত পরিবার ছাড়া ভালো সম্বন্ধ পাওয়ার আশা করা ছিল দুরাশা মাত্র। আর ভারতে পৌঁছামাত্র প্রস্তাবের বন্যায় সে ভেসে যেত।


প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলা ফিশিং ফ্লিট পালতোলা নৌকা থেকে পি অ্যান্ড ও লাইনার্সে পরিণত হয়, যাত্রীদের আরাম-আয়েশেরও কিছু ব্যবস্থা হয়। তবে ১৯১১ সালেও আমাদের মানদণ্ডেও পরিস্থিতি ছিল কঠোর। কাপড় ধোয়ার জন্য লবণমুক্ত পানির সরবরাহ এত কম ছিল যে, যেসব নারী ভ্রমণের পরিকল্পনা করত, তারা তাদের সবচেয়ে ছেঁড়া আন্ডারওয়্যারটিও সাথে রাখত এবং যাত্রায় কোনো একপর্যায়ে ব্যবহার করে সাগরে ফেলে দিত। কল্পনা করে নেয়া যায় নোংরা, ছেঁড়া নাইটড্রেস আর নিকারের সারি ভারত মহাসাগরজুড়ে ভাসতে থাকত।
অস্ট্রেলিয়ার কোনো একটি রাজ্যের প্রধান বিচারপতি ও লে. গভর্নর স্যার জন ম্যাডেনের মেয়ে রুবি ম্যাডেনও এই প্রথার সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন। রুবি বেশ সতর্কতার সাথে লিখেছিলেন, পৌঁছার সময় তার সাথে সামান্যই পোশাক ছিল, কারণ ‘বেশির ভাগ কাপড়ই জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় সাগরে ফেলে দিয়েছিলেন।’


জাহাজে মহাসমারোহপূর্ণ ভোজের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ছোটখাটো একটি খামার, জবাই করার জন্য গরু, ভেড়া, শূকর ও মুরগি রাখার মধ্য-ভিক্টোরিয়ান ঐতিহ্য অনেক আগে বিদায় নিলেও সাত কোর্সের প্রথা রয়ে গিয়েছিল। শুরু হতো বেলা ১১টায় চা বা আইসক্রিম দিয়ে। সার্ভিসও ছিল আড়ম্বরপূর্ণ : স্যুপ পরিবেশনের পর হেড ওয়েটার পুরো এলাকা ঘুরে দেখত, যখন তার মনে হতো সবার শেষ হয়ে গেছে, তখন ঘণ্টা বাজাত। ঘণ্টা শুনে স্টুয়ার্টরা খালি পাত্রগুলোর ওপর হামলে পড়ত, তারপর একজন পরিবেশন করত মাছ।


যারা প্রেমে পড়ত, তাদের জন্য সমুদ্র শান্ত থাকাটা ছিল ভালো সময়। ১৯২০ সালে ভারতবর্ষে আসা ভায়োলেট হ্যানসন লিখেছেন, ‘ডেকে ঘুমানোটা ছিল রোমাঞ্চকর ব্যাপার। গরমের সময় দিনের তাপে ক্যাবিনগুলো ওভেনের মতো উত্তপ্ত হয়ে যেত, আমরা তখন ডেকে ঘুমাতাম।’ তিনি জানান, ‘অবাক তারাগুলোর নিচে শুয়ে থাকাটা ছিল বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। স্বচ্ছ কালো আকাশে মাস্তুল চমৎকারভাবে দুলছে, মৃদুমন্দ বাতাস আলতোভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে।’


ফলে যারা কখনো আগে প্রেমে পড়েনি, তাদের কারো কারো মধ্যেও ভাবের উদয় ঘটত। এমনও দেখা গেছে, বাগদান সেরে ফেলাও অনেকে জাহাজে নতুন করে প্রেমে পড়েছে।


এমন ঘটনাও ঘটেছে, বিয়ে করার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফেরার পথে জাহাজে মনের মানুষকে পাওয়া গেছে।
সাধারণত জাহাজবোঝাই করে আসা মেয়েরা নামমাত্র বর পেয়ে যেত। দ্রুত বিয়ে অনুষ্ঠান সারার জন্য মুম্বাই, কলকাতা ও রেঙ্গুনে অনেক চার্চও তৈরি থাকত। তা ছাড়া কর্তৃপক্ষও চাইত না, অবিবাহিত মেয়েরা ভারতবর্ষে থাকুক। নারীরা যেন কারো স্ত্রী, মা, মেয়ে, বোন, চাচী, খালা ইত্যাদি হয়, সেটা নিশ্চিত করতে চাইত। এতে করে এসব নারীর তদারকির ঝামেলা থেকে তারা রেহাই পেত, সব দায়িত্ব তখন চাপত সংশ্লিষ্ট লোকের ওপর।


তবে সুখস্বপ্নে বিভোর অনেক ফিশিং ফ্লিট মেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই জীবনের কর্কশ দিকটির সাথে পরিচিত হতো। এই দেশ ছিল তাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। গরম, সাপের কামড়, রোগ-বালাই অনেক কিছুর মোকাবেলা তাদের করতে হতো। তবে এগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে পারলে কিন্তু এখানকার অতিথিবৎসল মানুষ, চিরসবুজ প্রকৃতি, নির্মল হিমালয়, বাঘ, হাতির মতো প্রাণী, নানা পাখ-পাখালি তাদের মুগ্ধ করত।


রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে