উসমানি খিলাফতের উত্থান ও বিস্তৃতি পর্ব

Dec 31, 2017 02:34 pm
আলবেনিয়াকে ইসলামের একটি সুরক্ষিত ঘাঁটি


মাসুদ মজুমদার


পেছন ফিরে দেখা

৫৭০ সালে রাসূল সা:-এর জন্ম। ৬১০ সালে তিনি নবুয়ত পেয়েছেন। ৬২২ সালে হিজরত করে মদিনায় গমন করেন। ৬৩০ সালে মক্কা বিজয়ের আগে পরপর কয়েকটি আক্রমণাত্মক যুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়। কার্যত ৬২২ সালে মদিনা পৌঁছার পরই মসজিদে নববীকেন্দ্রীক একটি সরকারব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়। মদিনা সনদের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক শাসনতান্ত্রিক কাঠামো দাঁড়ায়। বিদায় হজের ভাষণের মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রকাঠামোর মূল নীতিগুলো আরববাসীর কাছে পৌঁছে যায়। ৬৩২ সালে রাসূল সা. ইন্তেকাল করেন। মহানবীর ওফাতের মাধ্যমে অহির মাধ্যমে পরিচালিত ঐশীতান্ত্রিক মদিনা রাষ্ট্র পরিচালনার পরিসমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ মহানবীর মৃত্যুর মাধ্যমে অহিধারায় পথ চলায় বিশ্বনবীর নেতৃত্ব থেকে দুনিয়াবাসী বঞ্চিত হয়। অবশ্য মহানবীর মৃত্যুর আগেই আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীন হিসেবে অর্থাৎ জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে পূর্ণতা দেয়ার কথা প্রিয় নবীকে অহির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়। মহানবীর সরাসরি নেতৃত্বের অবসান ঘটে।


এরপর ৬৩২ থেকে ৬৩৪ সাল পর্যন্ত প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা: দুই বছর মদিনা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। ৬৩৪ থেকে ৬৪৪ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর হযরত ওমর ফারুক রা: রাষ্ট্রীয় খিলাফত পরিচালনা করেন। ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ সাল পর্যন্ত ১২ বছর হযরত উসমান রা: খিলাফত পরিচালনা করেন। ৬৫৬ থেকে ৬৬১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন হযরত আলী রা.। এ চারজন খলিফাকে সঠিক পথে পরিচালিত খলিফা হিসেবে মনে করা হয়। এরপর উমাইয়া শাসন যুগ শুরু হয়। ৬৬১ থেকে ৬৮০ সাল পর্যন্ত হযরত মুয়াবিয়া ১৯ বছর, ৭৪৩ থেকে ৭৪৪ সাল পর্যন্ত আল ওয়ালিদ দুই বছর এবং মারওয়ান ৭৪৪ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত ছয় বছর শাসন পরিচালনা করেন। এই যুগটিকে সাহাবা যুগ ধরা হলেও দামেস্ককেন্দ্রিক উমাইয়া শাসনকে মানোত্তীর্ণ শাসনকালের মধ্যে বিবেচনা করা হয় না, বরং উমাইয়া বংশের শাসনকালকে জোর জবরদস্তির শাসনকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশৃঙ্খলা আর নানা ধরনের চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে একটি অস্থির সময় অতিবাহিত করেছে উমাইয়ারা। একই সাথে মনে করা হয় রাসূল সা:-এর উত্তরাধিকার কুরাইশ এবং হাশিমিদের অন্যায্যভাবে বঞ্চিত করেই উমাইয়ারা দেশ পরিচালনা করেছেন। তাই জনমত ফুঁসে ওঠার প্রেক্ষাপটে উমাইয়া শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই ধারাটি অর্থাৎ উমাইয়ারা আবু সুফিয়ানের ধারা হিসেবেও চিহ্নিত হয়।


আব্বাসীয় বংশের শাসন শুরু হয় ৭৫০ সালে আবুল আব্বাস আবদুল্লাহর মাধ্যমে, শেষ হয় ১৫১৭ সালে। শেষ খলিফা ছিলেন মুসতাসিম বিল্লাহ। এই ধারায় শাসনকার্য ও দেশ পরিচালিত হয় বাগদাদকেন্দ্রিক। অবশ্য ৭৫০ থেকে ৭৬২ সাল পর্যন্ত রাজধানী ছিল কুফায়। এরপর রাকায় রাজধানী ছিল ৭৯৬ থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত। সামারায় রাজধানী ছিল ৮৩৬ থেকে ৮৯২ সাল পর্যন্ত। বাগদাদকেন্দ্রিক রাজধানী ছিল ৭৫০ থেকে ১২৫৮ সাল পর্যন্ত। আব্বাসী বংশের রাজধানী কায়রোকেন্দ্রিক ছিল ১২৬১ থেকে ১৫১৭ সাল নাগাদ। কায়রোকেন্দ্রিক প্রথম খলিফা ছিলেন আবুল কাসিম আহমদ। মুহাম্মাদ মোতাওয়াক্কিল ছিলেন শেষ কায়রোকেন্দ্রিক শাসক।


উল্লেখ, বাগদাদকেন্দ্রিক শাসন পরিচালনা করেছেন মোট ৩৯ জন খলিফা। কায়রোকেন্দ্রিক শাসন পরিচালনা করেছেন ২২ জন খলিফা। কায়রোকেন্দ্রিক শাসন পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্টদের ফাতেমি বংশের সাথে মিলিয়েও অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন।


আব্বাসীয় খলিফাদের সময় ইসলাম অনুসৃতির ব্যাপারে ব্যত্যয়ের অভিযোগ রয়েছে কিন্তু মৌলিক বিচ্যুতির অভিযোগ কম ছিল। তবে খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি প্রতিনিধিত্বশীল না হয়ে উত্তরাধিকার নীতি গুরুত্ব পায়। বায়তুল মাল জনগণের কোষাগারের মর্যাদা হারায়। আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে অনেক খলিফাকে ইতিহাসবিদেরা উচ্চতর মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। তাদের উন্নত শাসননীতি জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ও ইসলামের বিস্তৃতির জন্য প্রশংসা করেছেন। বেশক’জন খলিফাকে ইতিহাস প্রকৃত খলিফার সম্মান দিয়েছে। উমর বিন আবদুল আজিজকে চার খলিফার পর পঞ্চম খলিফা ভাবা হয়। বাগদাদের স্বর্ণযুগের বেশ ক’জন প্রজাহিতৈষী ও নীতিনিষ্ঠ শাসকদের মধ্যে হারুনুর রশিদের নাম উল্লেখ করা হয়। বিশ্বকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করিয়েছেন আব্বাসীয় খলিফারা। এই বংশের খলিফারা সব সময় নবী বংশের মর্যাদা রক্ষায় যতœশীল থেকে ইসলামের প্রাণস্পর্শী ধারায় চলার চেষ্টা করেছেন।


কিছু শাসক ছিলেন বিলাসী এবং কম যোগ্যতাসম্পন্ন। আল মুসতাসিমের শাসনকালে মোঙ্গল তাতার সমরনায়ক হালাকু খান ১২৫৮ সালে বাগদাদ অবরোধ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। বাগদাদ অবরোধ ও ধ্বংসের ফলে আব্বাসীয় সোনালি যুগের অবসান ঘটে।


হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের পর আব্বাসীয় বংশের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। তা ছাড়া বিচ্যুতি-বিলাসিতা, ইসলামের শিক্ষা থেকে ধীরে ধীরে ছিটকে পড়েছিলেন খলিফারা। এর বাইরে খলিফারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতেন না। বায়তুল মালের আমানত সংরক্ষণ করতেন না, বিলাস-বসন প্রাধান্য পেয়েছিল। বংশীয় শাসনের দুর্বল দিক ও সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। সামরিক শক্তির বদলে যশ-খ্যাতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। ফলে তাতার সমরনায়ক হালাকু খানের বাগদাদ লুণ্ঠন ও ধ্বংসের পর মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার মতো হিম্মত শাসকেরা হারিয়ে ফেলেছিলেন। উল্লেখ্য, যে বছর হালাকু বাগদাদ ধ্বংস করলেন, সে বছরই অর্থাৎ ১২৫৮ সালে জন্ম নিয়েছিলেন উসমানী খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা উসমান। বাগদাদ ধ্বংসের পর ক’টা বছর ছিল অস্থিতিশীল। অবশেষে ১২৮৮ সাল থেকে ৩৭ জন ওসমানী খলিফারা প্রায় ৬৩৬ বছর উসমানী খেলাফত পরিচালনা করেছেন। যার পরিসমাপ্তি ঘটেছে ১৯২৪ সালে। ইউরোপ এটাকে অটোমান যুগ হিসেবে চিহ্নিত করে।


সুলতান প্রথম বায়েজিদ

গত পর্বে আমরা খলিফা উসমান, উরখান ও প্রথম মুরাদ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। প্রথম মুরাদের শাহাদাতের পর ১৩৮৯ সালে তার ছেলে প্রথম বায়েজিদ আড্রিয়ানোপলের শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৪০২ সালে বায়েজিদ বন্দী অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তিনি ১৪ বছর শাসন পরিচালনা করেন। বায়েজিদ ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শাসক। যুদ্ধক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ ক্ষিপ্রতা প্রদর্শন ও কৌশলী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি ছিল তার। তাকে বিদ্যুতের চমকের সাথে তুলনা করা হতো বলে তার খ্যাতিময় উপাধি ছিল ইলদ্রিম বা বিদ্যুৎ। কসোভোর যুদ্ধে পরাজিত ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সার্বিয়ার রাজা ল্যাজারাসের উত্তরাধিকারী হিসেবে তার পুত্র স্টিফেন বুলকোভিস সার্বিয়ার রাজা হিসেবে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হন। বায়েজিদ স্বভাবে ছিলেন বদমেজাজি, কতকটা নিষ্ঠুর প্রকৃতিরও। তা ছাড়া সার্ব বংশোদ্ভূত স্ত্রীর প্রভাবে তার নৈতিকতার স্খলন ঘটেছিল। তাই ইউরোপের খ্রিষ্টান বলয়ে তার প্রসার ঘটলেও উসমানী খেলাফত যতটা সংহত হয়েছে, ততটা সুনামও ক্ষুণœ হয়েছে। বায়েজিদ স্টিফেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ভীত হয়ে স্টিফেন শান্তি চুক্তি করে রক্ষা পান। সার্বিয়া উসমানী খেলাফতের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদা পায়। সার্বিয়ার রাজা তার বোন আলিভরা ডিসপিনাকে প্রথম বায়েজিদের সাথে বিয়ে দিয়ে সম্পর্ক উন্নত করতে সচেষ্ট ছিলেন। স্ত্রীর প্রভাবে বায়েজিদ একপেশে হয়ে পড়েন। নৈতিকভাবেও দুর্বলতার শিকার হন। অবশ্য স্টিফেন বিশ্বস্ততার সাথে সন্ধি চুক্তি মেনে চলেছেন।


১৩৯৩ সালে বায়েজিদ তার জ্যেষ্ঠ ছেলেকে বুলগেরিয়া জয়ের মিশনে পাঠান, বায়েজিদপুত্র সুলেমান উত্তর বুলগেরিয়া আক্রমণ করে রাজধানী ত্রিনোডায় বিজয় পতাকা উড়াতে সক্ষম হন। ১৩৯৬ সালে হাঙ্গেরির রাজা সিজি সমান্ডের আহ্বানে পোপ নবম বেনিফাস উসমানী খিলাফতের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা দেন। ফ্রান্সের রাজা পঞ্চম চার্লসের নেতৃত্বে যুবরাজ জন ডি নেভার্সের পরিচালনায় যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সাথে যোগ দেয় ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, লোম্বার্ডি, স্যাভয়, ব্যাভারিয়া, জার্মেনি, ওয়ালাচিয়া, বোহেমিয়া ও অস্ট্রিয়াসহ ধর্মযুদ্ধে শরিক হয়ে অস্ট্রিয়ার বুদাপেষ্টে সমবেত হয়। তারা দানিউব নদীর তীর ধরে অগ্রসর হয়ে বুলগেরিয়ার নিকোপলিশ শহরে শিবির স্থাপন করে। বায়েজিদ সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল হামলার মুখোমুখি হন। পাল্টা আঘাত হানেন বায়েজিদ বাহিনী। তিন ঘণ্টার যুদ্ধে সম্মিলিত খ্রিষ্টান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দশ হাজার খ্রিষ্টান ধর্মযোদ্ধা প্রাণ হারায়। হাঙ্গেরির রাজা সিজি সমান্ড নৌকাযোগে দানিউব নদী অতিক্রম করে স্বদেশের পথে পালিয়ে বাঁচেন। যুবরাজ জন ডি নেভার্স বন্দী হন। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এই নিকোপলিশের যুদ্ধ ছিল খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড। ক্রুসেডজয়ী সালাউদ্দীন আইয়ুবির পর এই ক্রুসেড জয় বায়েজিদের অশেষ কৃতিত্ব হিসেবে দেখা হয়। এর আগে ১০৯৫ সালে পোপ আরবান-২ প্রথম ক্রুসেডের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ক্রুসেড চলেছিল ১০৯৯ সাল পর্যন্ত। ১৩৯৭ সালে গ্রিসের বিশব রানী হেলেনার বিরুদ্ধে বায়েজিদকে গ্রিস আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। বায়েজিদ অগ্রসর হলে রানী এগিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করে।
এরপর প্রথম বায়েজিদ কনসটান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) অবরোধ করেন। এ সময় খবর আসে তাতার বাহিনীর প্রধান তাইমুর খান জর্জিয়া দখল করে এশিয়া মাইনরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। প্রথম বায়েজিদ কনসটান্টিনোপল অবরোধ প্রত্যাহার করে তাইমুরের মোকাবেলায় ১৪০২ সালে আঙ্কারার প্রান্তরে সমবেত হন। উভয়পক্ষের তুমুল যুদ্ধে শেষ ক্রুসেড বিজয়ী প্রথম বায়েজিদ ও তার পুত্র বন্দী হন। বন্দী অবস্থায় ১৪০২ সালে প্রথম বায়েজিদ ইন্তেকাল করেন।

 

সুলতান প্রথম মুহাম্মদ

১৪০২ সালে প্রথম বায়েজিদের ইন্তেকালের পর তার সন্তানরা ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এই অন্তর্কলহ চলে কয়েক বছর। অবশেষে বায়েজিদপুত্র প্রথম মুহাম্মদ আড্রিয়ানোপলের ক্ষমতাসীন হন। জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত ও বিচক্ষণতার কারণে প্রথম মুহাম্মদ রাজনৈতিক সাফল্য পান। শাসন কাজেও দক্ষতার ছাপ রাখেন। তাকে ন্যায়পরায়ণ ও মহানুভব শাসকের মর্যাদা দেয়া হয়। শান্তিপ্রিয় হিসেবে তার সময়কালে যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে তেমন একটা মাতামাতি ছিল না, পূর্বপুরুষদের বিজয় ধরে রাখা এবং সংহতি নিয়ে তিনি বেশি ভেবেছেন। প্রজা হিসেবে খ্রিষ্টানরা তার কাছে আমানত হিসেবে অত্যন্ত সদয় ব্যবহার পেয়েছে। তার এই নীতি ওসমানী খিলাফতের জন্য একটি ইতিবাচক নজির হিসেবে ইতিহাসে উপস্থাপিত হয়েছে। বলতে গেলে সীমানা বৃদ্ধিকে স্থগিত রেখে প্রজা লালন ও সংহতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তিনি। আট বছর শান্তি ও স্থিতির শাসন শেষে ১৪২১ সালে প্রথম মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেন।

 

সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ

১৪২১ সালে প্রথম মুহাম্মদেরই দ্বিতীয়পুত্র দ্বিতীয় মুরাদ মাত্র ১৮ বছর বয়সে আড্রিয়ানোপলের শাসনভার গ্রহণ করেন। মুরাদ ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলিমও দয়ালু প্রকৃতির মানুষ। এ ছাড়া তার উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা দরিদ্র-দুখীর প্রতি ভালোবাসার খ্যাতি ছিল। ইসলামি মূল্যবোধ সংরক্ষণে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান। মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় তার মনোযোগ ছিল বেশি। প্রায় সব ইতিহাসবিদ তাকে ন্যায়পরায়ণ, উন্নত শিষ্টাচারসম্পন্ন ধর্মানুরাগী বলেছেন। ঐতিহাসিক গিবন তার সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তার অভিধানে যুদ্ধ ছিল না, সন্ধি চুক্তি পালনকে তিনি পবিত্র জ্ঞান করতেন। তার রাজ্যে খ্রিষ্টানরা এতটা শান্তিতে বসবাস করেছে যে, গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের খ্রিষ্টানদের অত্যাচারের মুখে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্যান্য উপদলের লোকেরা দ্বিতীয় মুরাদের রাজ্যে নিরাপদে বসবাস করেছে। তার শাসনকালে খ্রিষ্টান অধ্যুষিত সার্বিয়া উসমানী খিলাফতের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদায় ছিল। নতুন রাজা জর্জ ব্রাংকোভিচ বসনিয়া হারজেগোভিনা, পোল্যান্ড, ওয়ালচিয়া, আলবেনিয়া এবং হাঙ্গেরির রাজাদের উসমানী খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইন্ধন জোগাচ্ছিলেন।

বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান সেনাপতি ১৪৪৪ সালে ভার্না প্রান্তরে মুরাদ বাহিনীর সাথে যুদ্ধে জড়ায়। হাঙ্গেরির রাজা ভ্যাডিসলাস ও কার্ডিনাল জুলিয়ান এই যুদ্ধে নিহত হন। সেনাপতি হুনিয়াডি পালিয়ে যান। হুনিয়াডি সার্বিয়া ও বসনিয়া হার্জেগোভিনার খ্রিষ্টানদের জোর করে রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনুসারী বানাতে চাইলে জনগণ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উসমানী খেলাফতের অধীনে স্বধর্ম মতে বেঁচে থাকাকে শ্রেয় ভাবেন। তাই রাজাদের কথা উপেক্ষা করে জনগণ উসমানী খেলাফতের কাছে সমর্পিত জীবন বাছাই করে নেন। ৬৮ বছর বয়সে ১৪৫১ সালে শান্তিবাদী ও ন্যায়ানুগ শাসক হিসেবে খ্যাত দ্বিতীয় মুরাদ ইন্তেকাল করেন। প্রায় ৩০ বছর দ্বিতীয় মুরাদ উসমানী খেলাফতের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করে রেখেছিলেন। ইতিহাস তাকে সুশাসক হিসেবে স্থায়ী আসন নিশ্চিত করেছে।

 

সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ

১৪৫১ সালে দ্বিতীয় মুরাদের সুযোগ্য পুত্র দ্বিতীয় মুহাম্মদ আড্রিয়ানোপলের মসনদে বসেন। তখন তার বয়স ছিল ২১ বছর। দ্বিতীয় মুহাম্মদ ছিলেন পিতার দাসীর গর্ভজাত সন্তান। দ্বিতীয় মুহাম্মদ ছিলেন এক নিষ্ঠাবান মুসলিম। ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তার পৃষ্ঠপোষকতা ছিল ব্যাপক। ‘নেক আমলের জনক’ হিসেবে তার আলাদা খ্যাতি ছিল।
কনসটান্টিনোপল বিজয়ের পর তিনি সেখানে ইয়েনি সারাই নামে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই শহরে তিনি অনেক মসজিদ, ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল স্থাপন করেন। এই কনসটান্টিনোপলই আধুনিক ইস্তাম্বুল।
তার সময় জাকাত, গণিমত এবং জিজিয়া ছিল রাষ্ট্রীয় তহবিলের আয়ের প্রধান উৎস। বিজিত অঞ্চলের রাজস্ব থেকে একটি অংশ ওয়াকফ সম্পত্তিরূপে আলাদা রাখা হতো। এর মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ভার বহন করা হতো। মুসলিম নাগরিকদের কাছ থেকে ফসলের জাকাত আদায় করার নিয়ম ছিল।
দ্বিতীয় মুহাম্মদ বেসামরিক শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একটি পরিষদ গঠন করেছিলেন। উজির, সচিব, কাজী এবং খাজাঞ্চি এই চারজনের ওপর দিওয়ান পরিচালনার দায়িত্ব ছিল। ধর্মীয় বিষয়ে তিনি প্রধান মুফতির ফতোয়ার ওপর নির্ভর করতেন।


দ্বিতীয় মুহাম্মদ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমান চোখে দেখতেন। সবার প্রতি ন্যায়বিচার করতেন। বিচারব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ রাখার জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি খিলাফতকে কয়েকটি প্রদেশে এবং প্রতিটি প্রদেশকে কয়েকটি জিলায় বিভক্ত করেন। সরকারি কর্মচারীদের ট্রেনিংয়ের জন্য তিনি রাজধানীতে একটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করেন। সুলতানের অসীম সাহস ও রণকৌশলে পারদর্শিতা ছিল অসাধারণ যোগ্যতা। তিনি এক লাখ সদস্যবিশিষ্ট একটি সুদক্ষ সেনবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন।


উল্লেখ্য, ৩৩০ সালে রোমান সম্রাট কনসটান্টাইন বসফরাস প্রণালীর উপকূলে প্রাচীন গ্রিক শহর বাইজেনটিয়ামে তার সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী স্থাপন করে এর নাম রাখেন নোভারোমা বা নয়া রোম। পরে তার নামানুসারে এই শহরের নাম হয় কনসটান্টিনোপল।
৩৯৫ সালে রোমান সম্রাট থিউডোসিয়াস তার দুই পুত্রের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেন। তা পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য নামে পরিচিত ছিল। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের নাম ছিল বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য। কনসটান্টিনোপল ছিল এ সাম্রাজ্যের রাজধানী। এটি খ্রিষ্টানদের গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।


দ্বিতীয় মুহাম্মদের সময় গ্রিসের রাজা কনসটান্টাইন কনসটান্টিনোপলের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। দ্বিতীয় মুহাম্মদ তার পূর্বসূরিদের মতো কনসটান্টিনোপল দখলের উদ্যোগ নিচ্ছেন জেনে রাজা কনসটান্টাইন পশ্চিম ইউরোপের খ্রিষ্টান রাজাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। সমঝোতার শর্তে তিনি তখন রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনেক দাবি-দাওয়া মেনে নেন। এতে গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের নেতারা ক্ষুব্ধ হন। গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের প্রধান গ্র্যান্ড ডিউক নোটারাস মনে করতেন রোমান সম্রাটের মুকুট অপেক্ষা উসমানী সুলতানের পাগড়ি তিনি বেশি পছন্দ করেন। এ সব কারণে গ্রিসের রাজা বেশি যোদ্ধা জোগাড় করতে পারেননি।
১৪৫৩ সালে ২৫ মে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ রাজা কনসটান্টাইনের প্রতিরোধ ভেঙে ফেলে কনসটান্টিনোপলে প্রবেশ করেন। যুদ্ধে গ্রিসের রাজা নিহত হন। কনসটান্টিনোপলে ইসলামের পাতাকা উড্ডীন হয়। এই মহা বিজয়ের জন্যই দ্বিতীয় মুহাম্মদ ফাতিহ মুহাম্মদ বা বিজেতা মুহাম্মদ ও ফতেহ মোহাম্মদ নামে পরিচিতি পান।


কনসটান্টিনোপল দখলের পর দ্বিতীয় মুহাম্মদ গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের কর্তৃপক্ষকে একটি সনদ প্রদান করেন। খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি অবাধে প্রতিপালনের অধিকার স্বীকৃত হয়। খ্রিষ্টানদের গির্জা আয়া সুফিয়া সংরক্ষিত হয়। এখনো ইস্তাম্বুলে খ্রিষ্টানদের তোলা প্রাচীর ও গির্জা আয়া সুফিয়া সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান দু’বছর আগে ইস্তাম্বুল বিজয়ের বার্ষিকী পালন করেছেন।
যুদ্ধকালে যেসব খ্রিষ্টান শহর ছেড়ে পালিয়েছিল দ্বিতীয় মুহাম্মদ তাদেরও স্বগৃহে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু খ্রিষ্টান কনসটান্টিনোপল ফিরে আসে। দ্বিতীয় মুহাম্মদ আড্রিয়ানোপল থেকে কনসটান্টিনোপলে উসমানী খিলাফাতর রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। যা এখন ইস্তাম্বুল হিসেবে খ্যাত।
এই সময় বসনিয়া-হারজেগোভিনার শাসক ছিলেন একজন উগ্র রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। নাগরিকদের বেশির ভাগ ছিল বোগোমিল খ্রিষ্টান। এরা ঈসা আ: এবং মরিয়মের পূজা করত না। তাদের উপসনালয়ে কোনো মূর্তি ছিল না। এরা ক্রসকে ধর্মীয় প্রতীক গণ্য করত না। তারা মানতো না যে ঈসা আ: শূলবিদ্ধ হয়েছেন। এরা মদ পান করত না। বোগোমিলদের ধর্মবিশ্বাস রোম থেকে প্রচারিত পোপের ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। তাই রোমান ক্যাথলিক চার্চ তাদের প্রতি রুষ্ট ছিল। বোগোমিলদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়। বহু বোগোমিল নিহত হয়। অনেকে অন্যত্র পালিয়ে যায়।


অচিরেই বসনিয়া হারজেগোভিনার বোগোমিল খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের সদাচরণ ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে পরিচিত হয়। রোমান ক্যাথলিকদের জুলম থেকে বাঁচার জন্য তারা মুসলিমদের সাহায্য প্রার্থনা করে।
১৪৬৩ সালে দ্বিতীয় মুহাম্মদ একদল সৈন্য নিয়ে বসনিয়া হারজেগোভিনা পৌঁছে গণধিকৃত শাসককে যুদ্ধে পরাজিত করেন। ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার বোগোমিল খ্রিষ্টান মুসলিম হয়ে যায়। মাত্র একদিনেই ছত্রিশ হাজার খৃষ্টান মুসলিম হবার নজির রয়েছে।


১৪৬৬ সালে দ্বিতীয় মুহাম্মদ আলবেনিয়ার উদ্দেশে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। আলবেনিয়া উসমানী খিলাফাতের অধীনে আসে। ইসলামের সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হয়ে আলবেনিয়ার অগণিত খ্রিষ্টান ইসলাম গ্রহণ করে আলবেনিয়াকে ইসলামের একটি সুরক্ষিত ঘাঁটিতে পরিণত করে।


১৪৬৭ সালে দ্বিতীয় মুহাম্মদের অন্যতম সেনাপতি কুদুক আহমদ ক্রিমিয়া জয় করেন। ১৪৭৭ সালে সেনাপতি উমার পাশা যুদ্ধক্ষেত্রে ভেনিসের রাজাকে পরাজিত করেন। ১৪৮০ সালে সেনাপতি কুদুক আহমদ ইতালির দ্বার অট্রেন্টো দখল করেন। এইভাবে ইতালির একাংশ উসমানী খিলাফতের অধীনে চলে আসে। দ্বিতীয় মুহাম্মদ সমগ্র ইতালি জয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ১৪৮১ সালে দ্বিতীয় মুহাম্মদ ইন্তিকাল করেন।

 

সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ

১৪৮১ সালে দ্বিতীয় মুহাম্মদের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিতীয় বায়েজিদ ইস্তাম্বুল বা কনসটান্টিনোপলের ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর।
তিনি একত্রিশ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। প্রথম ভাগে তাকে ভাইদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়। শাসক হিসেবে তিনি তেমন কোন যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেননি। তখন মিসরের মামলুক শাসকদের সাথে উসমানী খিলাফাতের সংঘর্ষ একটি দুঃখজনক ঘটনা। ১৪৮৪ সাল থেকে শুরু করে ১৪৯১ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বায়েজিদকে ছয়বার মিসরের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। ১৪৯১ সালে একটি সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হয়। ১৪৯১ সালে দ্বিতীয় বায়েজিদ ভেনিস বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ১৫০৩ সালে ভেনিস তার সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। দ্বিতীয় বায়েজিদ ইরানের শাহ ইসমাইলের সাথেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। শাহ ইসমাইল শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন, তার পৃষ্ঠপোষকতায় এশিয়া মাইনরে শিয়াগণ উসমানী খিলাফাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক তৎপরতার শুরু করে। যা আগে এমন দাম্ভিক অবস্থানে ছিল না।
১৫১১ সালে দ্বিতীয় বায়েজিদ উজিরে আযম আলী পাশার নেতৃত্বে শিয়াদের বিরুদ্ধে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। সেভার্স-এর সন্নিকটে সংঘটিত যুদ্ধে শিয়ারা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে উজিরে আযম আলী পাশা, শিয়া নেতা শাহ কুলীও নিহত হন। ইতিহাসে এ দ্বন্দ্ব সংঘাতকে দুঃখজনক আখ্যায়িত করেছে।
১৫১২ সালে দ্বিতীয় বায়েজিদ জাননিসার এবং অন্যান্য সৈন্যদের চাপের মুখে তার কনিষ্ঠ পুত্র প্রথম সেলিমের পক্ষে ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। দ্বিতীয় বায়েজিদ মিসর ও পারস্যের সংঘাতে জড়িয়ে আত্মঘাতী ভূমিকা পালন ও শিয়া-সুন্নি বিরোধ সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত হয়ে আছেন।

 

সুলতান প্রথম সেলিম

১৫১২ সালে প্রথম সেলিম কনসটান্টিনোপলের ক্ষমতায় বসেন। গৃহবিবাদ দমন করে তাকে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে হয়। প্রথম সেলিম ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নিতে আনন্দ পেতেন। অন্যান্য ধর্মানুসারীদের প্রতিও তিনি উদার ছিলেন। তার শাসনকালে খৃষ্টান এবং ইয়াহূদীরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতো। তিনি খুবই বিদ্যানুরাগী ছিলেন। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি পড়াশুনা করতেন। তার প্রশাসনে বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির সমাবেশ ঘটেছিলো। সাধারণত তিনি দয়ালু ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু অসাধু ব্যক্তিদের প্রতি ছিলেন তিনি খুবই কঠোর। এ লক্ষে ক্ষেত্রবিশেষে তিনি নিষ্ঠুরতার আশ্রয়ও নিয়েছেন। জনগণের সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধির ব্যাপারে তিনি সজাগ ছিলেন। সেনাবাহিনীর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দিকেও তার বিশেষ নজর ছিল।
১৫১৪ সালে প্রথম সেলিম কালদিরান প্রান্তরে পারস্যের শাসক শাহ ইসমাঈলকে পরাজিত করেন। আহত অবস্থায় শাহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তার স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যবৃন্দ বন্দী হন। প্রথম সেলিম ইরানের তৎকালীন রাজধানী তাব্রিজে প্রবেশ করেন। তিনি ইরানের দিয়ারবেকির এবং কুর্দিস্তান উসমানী খিলাফাতের অন্তর্ভুক্ত করে রাজধানী ফিরে আসেন। ১৫১৬ সালে প্রথম সেলিম মামলুক শাসক কানসোহ আলঘোরীর কাছ থেকে সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং আরবের বৃহত্তর অংশ দখল করেন। ১৫১৭ সালে প্রথম সেলিম মিসরের নতুন শাসক তুমান বে-কে কায়রোর নিকটবর্তী রিদানিয়া রণাঙ্গনে পরাজিত করে মিসরকে উসমানী খিলাফাতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
বাগদাদকেন্দ্রিক বিশাল আব্বাসী খিলাফত তাতারদের আক্রমণে তছনছ হয়ে গিয়েছিলো। ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতন ঘটে তাতার সমর নায়ক হালাকু খানের হাতে। আব্বাসিয় বংশের জীবিত সদস্যগণ পালিয়ে মিসরে গিয়ে পৌঁছে। মিসরে তখন মামলুকদের শাসন চলছিল।
খলিফা পদবি তখন মুসলিম জাহানের আত্মিক ঐক্যের একটি প্রতীকী পদবি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। প্রথম সেলিম যখন মিসর জয় করেন তখন খলিফা পদবিধারী আহমদ আলমুতাওয়াক্কিল কায়রোতেই অবস্থান করছিলেন। তিনি ছিলেন মামলুকদের হাতের পুতুল মাত্র। প্রথম সেলিম তাঁকে বন্দী করে ইস্তাম্বুল নিয়ে আসেন। আহমদ আলমুতাওয়াক্কিলকে খলিফা পদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। প্রথম সেলিম খলিফা পদবী গ্রহণ করেন। তখন থেকে উসমানী শাসকগণ একই সময় ‘সুলতান’ ও ‘খলিফা’ পদে অধিষ্ঠিত হতে থাকেন। ১৫২০ সালে সুলতান ও খলিফা প্রথম সেলিম ইন্তিকাল করেন।


সুলতান ও খলিফা প্রথম সুলাইমান

১৫২০ সালে প্রথম সেলিমের একমাত্র পুত্র ইতিহাসখ্যাত প্রথম সুলাইমান কনসটান্টিনোপলের মসনদে বসেন। তখন তার বয়স ছিল ২৬ বছর। যুবরাজ থাকাকালেই প্রথম সুলাইমান অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তখনই তার সততা ও যোগ্যতার কথা সর্বত্র আলোচিত হতো। তিনি খলিফা হওয়ার পর সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রথম সুলাইমান ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। দৈনন্দিন জীবনে তিনি ইসলামের অনুশাসনগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। সকল মুসলিম নাগরিক যাতে নিয়মিত নামাজ আদায় এবং রোজা পালন করে সেই দিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। নামাজ রোজা পালনে শৈথিল্যের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। প্রথম সুলাইমান আল কুরআনের আটটি খণ্ড নিজের হাতে কপি করে সুলাইমানিয়া মসজিদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তিনি খানায়ে কা’বারও সংস্কার সাধন করেন। সুলাইমান অন্যান্য ধর্মানুসারীদের প্রতিও উদার মনোভাব পোষণ করতেন। তার শাসনকালে ধর্মীয় কোন্দলের কারণে বিপদাপন্ন হয়ে খৃষ্টান দেশগুলো থেকে বহু প্রোটেষ্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক খৃস্টান তাঁর পরিচালিত রাষ্ট্রে এসে নিরাপদে বসবাস করতে থাকে। ইতিহাসবিদ লর্ড ক্রেজির ভাষায়, ‘খৃষ্টান জগতে রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেষ্ট্যান্টদের মধ্যে অত্যাচার-অবিচারের যুগে সমসাময়িক অন্যকোন নরপতি সুলাইমানের ন্যায় প্রশংসা অর্জন করতে পারেননি।’ সাহসিকতা, মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং বদান্যতার জন্য তিনি প্রসংশিত ছিলেন নাগরিকদের করভাব লাঘব করেও তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। আইনের সংস্কারক ও প্রণেতা হিসেবে তাঁকে কানুনিও বলা হতো।
সুলাইমানিয়া মসজিদ তাঁর অমর কীর্তি। রাষ্ট্রের সর্বত্র তিনি বহু মসজিদ, ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গোসলখানা ও সেতু নির্মাণ করেন।
দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করে সৎ ও যোগ্য লোক নিয়োগ করার ক্ষেত্রে তার বিশেষ সুনাম ছিল। ন্যায় বিচারের স্বার্থে তিনি আপন স্বজনদেরকেও পদ থেকে সরিয়ে দেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি সমগ্র খিলাফতকে ২১টি ওলায়াত বা প্রদেশ এবং ২৫০টি সানজাকে বা জিলায় বিভক্ত করেন। প্রত্যেকটি সানজাক আবার কয়েকটি কাদাসে বিভক্ত ছিল। প্রদেশের শাসনকর্তাকে ওয়ালী বলা হতো। সানজাকের শাসনকর্তা ছিলেন পাশা। প্রত্যেকটি কাদাসে ছিলেন একজন কাযী। তবে প্রথম সুলাইমান আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন পছন্দ করতেন। তার ওপর অন্যতমা স্ত্রী রোক্সেলানার পরিবর্তিত নাম হুররম এর বিশেষ প্রভাব ছিল। এটাই ছিলো সুলতানের ইতিহাস চিহ্নিত দুর্বল দিক।
তার সমসাময়িক প্রখ্যাত শাসক ছিলেন জার্মেনীয় পঞ্চম চার্লস, ফ্রান্সের প্রথম ফ্রান্সিস, ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথ, রাশিয়ার জার আইভানোভিচ, পোল্যান্ডের সিজিসমান্ড, ইরানের শাহ ইসমাঈল এবং ভারতের মোগল সম্রাট আকবর।


প্রথম দিকে উসমানী শাসকগণ নিজেদেরকে ইসলামী আইনকানুনের প্রতিভূ মনে করতেন। ধর্মীয় আইনবিদগণ কাযী ও মুফতী নামে দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে বিভাগ দুইটিকে প্রধান মুফতীর অধীনে আনা হয়। প্রধান মুফতী শাইখুল ইসলাম নামে পরিচিত হতেন। ১৬ শতকের মধ্যভাগ থেকে শাইখুল ইসলামের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁর পদমর্যাদা প্রায় উযীরে আযমের পদমর্যাদার সমকক্ষ ছিলো। কোন আইন ধর্মীয় বিধানসম্মত কি না সেই সম্বন্ধে অভিমত দেওয়াই ছিল শাইখুল ইসলামের প্রধান কাজ। সকল দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর দফতরের অধীন ছিল।
হাংগেরীর রাজা দ্বিতীয় লুই খলিফার দূতকে হত্যা করেন। ১৫২১ সালে প্রথম সুলাইমান সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে হাংগেরীর তখনকার রাজধানী বেলগ্রেড দখল করে নেন।


১৫২২ সালে প্রথম সুলাইমান রুডস দ্বীপ জয় করেন। ১৫২৬ সালে হাংগেরীর রাজা দ্বিতীয় লুই শক্তি সঞ্চয় করে আবার মুসলিমদের ওপর অত্যাচার শুরু করেন। প্রথম সুলাইমান উযীরে আযম ইবরাহীম পাশার সেনাপতিত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। মোহাক্স প্রান্তরে উভয় বাহিনীর মুকাবিলা হয়। যুদ্ধে দ্বিতীয় লুই পরাজিত ও নিহত হন। হাংগেরীর রাজধানী বুদাপেষ্ট মুসলিমদের দখলে চলে আসে। ১৫৫৩ সালে প্রথম সুলাইমান ইরানের হাত থেকে ইরাক দখল করে নেন। ১৫৫৬ সালে তিনি বসরা জয় করেন।
তিনি প্রধান নৌ সেনাপতি খাইরুদ্দিন বারবারোসা এবং দ্রাগুত পাশা, উলুজ আলী, পিরি পাশা এবং পিয়ালী পাশা নামক কয়েকজন নৌ-সেনাপতির সাহায্যে একটি দক্ষ নৌ-বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এই নৌ-বাহিনী ভূমধ্য সাগর, লোহিত সাগর, কৃষ্ণ সাগর ও আরব সাগরে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কোন কার্পন্য করেনি।
১৫৬৬ সালে হাংগেরীর রাজা দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলান বিদ্রোহী হয়ে ওঠলে প্রথম সুলাইমান অভিযানে বের হন। পথিমধ্যে তিনি ক্রোশিয়া দখল করেন। তার পর তিনি সিগেত দূর্গ জয় করেন। সিগেত দূর্গের পতনের পর সেই রাতেই প্রথম সুলাইমান আকস্মিকভাবে ইন্তিকাল করেন। ইতিহাস সুলাইমানকে মহান সুলতান ও ম্যাগনিফিসেন্ট হিসেবে তুলে ধরেছে। তার নামে কোন কোন ইতিহাসবিদ ‘গ্রেট’ শব্দটিও ব্যবহার করেছেন। বাস্তবে সীমাবদ্ধতা, দোষ-ত্রুটি নিয়েও তিনি ছিলেন স্বর্ণযুগের কিংবদন্তিতুল্য শাসক।