বড় অসুখ হতে পারে বলে মানুষ ভয় পায় কেন?

Dec 13, 2017 03:30 pm
অহেতুক রোগভীতিতে ভোগেন যার পুরোটাই মনের কল্পনা

 

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

বেশিরভাগ লোক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে চেস্টা করেন সেটাকে উপেক্ষা করতে। কারণ তারা ভয় পান, রোগটা যদি গুরুতর কিছু হয়। কেউ কেউ আরো ভয়নাক কিছু চিন্তা করেন। সামান্য অসুস্থতায় ধারণা করেন যে, খুব খারাপ ধরনের রোগ হয়েছে। হয়তো।
এরা অহেতুক রোগভীতিতে ভোগেন যার পুরোটাই মনের কল্পনা।

যারা জেরোম কে জেরোমের বিশ্ববিখ্যাত রম্যরচনা ‘থ্রি মেন ইন আ বোট’ পড়েছেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে নায়ক যুবকটির কথা। একটি রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধে পড়াশোনা করার জন্য সে ঢুকেছিল ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। মেডিকেল বই নিয়ে বসার পর সে আবিষ্কার করে, এমন কোনো রোগ নেই যাতে সে ভোগেনি। যে রোগটি নিয়েই সে পড়তে থাকে, পড়ার সময় মনে হয়, এ রোগের লক্ষণগুলো তার মধ্যে আগে ঘটেছে। বইটি পড়ার সময় তার অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে, কারণ আগে ছিল সে একজন সুস্থ সবল মানুষ বইটি পড়ার পর তার মনে হয় পৃথিবীর সব রোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে।


আমাদের দেশে এমন লোকের সংখ্যা অগণিত। মেডিকেলের পরিভাষায় এই অহেতুক রোগভীতিকে বলে ‘হাইপোকনড্রিয়া’। এক্ষেত্রে রোগী কল্পনা করে নেয় যে সে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হেয়ছে, আসলে তার কোনো রোগই হয়নি। হাইপোকনড্রিয়াতে ভুগছে এমন ব্যক্তিরা রোগ বিষয়ে এরকম আজগুবি চিন্তা করে যে শুনলে বিস্মিত হতে হয়। তাদের শরীরে সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই তারা ভয়ানক সব ব্যাপার কল্পনা করে।


হাইপোকনড্রিয়া মূলত অবাস্তব কিংবা অযৌক্তিক ভয়। কখনো কখনো কারো মনে এ বিশ্বাস জন্মে যে, সে কোনো রোগে ভুগছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা যৌনবাহিত রোগের কথাই চিন্তা করে। কোনো বিশেষ ভয় বা চিন্তা থেকে এ ধরনের ধারণার জন্ম নেয়। চিকিৎসক যদি তার শরীর চেকআপ করতে চান সে মনে করে নিশ্চয়ই তার এমন কোনো রোগ হয়েছে যার জন্য চেকআপের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে; কিংবা শরীরে কোনো তিল বড় হলে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় মন আচ্ছন্ন থাকে বুঝি ব্যান্সার হলো অথবা রাতের ক্ষণস্থায়ী স্ত্রীর সঙ্গে পুরুষত্বের প্রশ্নে সন্দিহান হয়ে পড়ে।

এরা যুক্তিহীন পথে পরিচালিত হয়। কেউ কেউ একের পর এক মেডিকেল টেস্ট করাতে থাকে। রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকলে আরেক ল্যাবরেটরিতে গিয়ে টেস্ট করায়।


শ্যারিংক্রস অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার মেডিকেল স্কুলের সাইকিয়াট্রিস্ট ও সিনিয়র লেকচারার ডাক্তার মাসিমোরিকিও হাইপোকনড্রিয়া সম্পর্কে বলেন, এটি একটি উপসর্গ। এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে মানসিক মতিভ্রম অবস্থার, যেমন সিজোফ্রেনিয়ার। কিংবা ডিপ্রেশনের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে একজন মানুষ তার নিজের সম্পর্কে সব সময় নেতিবাচক ভাবনা করে।

দুশ্চিন্তা থেকে তীব্র ধরনের হাইপোকনড্রিয়ার উদ্ভব ঘটতে পারে। হাইপোকনড্রিয়া কখনো ভালো হয় না যদি রোগী সারাক্ষণ তার স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় থাকে। তাই হাইপোকনড্রিয়ার রোগীদের বেশ ধৈর্য্য নিয়েই চিকিৎসা করতে হয়।

প্রথমে পরীক্ষা করে দেখতে হবে তাদের আদৌ কোনো রোগ আছে কিনা। যদি কেউ ডিপ্রেশন বা বিষন্নতার কারণে হাইপোকনড্রিয়ায় ভোগে তাহলে তাকে অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ওষুধ দিতে হবে এবং সেই সঙ্গে দিতে হবে কগনিটিভ থেরাপি। এর ফলে সে তার নেতিবাচক চিন্তাভাবনা থেকে মুক্তি পেয়ে সৃষ্টিশীল এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম হয়।

যদি কারো সিজোফ্রেনিয়া অসুখ থাকে তাহলে তাকে অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ দিতে হবে। অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের সঙ্গে সাইকোথেরাপি এক্ষেত্রে ভালো কাজ করে। অবশ্য অনেক সময় হাইপোকনড্রিয়ার রোগেিদর ওপর এসব চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। এর কারণ হলো, এটা যে তাদের একটা মানসিক সমস্যা তারা তা মনে করে না। তারা বিশ্বাস করে যে, এটা সত্যিই কোনো শারীরিক অসুস্থতা এবং এজন্য তারা মানসিক বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে চায় না।


হাইপোকনড্রিয়া থাকলে যে শারীরিক অসুখ হবে না তা নয়। হাইপোকনড্রিয়া রোগের রোগীরা শারীরিক অসুখে মারা যেতে পারে। কিন্তু আগে নির্ণয় করতে হবে তার রোগটি কী? এক্ষেত্রে চিকিৎসকই রোগীকে বুঝিয়ে বলবেন। রোগীও সত্যি ইতিহাস জানিয়ে চিকিৎসককে সহযোগিতা করবেন। নইলে এ অহেতুক রোগভীতি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। কখন বুঝবেন যে আপনি অহেতুক রোগভীতি বা হাইপোকনড্রিয়াতে ভুগছেন? নিচের বিষয়গুলো আপনার মধ্যে থাকলে বুঝতে হবে আপনার হাইপোকনড্রিয়ার সমস্যা রয়েছে


* যে কোনো মাথাব্যথা হলেই আপনি তাকে ব্রেইন টিউমার মনে করেন।
* স্বাস্থ্য নিয়ে এতোটা উৎকণ্ঠায় থাকেন যে, আপনার ঘুম ভেঙে যায় মধ্যরাতে।
* যে কোনো সমস্যা উপসর্গেই আপনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং চিকিৎসকের একটি কথাও আপনি বিশ্বাস করেন না।
* আপনি সব সময় দ্বিতীয় কারো মতামত নেন এবং তার কথাও বিশ্বাস করেন না।
* কেউ আপনার স্বাস্থ্য নিয়ে মন্তব্য করছে না অথচ আপনি এ ব্যাপারে খুব উদ্বিগ্ন।
* আপনার বিছানাকে আপনি সাজিয়েছেন মেডিকেল ডিকশনারি দিয়ে।
* পাস করা ডাক্তার নয় এমন সব ব্যবসায়ী রাস্তায় কিংবা হাটে-বাজারে ওষুধ বিক্রির জন্য চিকিৎসক-সংক্রান্ত বক্তৃতা দেয় এবং আপনি সেসব বক্তব্য বিশ্বাস করেন।