স্বৈরশাসকরা কেন সুন্দর নগরী গড়ে তোলেন

Dec 31, 2017 02:48 pm
রাজধানীকে গড়ে তুলছেন নিজের মনের মতো করে

 

দিল্লি থেকে রাজধানী সরিয়ে দৌলতাবাদ নিয়েছিলেন সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক। তাই এখনো কোনো আহাম্মকীকে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ বলা হয়। কাজাখস্তানের রাজধানীও সরিয়ে নিয়েছেন সে দেশের একনায়কত্ববাদী কিন্তু সফল প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভ। নতুন রাজধানীকে গড়ে তুলছেন তিনি নিজের মনের মতো করে। তিনি কি সফল হবেন, নাকি আহাম্মকির প্রতিশব্দ হয়ে যাবে তারও নাম? বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে লিখেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


কাজাখস্তানের নতুন রাজধানী এসতানায় চমকপ্রদ ভবনের কোনো অভাব নেই। এতই চমকপ্রদ যে, সেগুলোর আসল নামের চেয়ে লোকমুখে প্রচলিত ডাকনামকেই যথার্থ মনে হয়। যেমন উজ্জ্বল হলদে রঙের অফিস টাওয়ারকে লোকে ডাকে ‘কলা বিল্ডিং’ নামে। এক জায়গায় আছে একগুচ্ছ অ্যাপার্টমেন্ট টাওয়ার। লোকের কাছে ওটার পরিচয় ‘সাত চোঙা’। তেমনিভাবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে বলা হয় ‘সিগারেট লাইটার’। এভাবে অসংখ্য ভবনের অগুনতি ডাকনাম গড়ে উঠেছে। ব্যতিক্রম শুধু বাইতেরেক। এটি হচ্ছে কাজাখস্তানের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এটিকে কোনো ডাকনাম দিতে পারেনি এসতানাবাসী। দেবে কিভাবে, এটি যে দেখতে এ দুনিয়ার কিছুর সাথেই মেলে না!


কাজাখ ভাষায় ‘বাইজেরেক’ শব্দের অর্থ ‘লম্বা পপলার গাছ’। স্তম্ভটির দৈর্ঘ্য ৩১৮ ফুট। বানানো হয়েছে ইস্পাত দিয়ে। তার ওপর সাদা রঙের প্রলেপ। এর চূড়ায় স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া কাঁচের গোলক। স্তম্ভের গোড়ায় উৎকীর্ণ আছে : ‘কাজাখস্তানের পুরান কাহিনীর স্বর্গীয় পাখি সামরুকের প্রতীক হিসেবে এই স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।’ কাজাখ পুরাণ মতে, এই পাখি বিশাল জীবনবৃক্ষের শীর্ষে প্রতি বছর একটি করে সোনার ডিম পাড়ে। ওটিই সূর্য হয়ে সারা বছর আমাদের আলো দেয়, তাপ দেয়।


তো এই স্তম্ভের ডিজাইনার কে? কে আবার, অবশ্যই নূর সুলতান নাজারবায়েভ। এক সময়কার ইস্পাতকর্মী এবং এখন কাজাখস্তানের লৌহমানব নাজারবায়েভ, ১৯৯১ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে কাজাখস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শক্ত হাতে যিনি দেশটি শাসন করে আসছেন।


অষ্টাদশ শতাব্দীতে জার পিটার যেমন বাল্টিক সাগরের উপকূলে এক জলাভূমিতে সেন্ট পিটার্সবার্গ নগরী গড়ে মহাকালের বুকে আপন কীর্তির স্বাক্ষর রচেছিলেন, যে নগরী হয়েছিল রাজতান্ত্রিক রাশিয়ার ক্ষমতার ভরকেন্দ্র, একইভাবে নিজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নাজারবায়েভও নির্বাচন করেছেন একটি জায়গা, যেখানে তিনি একটি নতুন কাজাখস্তানের পতাকা তুলতে চাইছেন।


এ কথা মনে করার কোনোই কারণ নেই যে, আগের রাজধানী আলমাতি খুব ঈষদুষ্ণ আরামদায়ক জায়গা। এ অবস্থায় ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে সরকারিভাবে আকমোলায় রাজধানী সরিয়ে নেয়। নতুন রাজধানীটি মধ্য এশিয়ার এক বৃক্ষহীন নগরে অবস্থিত। প্রচণ্ড শীত ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায় সর্বক্ষণ। আগের রাজধানী থেকে ৬০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই নগরীর নতুন নামকরণ হলো এসতানা। কাজাখ ভাষায় যার অর্থ ‘রাজধানী’। নতুন রাজধানী স্থাপন উদযাপন করতে প্রতি বছর ৬ জুলাই পালন করা হয় ‘এসতানা দিবস।’ সে দিনটি আবার প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভের জন্মদিনও।


কাজাখস্তান তেল ও নানা খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। অর্থের কোনো অভাব নেই তাদের। সুতরাং নতুন রাজধানী গড়ে তুলতে অকাতরে অর্থ ব্যয় হতে থাকল। নগরীটিকে দুই ভাগ করেছে এসিল নদী। ডানে রয়েছে পুরনো অংশ। সাবেক সোভিয়েত আমলে এটি গড়ে তোলা হয়। নাজারবায়েভ নতুন রাজধানী গড়তে চলেছেন নদীর বাম পাশে। সেখানে সুরম্য ভবনরাজি গড়ে তুলতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের। ফল যা দাঁড়াল, তা কারো পছন্দ হলো, কারো বা নয়। কিন্তু তাতে কী, রাজধানী তো! ফলে দেখা গেল, মাত্র এক যুগেই নতুন রাজধানীর লোকসংখ্যা তিন লাখ থেকে সাত লাখের বেশি হয়ে গেছে। নগরীটি যতটা না রাজধানী, তার চেয়ে বেশি করে হয়ে উঠল কাজাখ জাতীয়তাবাদ ও ক্ষমতাকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক।


বিশ্বের অন্য অনেক রাজধানী সম্বন্ধেও নানা প্রশংসাবাক্য আছে। যেমন বরেণ্য লেখক ফিওদর দস্তয়েভস্কি বলেছিলেন সেন্ট পিটার্সবার্গ সম্বন্ধে : ‘ভূমণ্ডলের সবচেয়ে তাত্ত্বিক ও পরিকল্পিত নগরী।’ এটা কোনো তোষামোদবাক্য নয়, বাস্তবেই রাশিয়ান নগরীটি টেকসই ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পেরেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এসতানা কি তেমনটা হতে পারবে?


যারা মনে করে ‘পারবে’, তাদের একজন ইয়ারনার ঝারকেশভ। কেতাদুরস্ত খাকি প্যান্ট ও পোলো শার্ট পরা এই যুবকের সাথে আমার দেখা নুরঝল বুলেভারের (এভিনিউ) এক মধ্য এশীয় রেস্তোরাঁয়। ওয়াশিংটনে যেমন ন্যাশনাল মল, এসতানায় এটিও তাই। ঝারকেশভের সাথে ছিল এক সুন্দরী সিঙ্গাপুরি তরুণী। তার নাম মিশেল। ঝারকেশভ সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে পাবলিক পলিসি বিষয়ে মাস্টার্স করে এসেছে। সেখানেই মিশেলের সাথে তার পরিচয়। ঝারকেশভ নিজের ও বান্ধবীর জন্য অর্ডার দিলো ঘোড়ার মাংসের সসেজ এবং কাজাখস্তানের জাতীয় পানীয় কুমিজের। দুধকে গাঁজিয়ে তৈরি করা হয় কুমিজ। খেলে একটু নেশা হয়। মিশেল কুমিজে দু-এক চুমুক দিয়েই বাকিটা ঠেলে দিলো ঝারকেশভের দিকে। ঝারকেশভ অম্লান বদনে তাতে চুমুক লাগাল।


ঝারকেশভের পিতা ছিলেন সাবেক কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মকর্তা। তারা কাজাখ গোত্রের মানুষ। কাজাখস্তানে এই গোত্রই সংখ্যাগরিষ্ঠ শতকরা ৬০ (দেশটির লোকসংখ্যা এক কোটি ৬০ লাখ)। কাজাখরা ঘোড়া পালনের জন্য বিখ্যাত। সোভিয়েতদের দখলে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী এই গোত্রের মানুষ পশুচারী জীবনযাপন করেছে ইউরোপের সমান এক বিস্তীর্ণ জনশূন্য প্রান্তরে। সোভিয়েত শাসনের অধীনে যাওয়ার পরও ঝারকেশভ পরিবার তাদের মধ্য এশীয় ঐতিহ্য রক্ষায় কঠোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। এসতানার দক্ষিণ-পশ্চিমের এক গ্রামে তারা তাদের গৃহপালিত পশুগুলো রাখে। ঝারকেশভের বাল্যকাল কেটেছে ওই গ্রামেই, ঘোড়ায় চড়ে ভেড়া চরিয়ে, কুমিজ বানিয়ে।


সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের ছয় বছর পর ঝারকেশভ তার মা, বাবা ও ছোট চার ভাইবোনকে নিয়ে নতুন রাজধানীতে চলে আসে। সেখানে তার বাবা প্রথমে একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেন, পরে নিজেই একটি বাথহাউজের (গোসলখানা) মালিক হন। জন্মসূত্রে কাজাখ ভাষাভাষী ঝারকেশভ। ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই আরো দু’টি ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠে সে। একটি হচ্ছে রুশ, যা কি না সোভিয়েত আমলে এবং এখনো কাজাখস্তানের অন্যতম প্রধান ভাষা। এ ছাড়া সে ভালোভাবে শিখে নেয় ইংরেজি। এরই মধ্যে ব্রিটেনে লেখাপড়ার জন্য সরকারি বৃত্তি পেয়ে যায় ঝারকেশভ। সেখানে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্স শেষ করে যায় সিঙ্গাপুর। সেখানে মাস্টার্স করে এখন চাকরির খোঁজে এসতানা এসেছে জারকেশভ। নতুন রাজধানী এসতানাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত এই কাজাখ যুবক। তার ভাষায় এসতানা হচ্ছে কাজাখস্তানের নতুন চেহারা।


আমার সাথে পরিচয়ের কয়েক দিনের মাথায় অর্থনীতিবিদ হিসেবে সরকারি চাকরি পেয়ে যায় ঝারকেশভ। যুক্ত হয় হাজার হাজার কাজাখ তরুণের সাথে, যাদের গড় বয়স ৩২ এবং এসতানা যাদের সুযোগ দিতে হাতছানি দিচ্ছে। ঝারকেশভের মতো অসংখ্য তরুণ, যারা সেই হাতছানিতে সাড়া দিয়ে নতুন রাজধানীতে আসছে, তাদের প্রায় সবাই কাজাখ গোত্রভুক্ত। সর্বত্র তাদের প্রাধান্যই বলে দিচ্ছে, সরকার কাজাখভাষীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে ও দেবে। সরকারের এই নীতিতে রাশান, জার্মান, ইউক্রেনিয়ান ও অন্যান্য গোত্রের লোকজন ক্ষুব্ধ।


কাজাখ ভাষার ওপর জোর দেয়াটা কাজাখস্তান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার একটা অংশমাত্র। অনেকে একে বলছেন কাজাখিকরণ, যা সবচেয়ে বেশি দর্শনীয় এসতানায় এবং প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভ হচ্ছেন এর সবচেয়ে উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক। এটাই স্বাভাবিক। কেননা প্রেসিডেন্ট স্বয়ং কাজাখ গোত্রের মানুষ। আজ থেকে ৭১ বছর আগে তিনি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক গ্রামে এক পশুপালক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন লোহা কারখানায়। এরপর যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের যখন পতন ঘটছিল, তখন তিনি পার্টির একজন সিনিয়র নেতা। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই তিনি আলমাতা থেকে রাজধানী সরিয়ে দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় আকমোলায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন।


প্রেসিডেন্টের এই পরিকল্পনার অর্থ বুঝতে পারেন না অনেকেই। ১৮৩০ সালে জার সম্রাটদের একটি দুর্গ স্থাপনের মধ্য দিয়ে এর পত্তন ঘটে। এরপর একটি রেলজংশন হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে আকমোলা। সোভিয়েত আমলে এর নাম ছিল সেলিনোগ্রাদ। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সময়কালে তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘ভার্জিন ল্যান্ড ইনিশিয়েটিভ’-এর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এ অঞ্চল, যার লক্ষ্য ছিল এলাকাটিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের শস্যভাণ্ডারে পরিণত করা। ১৯৯০-এর দশকে এর দুঃসময় শুরু হয়। এ অঞ্চলের পরিচিতি গড়ে ওঠে এভাবে : শীতে মাইনাস ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ঠাণ্ডা, গ্রীষ্মে ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমণ, প্রবল ঝড়ো হাওয়া এবং সেই হাওয়ার সাথে অতিকর্ষিত জমি থেকে উড়ে আসা ধুলো।


আলমাতি থেকে রাজধানী সরিয়ে পক্ষে অনেক যুক্তি দেখিয়েছেন প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভ। তার অন্যতম হচ্ছে, এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ। দ্বিতীয়ত, তিয়ান শান পর্বতমালার কারণে এ শহর আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে নাজারবায়েভ না বললেও সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক। ব্যাপকভাবে মনে করা হয়, কাজাখস্তানের উত্তরাঞ্চল নিয়ে রাশিয়ার একটা ‘পরিকল্পনা’ আছে এবং নাজারবায়েভ এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই অঞ্চলটি রাশিয়ার সীমান্তঘেঁষে অবস্থিত এবং কাজাখস্তানের রাশান গোত্রের বিরাট অংশের বসবাস এখানে। কাজেই অঞ্চলটির দিকে রাশিয়ার নজর এবং সে ব্যাপারে নাজারবায়েভের ভীতি থাকতেই পারে। তবে এখনো পর্যন্ত লৌহমানব নাজারবায়েভকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কাউকে দেখা যাচ্ছে না, যদিও তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সমালোচনা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য নাজারবায়েভ বিপুলভাবে জনপ্রিয়।
নিজের স্বপ্ননগরী গড়ার ক্ষেত্রে অনেক বিদেশীর সহযোগিতাও পেয়েছেন নাজারবায়েভ, যারা কি না কাজাখস্তানের সাথে ব্যবসায় করতে আগ্রহী। তাদের একজন হচ্ছেন কাতারের আমির। তার অর্থসাহায্যে এসতানায় নির্মিত হচ্ছে বিশাল এক মসজিদ, যেখানে সাত হাজার মুসল্লি একযোগে নামাজে আদায় করতে পারবেন। এ ছাড়া নগরীটি নির্মাণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক প্রতিভাবান মানুষকে ডেকে এনেছেন নাজারবায়েভ। তাদের একজন হচ্ছেন জাপানি স্থপতি কিশো কুরোকাওয়া। এসতানা নগরীর মাস্টার প্ল্যান তারই করা।


নগরীটি কেমন হবে, তা নিয়ে সারাক্ষণ ভাবনায় মগ্ন থাকেন প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভ। এমনকি কোথায় কোন ফুল গাছের চারা লাগানো হবে, তাও বলে দেন তিনি। নগরীর প্রধান স্থপতি সারসেমবেক ঝুনুসভ এ প্রসঙ্গে জানান কয়েক বছর আগের এক ঘটনার কথা। নাজারবায়েভ হঠাৎ আদেশ জারি করেন, এসতানায় একটি বড় পিরামিড বানানো হবে। এ নিয়ে স্থপতিদের মধ্যে উত্তেজনা। তাদের কাছে পিরামিড ‘পবিত্র’ বস্তু, এর প্রতিমূর্তি বানানো ঠিক নয়। জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, সবই তো পবিত্র। আপনারা আরেকটি পিরামিডের মহান নির্মাতা হোন না কেন!


স্থপতি ঝুনুসভ বলেন, সব বিষয়ে সর্বক্ষণ চিন্তা করেন প্রেসিডেন্ট। বড় বড় চিন্তা। যেমন নতুন রাজধানীর নির্মাণকাজ যখন শেষপর্যায়ে, প্রেসিডেন্ট তখন স্থপতিদের নির্দেশ দেন ১৫ হাজার লোক ধারণে সক্ষম একটি বড় তাঁবু বা ইনডোর সিটি বানানো যায় কি না ভেবে দেখতে।


নাজারবায়েভের আকাক্সক্ষা ও অহংবোধের সবচেয়ে বড় নিদর্শনটি হচ্ছে বাইতেরেক, যার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। এর শীর্ষে আছে একটি পর্যবেক্ষণ কক্ষ, আছে একটি বার। বারে পাওয়া যায় ঠাণ্ডা তুর্কি বিয়ার। বাইতেরেকের শীর্ষ দেশটি ৪.৪ পাউন্ড ওজনের একটি স্বর্ণখণ্ড দিয়ে মোড়ানো। এই স্বর্ণখণ্ডের মাঝখানে আছে প্রেসিডেন্টের ডান হাতের ছাপ। দর্শনার্থীরা তাদের মনস্কামনা পূরণের জন্য সেই হাতের ছাপের ওপর হাত রাখে। বিশেষ বিশেষ দিনে সেখানে বাজে জাতীয় সঙ্গীত। কথিত আছে, কাজাখস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা প্রেসিডেন্ট নূর সুলতান নাজারবায়েভ স্বয়ং।


নগরীর আরেক দর্শনীয় স্থান হচ্ছে খান শাতির বা রাজার তাঁবু। ব্রিটিশ স্থপতি নরম্যান ফস্টারের ডিজাইন করা এই শপিং মলটি বাস্তবিকই রাজকীয়। এর ওপরতলায় বানানো হয়েছে কৃত্রিম সমুদ্রসৈকত। এর জন্য বালু আনা হয়েছে মালদ্বীপ থেকে। এক রাতে সেখানে আয়োজন করা হয় বিকিনি পার্টি। ২০ মার্কিন ডলার ফি দিয়ে স্নানের পোশাক পরা অসংখ্য নারী ও পুরুষ ঢুকে পড়ল সেখানে। ভদকা ও লাল মদে চুর হয়ে সংক্ষিপ্ততম পোশাকে রাতভর চলল নাচ।


তবে কোনো স্বৈরাচারী শাসকের আত্মগর্বী প্রকল্প কিংবা একটি শহরের চেয়েও কিছুটা অন্য রকম এসতানা। এ শহর কাছে টানছে উদ্যমী তরুণদের। আশ্রয় দিচ্ছে তাদের। এ রকম একজন, ইয়ারনার ঝারকেশভ, তার কথা আগেই বলা হয়েছে। আরেক জনের কথা বলা যাক। তার নাম দারখান দোসানভ। এসতানার পাঁচ শ’ মাইল দূর থেকে এসেছে সে। ট্রেনের টিকিটের অর্থ জোগাড় করতে তাকে নিজের ডিজিটাল ক্যামেরাটি বিক্রি করতে হয়েছে। এখানে এসে এক মেসে ওঠে সে। এক ইতালিয়ান রেস্তোরাঁয় চাকরিও হয় তার। কিন্তু ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির অজুহাতে আট দিনেই চাকরি হারায় সে। ওই ক’দিনের বেতনও দেয়নি ওরা তাকে। ফলে প্রায় না খেয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। কিন্তু তাতে হতাশ নয় দোসানভ। তার কথা, ভবিষ্যতে এক দিন আমি বড় ধনী হবো। এই জায়গাটি (এসতানা) আমার জন্য খুব পয়মন্ত।


ঝারকেশভ বা দোসানভ একা নয়, তাদের মতো অসংখ্য সৃজনশীল, উদ্যমী ও প্রাণবন্ত যুবক প্রতিদিনই আসছে নতুন রাজধানী এসতানায়। কেউ খুঁজে নিচ্ছে চাকরি, কেউ বা স্বাধীন ব্যবসায় বা অন্য কিছু। যেমন কিরগিজস্তান থেকে আসা এরকিনবায়েভ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় খুলেছিল ন্যাশনাল ব্যালে স্কুল। স্কুলটি কিছুদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু চারজন নাচিয়ে রয়ে গেছে এরকিনবায়েভের সাথে। তারা স্বাধীনভাবে কোনো অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করছে।


এক রাতে তরুণ পেশাজীবীদের একটি দল সভায় বসল। এদের বেশির ভাগই বিদেশে লেখাপড়া করেছে। তাদের সংগঠনের নাম এসতানা এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন। সভার একমাত্র বক্তা আইদিন রহিমবায়েভ (৩৮)। রহিমবায়েভ বক্তৃতায় বললেন, কিভাবে ছোট এক কয়লা ব্যবসায়ী থেকে আজ তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ কনস্ট্রাকশন ফার্মের প্রধান। শ্রোতারা গভীর মনোযোগের সাথে তার কথা শুনল। বক্তৃতা শেষে শ্রোতাদের একজন কোনো ব্যবসার আইডিয়া চাইলে রহিমবায়েভ হাসলেন। বললেন, ‘আইডিয়া কিছুই না। তোমার কোন কাজে দক্ষতা আছে, সেটা নিয়েই ব্যবসায় পরিকল্পনা করে ফেল।’ উপস্থিত তরুণ পেশাজীবীদের বই পড়তে উপদেশ দিলেন রহিমবায়েভ টম পিটার্সের মতো ম্যানেজমেন্ট গুরুদের বই। স্বীকার করলেন, শুরুতে তাদের বই পড়ার সুযোগ হয়নি তার। বললেন, ২৯ বছর বয়সে প্রথম আমি মিলিয়ন ডলার উপার্জন করি, ৩২ বছর বয়সে ১০ মিলিয়ন ডলার। এরপর সিদ্ধান্ত নিই, বই পড়তে শুরু করার এখনই সময়।


এভাবে আশাবাদী উদ্যমী সৃজনশীল মানুষেরা চার দিক থেকে ছুটে আসছে এসতানায়। তবে হতাশাবাদীরও অভাব নেই। যেমন কোনো শনিবার অপরাহ্নে এসতানার এক পার্কে অনুষ্ঠিত এক পিকনিকে যাই আমি। টোস্টমাস্টার ইন্টারন্যাশনালের স্থানীয় সদস্যরা এর আয়োজক। সেখানে এক তরুণ ব্যাংকারের সাথে দেখা। লেখাপড়া করেছেন আমেরিকায়। আমাকে বললেন, এসতানা দেখে অভিভূত হবেন না যেন। পুরো ব্যাপারটাই আসলে একটা স্বপ্ন। এটা টিকবে না। আসলে তেল বেচে আমাদের এত পয়সা হয়েছে, আমরা তার কিছু এসব বাজে কাজে খরচ করছি।


আমার মনে হয়, এই তরুণ ব্যাংকারের তার সাথে পিকনিকে আসা লোকজনই একমত হবেন না। আমি দেখতে পাই, পপলার গাছের নিচে কম্বল বিছিয়ে খেতে বসেছে লোকজন। হঠাৎ হাঁক দিলেন ঝান্না কুনাশেভা (৩৩)। এই নারী শেল অয়েল কোম্পানির লোকাল অফিসে কাজ করেন। বললেন, ‘নিজের কাজটি যাদের পছন্দ, তারা হাত তোলো তো!’ মুহূর্তেই চার দিকে অনেক হাত ওপরে উঠল।
কয়েক ঘণ্টা পর পিকনিক শেষ। সবাই ছুটল যে যার গন্তব্যে। পার্কের পপলার গাছের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তুমুল বাতাস। নতুন রাজধানীর স্কাইলাইন যেন উজ্জ্বল ও রোমাঞ্চকর প্রতিশ্রুতির হাতছানি হয়ে ডাকছে মানুষদের। এ কী কেবলই স্বপ্ন?