রানী ভিক্টোরিয়ার সাথে কী সর্ম্পক ছিলো মুসলিম যুবকের

Dec 28, 2017 03:54 pm
রানী ভিক্টোরিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী বন্ধু

 

 

রানী ভিক্টোরিয়া ১৩ বছর ধরে ‘মুন্সী’ আবদুল করিমকে প্রায় প্রতিদিন চিঠি লিখতেন এবং কোনো কোনো দিন একাধিক। কোনো কোনো চিঠিতে তাকে তিনি সম্বোধন করতেন ‘প্রিয়তম মুন্সী’ ও ‘তোমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু’ বলে। কোনো কোনো সময়ে রানী ভিক্টোরিয়া এমনকি চুমু খেয়ে চিঠি শেষ করতেন। তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা কানাঘুষা চলত।রাজপরিবারের সদস্যরা এমনকি রানীর পুত্র ও উত্তরসূরি পর্যন্ত এই সম্পর্কে ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু রানী এসবের থোড়াই কেয়ার করতেন। তিনি উইল করে গিয়েছিলেন যে তার মৃত্যুর পরে আবদুল করিমই যেন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করে। আগ্রার এক কেরানী থেকে তিনি ওই সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক রানী ভিক্টোরিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। লিখেছেন আসিফ হাসান

তার পুরো নাম মুন্সী হাফিজ মোহাম্মদ আবদুল করিম। জন্ম ১৮৬৩ সালে ঝাঁশির কাছে লালতপুরে। তার পিতা হাজী মোহাম্মদ ওয়াজিরউদ্দিন। তিনি ছিলেন হাসপাতাল সহকারী। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কান্দাহার অভিযানে আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন। আবদুল করিম ফারসি ও উর্দু শিখেছিলেন ব্যক্তিগতভাবে। উত্তর ভারত ও আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। প্রথমে তিনি আগর রাজ্যের জাওয়ারার নবাবের উকিল হিসেবে কাজ করেছিলেন। পরে সেটা ছেড়ে আগ্রার কারাগারে অনুবাদসংক্রান্ত কেরানীর কাজ করতেন।

ওই অবস্থাতেই তিনি ইংল্যান্ড পাড়ি জমান। তবে এর আগে তার পিতা তার এক সহকর্মীর মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। পরে স্ত্রী রাশিদানকেও তিনি ইংল্যান্ড নিয়ে যান এবং তিনিও রানীর স্নেহসিক্ত ছিলেন। পরে তিনি আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। তার পিতাও ইংল্যান্ডে তার কাছে গিয়েছিলেন। রানী তার প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। এমনকি তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে উইন্ডসর প্রাসাদে হুক্কা টেনেছিলেন। পিতাকে খান বাহাদুর খেতাব দেয়া হয়। কোনো সাধারণ চিকিৎসকের এটা পাওয়ার কথা নয়। আর আবদুল করিমকে সিভিও খেতাব দিয়েছিলেন। রানী তাকে আরো বড় খেতাব দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নানা আপত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতায় পারেননি।


ভারতবর্ষের প্রতি রানীর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তখন গোল্ডেন জুবিলি উদযাপিত হচ্ছিল। এর রেশ ধরে রানীই এক বছরের জন্য দুজন ভারতবর্ষীয় কর্মচারী পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। ইংল্যান্ড যাওয়ার আগে আবদুল করিম ইংরেজদের আদব-কায়দা ও ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন। তার সঙ্গে যাওয়া অপর ভারতীয় ছিলেন মোহাম্মদ বুখশ। তাকে চাকরের কাজ দেয়া হয়েছিল। বুখশ রানীর খেদমতগার (টেবিল সার্ভেন্ট) হিসেবেই ১৮৯৯ সাল উইন্ডসরে মারা যান। আর আবদুল করিমের অবস্থান দিন দিন বাড়তে থাকে।


রানী ও মুন্সীর সাক্ষাতের সময়ে করিমের বয়স ছিল ২৬ বছর, আর ভিক্টোরিয়ার ৬৮। ব্যবধান ৪০ বছর। প্রায় ১৫ বছর তারা একত্রে ছিলেন।


আবদুল করিম তার ডায়েরিতে রানীর সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতের কথাটি লিখেছেন এভাবে : ‘ডা. টেইলর ও আমাকে ডাইনিং রুমের কাছে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়া হলো এবং আমরা সে অনুযায়ী হার ম্যাজেস্ট্রির আগমনের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। আমি মহামান্বিতা সম্রাজ্ঞীর কাছাকাছি হয়ে কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম, তিনি এইচআরএইচ দ্য ডিউক অব কনট ও প্রিন্সেস বিত্রেসকে নিয়ে প্রবেশ করলেন। ডা. টেইলর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন এবং আমি প্রাচ্যদেশীয় কায়দায় করলাম। আমি তাকে নজর দিলাম, তার দুই হাতে একটি সোনার মোহর দিলাম, হার ম্যাজেস্ট্রি তা স্পর্শ করে ভারতীয় প্রথা অনুযায়ী সরিয়ে রাখলেন। তারপর রানী খুশি হয়ে ডা. টেইলরের সঙ্গে দুই-একটি কথা বললেন, আর এভাবেই ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎকার শেষ হলো।’


দুই দিন পরে ডা. টেইলর বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে একটি টেলিগ্রাম পেলেন, তাকে করিমকে নিয়ে দেখা করতে বলা হয়েছে। রানী তার দুই ভারতীয় চাকর সম্পর্কে লিখেছেন : ‘একজনের নাম মোহাম্মদ বুখশ, খুবই কালো, তবে অত্যন্ত হাসিখুশি চেহারার... আরেকজন বেশ অল্প বয়স্ক, নাম আবদুল করিম, অনেক উজ্জ্বল, লম্বা ও সুদর্শন। তার পিতা আগ্রার একজন স্থানীয় চিকিৎসক। তারা উভয়ে আমার পায়ে চুমু খেলো।’


রাজপ্রাসাদে ওয়েটারের (পরিচারক) কাজটি আবদুল করিমের পছন্দসই ছিল না। ভারতে তিনি করতেন কেরানীর কাজ। আর এখন টেবিলে খাবার পরিবেশনের কাজটি তার কাছে মনে হচ্ছিল ‘খুব বেশি দাসসুলভ’। তাই তিনি চাকরিটি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রানী তত দিনে তাকে খুবই পছন্দ করে ফেলেছেন। তাই তাকে চাকরি না ছাড়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তাকে রাজপরিবারের পূর্ণাঙ্গ সদস্য করে নিয়েছিলেন।


১৮৮৭ সালের ২৩ জুন উইন্ডসর ক্যাসলের ফ্রগমোর হাউজে আবদুল করিম প্রথমবারের মতো রানীকে নাশতা পরিবেশন করেন। রানী ওই দিন আবদুল করিম সম্পর্কে তার ডায়েরিতে লিখেন : ‘অন্য জন, বেশ অল্প বয়স্ক, অনেক বেশি হালকা (বুখশের তুলনায়), লম্বা ও খুবই সুদর্শন। তার পিতা আগ্রার একজন হেকিম। তারা উভয়ে আমার পায়ে চুমু খেলো।’


পাঁচ দিন পরে রানী উল্লেখ করলেন, ‘ভারতীয়রা এখন সব সময়ে কিছু করার অপেক্ষায় থাকে, শান্তভাবেই তারা কাজ করে’। ৩ আগস্ট তিনি লিখেন, ‘আমি আমার চাকরদের সঙ্গে কথা বলার জন্য হিন্দুস্তানি কিছু শব্দ শিখছি। ভাষা ও লোকজন সম্পর্কে আমার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আমি আগে কখনো সত্যিকার সংস্পর্শে আসিনি।’ ২০ আগস্ট তিনি লিখেন, চাকরদের একজন ‘দারুণ কারি’ তৈরি করে আনল। রানীর তা এতই পছন্দ হলো যে পরের ১৩ বছর এটা রাজকীয় মেনুতে রয়ে গেল।


৩০ আগস্টের মধ্যেই আবদুল করিম রানীকে উর্দু শেখাতে শুরু করেন। তার কাছ থেকে প্রতিদিন সবক নিতেন। আবদুল করিমের শিক্ষকতায় রানী উর্দু পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। তখন থেকেই আবদুল করিম হয়ে গেলেন ‘মুন্সী’ (শিক্ষক; মুন্সী শব্দ দিয়ে কেরানি বোঝালেও তা দিয়ে শিক্ষকও বোঝায়)। ১৮৮৮ সালে রানী তার বোন ভিকিকে, জার্মান সম্রাজ্ঞী, লিখলেন, ‘তরুণ আবদুল আমাকে শেখাচ্ছে এবং ও খুবই কড়া শিক্ষক এবং নিপাট ভদ্রলোক’। ডিসেম্বরে বরোদার মহারানী চিমনাবাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি ওই ভাষা ব্যবহার করেন।


আবার ভিক্টোরিয়া তাকে ইংরেজিতে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য সহকর্মীদের নির্দেশ দেন। ১৮৮৮ সালে ভিক্টোরিয়া জানান, আবদুল করিম ‘চমৎকার ইংরেজি শিখে ফেলেছে’।


১৮৮৮ সালের আগস্টে তাকে ‘মুন্সী’ হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। পরিচারক (ওয়েটার) হিসেবে তিনি কাজ করছেন, এমন ছবিগুলো ধ্বংস করা হলো এবং তাকে রানীর প্রথম ব্যক্তিগত ভারতসচিব করা হয়। রানীর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। ইউরোপে সফর ও ছুটি কাটানোর সময়েও তিনি তাকে সঙ্গে নিতেন।


১৮৮৮ সালে রানী স্যার থিওডোর মার্টিনকে লিখেন যে, “মুন্সি খুবই চমৎকার লোক, চতুর, সত্যিকারের ধার্মিক এবং অত্যন্ত মার্জিত ভদ্রলোক, যিনি বলেন, ‘খোদা এই হুকুম দিয়েছেন’, খোদার নির্দেশ তারা পুরোপুরি পালন করে। তাদের এমন ঈমান এবং জ্ঞান আমাদের জন্য বড় উদাহরণ।” স্যার স্ট্যানলি লেন পুলের কাছে লেখা রানীর সচিব স্যার পনসোনবির একটি মূল চিঠিতে (ড. ফারহান আসারের সংগ্রহ) জানিয়েছেন, কথাবার্তায় মুন্সী নবী মোহাম্মদ (সা:) সম্পর্কে রানীকে যেসব জানিয়েছেন, তাতে দেখা যায়, তিনি (রানী) ইসলামের প্রতি আগ্রহী ছিলেন।


আবদুল করিমের গলায় একবার একটা ফোঁড়া হলে রানী ব্যক্তিগতভাবে তার পরিচর্যা করেন। তিনি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. রিডকে চিকিৎসার ভার দিয়ে বলেন, আবদুল করিম বিদেশ-বিভুঁয়ে পড়ে আছে। তাকে দেখার কেউ নেই, এখন যেন তার কোনো অবহেলা না হয়। ডা. রিড লিখেছিলেন, ‘রানী দিনে দুবার আবদুল করিমের কক্ষে গিয়ে তার কাছ থেকে হিন্দুস্তানি শিক্ষা নেন, তার গলা পরীক্ষা করেন, তার বালিশগুলো ঠিকঠাক করে দেন।’ ওই চিকিৎসক এটাকে ‘মুন্সী-ম্যানিয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
মুন্সীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে রানী তাকে কটেজ, দামি দামি উপহার, খেতাব, তার ব্যবহারের জন্য সহিসসহ ঘোড়ার গাড়ি ইত্যাদি উপহার দিয়েছিলেন। আবদুল করিমকে একটি চিঠিতে রানী লিখেছিলেন, ‘আমার দীর্ঘ চিঠিটি আমি (আলাদাভাবে) পাঠিয়েছি, যা প্রায় এক মাস আগে লিখেছিলাম, তাতে আমার একান্ত চিন্তাভাবনা আছে এবং সেটা কোনো মানুষই কখনো জানবে না বা তোমার এর জবাব দিতে হবে না। তুমি যদি এটা পড়তে না পারো (রানীর হাতের লেখার ইঙ্গিতপূর্ণ) তবে আমি তোমাকে পড়তে সাহায্য করব এবং তারপর সঙ্গে সঙ্গে এটা পুড়িয়ে ফেলব।’


রানী কী লিখেছিলেন, সেটা কোনোকালেই জানা যাবে না। কারণ তিনি পড়ার পরই চিঠিটি পুড়িয়ে ফেলার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। আবদুল করিমকেও ওই গোপন চিঠির জবাব পর্যন্ত দিতে বারণ করেছিলেন। তবে চিঠিটিতে রানী অনেক গুরুত্বপূর্ণ একান্ত কথা বলেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তিনি ডুশেস অব কনটকেও এ প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, ‘আমি তাকে অনেক ভালোবাসি, সে খুবই ভালো, ভদ্র এবং তার সঙ্গে মনের মিল রয়েছে।’


আবদুল করিমকে রানীর স্কটিশ এস্টেটে বালমোরাল ক্যাসলের কক্ষ বরাদ্দ করা হয়। রানী একে বলতেন ‘করিম কটেজ’। এখানে আগে রানীর প্রিয় চাকর জন ব্রাউন থাকতেন, তিনি ১৮৮৩ সালে মারা যান। এখানে রানী অনেক রাত একাকী আবদুল করিমের সঙ্গে থাকতেন। ব্রাউন জীবিত থাকার সময়েও তিনি একই কাজ করতেন।


আবদুল করিমের জীবনীকার সুশীলা আনন্দের মতে, রানীর ব্যক্তিগত চিঠিপত্রগুলো প্রমাণ করছে যে ‘মুন্সীর সঙ্গে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও সাংসারিক বিষয়সহ নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা করতেন। উভয়ে বিবেচনাবোধ ও হৃদয়-মন পরস্পরের প্রতি উজাড় করে দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, রানী বিশ্বকে দেখেছিলেন আবদুল করিমের মাধ্যমে এবং সেটা তার নিঃসঙ্গ জীবনকে আলোকিত করেছিল এবং আবদুল করিম তাকে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।’


অনেকে বলে থাকেন, মুন্সীর প্রভাবেই রানী ভিক্টোরিয়া নির্বাচিত কাউন্সিল ব্যবস্থা প্রবর্তনের ব্যাপারে তার নেতিবাচক অভিমত প্রকাশ করে বলেন যে সংখ্যালঘু হওয়ায় মুসলমানেরা পর্যাপ্ত সংখ্যায় নির্বাচিত হতে পারবে না।


তবে রানীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা অনেকের মধ্যে ঈর্ষা ও হিংসার সৃষ্টি করেছিল। পনসোনবি, কর্নেল বিগ, ডা. রিডরা মুন্সীর ভারতে সামাজিক মর্যাদা, তার অর্থনৈতিক অবস্থা এবং এমনকি স্বাস্থ্য নিয়েও নানা অবমাননাকর মন্তব্য করে রানীকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রানী তাদের কথাবার্তাকে বর্ণবাদগত পূর্বধারণা বিবেচনা করেছেন এবং সেগুলোকে ‘লজ্জাজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একবার কেউ একজন আবদুল করিম সম্পর্কে খারাপ কথা বললে রানী ক্ষুব্ধভাবে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এটা তোমাদের ব্রিটিশ মনোবৃত্তি’।


বোনহ্যামের ২০০৮ ক্যাটালগে উল্লেখ করা হয়েছে যে রানী ‘বুঝতে পেরেছিলেন যে তার মৃত্যুর পর বিদ্যমান বর্ণবাদী মনোভাব আবদুল করিমকে বিপদে ফেলবে, তাই তিনি তার উইলে তার জন্য কিছু ব্যবস্থা করে যান’। তিনি ভাইসরয়কে আগ্রায় আবদুল করিমকে কিছু জায়গা বন্দোবস্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভাইসরয় অনিচ্ছুকভাবে সেটার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি রানীকে ফিরতি চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে, ১৮৫৭ সালের যুদ্ধে যে ব্যক্তিজীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিল্লি গেট উড়িয়ে দিয়েছিল তাকে সারা জীবনের জন্য যে জমিটি দেয়া হয়েছে তা থেকে আয় হয় ২৫০ রুপি, আর আবদুল করিম পান তার দ্বিগুণ। রানী এ নির্দেশও দিয়েছিলেন যে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আবদুল করিমকে প্রধান শোকপ্রকাশকারীর সম্মান দিতে হবে।


রানী ভিক্টোরিয়া মারা গিয়েছিলেন ১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি। তার কফিন বন্ধ করার আগে আবদুল করিম শেষ ব্যক্তি হিসেবে তাকে দেখেছিলেন।


রানী মারা যাওয়ার পরে রাজপরিবারের সদস্যরা এবার আবদুল করিমের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের মওকা পেল। প্রহরীদের নিয়ে নতুন রাজা অ্যাডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেক্সান্দ্রা, মৃত রানীর কনিষ্ঠা কন্যা প্রিন্সেস বিয়েত্রা দরজা ভেঙে আবদুল করিমের কটেজে প্রবেশ করলেন এবং রানী ও তার মধ্যে যেসব চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে, সেগুলো পুড়িয়ে ফেললেন। মুন্সী ও তার স্ত্রী অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখলেন যে রানীর লিখিত কথাগুলো আগুনের পেটে চলে যাচ্ছে। রাজা অ্যাডওয়ার্ড তখনই মুন্সীকে ভারতে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিলেন।
এমনকি মুন্সী ভারতে ফেরার পরও ব্রিটিশ রাজকীয় কোপানল থেকে রেহাই পাননি। রানীর অবশিষ্ট চিঠিগুলো হস্তগত করতে রাজা অ্যাডওয়ার্ড আগ্রায় মুন্সীর বাড়িতে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি মুন্সী মারা যাওয়ার পরও একবার অভিযান চালানো হয়েছিল। পরে ভাইসরয় মিন্টো ও তার স্টাফ ওই অভিযান অনুমোদন করেননি এবং তারা জব্দ করা কাগজপত্র আবদুল করিমের বিধবা স্ত্রীর কাছে ফেরত দিতে সুপারিশ করেন।


রানীর মৃত্যুর পরে মুন্সীও বেশি দিন বাঁচেননি। ১৯০৯ সালের এপ্রিলে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। আগ্রায় রানীর দেয়া জায়গাতেই তিনি দুই স্ত্রীকে নিয়ে নিরিবিলিতে বাস করতেন।


তার কোনো সন্তানাদি ছিল না। বড় ভাই ও ছোট পাঁচ বোন ছিল। আবদুল করিম তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘আমি সর্বশক্তিমানের কাছে মুনাজাত করছি যাতে তিনি আমাদের দয়ালু সম্রাজ্ঞীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন।’


রানীর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে আবদুল করিম কখনো কাউকে কিছু বলেননি, কারণ এতে রানীর মর্যাদাহানি হতে পারত বলে মনে করতেন। তিনি হয়তো চাইতেন তার ও ভারতবর্ষের রানীর মধ্যকার সম্পর্কটি শুধু তাদের মধ্যেই থাকুক। আবার রানীও তার বিশেষ কিছু চিঠি সংরক্ষণ করেননি।


রানী-মুন্সী সম্পর্কে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে খুব বেশি দিন আগে নয়। তবে সেটা মুন্সীর কারণে নয়, রাজকীয় আর্কাইভ ও ফ্রেডেরিক পনসোনবির প্রকাশিত (১৯৫১ সালে) স্মৃতিকথা থেকে। এ ছাড়া আবদুল করিমের ‘হারানো ডায়েরি’র সন্ধানও পরে পাওয়া যায়।
মুন্সীর চেয়ে রানী বয়সে ছিলেন ৪২ বছরের বড়। অসম প্রেম হতেই পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সম্পর্কটা ছিল সম্ভবত ‘মানসিক’। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারিণী হয়েও রানীর অন্তরঙ্গ বলতে কেউ ছিলেন না। বিশেষ করে ১৮৬১ সালে স্বামী আলবার্ট মারা গেলে ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন রানী। এ সময় তাকে সঙ্গ দিতেন জন ব্রাউন নামে এক চাকর। তারা এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে তারা পরস্পরের প্রেমে এবং এমনকি গোপনে বিয়ে করেছেন কি না তা নিয়ে গুঞ্জন চলতে থাকে। তার মৃত্যুর পরে (১৮৮৩) এলেন আবদুল করিম। তার সঙ্গেও রানীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে আরেক দফা কানা-ঘুষা শুরু হয়। রানী তার কটেজেও রাতে একাকী থাকতেন।


তবে আবদুল করিমের জীবনীকার শ্রাবণী বসু মনে করেন, একত্রে কটেজে রাতযাপন করলেও তারা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘প্রিন্স আলবার্ট মারা গেলে ভিক্টোরিয়া বলেছিলেন যে তিনি (আলবার্ট) ছিলেন তার স্বামী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, পিতা ও মাতা’। শ্রাবণীর ধারণা, ‘আমি মনে করি এটাই যৌক্তিক যে আবদুল করিম একই ভূমিকা পালন করেছিলেন’। রানীর কোনো কোনো পত্রে ‘তোমার প্রিয়তম মা’ হিসেবেও উল্লেখ রয়েছে। আর বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানে বসবাসরত মুন্সীর স্বজনেরাও বলে থাকেন, তাদের মধ্যে মা-ছেলে সম্পর্ক ছিল।