বসনিয়ার মানুষ এখন কেমন আছে

Dec 14, 2017 03:08 pm
প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে নগরীটি

 

উগ্র সার্ব জাতীয়তাবাদীদের আগ্রাসনে তছনছ হয়ে গিয়েছিল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভো। এখন আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে নগরীটি। বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করে গড়ে ওঠা নগরীটি সফর করেন যশুয়া হ্যামার। ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ থেকেভাষান্তর করেছেন আসিফ হাসান

 

 

 এক রোববারের উজ্জ্বল সকালে আমার বন্ধু সেনাদ স্লাতিনা প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে সারায়েভোর প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। পিঠে ব্যাগ চাপানো অস্ট্রেলিয়ান, ভবঘুরে ভিখারি, হিজাব পরা মহিলা, ইউনিফর্মধারী ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সৈন্যদল, যুবক, ধর্মনিরপেক্ষ বসনিয়ান মুসলমান - সবাই সেখানে জড়ো হয়েছে। পায়ে চলা রাস্তাটি সুইট কর্নার নামে পরিচিত আইস-ক্রিমের দোকানগুলোর পরে মাত্র চার মিটারের সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু হ্যাপসবার্গ ভিয়েনার ঐতিহ্য ছাড়িয়ে সেখানেই দেখা গেল টলমল করা লাল-টাইলসের ছাদওয়ালা বাড়ি, ধাতবসামগ্রী প্রস্তুতের আয়োজন; তুর্কি কফি হাউস; পাথুরে মিনারযুক্ত মসজিদ সব কিছু ওসমানিয়া সাম্রাজ্যর প্রতিচ্ছবি।


আমি পুলকিত হলাম। মনে হবে না বছর দশেক আগে সর্বগ্রাসী একটি যুদ্ধ এখানে হানা দিয়েছিল। পাশ দিয়ে বয়ে চলা মিলায়াকা নদীর তীর আর কাছের পাহাড় থেকে সার্বরা অবিরাম গুলি ছুড়ত শহরটিতে। প্রতি সপ্তাহে কোভাচি পার্কে শত শত লোককে কবর দেয়া হতো। এখন সবটাই একটা দুঃস্বপ্ন মনে হয়। অনেক বছর ধরেই বসনিয়া হার্জেগোভিনায় যুদ্ধ নেই এবং সারায়েভো তার জীবন ফিরে পেয়েছে। নগরীটি এখন দেশ-বিদেশের পর্যটকে মুখরিত। স্থানীয় শিশুরা রাস্তায় ছোটাছুটি করছে। ইউরোপের যেকোনো প্রাণবন্ত নগরীর একটি শপিং এলাকা মনে হবে এটিকে।


আবারো বলতে হয়, সারায়েভো এখন শৌখিন ইতিহাসবিদদের ভিড়ে ঠাসা। ইতিহাসের সূত্রগুলো এখানে ছড়িয়ে আছে। ওসমানিয়া সাম্রাজ্যর অধিপতি, হ্যাপসবার্গের রাজপুরুষ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সার্ব রাজা আলেক্সান্ডার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্ষমতা দখল করা নাৎসিদের পর কমিউনিস্ট সবাই এখানে উপস্থিত। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে এমন ব্যতিক্রমধর্মী শহর বিশ্বে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে বিভাজিত এমন শহরও আর নেই। এখানে গতিশীল ইউরোপের সাথেই অবস্থান করছে অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এশিয়া। খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যের পাশেই রয়েছে ইসলামি প্রাচ্য।

তবে আমার বন্ধু স্লাতিনাকে (৪১) এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য খুব একটা উদ্দীপ্ত করে না। সাবেক এই সাংবাদিক এখন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ওসমানিয়া পরিমণ্ডলকে আত্মস্থ করলেও সে এখনো যুদ্ধের ক্ষত ভেতর থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।
দেড় হাজারেরও বেশি বছর ধরে সারায়েভো জাতিগত ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার জন্য পরিচিত। আর এটাই ১৬ বছর আগে স্লাতিনাকে আকৃষ্ট করেছিল। একজন তুর্কি জেনারেল ১৪৬১ সালে মিলায়াকা নদীর তীরে নগরীটি গড়ে তুলেছিলেন। এটি ছিল ওসমানিয়া-শাসিত বসনিয়ার রাজধানী। বলকানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শহরটির পূর্ব দিকে ছিল গোঁড়া সার্বিয়া এবং উত্তর ও পশ্চিম দিকে ছিল ক্যাথলিক ক্রোয়েশিয়া। ওসমানিয়া এবং তাদের উত্তরসূরি হ্যাপসবার্গ শাসনামলে মুসলিম, ক্রোট, সার্ব ও ইহুদিরা পারস্পরিক সম্প্রীতির সাথে বসবাস করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে মার্শাল জোসেফ টিটো ‘ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের’ স্লোগান দিয়ে কঠোর হাতে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসেডোনিয়া, স্লোভেনিয়া, মন্টেনেগ্রোর সাথে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে নিয়ে একটি মিশ্র জাতির বৃহত্তর যুগোস্লাভিয়া গড়ে তোলেন।
১৯৮০ সালে তার মৃত্যু এবং এর পরপরই স্লোবোদান মিলোসেভিচের উত্থানের ফলে যুগোস্লাভিয়ায় সহিংসভাবে ভেঙে পড়া ত্বরান্বিত হয়। বার্লিন প্রাচীর যখন ধসে পড়ছিল আর পূর্ব ইউরোপ সমাজতন্ত্রের শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছিল, তখন উগ্র সার্ব জাতীয়তাবাদী মিলোসেভিচ তার ক্ষমতা সুসংহত করছিলেন।

জাতীয়তাবাদ আর স্বাধীনতার জ্বরে একের পর এক প্রজাতন্ত্র আক্রান্ত হচ্ছিল। যুগোস্লাভিয়ার প্রধান প্রজাতন্ত্র সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিলোসেভিচের নাম ঘোষিত হয় ১৯৮৯ সালে। তিনি ভেঙে পড়া দেশটি জুড়ে নিজস্ব ছিটমহল গড়ে তোলার জন্য সার্বদের প্রতি আহ্বান জানালেন।


স্লাতিনা সার্বিয়ার একটি মুসলিম প্রাধান্যপূর্ণ এলাকায় জন্মেছিলেন এবং বেড়ে উঠেছিলেন। যুগোস্লাভিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগদানের বাধ্যতামূলক নির্দেশ এড়াতে তিনি ১৯৯২ সালের মার্চে সারায়েভো পালিয়ে আসেন। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ছিল মুসলমান (মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ), সার্ব (৩২ শতাংশ) ও ক্রোটদের (১২ শতাংশ) নিয়ে গঠিত এবং এর রাজধানী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। স্লাতিনার হিসাবটা ভুলই হয়েছিল। যুগোস্লাভিয়া যখন ভেঙে যাচ্ছিল, তখন অন্য কোনো প্রজাতন্ত্রই এর মতো এমন বিভক্ত, আতঙ্ক আর সহিংসতার কবলে পড়েনি।


সেই মাসেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী আলিজা ইজেতবেগোভিচের নেতৃত্বাধীন সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় প্রজাতন্ত্রটির সার্বরা এবং নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। বসনিয়ান সার্বরা সারায়েভোতে অবরোধ আরোপ করে।


পরের সাড়ে তিন বছর তারা নগরীটিতে ১০ লক্ষাধিক শেল বর্ষণ করে এবং হত্যা করে ১২ হাজার মানুষকে। স্লাতিনা বাস করত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের বেসমেন্টে আর সারা শহর চষে বেড়াত একজন টিভি রিপোর্টার হিসেবে। আর সেই সময়ই সে মোটরগাড়িতে ব্যবহার্য তেল দিয়ে রান্না করা শিখেছিল। ‘স্টোভে প্রথমে সেই তেলকে ফুটাতে হতো, এতে বিষাক্ত কেমিক্যালগুলো উবে যেত। সেখান থেকে খাবার তেল ছেনে বের করতে হতো। সেই তেলে রান্না চলত।’ একবার সে ও তার এক প্রতিবেশী প্রচণ্ড গোলাগুলিতে এক কোনায় আটকা পড়েছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না, গোলার মধ্যেই সামনের রাস্তাটি পার হবে কি না। সে দৌড়াল আর তার প্রতিবেশী ভয়ে জমে গিয়েছিল। এখনো সেই দৃশ্য তার চোখে পড়ে : ‘আমি বেঁচে গেলাম, আর সে কয়েক সেকেন্ড পরেই এক গোলায় নিহত হলো। একটা বুলেট তার গলায় বিঁধেছিল।’


ভয়াবহ সেই সময়ের অবসান ঘটে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে যখন সার্ব, ক্রোট আর বসনিয়ার নেতারা ডেটন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। একটি হয় সারায়েভোকে রাজধানী করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (ক্রোট ও বসনিয়ান মুসলমান) ফেডারেশন ও অপরটি বসনিয়ান সার্ব প্রজাতন্ত্র।


২০০০ সালে আমি যখন নিউজউইকের বার্লিন ব্যুরোর চিফ হিসেবে সারায়েভোর অবস্থা দেখার জন্য এসেছিলাম, তখন খুব একটা আশাব্যঞ্জক মনে হয়নি। মানুষ তখনো জাতিগতভাবে বিভক্ত ছিল। ‘সারায়েভো পর্যটন’ কোনোকালে মাথা তুলে দাঁড়াবে এমন ধারণা করা ছিল খুবই কষ্টকর স্বপ্ন।


কিন্তু আট বছর পর জীবন আশীর্বাদপূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ব্যাংকিং, হাইড্রোইলেকট্রিক, হোটেল ও রেস্তরাঁয় বন্যার মতো ইউরোপিয়ান বিনিয়োগ ধেয়ে এসেছে। চার লাখ জনসংখ্যার সারায়েভো ইউরোপের অন্যতম প্রাণবন্ত ছোট নগরীতে রূপান্তর হয়েছে। একের পর এক শপিং মল আর অফিস ভবন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। একসময়ের বুলেট-জর্জরিত পার্লামেন্ট ভবন নতুন করে গড়া হয়েছে, যুগোস্লাভ সেনাবাহিনীর ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্থানে নতুন মার্কিন দূতাবাস নির্মিত হচ্ছে। ‘জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের’ শিকার শহরটি এখন বহুসাংস্কৃতিক ও বহুজাতিক পরিচয় নিয়ে বিকশিত হচ্ছে।


মুসলিম সারায়েভোর কেন্দ্রস্থল তথা পাথর বাঁধানো পিজন স্কয়ারটি, পেনসিল সরু মিনার-সমৃদ্ধ মসজিদ আর ম্যাপল আচ্ছাদিত পাহাড়ের ছায়ায় ঢাকা, এক সময় সার্ব গোলন্দাজদের অন্যতম লক্ষ্যস্থল ছিল। তাদের কাছে মনে হয়েছিল এটা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার নেতৃবৃন্দ যে ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করতে চাইছে তারই প্রতীক। যদিও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রথম প্রেসিডেন্ট ইজেতবেগোভিচ বারবার বলছিলেন, তিনি প্রজাতন্ত্রকে একটি বহুজাতিক গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত করতে চান। এখন এই স্কয়ারটি স্যুভেনিরের দোকানে ভরা। সেখানে পাওয়া যায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফুটবল দলের জার্সি, সারায়েভোর পোস্টকার্ড। এমনকি রসবোধ ফিরে আসছে। একটি টি-শার্টে লেখা হয়েছে হয়েছে ‘অ্যাই অ্যাম ইসলামিক ডোন্ট প্যানিক’।


এক রাতে স্লাতিনা আর আমি ডিনার সারতে গেলাম লিবারটাসে। ভালো মাছ রান্না করতে পারে এমন রেস্তরাঁগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম। আমাদের সাথে যোগ দিলো স্থানীয় সারায়েভো টিভিতে কাজ করে এমন একজন ক্রোট এবং তার চল্লিশোর্ধ্ব সার্ব বান্ধবী। এই মহিলা এক দশক জার্মানিতে কাটিয়ে নগরীতে ফিরে এসেছে। মাত্র বছর ছয়েক আগেও কেউ কল্পনা করতে পারত না, একই টেবিলে বসে একজন সার্ব, একজন ক্রোট এবং একজন বসনিয়াক (বসনিয়ান মুসলমান) কৌতুক করবে, একজন অন্যজনের সিগারেটে আগুন দেবে আর একটি পাত্র থেকে খাবার তুলে নেবে। অবশ্য এই আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশ ক্ষণিকের জন্য ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, যখন সার্ব মহিলাটি বলে উঠল যে, রাদোভান কারাদজিচকে, সাবেক বসনিয়ান সার্ব নেতা, গ্রেফতার করে হেগের আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে পাঠানো ঠিক হয়নি। রাজনৈতিক উত্তেজনা অবশ্য উত্তপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়নি সেই সকালে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে ধরা চিংড়ির খাবারটা টেবিলে এসে পৌঁছানোর কারণে।


সার্ব মহিলাটি জানাল, তিনি কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা করেছিলেন তার বাড়িতে ফিরে আসতে। আর যে কারণে তিনি বাড়ি ফিরতে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন, তাহলো সার্বদের তাদের সম্পত্তি রক্ষার অধিকার-সংক্রান্ত আইন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার এখানে বাস করছে, আমার বন্ধুরা এখানে রয়েছে এবং আমি অচ্ছ্যুৎ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া ছাড়াই এখানে বসবাস করতে পারছি।’