ঈসা (আ:) যেখানে জন্মেছিলেন সেখানকার মানুষ কেমন আছে

Dec 26, 2017 02:40 pm
রুদ্ধ নগরী বেথেলহেম

রুদ্ধ নগরী বেথেলহেম

মাইকেল ফিঙ্কেল


ঈসা (আ:) যেখানে জন্মেছিলেন, সেই বেথেলহেম এখন পৃথিবীর আতঙ্ক-স্পৃষ্ট শহরগুলোর একটি। এখানকার মানুষদের ভয় পায় ইসরাইলিরা। আর এখানকার মানুষ দেখে কারাগারের মতো উঁচু একটা দেয়াল ঘিরে রেখেছে তাদের। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকা অবলম্বনে লিখেছেন জুলফিকার হায়দার

মরিয়ম আর যোসেফ যেদিন বেথেলহেম ঢুকেছিলেন, সেদিন সামনে কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু এখন এই শহরে ঢুকতে এক দেয়ালের সামনে দাঁড়াতে হয়। নিরেট কংক্রিট, তিনতলা উঁচু, ধারালো তারে আবৃত দুর্ভেদ্য দেয়াল। এর পাশে দাঁড়লে মনে হয় কোনো বাঁধের কিনারে যেন দাঁড়ানো। অ্যাসল্ট রাইফেল কাঁধে ইসরাইলি সেনারা তোমাকে পরীক্ষা করবে। তোমার কাগজপত্র, যানবাহনসব। কোনো ইসরাইলিকেও এই দেয়াল পেরোতে দেয়ার নিয়ম নেই। বেথেলহেমের লোকদেরও বেরোতে দেয় না অ্যাসল্ট রাইফেল। ইসরাইলের সরকার বলেছে এটা নাকি সন্ত্রাস প্রতিরোধের দেয়াল।


বেথেলহেম থেকে জেরুসালেমের দূরত্ব ছয় মাইল। তবু কোন দুর্বোধ্য ভূগোলের মারপ্যাঁচে দুই শহর এখন দুই রাজ্যে। এক শহর থেকে আরেক শহরে পোস্টকার্ড পৌঁছুতে কখনো মাস পেরিয়ে যায়। বেথেলহেম পড়েছে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের এক যুদ্ধে এই মাটি কেড়ে নিয়েছিল ইসরাইল। অথচ এই শহর ফিলিস্তিনিদের। এখানকার ৩৫ হাজার অধিবাসীর বেশিরভাগই মুসলমান। ১৯০০ সালে এখানকার ৯০ শতাংশ জমিনজুড়ে ছিল খ্রিষ্টানরা। এখন তাদের সংখ্যা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এই পরিমাণও প্রতিদিন কমছে। খ্রিষ্টানরা চলে যাচ্ছে ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। এই শহর এখন সহিংসতার অন্ধকারে ডুবে আছে। বেথেলহেম আসলে এখন ছমছম আতঙ্কের একটি শহর।
ইসরাইলি সেনাদের অনুমতি মিললে স্টিলের একটি স্লাইড-ডোর খুলে যাবে সামনে। সাময়িক এই স্টিলগেট আর ইসরাইলি সেনাদের ফোকর গলে তোমার গাড়ি পেরিয়ে গেলেই আবার বন্ধ হবে গেট। এখন তুমি বেথেলহেমে।


জুডাইয়ান মরুভূমির প্রান্তে কতগুলো কাটা-গুল্ম ছাওয়া পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই শহর। পুরনো বাড়িগুলো ফ্যাকাসে হলুদ পাথরের। খাড়া-ঘিঞ্জি রাস্তায় ঘেরা। খুব অল্পসংখ্যক ট্যাক্সি এসব পাহাড়ি রাস্তায় চলাফেরা করে। উপরে উঠতে অনবরত হর্ন দিতে হয় ট্যাক্সিগুলোকে। মাঝে মাঝে চোখে পড়বে রেস্তোরা। ওখানে হয়তো মেষের গোশত কাবাব হচ্ছে আর প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ঘন আরব্য কফিতে চুমুক দিচ্ছে মানুষ। কেমন যেন বোটকা গন্ধ চারদিকে। পাহাড়ে উঠতে চোখে পড়বে সাপের মতো ধূসর আঁকাবাঁকা রেখা। শহরের বর্ধিষ্ণু সীমানার চিহ্ন ওগুলো। আর মাঝে মাঝে বোতলের মতো দাঁড়িয়ে পাহারাদারদের টাওয়ার।


বেথেলহেমের সীমানা বরাবর ফিলিস্তিনিদের তিন-তিনটি উদ্বাস্তু শিবির। বাক্সের মতো এপার্টমেন্টগুলো এলোমেলো গাদাগাদি দাঁড়িয়ে। উদ্বাস্তু শিবিরের ঢোকার রাস্তাগুলোর মোড়ে মোড়ে শহীদদের ছবি আর পোস্টার। কেউ তরুণ, কেউ যুবক, কেউবা এম-১৬ রাইফেল হাতে নির্বিকার দাঁড়িয়ে। তাদের অধিকাংশের জীবন ইসরাইলি বুলেটে স্তব্ধ হয়ে গেছে। কেউ হয়তো ইসরাইলি ট্যাঙ্কের নিচে মাইন-বুকে ঝাঁপিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে। পোস্টারে আরবিতে লেখা ওদের কীর্তিগাথা। দেয়ালের ওপারে ইহুদি বসতি। পাহাড় চূড়া আর উঁচু জায়গাগুলোতে নির্মানসামগ্রী আর ক্রেন দিয়ে ভর্তি। ব্যাঙের ছাতার মতো বাড়ছে এই বসতি। শেষ বিকেলের তীর্যক আলোয় এসব বিল্ডিংগুলো জ্বলে উঠলে বেথেলহেম শহরটিকে মনে হয় যেন আগুন দিয়ে ঘেরা।


বেথেলহেমের শীর্ষ পাহাড় চূড়ায় পাথরের তৈরি ম্যাঙ্গার স্কয়ার‘চার্চ অব দ্য নেটিভিটি’। তবে শহরের সবচেয়ে উঁচু আর আকর্ষণীয় স্থাপনাটি একটি মসজিদ। বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানগুলো দেখলে সমৃদ্ধ অতীতের কথা মনে পড়ে। পর্যটন তেমন জমতে পারেনি এখানে। ধর্মীয় পর্যটকরা এখানে ঢোকার অনুমতি পেলে গাইডরা তাদের কোনোমতে ম্যাঙ্গার স্কয়ার দেখিয়ে দ্রুত আবার পাথর দেয়ালের ওপারে জেরুসালেমে ঠেলে দেয়। বেশিরভাগ হোটেলই খালি। রাতে খুব কম পর্যটকই এখানে থাকে। মেয়রের হিসাবে শহরে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ। অনেক পরিবারই কোনোমতে খেয়ে-পরে বেঁচে আছে।


চার্চ অব নেটিভিটি যেন অনেকটা লুকিয়ে আছে। দেখতে হয়েছে দুর্গের মতো, কয়েক ফুট পুরু পাথরের দেয়াল আর সামনের দিকটা একেবারেই সাদামাঠা। হয়তো এজন্যই ১৪ শতাব্দী ধরে টিকে আছে। বেথেলহেম সুরম্য বিল্ডিং আর প্রাসাদের জায়গা নয়। এটা ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকার ব্যস্ততম সংযোগবিন্দু। প্রতিনিয়ত দখলদারদের আগ্রাসনে ক্ষত বিক্ষত। এখানে পা পড়েছে পার্সিয়ান, বাইজেন্টাইন, মুসলমান শাসক থেকেশুরু করে নিয়ে ক্রুসেডার, মামলুক, অটোম্যান, জর্ডানিয়ান, ব্রিটিশ আর ইসরাইলি সেনাদের। দখলদারদের অশ্ব আর উটের প্রবেশ বন্ধ করতেই হয়তো ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে এর প্রবেশদ্বার। এতটাই সঙ্কুচিত হয়েছে যে, শরীর ভাঁজ না করলে এখন আর এখানে ঢোকাই যায় না।


চার্চের ভেতরটা ঠাণ্ডা আর অন্ধকার। বাইরের মতোই বৈশিষ্ট্যহীন। চার সারি কলাম পেরিয়ে গেলে মূল বেদি। কোনাা বেঞ্চ নেই। আছে সস্তা কিছু ফোল্ডিং চেয়ার। বেদির নিচে চুনাপাথরের কয়েকটা ধাপ, ছোট্ট একটা গুহা। গ্রাম্য এলাকায় এখনো আছে ২ হাজার বছর আগেও এ ধরনের গুহাতেই গৃহপালিত পশুদের রাখা হতো। এখানে এই উষ্ণ গুহায়, ইহুদি বসতি আক্রান্ত দেয়ালের ভেতরে বন্দী, চারদিকে উদ্বাস্তু শিবিরে থকথকে, দুর্গম মিনারখচিত জঙ্গলে লুকানো প্রাচীন এই চার্চের মেঝের নিচে রাখা আছে একটি রূপালী নক্ষত্র। বলা হয়, এখানেই জন্মেছিলেন হজরত ঈসা (আ:)।


বেথেলহেমের মানুষ কেউ কুরআনের কথা বলে, কেউ বাইবেল কিংবা তোরাহ থেকে আওড়ায়। কেউ মাঠ দেখায় তো কেউ দেখায় জলপাই বাগান। কেউ বলে ইতিহাসের কথা, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকে। কেউ হাঁটু গেঁড়ে প্রার্থনা করে, কেউ সেজদা দিয়ে। কেউ পাথর ছোড়ে, কেউ ট্যাঙ্ক চালায়। কেউ হয়তো শরীরে বিস্ফোরক জড়িয়ে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু আরো গভীরে গিয়ে এদের ঘৃণা, রাজনীতি আর বিশ্ব কাঁপানো যুদ্ধের পর্দাটা যদি সরানো যায় তাহলে শুনবে এরা সবাই একটা কথাই শুধু বলছে এক টুকরো ভূখণ্ডের কথা বলছে। ধূলি-উড়া, বিশুষ্ক, পাথুরে এক টুকরো শহর বেথেলহেমের কথা বলছে।


ইহুদিরাই এখানে প্রথম এসেছিল বললেন রাব্বি মিনাকেম ফ্রোম্যান। ফ্রোম্যান থাকেন ইহুদি বসতি টেকোয়াতে। জায়গাটা মালভূমির মতো। ঝকঝকে কিছু রঙিন পাথরের বাড়ি। বাড়ির ছাদ লাল টাইলসের। অনেক বাড়ির সামনেই গাড়ি দাঁড়ানো। ১ হাজার ৫০০ মানুষের বাস এখানে। টেকোয়ার উত্তর কোনায় দাঁড়ালে পুরো বেথেলহেম নজরে আসে। দিনে পাঁচবার হিসাব কষে আজানের শব্দ এখান থেকেও শোনা যায়। দক্ষিণ দিকে জুডাইয়ান মরু-জঙ্গল। হজরত ঈসা (আ:) এখানেই ৪০ দিন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাটিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। জুডাইয়ান জংলার পরই নেমে গেছে একটা খাড়া ঢাল। দারুণ অসহিষ্ণু এই ঢাল নামতে নামতে এক বেপরোয়া গভীরে গিয়ে ডুবে গেছে মৃত সাগরে। পৃথিবীর নিম্নতম জায়গা এটাই।


‘এটা শুধু একটা ভূখণ্ড মাত্র নয়’, বলে চলল ফ্রোম্যান। তার দীর্ঘ সাদা দাঁড়ি অপ্রতিরোধ্য স্রোতের মতো উড়ছিল। ‘এটা পবিত্রতম মাটি। তেল, সোনা বা হীরা কিছুই নেই এখানে। উষর মরুভূমি, কিন্তু এটা স্রষ্টার জমিন।’ ৬২ বছরের ফ্রোম্যান ঝরঝর করে তার ১৭ পূর্বপুরুষের নাম বলতে পারেন। তারা সবাই ছিলেন রাব্বি। তার ছেলেও রাব্বি বটে।
ফ্রোম্যানের জন্ম বর্তমান ইসরাইলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই এলাকাকে বলা হতো ব্রিটিশ ম্যানডেট ফর প্যালেস্টাইন। বিশ্বযুদ্ধের পর হলোকাস্টের বীভৎসতা দেখে জাতিসঙ্ঘ এই অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করার পক্ষে ভোট দেয়। এক ভাগ ইহুদিদের, অন্য ভাগ আরবদের। ইহুদিরা প্রস্তাব লুফে নিলেও আরবরা তা মানতে পারেনি। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণার আগেই শুরু হয়ে যায় আরব-ইহুদি যুদ্ধ। ইতিহাসের কলঙ্কজনক এই যুদ্ধে সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছিল। ইসরাইলি আগ্নেয়াস্ত্রই এই অযুত ফিলিস্তিনিকে তাদের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করেছিল। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিল জর্ডান নদীর তীরে, তখনকার মিসর শাসিত গাজায়। পিতৃপুরুষের জমিন থেকে উৎখাত হয়ে সেই প্রথম উদ্বাস্তু হয় ফিলিস্তিনিরা ।


১৯৬৭ সালে ৬ দিনের এক বীভৎস যুদ্ধে মিসর, জর্দান, সিরিয়া, ইরাক আর লেবাননের বাহিনীকে পরাজিত করে ইসরাইল। অন্যান্য ভূখণ্ডের সাথে পশ্চিম তীরও দখলে আসে ইসরাইলের। বাইবেলের সূত্রে ইসরাইলিরা পশ্চিম তীরকে বলে জুডাইয়া আর সামারিয়া। দখলের পরপরই সাধের জুডাইয়া আর সামারিয়াতেও বসতি নির্মাণের তোড়জোর শুরু হয় ইহুদিদের।


একেবারে শুরুর দিকে যারা এখানে বসত গেড়েছিল, ফ্রোম্যান তাদেরই একজন। আর ১০ জন ইহুদির মতোই তার বিশ্বাস ইহুদিদের জুডাইয়া আর সামারিয়া দখলের কথা ওল্ড টেস্টামেন্টে লেখা আছে। তারাই এখানকার আসল মালিক। ফ্রোম্যান তাই মনে করে স্রষ্টার ইচ্ছাতেই তার এখানে বসবাসের অধিকার আছে। বেথেলহেমের বিস্তৃতি মূল শহর আর আশপাশের গ্রামগুলো নিয়ে। এখানকার ১ লাখ ৮০ হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে ২৫ হাজার খ্রিষ্টান। মানচিত্রে ইহুদি বসতি দেখা যায় ২২টি। ওখানকার জনসংখ্যা ৮০ হাজার হতে চলেছে। সাথে আছে ডজনখানেক ফ্রন্টিয়ার ধরনের অস্থায়ী কোয়ার্টার। মোবাইল-হোম ধরনের এই বসতিগুলোকে বলা হয় আউটপোস্ট।


টেকোয়ার বাড়ির জানালা গলে বেথেলহেমের দিকে তাকান ফ্রোম্যান। বলতে থাকেন কেন এই ‘টুকরো-ভূখণ্ড’ নিয়ে সবার কাড়াকাড়ি। ইহুদিদের বিশ্বাস তাদের মসিহ এখানেই আসবে। বেথেলহেমের ক্ষয়িষ্ণু মাটি আর ধুলাউড়া বাতাসে তারা সেই গন্ধ পান। খ্রিষ্টানরাও আছে যিশুর প্রত্যাবর্তনের অপোক্ষায়। যেখানে জন্মেছিলেন তিনি, প্রত্যাবর্তনও হবে সেখানে এই বিশ্বাসে তারাও আঁকড়ে আছে বেথেলহেম। মুসলমানরা কারো অপেক্ষায় নেই। তাদের আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তবে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের কাছেও এই জায়গা পবিত্র। কারণ তাদের এক নবী ঈসা (আ:) এখানেই জন্মেছিলেন। কিন্তু ইহুদিদের খোয়াব হলো বেথেলহেম, পশ্চিম তীর থেকে নিয়ে গাজা উপত্যকা আর জেরুসালেমজুড়ে একচ্ছত্র বসতি গড়বে তারাই।


জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস ঘোষণা করেছে ইহুদিদের এসব বসতি অবৈধ। দখল করা জমির নাগরিকদের উচ্ছেদ করে সেখানে বসতি গড়া জেনেভা কনভেনশনের পরিষ্কার লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, পশ্চিত তীরে বসত গড়ার জন্য ঋণও দিচ্ছে ইসরাইল। বেথেলহেমেও আছে এরকম বসতি। সবচেয়ে বড়টার নাম হার-হোমা। হার-হোমার ঝকঝকে হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো বেথেলহেমের মূল শহরের একেবারে সাথেই। রাস্তার এপাশ-ওপাশ যেন। হার-হোমা এখন জমজমাট শহরতলী। সহজ ঋণের সুবিধা নিয়ে ২ হাজার ইসরাইলি বাসা গেড়েছে এখানে। এদের প্রায় অর্ধেকই নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের অসংখ্য বিলবোর্ডও দাঁড়িয়ে গেছে এখানে। বিজ্ঞাপনের বক্তব্য অনেকটা এরকম ‘দামে সস্তা, জায়গাও চমৎকারকেউ কি আছে জেরুসালেম ছেড়ে এখানে আসার?’ এটা আসলে ইসরাইলি কৌশল। ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১৯৪৯ সালে যে তথাকথিত গ্রিন লাইন টেনে দুই দেশের মধ্যে জায়গা ভাগ হয়েছিল, এর পূর্বদিকে যত অল্প জায়গায় যত বেশি ইসরাইলি বাস করবে, সে জায়গা তত সহজে ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইসরাইলের ভাষায় এই কৌশলের নাম ‘ফ্যাক্টস অন দ্য গ্রাউন্ড’। ফিলিস্তিনিরা অবশ্য হার-হোমাকে ‘জাবাল-আবু-ঘুনেইম’ নামেই ডাকে। আদি এই আরবি নামের অর্থ হলো মেষপালকদের পাহাড়। এটা ছিল বেথেলহেমের শেষ উন্মুক্ত পাহাড়গুলোর একটি। পাইনগাছে ছাওয়া পাহাড়ের পাদদেশে পশু চড়াত রাখালরা। সেই বাইবেলের জন্মকালেও এটা চারণভূমিই ছিল। কিন্তু এই চারণভূমিতেই বিল্ডিং তৈরি শুরু হলো ১৯৯৭ সালে। পাহাড় কেটে বানানো হলো এপার্টমেন্ট। যেসব ফিলিস্তিনি এসব জায়গার মালিক ছিল, তাদের এজন্য এক কানাকড়িও দেয়া হয়নি। ইসরাইলিরা পাহাড়ের যে নাম দিয়েছে, হিব্র“ ভাষায় তার অর্থ ‘দেয়াল ঘেরা পাহাড়’।


বসতিটা এমনভাবে সাজানো- দেখে যাতে নিরাপদ মনে হয়। যেন শহরতলীর মরূদ্যান। কিন্তু আসলে তা নয়। জায়গাটা ফিলিস্তিনি শহরের এত কাছে যে, আক্রান্ত হওয়া খুবই সহজ। পাথরের আঘাতে এখানকার কোনো গাড়ির কাচ আস্ত ছিল না এক সময়। এখন কাচের বদলে পাথর প্রতিরোধী প্লাস্টিক লাগানো হয় গাড়িতে। দেয়াল নির্মাণের আগে যখন তখন বুলেট এসে বিঁধত এপার্টমেন্টগুলোর দেয়ালে। ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়া এই ফিলিস্তিনিরাই কখনো হয়তো কোনো ইহুদি বসতিতে আত্মঘাতী বোমা বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধরা পড়ে মারাও পড়ে ইসরাইলিদের গুলিতে। গুলি শুধু সেনারাই করে না, বেসামরিক ইহুদিরাও করে।


ছয় সন্তানের মা বেদেইন থাকেন ইফরাতে। বলছিলেন, বয়স্ক লোকেরা জীবনে যত না শেষকৃত্য দেখেছে, তাদের শিশুরা দেখেছে তার চেয়ে বেশি। তার সব সন্তানেরই বন্ধু, প্রতিবেশী, সহপাঠী কেউ না কেউ মারা গেছে। অর্থাডক্স ইহুদি হলেও মুসলমানদের মতো মাথায় স্কার্ফ পরেন বেদেইন। বললেন ‘একবার স্কুলবাসে বোমা হামলায় তিন শিশুর পা উড়ে যায়। মারা যায় দু’জন শিক্ষক। এর পর থেকে তার মেয়ে আর সহপাঠীরা স্কুলবাসে বসে আসনের ভঙ্গিতে। তাদের ধারণা বোমা হামলা হলে তাদের পা হয়তো বেঁচে যাবে।’ এত যে সঙ্ঘাত, তাহলে এই দখলি জমিতে আছেন কেন? জিজ্ঞেস করলেই ত্বরিত জবাব ‘আমরা এই জমিন ভালোবাসি।’ এই দিগন্ত, পাহাড়ি বাতাস, আর ইহুদিদের গুমোট-কঠিন কমিউনিটি এসবই ভালোবাসেন বেদেইনরা।


ইহুদিদের অনেকের কোমরেই আগ্নেয়াস্ত্র। নিজের বনে যেন নিজেই বাদশাহ। সিনাগগেও অস্ত্র নিয়ে যায় অনেকে। প্রার্থনার জন্য যখন হাত উঠায় তখন হোলস্টারে হ্যান্ডগান চকচক করে। পরিষ্কার বোঝা যায় নিরাপত্তার জন্য একক স্রষ্টারওপর তাদের আস্থা নেই মোটেই।


ঈসা (আ:) এর জন্মেরও হাজার বছর আগের কথা। বেথেলহেমকে বলা হতো ডেভিডের শহর। ইহুদিদের জাতশত্র“ গোলিয়াথকে পাথর মেরে হত্যা করেছিলেন এই ইহুদি নেতা। গোলিয়াথ ছিলেন ফিলিস্তিনি গোত্রের। বর্তমানের ফিলিস্তিন শব্দের আমদানিও ওখান থেকেই। যদিও শব্দগত মিল ছাড়া দুই জাতির মধ্যে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।


ক্ষমতায় কম থাকলেও ইহুদিরাই ছিল তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রথম শতাব্দীতে রোমানদের কাছে পরাজিত হয় ইহুদিদের কিছু দুর্বল আর অকার্যকর শাসক। পরাজিত ইহুদিদের পবিত্র ভূমি থেকে বের করে দেয় রোমানরা। পরের ২ হাজার বছর পৃথিবীর এখানে ওখানে ঘুরেছে তারা। কিন্তু পবিত্র ভূমিতে ফেরার ইচ্ছা তাদের কখনো মরেনি।


তত দিনে খ্রিষ্টান ধর্মের ভিত্তি শক্ত হয়েছে। চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিষ্টান ধর্ম রূপ নেয় রোমান সাম্রাজ্যের প্রধান ধর্মে। সেই সাথে বেথেলহেম হয়ে ওঠে খ্রিষ্টানদের পবিত্র জায়গাগুলোর একটিতে। ৩২৬ সালে রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম খ্রিষ্টান শাসক কনস্ট্যান্টাইনের মা হেলেনা বেথেলহেম সফর করেন। এর পরপরই সেখানে চার্চ অব দ্য নেটিভিটি নির্মাণ করেন কনস্ট্যান্টাইন।


হেলেনার সফরের পর রাজকীয় অর্থবিত্তের পাশাপাশি তীর্থযাত্রীদের যাওয়া-আসাও বেড়ে যায় বেথেলহেমে। শহরের আশপাশে বেশ কিছু গির্জাও তৈরি হয় সে সময়। এরপর আসে মুসলমানরা। ১৭ শতাব্দীর শুরুতে বর্তমান সৌদি আরবের মক্কায় ইসলামের বাণী নিয়ে আসেন মোহাম্মদ (সা:)। তার মৃত্যুর এক শতাব্দীর মধ্যেই গোটা আরবে ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম।


বহু শতাব্দী ধরে বেথেলহেম ছিল মূলত খ্রিষ্টান শহর যদিও প্রতিনিয়ত মুসলমানদের সংখ্যা সেখানে বাড়ছিল। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ঢল নামলে মুসলমানদের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। তবু খ্রিষ্টানদের সংখ্যাই বেশি ছিল, অন্তত ১৯৬৭ পর্যন্ত। কিন্তু ইসরাইলের বর্বর বিজয় জটিল করে দিলো এই শহরের হিসাব নিকাশ। একদিকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি গাড়তে শুরু করল ইহুদিরা। অন্য দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে খ্রিষ্টানদের দেশ ছাড়ার মাত্রাও গেল বেড়ে, যার শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরকালে। আর মাটি আঁকড়ে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলল ফিলিস্তিনি মুসলমানরা। বেথেলহেমের সরল-স্বাভাবিক-শান্তিপূর্ণ যুগের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির আগের কাহিনী। ম্যাঙ্গার স্কয়ারের কাছেই যে আল-আমাল রেস্টুরেন্ট, এখানকার বেশিরভাগ খদ্দেরই ছিল ইহুদি। চিকেন-পেস্ট সবজি কিংবা শর্মা- স্যান্ডউইচ খেতে আসত তারা। কিংবা মেষের গোশতভরা গরম রুটি। বেথেলহেমে এমনকি বাজারও করত ইহুদিরা। এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভালো সবজি বেথেলহেমেই পাওয়া যায় কিনা।


কিন্তু ইসরাইলি আগ্রাসন ফিলিস্তিনিদের অপমান আর মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিলো। ঘৃণিত শত্র“র ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল আত্মসম্মানে গর্বিত একটি জাতি। ইসরাইলি সামরিক আইনের করুণায় যেন বেঁচে থাকতে হয় ফিলিস্তিনিদের। বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ নেই। আগ্রাসী বাহিনীকে করও দিতে বাধ্য তারা। দুই দশক এই অমানবিক অপমান-নির্যাতনের ফল হিসেবে ১৯৮৭ সালে জন্ম নিল ইন্তিফাদা এক অনিবার্য অভ্যুত্থান। এখন ইসরাইলি ট্যাঙ্কের বিপরীতে নুড়ি-পাথর হাতে নির্ভিক দাঁড়িয়ে থাকে ফিলিস্তিনি কিশোর। এ যেন সেই প্রাগৈতিহাসিক ডেভিড আর গোলিয়াথেরই আধুনিক রূপ।


ইন্তিফাদা তীব্র হলে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয় ইসরাইল। তখন ১৯৯৩ সাল। ওসলো চুক্তি স্বার হলো । কিন্তু চুক্তি ঠিক রাখেনি কোনো পই। ফল আরেকটি ইন্তিফাদা। ২০০০ সালের সেই অভ্যুত্থান ছিল আরো তীব্র। ইসরাইলি সেনা শেল বর্ষণ করেছে ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে। বেসামরিক ইহুদিরা হামলা করেছে গ্রাম আর খামারগুলোতে। প্রতিরোধে সীমিত সামরিক শক্তি নিয়েই ইসরাইলি সেনা আর ইহুদি বসতিতে বারবার প্রত্যাঘাত হেনেছে ফিলিস্তিনিরা। বাধ্য হয়েই দুই বছর পর দেয়াল নির্মাণ শুরু করে ইসরাইল। এখন ইহুদি বলতে শুধু ইসরাইলি সেনারাই প্রবেশ করে বেথেলহেমে। প্রবেশ করে সুসজ্জিত সামরিক যান নিয়ে, আগ্নেয়াস্ত্র থাকে সবসময়ই উদ্ধত, প্রস্তুত।


আল-আমাল রেস্টুরেন্টের মালিক ওমর শাওরিয়া। ৫৩ বছরের এক মুসলমান। মানুষটা ছোটখাটো, গোছানো দাঁড়ি আর চোখজোড়া যেন ভীষণ ভারী। রেস্টুরেন্টের ডেকোরেশনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে শহীদের একটা পোস্টার হালকা নীল পোলো শার্ট পরা কোঁকড়া চুলের এক বালক। ‘ওটা ওর স্কুলের পোশাক’, বলল শাওরিয়া ছবিটা তার ছেলের।


বছরখানিক আগে ইসরাইলি সেনারা ম্যাঙ্গার স্কয়ারে ঢুকেছিল এক সন্দেহভাজন মিলিশিয়ার খোঁজে। ডজনখানেক সুসজ্জিত সামরিক জিপ নিয়ে এসেছিল প্রায় এক প্লাটুন সেনা। তখন মাত্র বিকেলের শুরু। ১৩ বছরের মোহাম্মদ শাওরিয়া বাবার রেস্টুরেন্টে এসেছিল টাকা নিতে। চুল কাটাতে হবে। এ দিকে ইসরাইলিদের প্রবেশ খেপিয়ে তুলেছিল ফিলিস্তিনিদের। সেনাবহরে পাথর ছুড়তে শুরু করেছে তখন অনেকে। ফল সঙ্ঘর্ষ আর ইসরাইলি সেনাদের গুলিবর্ষণ।


কৌতূহলী মোহাম্মদ চলে গিয়েছিল ম্যাঙ্গার স্কয়ারের কাছে। ছেলেকে আশপাশে না দেখেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল ওমর। ‘দৌঁড়ে গেলাম ছেলের খোঁজে। কিন্তু আমি পৌঁছার আগেই ইসরাইলিদের বুলেটের ছোবলে পড়েছিল সে’, বলল সে। শরীরের একপাশে গুলি লেগেছিল মোহাম্মদের। ফুটো হয়ে গিয়েছিল লিভার। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রক্তরণে নিভে যায় মোহাম্মদের প্রাণ।


পরদিন বেথেলহেমের উপকণ্ঠে গোরস্থানের এক অ্যালমন্ড গাছের ছায়ায় কবর দেয়া হয় মোহাম্মদকে। অনেক মানুষের ভিড় হয়েছিল সেদিন। বিলি করা হয়েছিল মোহাম্মদের ছবিওয়ালা পোস্টার। পরে স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হয় চার্চ অব দ্য নেটিভিটির কাছে, যেখানে মোহাম্মদ গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। কথিত আছে, ২ হাজার বছর আগে রাজা হেরোড যেসব শিশুকে হত্যা করেছিল তাদের হাড়-হাড্ডি এখানেই ভূ-গর্ভস্থ এক শবাগারে গাদা করে রাখা হতো।


দুই পই দায়ী করে দুই পকে। ওমর শাওরিয়ার মতো ভুক্তভোগীরা সমালোচনা করে ইসরাইলি সামরিক নীতির। তাদের সশস্ত্র অনুপ্রবেশ আর ত্বরিত গুলিবর্ষণ কৌশলের। ইসরাইলি সেনারা বলে সন্ত্রাসীরা তাদের হত্যার চেষ্টা না করলে তাদের ম্যাঙ্গার স্কয়ারে ঢুকতেই হতো না। যতই দোষারোপ-পাল্টা দোষারোপ হোক, সত্য বড় নির্মম। প্রথম ইন্তিফাদা শুরুর পর এ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি মারা গেছে ৫ হাজার ৬০০ ’রও বেশি। ইসরাইলি মরেছে ১ হাজার ২০০। প্রতিদিনই বাড়ছে এই সংখ্যা।


মধ্যপন্থীরাও আছে বেথেলহেমে। ইহুদি, মুসলমান আর খ্রিষ্টানদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা যূথবদ্ধ শান্তির স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাস্তবতা ভীষণ কঠিন। ফিলিস্তিনিরা ইহুদিদের বাজারে সামান্য একটা পণ্য পর্যন্ত বিক্রি করতে পারে না। একইভাবে ফিলিস্তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদিবাদের ওপর কোনো লেকচার দেয়ার জো নেই। ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইলিদের সাক্ষাৎ এখন শুধু চেকপয়েন্টেই হয়। অধিকাংশ ইসরাইলি সেনাই সেখানে থাকে ভারী বুলেটপ্র“ফ পোশাকে ঢাকা। মুখোশের কাচটা এমনই পুরু যে, চেহারা পর্যন্ত ঘোলাটে দেখায়।


হতাশার বিস্ফোরণ দেখা যাবে উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে। ইসরাইল রাষ্ট্রের পত্তনের কালে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল যেসব ফিলিস্তিনি, তারাই বংশ পরম্পরায় ভীষণ এক ক্রোধ আর দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে টিকে আছে এসব উদ্বাস্তু শিবিরে। বাড়ি কোথায় জানতে চাইলেই এরা যেসব শহরের নাম বলে, ইসরাইল হয়তো সেসব শহর মানচিত্র থেকেই মুছে ফেলেছে। পুরাণের গল্পের মতো এরা ফেলে আসা মিঠা পানি আর সবুজ দিগন্তের গল্প বলে। কেউ হয়তো মেলে ধরে মরচেধরা চাবির গোছা- ইসরাইলের অপজন্মের আগে যেগুলো দিয়ে ঘরের তালা খুলত তাদের পূর্বপুরুষরা।


‘উদ্বাস্তু শিবিরের প্রতিটি ইট-পাথর পর্যন্ত ইহুদিদের ঘেন্না করে’, বলছিল ২৮ বছরের আদেল ফারাজ। দুহেইশা ক্যাম্পে ছোট্ট একটা দোকান আছে তার। ক্যাম্পটা বেথেলহেমের পাহাড়গুলোর গোড়ায়। ক্যাম্পের আধা বর্গ কিলোমিটার জায়গায় ১০ হাজার লোকের বাস। সরু-চাপা গলিপথগুলো যুদ্ধের চিত্রকর্মে খচিত। ভাঙা কাচের ভেতর দিয়ে শিশুরা হাঁটে। খোলা স্যুয়ারেজ লাইন থেকে ময়লা গড়াচ্ছে হয়তো কোথাও। এই এলাকায় অন্তত দু’জন আত্মঘাতী যোদ্ধার খবর মিলে। এদের একজন ছিল কিশোরী।


প্রসাধনী, ল্যাম্প আর সিডি বিক্রি করে ফারাজ। লম্বাটে মুখ, কোঁকড়া চুলে জেল দিতে ভালো লাগে তার। ঘন ভ্রর নিচে জ্বলজ্বলে একজোড়া চোখ। একটা পাইপ আছে তার দোকানে। দিনভর আপেল-গন্ধী তামাক টানে সে। ‘এই ক্যাম্পে কোনো ইহুদি এলে সে মারবেই। হয় পাথরের আঘাতে। নইলে ছুরি বা বন্দুকের গুলিতে। সে যেই হোক না কেন। ইহুদি তো ইহুদিই,’ বলল ফারাজ।


তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ফারাজ জানাল তার বন্ধু মোহাম্মদ ছিল আত্মঘাতী। ২০০২ সালের মার্চে ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ দারাঘমেহ জেরুসালেমের এক সিনাগগের কাছে আত্মঘাতী বোমায় নিজেকে উড়িয়ে দেয়। ওই বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিল ১১ জন। এসব কথার ফাঁকে সিডি প্লেয়ারে গান চড়িয়ে দিলো ফারাজ। বব মার্লির গান। প্রথম ট্র্যাকটা বেজে উঠল: “ইজ দিস লাভ?”


‘বন্ধুকে নিয়ে গর্ব করি আমি’, বলে চলল ফারাজ। ‘বীরের মতো কাজ করেছে মোহাম্মদ। ইসরাইলই আমাদের আত্মঘাতী হতে বাধ্য করেছে। আমাদের কিছুই দেয়নি তারা। কিছু না থাকলে কিছু হারানোরও ভয় থাকে না।’


আর যাদের হারানোর কিছু আছে, স্ত্রী বা সন্তান আছে, সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই খুব ভোরে বেথেলহেমের দেয়ালের পাশে লাইনে দাঁড়াতে হয় তাদের। ইসরাইলি এলাকায় কাজ খুঁজতে যায় তারা। লাইনে দাঁড়ানোর জায়গাটা পশু-পাখি রাখার স্টিলের খাঁচার মতো। তারা অপোয় থাকে কখন তাদের তল্লাশি হবে, ধাক্কাধাক্কি হবে, আঙ্গুলের ছাপ আর মেটাল ডিটেক্টরের দেয়াল পেরোনো হবে। কাপড় পর্যন্ত খুলতে হয় অনেককে। এই বাছাই চলে প্রায় ২ ঘণ্টা। চেকপয়েন্ট পেরোনোর ন্যূনতম যোগ্যতা হলো স্ত্রী আর কমপক্ষে এক বা একাধিক সন্তান থাকতে হবে। একমাত্র এরাই দিনশেষে বেথেলহেমে ফিরবে বলে মনে করে ইসরাইলি সেনারা।


অনেকেই ইহুদি বসতিতে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে। শত্র“র ঘর নির্মাণের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা এদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। ঘর নির্মাণ হয় সেই জমিতে, যেই জমি এক দিন তাদেরই ছিল। দিন শেষে ৩৫ ডলার মজুরি নিয়ে পাথুরে দেয়াল গলে বেথেলহেম ফিরে আসে এরা।


সূর্য ওঠার তখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। অনেকের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে ৩৫ বছর বয়সী সুফিয়ান সাবাতিন। কার্বন বাতির তীব্র আলোয় অন্যরকম নির্বিকার দেখাচ্ছিল তাকে। হাতে কাগজের ব্যাগে রুটি আর হাম্মাস। এই নির্মাণ কাজ আর ভালো লাগে না তার। এখানে যা পায় তার অর্ধেক মজুরি দিলেও বেথেলহেমের ভেতরে যেকোনো কাজ করতে রাজি সে। কিন্তু বেথেলহেমের ভেতরে কোনো কাজ নেই। সপ্তাহের সাতটি দিনই বিস্বাদ হয়ে গেছে সাবাতিনের কাছে: ‘বিছানা থেকে কাজ আবার কাজ থেকে বিছানা। এটা কোনো জীবনই না।’


ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, সামান্য কিছু ইহুদিদের সুবিধার জন্য দেয়ালে ঘিরে পিষ্ট করা হচ্ছে পুরো একটা জাতিকে। তাদের মতে এই সবকিছুর জন্য ইসরাইলিরাই দায়ী। ১৯৬৭ সালে দুর্লভ পানির সব উৎস আর উর্বর জমি দখল করে ইচ্ছেমতো নতুন সীমানা এঁকেছে ইসরাইল। বেথেলহেম শহরকে গুঁজে দেয়া হয়েছে সাত বর্গমাইলের ছোট্ট এক বাক্সে। তিন দিকে এর দেয়ালের বাধা।


দেয়াল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। কড়া সামরিক পাহারায় দিন-রাত কাজ করছে দৈত্যাকার সব নির্মাণ যন্ত্র। কাজ শেষ হলে দেয়ালের দৈর্ঘ্য হবে ৪৫০ মাইল। সে দেয়াল পশ্চিম তীরের ১৫ মাইল ভেতর দিয়ে গাঁথা। দেয়াল নির্মাণ শেষ হলেই ফিলিস্তিনের ১০ শতাংশ অনায়াসে চলে যাবে ইসরাইলের পেটে। ইসরাইল অবশ্য দাবি করে এ দেয়াল স্থায়ী নয়। দুই পরে শান্তি চুক্তি হলেই দেয়াল ভেঙে দেয়া হবে। ফিরিয়ে দেয়া হবে দখল করা জমি। দেয়ালকে দেয়াল বলতেই রাজি নয় ইসরাইল। তাদের ভাষায় এটা ‘নিরাপত্তা বেষ্টনি’। নমুনা স্বরূপ পশ্চিম তীরের অনেক জায়গায় বিদ্যুতায়িত প্যাঁচানো তারের দেয়াল গড়ে তুলেছে তারা। কিন্তু বেথেলহেম ঘিরে যে দেয়াল, সেটা ভীষণ অন্যরকম। ইসরাইলি কোনো কারাগারেরও এত উঁচু দেয়াল নেই।


কংক্রিটের এই দেয়াল কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে ইসরাইলিদের জীবনে। আগের চেয়ে নিরাপদ মনে করে তারা নিজেদের। কিন্তু ফিলিস্তিনি নেতারা বলছেন, দেয়াল দিয়ে আত্মঘাতী যোদ্ধাদের রোখা যাবে না। এখন হামলা কম হচ্ছে, কারণ হামাসসহ ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো শান্তি আলোচনা শুরুর আশায় প্রতিরোধ বন্ধ রেখেছে। ফিলিস্তিনিদের কথা খুব পরিষ্কার যে মরতে চায়, কোনো কংক্রিটের দেয়াল তাকে রুখতে পারে না। আর ইচ্ছা করলে প্রতি ঘণ্টাতেই জেরুসালেমে আত্মঘাতী যোদ্ধা পাঠাতে পারে তারা।


বেথেলহেমের গভর্নর সালাহ আল-তামারি অবশ্য পুরো ব্যাপারটা দেখেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তিনি মনে করেন ইসরাইলিরা দেয়ালে ঘিরে ফিলিস্তিনিদের মানসিকভাবে পরাজিত করতে চায়, যাতে তারা নিজ থেকেই এই ভূখণ্ড ছেড়ে যায়। ‘কিন্তু তা হওয়ার নয়’, বললেন আল-তামারি। তার মতে বরং উল্টোটাই ঘটবে। জনসংখ্যার সাধারণ হিসাবে ইসরাইলিরাই হেরে যাবে এক দিন। ইহুদিদের চেয়ে গড়ে মুসলমানদের সন্তান সংখ্যা বেশি। এক ইসরাইলি সেনা বলেছিল, ‘ফিলিস্তিনি মায়েদের গর্ভই হলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্র।’ সেই হিসাবে ২০১০ সাল নাগাদ সমান সমান হয়ে যাবে ইসরাইল আর ফিলিস্তিনিদের জনসংখ্যা। তারপরই বাড়তে থাকবে ফিলিস্তিনি পারমাণবিক বোমার সংখ্যা।


‘এখানেই থাকব আমি। আমার সন্তানরাও এখানে থাকবে’, বললেন আল-তামারি। ‘ভবিষ্যতে বিশ্বাস করি আমি। ইসরাইলিদের পতন হবেই। এই দেয়াল ভেঙে পড়বে। হয়তো ১০ বছরে, হয়তো ৫০ বছরে। জানি না কখন। কিন্তু পতন এক দিন হবেই।’


বেথেলহেমের খ্রিষ্টানদেরও আলাদা পরিচয় নেই। ইসরাইলিদের চোখে তারাও ‘ফিলিস্তিনি’। পশ্চিমাদের মতো পোশাক-পার্বণ এখন খ্রিষ্টানদের। অন্য দিকে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও ধর্মীয় বিধিনিষেধ আছে মুসলমানদের। তবু সরকারি বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল সবখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে মুসলমান আর খ্রিষ্টানরা। এরপরও বেথেলহেমে খ্রিষ্টানরা যেন দিন দিন বহিরাগত হয়ে যাচ্ছে। গত সাত বছরে প্রায় ৩ হাজার খ্রিষ্টান বেথেলহেম ছেড়ে পশ্চিমে পাড়ি জমিয়েছে। বেথেলহেমের খ্রিষ্টানরাও তিনভাগে ভাগ হয়ে আছে। চার্চ অব দ্য নেটিভিটির প্রতিটি ইঞ্চি নিয়ে বিতণ্ডা আছে গ্রিক অর্থাডক্স, রোমান ক্যাথলিক আর আর্মেনিয়ান অর্থাডক্স খ্রিষ্টানদের মধ্যে। পর্যটকদের চেয়েও চার্চের প্রহরীদের বেশি সামলাতে হয় এসব যাজকদের পারস্পরিক ঠোকাঠুকি। ক্রিসমাসের দিনণ নিয়েও আছে বিবাদ। এক দল বলে ক্রিসমাস হলো ৬ জানুয়ারি। অন্যরা উৎসব করে ২৪ ডিসেম্বর। আর্মেনিয়ান অর্থাডক্সদের কাছে আবার ১৮ জানুয়ারিই সঠিক দিন। বেথেলহেমে বছরে ক্রিসমাস আসে তাই তিনবার।


কিন্তু আপনি ক্রিসমাস পালন করুন বা না করুন, কিংবা ধর্ম আপনার কাছে আদৌ কোনো গুরুত্বের বিষয় হোক বা না হোক, আপনার মনে হবে লোবান আর মোমের গন্ধমাখা চার্চের মেঝের নিচে কিছু একটা যেন আছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন পর্যটক আসে এখানে। অনেকেই ১৪টি ধাপ গুনে নেমে যায় মাটির গভীরে। নিজের অজান্তেই হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে কেউ। কেউ প্রার্থনা করে, গান গায়, কাঁদে, কেউবা নেটিভিটির এই কেন্দ্রবিন্দুতে এসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। প্রত্যেকদিনই এটা ঘটছে, প্রতিটি দিন।


গুহার ঠাণ্ডা অস্বস্তিকর বাতাসে ইতিহাসের গন্ধ ভাসে। বেথেলহেমের সংঘাতের ইতিহাস খুব সহজেই পৃথিবীর লাখো কোটি মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। এখানকার কোনো বিস্ফোরণে বড় ধরনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে সারা পৃথিবী। বেথেলহেমের মেয়র বলছিলেন তার বিশ্বাসের কথা: ‘এই শহরকে খুব সহজেই পৃথিবীর কেন্দ্র ভাবা যায়। এখানে স্থিতি আসবে না তা হতেই পারে না। পৃথিবীতে শান্তি যদি কখনো আসে, তার শুরুটা হতে হবে এখানেই।’