জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের বন্ধু কে এই নিকি হ্যালি

Dec 23, 2017 02:34 pm
নেতানিয়াহু ও নিকি হ্যালি

ফরহাদ মজহার

জাতিসংঘে জেরুজালেম নিয়ে যে ভোটাভুটি হোল তাতে আমরা যথার্থই নৈতিক ভাবে আপ্লূত।

কিন্তু অতোটুকুই। তাহলে কী করব? নিদেন পক্ষে বাস্তবতার দিকে নজর দিতে শিখুন। বিশ্ব রাজনীতির কুশীলবদের জানুন, অন্তত ঘটনার কিছু ব্যাখ্যা পাবেন।

নিম্রাতা রান্ধোয়া ১৯৯৬ মাইকেল হেলিকে বিয়ে করে নিকি হেলী (Nikki Haley) হয়েছেন। বাবা মা শিখ কিন্তু তাঁরা মার্কিন নাগরিক। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে জাতিসংঘের মার্কিন রাষ্টদূত হিসাবে নিয়োগের জন্য পছন্দ করলে সিনেট ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ তার অনুমোদন দেয়।

আমেরিকান-ইসরায়েলি পাব্লিক এফেয়ার্স কমিটির (AIPAC) কাছে নিম্রাতা খুবই প্রিয় মানুষ। রাজনৈতিক সংগঠনকে চাঁদা দেওয়ার মার্কিন ট্যাক্স বিধি (IRS) ৫২৭ মেনে নিকি হ্যালী যে অর্থ সংগ্রহ করেছেন, তার বড় একটি অংশই এসেছে ইসরায়েলের সমর্থকদের কাছ থেকে। যেমন, কচ ইন্ড্রাস্ত্রিস, ক্যাসিনো মোগল হিসাবে খ্যাত মার্কিন ইহুদি ব্যবসায়ী শেলডন এডেলসন (Sheldon Adelson), ইত্যাদি।

শেলডন এডেলসন ইসরায়েলি প্রধান মন্ত্রী নেতাইয়ানহুর ঘোর সমর্থক; গত বছর (২০১৬) মে থেকে জুনে শেল্ডন এডেলসন নিকি হ্যালির সংগঠনে চাঁদা দিয়েছে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার (২৫০,০০০) ডলার। তাছাড়া খবর হোল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইনগরাল কমিটিকে শেলডন এডেলসন চাঁদা দিয়েছে ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বৃহৎ চাঁদার পরিমান।

অনেকেই তাই মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা এবং সেখানে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের পেছনে জুয়ার টাকা ও মাফিয়া মোগলদের ভূমিকা রয়েছে। মার্কিন কূটনীতির দিক থেকে আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হলেও বিশ্বপুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কিভাবে কাজ করে – বিশেষত রাষ্ট্র, রাজনীতি, নৈতিকতা ইত্যাদির উর্ধে কিভাবে মাফিয়া পুঁজি বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী সক্রিয় তা না বুঝলে মাফিয়া-মার্কিন-ইসরায়েলি তৎপরতার মাজেজা আমরা ধরতে পারব না।

‘মাফিয়া পুঁজি’ বা ‘মাফিয়া রাষ্ট্র’ ইত্যাদিকে গালি হিসাবে নেবেন না; নিউ লিবারেলিজম বা নয়া উদারবাদ অর্থনীতির উপর রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার ছিন্ন করেছে সেই গত শতাব্দির আশির দশকে; মাফিয়া পুঁজির করাল গ্রাস থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা সবচেয়ে গণমুখী রাষ্ট্রের জন্যও কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে।

অন্যদিকে ডলার হিসাবে আমরা বিশ্বমূদ্রা হিসাবে যা দেখি তা মার্কিন টাঁকশালে ছাপা কাগজ মাত্র। বোঝার চেষ্টা করুন কিভাবে স্রেফ ছাপাখানার কাগজ বিশ্বমূদ্রা হিসবে কাজ করে এবং মাফিয়া পুঁজি রাষ্ট্রের আইন ও বিধিবিধানের বাইরে বিশ্ব পুঁজির বিচলন চক্রে কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করে ও মুনাফা কামায়। যুদ্ধলাগিয়ে দেওয়া মাফিয়া পুঁজির মুনাফা কামানোর শ্রেষ্ঠ উপায়, কারণ যুদ্ধ রাষ্ট্র, আইন, বিধিবিধান, নৈতিকতা মানে না।

ইতিমধ্যে ফোরাত নদির পানি বহুদূর গড়িয়েছে এবং সুন্নিরা শিয়া এবং শিয়ারা সুন্নিদের ভূপৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত করে দেবার সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেদের সাচ্চা মুসলমান প্রমাণ করতে চাইছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে শেলডন এডেলসন ও নেতাইয়ানহু যদি জেরুজালেম দখল করে নেয় তাতে অবাক হবার কিছুই নাই। হয়তো শেলডন জেরুজালেমে হোটেল ও ক্যাসিনো ব্যবসার স্বপ্ন দেখছেন। খোদ মক্কায় যদি পবিত্র কাবাঘরের দিগন্ত আচ্ছাদিত করে বিশাল বিশাল হোটেল হতে পারে, তাহলে শেলডন এডেলসন জেরুজালেমে ক্যাসিনো ও হোটেল ব্যবসা চালাতে পারবেন না কেন?

কোন রাষ্ট্রই বর্তমান কালে মাফিয়া পুঁজির বাইরে নয়, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তানও নয়। খামাখা রাজনীতিবিদদের গালি না দিয়ে মাফিয়া পুঁজির খোঁজ নিন।