শি জিনপিং বিশ্ব রাজনীতিতে কেন এতো ক্ষমতাধর

Dec 27, 2017 01:28 pm
চীনের একক অধিপতি

 

আহমেদ বায়েজীদ

 চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শি জিনপিং। বিশ্বরাজনীতিতেও তার অবস্থান জোরালো হয়েছে আগের চেয়ে অনেক গুণ। একদলীয় শাসনের দেশ চীনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রধানই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এ বছর শি জিনপিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মেয়াদ শেষ হয়েছে। অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, এত দিন জেনারেল সেক্রেটারি মর্যাদায় দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এবার তিনি চেয়ারম্যান পদমর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন।

১৯৮৯ সালের পর কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান পদে প্রথম নেতা শি জিন পিং। এর আগে মাও জে দংসহ মাত্র তিনজন নেতা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যানের মর্যাদা পেয়েছিলেন। পার্টিতে চেয়ারম্যান একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দল পরিচালনা করতে হয় স্ট্যান্ডিং কমিটির পরামর্শে, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের কাছে জবাবদিহিও করতে হয়। যেটি মূলত সম্মিলিত নেতৃত্ব। কিন্তু চেয়ারম্যান একক ক্ষমতায় দল পরিচালনা করার অধিকার রাখেন, কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না তাকে। শুধু তা-ই নয়, তার ব্যক্তিগত দর্শনও দলের সংবিধানে যুক্ত হয়েছে নীতিমালা হিসেবে। তাই সব কিছু মিলে শি জিনপিং গত কয়েক দশকের মধ্যে চীনের একক অধিপতি হিসেবেই অধিষ্ঠিত হয়েছেন ২০১৭ সালে।


দেশের জনগণের মধ্যেও তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। পাঁচ বছরের মেয়াদে চীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বের এক নম্বর বাণ্যিজ্যশক্তি হিসেবে। এ বছর বাণিজ্যের বিশ্বায়ন হয়েছে চীনের হাত ধরেই। এ বছরই চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্প আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। বছরটিতে সামরিক শক্তিতে চীন ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। দেশের বাইরে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ শুরু করেছে চীন।


পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার একটি করে সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। তাইওয়ানের ওপর আধিপত্য বজায় রাখা, দক্ষিণ চীন সাগর নিজেদের দখলে রাখা কিংবা সেখানে সামরিক স্থাপনা নির্মাণসহ সব কাজই করেছেন বছরটিতে। ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেও চীনের প্রভাব বেড়েছে অনেক গুণ। এসব কাজে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনও নিজেদের দিকে টানতে সমর্থ হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনবিরোধী পদক্ষেপগুলো ভালোভাবেই সামাল দিয়েছেন ৬৪ বছর বয়সী এই কমিউনিস্ট নেতা।


শি জিনপিংয়ের সমালোচনাও ছিল প্রচুর। জিনজিয়াংসহ বেশ কিছু অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর এ বছরও চলছে নির্যাতন। বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের ওপর বিধিনিষেধ ও নজরদারি আরোপ করা হয়েছে। এসব ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শি কখনোই কার্যকরী ব্যবস্থা নেননি।


রোহিঙ্গা নির্যাতন ও নিপীড়ন ইস্যুতে সরাসরি সমর্থন করেছেন মিয়ামারের সরকারকে। অনেকেই মনে করেন চীনের সমর্থনেই সু চি সরকার ও তার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গদের নির্মূল করতে সাহস দেখিয়েছে। নইলে আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা উপেক্ষা করার স্পর্ধা মিয়ানমারের ছিল না। উত্তর কোরিয়া ইস্যুতেও শি জিনপিং বরাবরই নীরব থেকেছেন।


কিম জং উনের একের পর এক আগাসী কর্মকাণ্ডে বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে চীনের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। উল্টো দেশটির প্রতি সাহায্য সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন শি। অভিযোগ আছে শি তার ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজনদের দলীয় নেতৃত্বে নিয়ে এসেছেন বলেও।


‘এক বন্ধনী, অভিন্ন সড়ক’

২০১৭ সালের একটা বড় ঘটনা হলো প্রাচীন সিল্করুটের অনুসরণে ও অনুপ্রেরণায় চীনের  One Belt One Road (OBOR) মহা প্রকল্পে বিশ্বের তিন মহাদেশের অন্তত ৬০টি দেশকে শামিল করার অভূতপূর্ব উদ্যোগ। সারা দুনিয়ায় সাড়া জাগানো প্রকল্পটির অপর নাম RBI,অর্থাৎ Road and Belt Initiative-এর চেহারাটা ‘অর্থনৈতিক’ হলেও তাৎপর্য যে ‘রাজনৈতিক’, তা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল সহজেই বুঝেছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র জনসংখ্যার হিসেবে। তা ছাড়া, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পরই চীন হলো বিশ্বে দ্বিতীয় প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি। অদূরভবিষ্যতে তারা প্রথম স্থানে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর সাথে যোগ হয়েছে বিশ্ব অঙ্গনে চীনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামরিক তৎপরতা।

এর বিপরীতে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ভেতর-বাইরে নানা সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতায় আগের মতো, কথিত ‘একক পরাশক্তি’র ঈর্ষণীয় অবস্থানে নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই মার খেয়েছে ও পিছু হটেছে এই দেশটি। সে জায়গায়, চীন-রুশ জুটির তৎপরতা ও প্রভাব বাড়ছে। চীন তার প্রভাববলয় এশিয়া ছাড়িয়ে সুদূর আফ্রিকা হয়ে পাশ্চাত্যের পীঠস্থান ইউরোপে প্রসারিত করতে চায়।


দক্ষিণ আমেরিকাতেও চীনের বিনিয়োগসহ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড উল্লেখ করার মতো। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রতিপক্ষ ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র তার একধরনের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব দিলেও ভারত অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে।
পাকিস্তান চীনের বলয়ভুক্ত দেশ। বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বর্ধমান। এমনকি, নেপাল এবারে ভারতের দিক থেকে চীনের প্রতি ঝুঁকে গেছে অনেকটা। এই প্রেক্ষাপটে চীনের ঙইঙজ-কে সন্দেহের চোখে দেখছে বিশেষত আমেরিকা ও ভারত। এই চৈনিক উদ্যোগ সফল হলে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বহু দেশ চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতার মাধ্যমে এর রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় চলে আসবে।

জন্ম : ১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে

দায়িত্ব গ্রহণ : নভেম্বর ২০১২

শিক্ষা : মাওবাদী দর্শনে ডক্টরেট ডিগ্রি

পরিবার : স্ত্রী পেং লিউয়ান ও মেয়ে শি মিংজি

পূর্ববর্তী দায়িত্ব : সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান