কেন চিকিৎসার জন্য মানুষ ভেলোর যায়

Dec 28, 2017 04:17 pm
মাদ্রাজ শহর ছেড়ে বেরোতেই ন-টা বেজে গেল


বুলবুল সরওয়ার

 

ভেলোর-সেবালয়
বাসে উঠে চমকে গেলাম। যাত্রীদের মধ্যে দৃশ্যমান অনেক রোগী; বাঙালিও কম না। দুই কামরার বাস আগে দেখিনি। কন্ডাক্টর জানাল, ভেলোর পৌঁছাতে লাগবে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা।
মাদ্রাজ শহর ছেড়ে বেরোতেই ন-টা বেজে গেল। এলআইসি বিল্ডিংয়ের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ানো সিনেমা হলের সামনে রজনীকান্তের সুবিশাল পোস্টার। তার পেছনেই আন্না ছোলাই বাস স্ট্যান্ড। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে সিট পেয়েছি দ্বিতীয় কামরার দ্বিতীয় সারির ডান দিকে। আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম কারণ, বাম দিকে কড়া রোদ থাকবে। মাদ্রাজ এমনিতেই সেদ্ধ হওয়ার জায়গা; সেখানে ভাজা হওয়ার কষ্ট থেকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।


পাশের সিটে বসেছেন সিএমসির সিনিয়র স্টাফ নার্স এলিজাবেথ। মাইনোরিটি ক্রিশ্চিয়ান। বয়স তিরিশের মতো। দু-বাচ্চার মা। এক বাচ্চার জন্ম দুবাইতে।
দুবাইতে কেন?
ওখানে দু-বছরের ডেপুটেশনে গিয়েছিলাম, ডক্টর।
বাহ্। তো আরো বেশি থাকলেন না কেন?
কী দরকার, ডক্টর? আমার জীবনে যা কিছু চাওয়া পাওয়া সবই তো হয়েছে।
কী রকম?


ঘরে ফ্রিজ আছে, রঙিন টিভি আছে, ওয়াশিং মেশিন আর গ্যাস স্টোভ আছে। গাড়িও কিনতে পারতাম, কিন্তু আমার হাজবেন্ড বলল : এইটুকু শহরে গাড়ির কী দরকার? তাই টাকাটা ব্যাংকে রেখেছি। লাভ যা জমবেমেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে।
একা গিয়েছিলেন?
না, আটজনের টিম।
সবাই নার্স?
হুম।


তারা সবাই-ই কি আপনার মতো চিন্তা করে সিস্টার?
কেন করবে না, বলুন? আমরা তো সবাই অনাথ। এই মিশনারিরা আমাদের লালন করেছে, শিক্ষা দিয়েছে, নার্স বানিয়েছে এবং চাকরিও দিয়েছে। এখন অকৃতজ্ঞ হওয়া চলে?
আমি মুগ্ধ হয়ে যাই এলিজাবেথের কথায়। সিএমসি বা ক্রিস্টিয়ান মেডিক্যাল কলেজ-ভেলোর এই ত্যাগের লক্ষ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠিত।
এলিজাবেথ জানায় : একজন একজন ডাক্তার একজন নার্স, একজন রোগী নিয়ে ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন এক মার্কিন তরুণী ড. আইডা স্কুডার।
তিনিও মিশনারি?
হ্যাঁ। আমেরিকান রিফর্ম চার্চের সদস্য তিনি ও তার পরিবার। তার বাবাও ডাক্তার ছিলেন।
এদের পরিবারের সবাই কি মিশনারি?
হ্যাঁ, স্কুডার পরিবার ভারতবাসীকে প্রায় তিন শ’ বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। এটাই তাদের ব্রত।
কী বললেন? তি-ন-শো বছর?
হ্যাঁ, ডকটর। প্রথম স্কুডার রেভারেন্ড ডা. জন ১৮৩৬-এ মাদ্রাজ আসেন শ্রীলঙ্কা হয়ে। তখন কলেরা, হলুদ-জ্বর এবং প্লেগ ছিল দক্ষিণ ভারতের বড় বিপদ। ড. জন এসব দক্ষ হাতে মোকাবেলা করেন।
পরে, তার ছেলে আমেরিকা থেকে ডাক্তারি ডিগ্রি নিয়ে ১৮৪৩ এ মাদুরাই এসে কাজ শুরু করেন। এরপর ডা. সিলাস ডাওলার কাজ করেন রানিপেটে। তাদের পারিবারিক ধারাবাহিকতায় রানিপেট হাসপাতালের দায়িত্ব পান রেভারেন্ড ডা. জন স্কুডার ডা. আইডার বাবা।


সোবহানাল্লাহ। আমি সত্যি সত্যি চোখের পানি মুছি দেখে এলিজাবেথ হেসে ওঠে। আপনিও কি মিশনারি, স্যার?
না না, সিস্টার এলিজাবেথ, আমি একজন মুসলিম, বিদেশী; তবে লেখাপড়া করেছি মিশনারি স্কুলে।
থ্যাংক গড। এলিজাবেথ ক্রুশ প্রণাম করে।
আমি কি ডা. আইডা স্কুডার সম্পর্কে আরো জানতে পারি, সিস্টার?
পারেন, তবে আমি খুব বেশি জানি না। ইতিহাস মনে রাখা খুব কঠিন, স্যার।
তা ঠিক। তবু যতটুকু মনে পড়ে বলুন?
ভারতে জন্মগ্রহণ করার কারণে মিস আইডা শৈশব থেকেই কলেরা, প্লেগ এবং কুষ্ঠর প্রাদুর্ভাব দেখে অভ্যস্ত। পারিবারিকভাবে তিনিও স্কুডারদের সেবামূলক রক্তের উত্তরাধিকারী। তাই তিনি আমেরিকায় যান পড়তে কিন্তু তার মন পড়ে থাকে ভারতের মাটিতে। ১৮৯৯ সালে তিনি কার্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম-ডি করেন এবং মায়ের অসুস্থতার কারণে ভারতে ফিরে আসেন। তখন ম্যানহাটনের একজন ব্যাংকারের মাত্র ১০ হাজার ডলার অনুদানকে শিরোধার্য করে ভেলোরে এক বেডের একটি প্রসূতিসেবা ক্লিনিক খোলেন। তার মূল ভাবনা ছিল নারী, বিশেষত গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং নিরাপদ প্রসব।
একা তিনি এ কাজ কিভাবে করলেন, মিস্টার?
একা তো করেননি, বাবা-মা ছিল, এবং ছিল উপকার পাওয়া জনগণ। ধীরে ধীরে তিনি মহিলাদের জন্য মেডিক্যাল স্কুল ও নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট খোলেন, যা আজকের সিএমসি।
আশ্চর্য!


আরো একটা চমৎকার ব্যাপার আছে, ডক্টর।
কী সেটা?
মায়ের অসুস্থতার সময় যখন তিনি ভারতে ফিরে এসেছিলেন এক রাতে এক তামিল এসে অনুরোধ জানাল তার স্ত্রীর প্রসবে সাহায্যে করতে। কিন্তু ড. স্কুডার মেয়েকে একা যেতে দিলেন না। এরপর আরো দুই লোক এলো বাচ্চা প্রসব করাতে; তাও বাবা তাকে যেতে দিলেন না।
সেই রাতেই?
হ্যাঁ।
কেন দিলেন না? ডা. স্কুডার নিজেও তো ডাক্তার ছিলেন; হয় মেয়ে, না হয় তিনি নিজে যেতেন।
নিজে তিনি ছিলেন অসুস্থ। আর মহিলা ডাক্তার ছাড়া স্থানীয়রা প্রসবের কথা ভাবতেও পারতেন না। অন্য দিকে তখনকার ভেলোর পাড়াগাঁ মাত্র। বিজলি বাতি নেই, ভালো বাহন নেই। নিরাপত্তারও ব্যাপার ছিল।
তারপর?
সেই রাতে তিনজন মা-ই মারা গেল। ঘটনাটা ডা. আইডাকে মানসিকভাবে বিপন্ন করে তোলে। বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ১৮৯৫-এ তিনি আবার আমেরিকা ফিরে যান এবং পেনসিলভানিয়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রি নিয়ে ভেলোরে ফিরে আসেন।
দারুণ মানুষ তো!
হ্যাঁ, মিশনারিরা এ রকমই হয়। শুধু মায়েদের জন্য তিনি প্রথম ৪০ শয্যার হাসপাতাল বানান। রাস্তার পাশের ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ধাই বসান এবং প্রসবকালীন সেবাকে ‘অত্যাবশ্যক’ প্রচার করে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দেন।


বাবা রে, এত সব কিছু করলেন কিভাবে?
তিনি ছিলেন জ্যোতির্ময় ‘ঈশ্বরের আলো’। ১৯০৯-এ তিনি নারীদের জন্য নার্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এরপর নার্সিং স্কুল। পরে সেটাই ১৯৪২-এ মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তরিত হয় মেয়েদের জন্য। স্বাধীনতার পর থেকে ছেলেরাও ভর্তি হয়। ১৯৫০ থেকে শুরু হয় এম-ডি, এম-এস। ১৯৬৯ থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট নার্সিং।
নিশ্চয়ই তিনি এখন বেঁচে নেই?
না, অবশ্যই না। তার জন্ম ১৮৭০-এ এবং মৃত্যু ১৯৬০-এ।
কোথায়?
কোদাই ক্যানেলে।
সেই পাহাড়ের ওপরকার পর্যটন নিবাসে?
হ্যাঁ।


গল্পের মধ্যেই আমাদের বাস চা-বিরতিতে থামল। আমি সিস্টার এলিজাবেথকে নিয়ে নিচে নামলাম। দুটো স্টিলের বাটিতে কফি পরিবেশিত হলো একটি বাটি বড়, মিনি ডেকচির মতো, তার ভেতরে ছোট একটি গ্লাস। দুটোই অ্যালুমিনিয়ামের। পুরো দক্ষিণে এরই চল। সতর্ক না থাকলে প্রথমেই ঠোঁট পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
দুটো কেক আর দুটো কলার সাথে কফি নিলাম আমরা। কলাকে এরা বলে কেলা। বেঞ্চে বসে এলিজাবেথ আমাকে দেখালো। মন্দিরের চূড়া মনে হলো : পিরামিড শেপের ওপরটা ভূমি সমান্তরাল করে কেটে মন্দির গড়া হয়েছে। এটাই দক্ষিণী মন্দিরের স্টাইল।
জায়গাটার নাম কী, সিস্টার?
একটা কৌতুক করে নিজের শাড়ির পাড় দেখালেন সিস্টার এলিজাবেথ।
আমি আশ্চর্য হয়ে বলি : মানে?
কাঞ্চিপুরম, যা থেকে এই শাড়ির নাম কাঞ্জিভরম।
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। শুধু জানতাম : কাঞ্জিভরম ইন্ডিয়ান সিল্ক শাড়ি। কিন্তু তা যেকোনো জায়গার নাম একেবারেই ধারণা ছিল না।


মার্কান্দা ঋষি ছিলেন দেবালয়ের তাঁতি এলিজাবেথ আমার অবাক হওয়া দূর করে এত নিপুণ ছিল তার বুনন যে, পদ্মপাপড়ি থেকে সুতো বের করে তিনি অপ্সরা ও দেবীদের পোশাক বুনতেন। তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব শীব তাকে আশীর্বাদ করেন যে মার্কান্দা পূজিত হবেন দুনিয়ায়। সেই মতো তার নামে কয়েক জায়গায় মন্দির গড়ে ওঠে। উত্তর-কাশি, হরিয়ানা এবং চামর্শী।
কোথায় এটা, সিস্টার?
মহারাষ্ট্রে ওয়েন গঙ্গা নদীর তীরে।
সেটা দক্ষিণে এলো কিভাবে?


অতশত জানি না, ডক্টর। তবে সিল্ক জিনিসটাই প্রকৃতির এক বিস্ময় তো; তাই হিন্দু ধর্মের সাথে তার একটা সংযোগ থাকতেই হবে। জানেনই তো হিন্দু ধর্মটা প্রাকৃতিক সত্যকে ধর্মীয় আচারের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
হতেও পারে। হয়তো ঋষি মার্কান্দার শিষ্যরা দক্ষিণ ভারতে নিয়ে এসেছিল তার শিল্পবিদ্যা। তাই না?
তা-ই হবে। কারণ, কাঞ্জিভরম বোনা হয় মালবেরি সিল্কের সাথে গুজরাটি জরি মিশিয়ে।
কাঞ্জিভরম চেনার উপায় কী, দিদি?
ঠিক জানি না, তবে জমিন ও আঁচল ভিন্ন হবে এবং পাড় হবে কন্ট্রাস্ট কাঞ্জিভরম সম্পর্কে এটুকুই আমার জ্ঞান, ডক্টর।
আমি আস্তে করে বলি : যতটুকু চিনি কাঞ্জিভরমের পাড়গুলো বেশ অদ্ভুত হয়।
হ্যাঁ, কারণ ওগুলোর মোটিফ নেয়া হয় দক্ষিণী-মন্দিরের ডিজাইন থেকে। আঁকাবাঁকা, হাতি অথবা গাছপালার মিশ্রণ। জানেনই তো, গণেশ হচ্ছে দক্ষিণ ভারতের দুর্গা।
বাহ্, ভালো বলেছেন!


বিরতির সময় শেষ। আমরা আবার বাসে উঠি। ভারতের নানা প্রদেশে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। প্রত্যেক প্রদেশের গরুর শিং আমার কাছে আলাদা মনে হয়। তামিল এলাকার গরুর জোড়া শিং খাড়া; প্রায় সমান্তরাল। দেখে সম্বর হরিণ-হরিণ মনে হয়।
উৎসুক চোখে আমি বাইরে তাকাই। এখানকার তালগাছগুলোও বিচিত্র। চুড়োর পাতাগুলো খাড়া খাড়া। নিচের দিকে ঝুলে থাকে না একটাও। দেখে মনে হয় নাচের মেয়েরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ঝঙ্কারের অপেক্ষায়। আমার মনে পড়ে সঞ্জীব চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের পালামৌ-এর বর্ণনা।
হঠাৎ খেয়াল হলো বাঙালি লেখকেরা দক্ষিণ ভারত নিয়ে তেমন সাহিত্যচর্চা করেননি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত প্রেমগাথা ‘শেষের কবিতা’ লিখেছেন ব্যাঙ্গালুরু বসে, অথচ দক্ষিণের ছাপ তাতে একেবারেই নেই। এমনকি কবিগুরুর প্রথম প্রেমও হয়েছিল মাদ্রাজে অথচ তার কবিতা বা গল্পে এর কোনো ছায়াই নেই।
বাইরেটা দেখছেন, ডক্টর? প্রচণ্ড রুক্ষ, তাই না?


কিন্তু আমি প্রকৃতির চেয়ে প্রাকৃত-কন্যাদের বেশি দেখছিলাম। প্রায় সব মেয়েই শাড়ি পরা; এবং তাদের প্রত্যেকেরই মাথায় গোঁজা ফুলের মালা। আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য! শ্যামল কোমল মেয়েগুলো শাড়ি পরে উল্টোভাবে পেঁচিয়ে। আঁচল টানে উল্টা। আর সাদা ফুলের প্রতি এদের সীমাহীন প্রীতি উত্তর ভারত থেকে পুরোপুরিই আলাদা। নারীসুলভ কমনীয়তার অনুগ্র-¯িœগ্ধ রূপটি যেন দক্ষিণের পথে পথে ঢেউ খেলে বেড়ায়।


রাস্তা খুব চওড়া নয়, কিন্তু খানাখন্দ নেই। আর নেই ট্রাকের অত্যাচার। ট্রাক আছে, বিশাল মালবাহী লরিও আছে কিন্তু নেই উন্মাদ প্রতিযোগিতা। দুপুরের পরপরই বাস ভেলোরে ঢুকল। আমি এলিজাবেথের পিছু পিছু নেমে দাঁড়ালাম সিএমসির বিশাল গেটে।
আপনি কোথায় যাবেন, ডক্টর?
আমি এসেছি ডা. পি এস জয়রাজের সাথে দেখা করতে।
কার্ডিয়াক সার্জন?
হ্যাঁ।
তিনি তো আমারই বস।
কিভাবে?
আমি তো কার্ডিও থোরাসিক ওয়ার্ডেই প্লেস্ড।
বাহ। তাহলে তো ভালোই হলো। কিভাবে তার সাথে দেখা করা যাবে, সিস্টার?
কী কারণে দেখা করবেন?
আমি তার আন্ডারে কাজ শিখতে চাই।
সত্যি?
হ্যাঁ। তিনি রাজিও হয়েছেন। এই যে তার চিঠি আমার কাছে। আমি কলকাতা থেকে ফোন করেছিলাম। তিনি সরাসরি আসতে বলেছেন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট শিডিউল দেননি?
না। বলেছেন : আসুন, সামনাসামনি কথা হবে।
আপনাকে কী নামে চেনেন?
সরওয়ার।
ওকে। আমি খোঁজ নেবো। কিন্তু আপনাকে জানাবো কিভাবে?
আমিই যাবো আপনার কাছে। কাল কখন ফ্রি থাকবেন?
ফ্রি থাকার সুযোগ নেই। তবে সাড়ে ১১টায় টি-টাইম, দোতলার কলাপসিবল গেটে আসলে দেখা হতে পারে।
ওকে সিস্টার, থ্যাংকিউ ভেরিমাচ।


***
ব্যাগ নিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা দিতেই বেশ ক’জন কলকাতার দালাল আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করল।
স্যার, আমার সাথে চলুন। ভালো রুম। কিচেন আছে। ভাতও মিলবে।
আমি নিয়ে যাই, দাদা। বাংলাদেশী তো? আসুন আসুন, ওখানে আরো দু-ঘর বাংলাদেশী আছেন।
বাধ্য হয়ে ঢুকে পড়লাম এক আইসক্রিম শপে। অর্ডার দিয়ে তামিল দোকানদারকে নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম : স্যার, কোথায় উঠলে ভালো হবে?
দক্ষিণে ‘স্যার’ সম্বোধন খুবই কমন। ভদ্রলোক খুশি হয়ে বললেন : গো টু সোলাই লজ। জাস্ট বিহাইন্ড।
তিনি আমাকে কাগজে এঁকে দেখালেনকোথায় সেটা।
তবু আমি বললাম : একটা রিকশা নেই?
তিনি হেসে সাহায্য করলেন।


মাত্র দু’ শো গজ দূরে এসে থামল রিকশা। আমি রিসেপশনে ঢুকে পাসপোর্ট দিয়ে বললাম : আমি একজন ডাক্তার, স্যার। একটু ভালো রুম দেবেন; হাই কমোড প্রেফারেবল।
রুম পেলাম দোতলায়। বারান্দাসহ। খুশি মনে গোসল করতে ঢুকলাম। চন্দন সাবানের গন্ধে বাথরুম ম-ম করছে। মাদ্রাজেই টের পেয়েছিলাম দক্ষিণীরা স্বভাবভালো মানুষ। ভেলোরে এসেও তার প্রমাণ পেলাম।
দুপুরের খাবার এবং চা খেয়ে গেলাম সিএমসি দেখতে। প্রাচীন তিনতলা বিল্ডিং। সামনেরটা গির্জার মতো। প্রথমেই ওপিডি ব্লক। পাশে রিসিপশন। কর্মচারীদের বেশির ভাগই নারী।


ইংরেজি বলে নিখুঁত তবে উচ্চারণে দক্ষিণী টান স্পষ্ট। যুক্তাক্ষর বুঝতে কষ্ট হয়, কারণ স্পেশালকে বলে সেপেশাল। আর দ্বিত্ব উচ্চারণের প্রভাব খুব। প্রথম প্রথম শুনলে মনে হবে মাটির হাঁড়িতে নুড়িপাথর ঝাঁকানো হচ্ছে।
রিসেপশনের ভদ্রমহিলা উচ্চকণ্ঠে বললেন : আর ইউ পেশেন্ট, স্যার? অর ভিজিটর?
বলতে বলতে এগিয়ে দিলেন দু’টি ছোট বুকলেট ‘সিএমসি অ্যাট এ গ্লান্স’ এবং ‘আওয়ার সিটি- আওয়ার প্রাইড : ভেলোর’।
আমি তাদের আপ্যায়নে অবাক না হয়ে পারলাম না। জানতে চাইলাম : কার্ডিয়ো থোরাসিক সার্জারি ওয়ার্ড কোথায়? এবং কেন্টিনে কী কী খাবার পাওয়া যায়?
একজন এইড বেরিয়ে এসে আমাকে নিয়ে চলল প্যাসেজ ধরে।
ক্যান্টিনটা সুবিশাল। ঢোকার দু-দিকে দু’টি স্টোর স্যুভেনিরে ঠাসা। মুগ্ধ হয়ে গেলাম খ্রিষ্টধর্মের নান্দনিক উপস্থাপনা দেখে। সেবা ও ধর্ম যদি এক হয় তাহলে হাউস হয়ে ওঠে হোম। বিশ্বাস হয়ে ওঠে ভালোবাসা এ রকম হাজারো টেবিলপিস, ওয়ালম্যাট এবং ছোট ছোট নানা স্যুভেনির। সত্যি বলতে কি, আশির দশকে দেখা সেই সব স্যুভেনিরই আমি এখন খুঁজে পাই আর্চিস, হলমার্ক, কে-জেড বা হ্যারল্ড্সে যাদের বাণিজ্যিক আগমন ঘটেছে নব্বইয়ের শেষ দিকে বা শূন্য দশকে।


স্টুয়ার্ড মার্থা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আমার কৌতূহলে। আর ইউ নট হাংরি, স্যার?
লজ্জা পেয়ে আমি একটা টেবিল দখল করি। তাকেও বসতে বলায় সে হেসে জানায় : আই অ্যাম অন ডিউটি, স্যার। সি ইউ।
আমি তাকে একটা ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দেই। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে : ইউ আর এ ডক্টর ফ্রম বাংলাদেশ? ও মাই গড আই অ্যাম সো হ্যাপি।
হোয়াই, ম্যাম?
আই ডিড নট সি এনি বাংলাদেশী ডক্টর, বিফোর। অল আই সি অনলি পেশেন্টস।
আমি তার কিশোরীসুলভ অবাক হওয়ায় হেসে ফেলি। যাক, এদ্দিনে আমিও একটা দেখার বস্তু হলাম। দিন তাহলে এক টাকা?
এক টাকা কেন, স্যার?
বাংলাদেশে প্রথা আছে যে নতুন মুখ দেখলে সেলামি দিতে হয়।
সে মজা পেয়ে আমার সাদামাটা ভিজিটিং কার্ডে চোখ রেখে বলল : হেয়াট ইজ ডক্টরস ক্লাব, স্যার?
আওয়ার রেসিডেন্স। ইন্টার্ন ডক্টরস রেসিডেন্ট অব ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ।
সে অবাক হয়ে যায়। বলে : ওহ ভেরি নাইস!
আমি নিজের কাছেই প্রশ্ন করি : কে রেখেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তারদের হোস্টেলের এই নাম?
মন বলে : জানি না।


যদিও মূল বিল্ডিংটা মাত্র তিনতলা; কিন্তু বিরাট-বিশাল হসপিটাল। ঘুরতে ঘুরতে আমার পা ব্যথা হয়ে গেল। আমি নিজে খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলে পড়েছি বলেই বলছি না, সত্যিই আমি গির্জার এই সেবাব্রতে আশৈশব মুগ্ধ। ধর্ম যদি কল্যাণব্রত না হয়, তাহলে তা দুঃখী অসহায় মানুষের ভালোবাসা কী করে পাবে? আমার মনে পড়ে বাংলাদেশী কিছু সংস্থার কথা। যারা কেবল সুন্দর সুন্দর মসজিদ আর মন্দির গড়েন; কিন্তু মানুষের জন্য তেমন কিছু করেন না। মধ্যপ্রাচ্যের শেখদের কাণ্ডকারখানা এবং উচ্ছৃঙ্খলতা বিবেচনা করলে কেবলই আমার বুক ভারী হয়। কারণ, মাত্র এক শো বছর আগেও এরা ছিল প্রায় পথের ফকির! বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর ‘হেজাজ ভ্রমণ’-এ পড়েছি কাবা ও মসজিদে নববীর ইমাম ও খাদেমদের চরম দুর্দশার কাহিনী। এক শো বছরও হয়নি; যখন তারা মুখাপেক্ষী ছিল ভারতীয় ধনাঢ্য মুসিলমদের দান-ধ্যানের ওপর। অথচ মাটির নিচ থেকে তরল সোনা বেরোতে-না-বেরোতেই তারা ফিরে গেছে আইয়ামে জাহেলিয়াতে!


কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। সদ্য পরিচয় হওয়া তামিল ডক্টর আহমেদ প্রতিবাদ করে মধ্যপ্রাচ্যেও বহু ভালো মানুষ এবং ত্যাগী মানুষ আছে, ডক্টর। আমি সৌদি আরব এবং কুয়েতে তিন বছর কাজ করেছি। সেখানে মহত মানুষের দেখা পেয়েছি অনেক। তাদের জীবনাচরণ স্পষ্টতই সৎ এবং মানুষের সেবায় নিবেদিত।
হতে পারে আমি বলি : কিন্তু পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা তো ভীষণ আশঙ্কাজনক। রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ধর্মাচরণ সব ক্ষেত্রেই তারা অবক্ষয়মুখী।
তা অবশ্য সত্য বলেছেন। আহমদ একমত হয়ে বলে : পুরো পৃথিবী কব্জা করে নিয়েছে পুঁজিবাদ। বিশ্বজুড়ে চলছে ভোগের রাজত্ব। এর প্রভাব ধনী লোকের ওপরই বেশি পড়ে। কিন্তু সাধারণ আরব জনগণ এখনো চমৎকার মানুষ। তাদের ঈমান বা আমল নিয়ে কোনো সংশয় থাকা উচিত নয়।
কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আহমদ আমার বন্ধু হয়ে যায় অল্পক্ষণেই। সে-ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সোলাইতে উঠেছেন তো? আমি আপনাকে ফোন করে ড. জয়রাজের টাইম জানিয়ে দেবো। অথবা এলিজাবেথ জানাবে আপনাকে।
আপনি তাকে চেনেন?
চিনবো না কেন? আমাদের এখানে প্রায় সবাই সবাইকে চিনি। তো আপনি ডা. স্টানলি জনের সাথে যোগাযোগ করেননি কেন? তিনিই তো বিভাগীয় প্রধান। ইউনিট ওয়ানের ইনচার্জ।
আমি শুনেছি, তিনি খুব রাগী।
সেটা অবশ্য ঠিকই শুনেছেন। কিন্তু সার্জনদের রাগ তো স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই না?
হ্যাঁ, ঠিক। তবু আমি ক্রোধকে ভালোবাসি না।
তবে যে বললেন, আপনার বস ডা. আতা এলাহী খানও প্রচণ্ড রাগী?
আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বলি : কিন্তু তিনি অত্যন্ত বড় মানুষ এবং ভালো মানুষ।
ড. স্ট্যানলি জনও তাই।
যা-ই হোক, ড. জয়রাজ তো খারাপ না, তাই না?
নিশ্চয়ই না। হি ইজ এ ফার্স্ট ক্লাস সার্জন। প্রমিনেন্ট ফিগার। তিনি দুবাই যেয়ে তিন বছর পরেই ফিরে এসেছেন কেন জানেন? তার নাকি আর টাকার দরকার নেই। ওখানে তার বেতন ছিল ভারতীয় কারেন্সিতে পৌনে দু-লাখ।
আর এখানে কত পান?
সাড়ে চার হাজার। সাথে একটা ছোট ফ্ল্যাট।
জয়রাজেই চলবে আমার, ডা. আহমদ।
সি ইউ এগেইন।
‘সি ইউ’ বলে আমিও এগিয়ে গেলাম গেটের দিকে।
এই যে ডক্টর, মার্থা ডাক দিলো রিসেপশন থেকে : কিছু কিনেছেন গিফট শপ থেকে?
আমি হেসে বললাম : না। তবে পছন্দ করে এসেছি কয়েকটা। কিনবো। তুমি কিছু নেবে, ম্যাডাম?
নেবো। শিশুর মতো হেসে বলল সে : এক বাক্স টফি চকোলেট।


***
বেলা এগারোটা দশে ড. জয়রাজের চেম্বারে ঢুকলাম। সাধারণ কাঠের টেবিলে বসা ছোটখাটো মানুষ তিনি। মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। উঠে এসে নিজে দরোজা খুলে দিলেন। তারপর কেটলি থেকে গরম পানি ঢেলে জানতে চাইলেন : চা, না কফি?
আমি স্তম্ভিত। মুখে কোনো কথাই জোগালো না প্রথমে। এলিজাবেথ এগিয়ে এসে বলল : কফিই দিন, স্যার। ড. সরোয়ারের কফি পছন্দ।
আপনি জানলেন কিভাবে?
বললাম না আপনাকে কাল আমরা এক বাসে এসেছি, স্যার।
ওহ্। ভুলে গিয়েছিলাম।
কফি খেতে খেতে কাজের কথা হলো। দু-মাস পরে যে নতুন ব্যাচের ট্রেনিং শুরু হবে তাতে আমি জয়েন করতে পারব। তবে পরীক্ষায় বসতে হবে এবং ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিলের টেম্পরারি রেজিস্ট্রেশন পেতে হবে।
এটা কি পাওয়া সম্ভব?
সম্ভব। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ আমাদের অ্যাক্রেডিটেড প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেনও। চেষ্টা করলেই আপনি পেয়ে যাবেন। আমিও রেকমেন্ড করব।
থ্যাংকিউ, স্যার।
ওয়েলকাম ডক্টর। এবার বলুন : খেতে পারছেন কি?
আমি অবাক হয়ে বললাম : কী খেতে পারছি, স্যার?
তিনি হাসলেন। জবাব দিলেন : সাউথের খাওয়া তো অন্য রকম। নারিকেল তেলের ছড়াছড়ি। অনেকেরই সহ্য হয় না।
খারাপ লাগেনি আমার, স্যার। আর দু-এক দিন গেলেই বুঝব সহ্য হয় কি না।
এটা কিন্তু ভাইটাল ব্যাপার, ডা. সরোয়ার। কারণ, খাওয়া অ্যাডজাস্ট না হলে আপনি সাউথে টিকতে পারবেন না।
সম্মতি জানিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। সিস্টার এলিজাবেথ বাইরেই অপেক্ষায় ছিলেন। হেসে বললেন : আজ রাতে আমার বাসায় ডিনার করবেন, ডক্টর।
আমি হতবাক হয়ে বলি : কেন, কোনো অকেশন আছে?
না-না, আপনার দাদাকে বলেছি বাংলাদেশ থেকে আমার যে অতিথি এসেছেন তিনি আমার নতুন বন্ধু। বন্ধুকে দেখতে চেয়েছেন তিনি।


যেতেই হলো পালার নদীর উত্তর পাড়ে বিষ্ণু সিনেমার পরের গলিতে। এলিজাবেথ আর তার স্বামী আলবার্ট-দা এসে নিয়ে গেলেন আমাকে। এত অল্প পরিচয়ে কারো বাড়ি যাওয়াটা একেবারেই ইচ্ছে ছিল না আমার। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ জগতে থাকে যাদের উপেক্ষা করা যায় না। এলিজাবেথও সেই ধরনের মেয়ে।
জীবনের এই রহস্য সম্পর্কে আমি একবার প্রখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক আবদুল মান্নান তালিবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন এক অদ্ভুত কাহিনী সমস্ত আত্মাকে নাকি সৃষ্টি করে এক স্থানে রাখা হয়েছিল। যাদের সময় হয়, তারা পৃথিবীতে জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মাবার আগে যে আত্মারা পাশাপাশি ছিল তারা দুনিয়ায় এসেও পরস্পরের প্রতি তীব্র টান অনুভব করে। এ কারণেই যুক্তিহীনভাবে কোনো কালো আফ্রিকান ভালোবেসে ফেলে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানকে; কিংবা কোনো চৈনিক রমণী বিয়ে করতে পাগল হয়ে যায় কোনো ভারতীয় তরুণকে। এ রকম ঘটনা চলতি পথেও ঘটে। বাসে বা ট্রেনে কাউকে দেখে হঠাৎ বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে ও যেন যুগযুগান্তের চেনা। এই অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসা জন্মায় ঐ সেই আদিম আত্মার আকুতির জন্য।


তালিব ভাইয়ের যুক্তিকে আমি উড়িয়ে দিতে পারি না। পৃথিবীর বহু দেশে আমার এমন অনেক বন্ধু তৈরি হয়েছে যারা চিরকালীন বন্ধনে আবদ্ধ। ইউসুফ তৌফিক নামে আমার এক আমেরিকান-বস আমাকে বহু বছর ধরে গিফট পাঠায়। জাপানি মেয়ে কেইকো সেনজুকে আজো দেখিনি কিন্তু বন্ধুত্ব টিকে আছে প্রায় আড়াই যুগ।


এলিজাবেথের বাসায় আসল-দক্ষিণী খাওয়া খেতে হলো বিরাট অ্যালুমিনিয়ামের থালির মধ্যে অন্তত আট-নয়টা ছোট ছোট স্টিলের বাটি সাজানো ভাজি, আচার, দই, মিষ্টি, সম্ভার (টক) এবং আরো নানা পদের নিরামিষ। মাঝখানে ছোট এক বাটি ভাত। তার ওপর ঘিয়ে ভাজা পাপড় এবং পাশে ভাদাই (বড়া)। পুরো খাবারে মসলা ও ঝাল কম তবে নারকেল আছে প্রায় সব কিছুতে। অ্যালবার্ট-দা জানালেন : দক্ষিণী খাবার যতই খান পেটে গ্যাস হবে না। তবে, ডায়রিয়া হলে মহা বিপদ, গরম এলাকা তো!
এ দিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার কী, দাদা?
দোসা; মাসালা দোসা।
আমার মনে পড়ে গেল কাশ্মিরে প্রথম দোসা খাওয়ার অভিজ্ঞতা। হায়দরাবাদের পরিবারটি গুলমার্গে আমাকে শিখিয়েছিল দোসা খেতে।
খেতে খেতে সিস্টার এলিজাবেথ জানতে চাইল : ডক্টর, ইডলি-ভাডা খেয়েছেন?
আমি বলি : না, দিদি।
ওকে; আমি খাওয়াবো আপনাকে।
না-না, আর না।
কেন-কেন, আমার রান্না ভালো না, নাকি? আপনি ভেলোরে এসে বিদ্রোহের পতাকা ওড়াচ্ছেন হায়দার আলীর মতো?
আমি অবাক হয়ে বলি : সে আবার কী, সিস্টার?
আলবার্ট-দা জবাব দেন : আরে, টিপু সুলতানের সন্তানদের তো আটকে রাখা হয়েছিল ভেলোর দুর্গে। সেখানকার সৈন্যরা ১৮০৬ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে টিপুর ছেলে শাহজাদা হায়দার আলীকে সুলতান ঘোষণা করে।


আমি খুবই অবাক হই। ভারতের এই শেষ বীরের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অপরিসীম। কিন্তু তার ছেলেকে নিয়ে যে এত কাহিনী, আমি তার কিছুই জানি না। লজ্জায় মাথা নিচু করি আমি।
রাত দশটার দিকে হোটেলে ফিরি। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেই যে ফোর্টে কিভাবে যাওয়া যায়।
ম্যানেজার খুবই অবাক হয়ে বলে : আমি এই প্রথম কোনো বাঙালিকে দেখলাম যে ভেলোর ফোর্ট দেখতে আগ্রহী। বাঙালিরা বরং জানতে চায় রেডলাইট এরিয়া আছে কোথায়?
কারণ কী, ম্যানেজার স্যার?
কারণ হচ্ছে কাজ না থাকা।
মানে কী?
মানে হলো, একেক জন পেশেন্টের সাথে অ্যাটেনডেন্ট আসে চার-পাঁচজন। দু-এক দিন দৌড়াদৌড়ি করেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যায়। তারপর কী করবে, বলুন? ড্রিংক খোঁজা আর দেহসুখ মেটানো ছাড়া কাজ থাকে?
আমি হতবাক হয়ে বলি : আপনার হোটেলে তো অনেক বাঙালি ও বাংলাদেশী। কারা এসবে বেশি ব্যস্ত?
সে হিসাব তো জানি না, স্যার। তবে পাপকাজে কোনো দেশ-জাতি নেই। ধর্ম বা বর্ণ নেই। পকেটে পয়সা থাকা আর মনের কামনা হলো মুখ্য বিষয়।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে রুমে এসে গোসলের পানি নিলাম। হোটেল বয়কে বললাম : চমৎকার এক কাপ কফি দাও তো, ভাই।
চিনিসহ, না চিনি ছাড়া, স্যার?
আমি অবাকই হলাম। পরে জানতে পেরেছি বহু তরুণই তখন বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত। সুতরাং রুমবয়রা জেনে নিয়ে চা-কফি আনে।
দক্ষিণ ভারতে চিনির ব্যাপারে আমি যত বিস্মিত হয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি অবাক হয়েছি লিকার বা রঙ-চা না-পাওয়ার কারণে। দুধ সর্বত্র পাওয়া যায় এবং তা খাঁটি। তামিল-চাও পেটে গ্যাস পয়দা করে না এবং খেতে খুবই সুস্বাদু।


আজানের শব্দে ঘুম ভাঙল দেখে বেশ অবাক হলাম। সহসা মনে হলো আমি ঢাকাতেই আছি। হায়দরাবাদেও একবার এ-রকম হয়েছিল আমার। প্রথমে বুঝতেই পারিনি যে এটা ভারতীয় কোনো শহর। শত শত মাইক থেকে যখন আজান ভেসে আসছিল তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, এটা ভারতীয় কোনো নগরী।
আজানের টানে উঠে পড়লাম। অজু করে নামাজ পড়তে যেয়ে দু-চোখ ভেঙে কান্না এলো এই আজান কি সত্যি এখন আর কোনো ‘আহবান’ বহন করে? মনে হয় না। সমগ্র পৃথিবীর কোথাও-না-কোথাও সব সময় ধ্বনিত হচ্ছে এই আহবান এসো শান্তির পথে; এসো কল্যাণের পথে। কিন্তু মানুষ কি সে পথে আসছে? না জ্ঞানে, না দর্শনে, না মানিবকতায়, না বীরত্বে কোথাও আজ এর মর্মবাণী নেই। অথচ এই জাতি সম্পর্কেই আমাদের কবি গেয়েছেন :
ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতী
সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা, বিশ্বে করেছি জ্ঞাতী...।


আজ নাশতা খেলাম ইউলি-ভাডা। একটি হচ্ছে চালের গুঁড়া সিদ্ধ সাথে একটি হালকা-মিষ্টি বড়া। ইডলির সাথে বাংলাদেশী ভাপাপিঠার অনেক মিল শুধু মিষ্টি নেই। দক্ষিণীরা ইডলি খায় ডাল ও সম্ভার দিয়ে। সাথে পুরিও নেয় কখনো কখনো।
প্রথমে ভাবছিলাম খেতে পারব না। পরে দেখি, ভালোই লাগছে। সার্ভিস এসে জিজ্ঞাসা করল : আরো দেবো, স্যার?
দক্ষিণের হোটেলগুলোতে সার্ভিসম্যানরা ডাল, সুরুয়া, সম্ভার এবং সবজির বড় বাটি নিয়ে হাঁটতে থাকে যার যত লাগে চাইলেই দেয়। সম্ভারের টক আমার খুবই ভালো লাগল দেখে, সার্ভিস আমার প্লেট ভরে দিলো সম্ভারে।
নাশতার পর কফি নিলাম। দক্ষিণে কফির চল্ অনেক বেশি। দামও কম; স্বাদও চমৎকার। আমি দ্বিতীয় বাটি কফি খেয়ে ভেলোর ফোর্টের জন্য রিকশা নিলাম।
দু-কিলোমিটারের রাস্তা। গেট দিয়ে ঢুকেই চমকে উঠি বিশাল নির্মাণ দেখে। চার দিকে পানির পরিখার ওপর বিরাট ফোর্ট যেন পাথরের নৌকার মতো ভাসছে।
যেহেতু এখানে টিপু সুলতানের পরিবার এবং শ্রীলঙ্কার শেষ-মহারাজা বন্দী ছিলেন তাই বিস্তারিত জানার লোভে আমি একজন গাইড নিলাম। টিপু পরিবারের ইতিহাস না জেনে আমি দেশে ফিরতে চাই না। মোহিনী কোট্টায়ামের সাথে রফা হলো পঞ্চাশ রুপিতে; সময় আড়াই ঘণ্টা।