চীনের গোয়েন্দারা কতটা তৎপর

Dec 13, 2017 03:11 pm
চীন পরিবর্তন এনেছে তার গোয়েন্দা তৎপরতায়

 

মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না চীনের ক্ষমতা দখল করে দলটি প্রতিষ্ঠার সিকি শতাব্দীরও আগে। গত শতাব্দীর প্রারম্ভে মাঞ্চু রাজবংশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে সেখানে জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উন্মুক্ত হয়েছিল বিদেশী হস্তক্ষেপের। অনেকগুলো যুদ্ধ করতে হয় তৎকালীন জাতীয়তাবাদী সরকারের। দলটির নাম ছিল কুওমিনটাং পার্টি। প্রধান ছিলেন সান ইয়াতসেন। তাকে বলা হতো চীনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পিতৃপুরুষ। দলটির আদর্শ ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও বেঁচে থাকার অধিকার। এ জন্য অনুসরণ করত পশ্চিমা গণতন্ত্রের। ১৯২১ সালে মাত্র আটজনের মতো সদস্য নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না গঠন করা হয়। জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতার স্বাদও গ্রহণ করে। এক পর্যায়ে চেপে বসে কুওমিনটাং দলের ঘাড়ে। শুরু হয় দুই দলের মধ্যে দূরত্বের। এই বিরোধ রূপ নেয় গৃহযুদ্ধে। একপর্যায়ে পালিয়ে গিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলারা। কিছু দিনের মধ্যে আবার সংগঠিত হয়। এক এক করে দখল করতে থাকে চীনের বিভিন্ন প্রদেশ। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।


কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা দখলের পর চীনের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার কেন্দ্রীয় কমিটি হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ফোরাম। চীনের ক্ষমতার পটপরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। সৃষ্টি হয় ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাময়িক মতদ্বৈধতার। অন্য দিকে চীনে শুরু হয় অর্থনৈতিক মন্দা ভাব।

 

মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি (এমএসএস)
চীনে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তৎপরতার জন্য আলাদা কোনো সংস্থা নেই। দেশটির একটি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করে। মন্ত্রণালয়ের নাম মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি। সংক্ষেপে এমএসএস। ১৯৮৩ সালে সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট এমএসএস’র অধীনে নেয়ার পর চীনের কৌশলগত গোয়েন্দা কার্যক্রম এ মন্ত্রণালয় পালন করছে। দেশটির গোয়েন্দা তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক গোপন তথ্য সংগ্রহ করা। টার্গেট দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, বর্তমান রাশিয়া, ব্রিটেন, জাপান ও জার্মানি। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় হংকং, ম্যাকাও ও তাইওয়ানে গোয়েন্দা তৎপরতায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এমএসএস ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির পরামর্শ দিলে বর্তমানে দেশটি এসব দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি শুরু করে। কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে দেশটি অনেকটা একলা চলো নীতিতে পরিচালিত হতো। গতানুগতিক আলোচনা না করে আজকের প্রবন্ধে চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চীনের বিরোধ, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাথে চীনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করব।

 

চীনে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখল
চীনা কমিউনিস্ট দলের ক্ষমতা দখল তৎকালীন রাজনৈতিক সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। যে বিশাল দেশ তার রাজকীয় ঐতিহ্য নিয়ে মাও সে তুংয়ের দখলে আসে গত শতাব্দীর প্রারম্ভে সেখানে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। চীনের সর্বশেষ রাজবংশের (মাঞ্চু রাজবংশ) অবনতি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে চীনকে বিদেশী হস্তক্ষেপের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। এ অবস্থায় চীনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পিতৃপুরুষ সান ইয়াতসেন পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৯৭ সালে গঠন করেন কুওমিনটাং দল। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও বেঁচে থাকার অধিকার এ তিনটি মূল নীতির প্রবক্তা সান ইয়াতসেন চীনের পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে থাকেন। তার নেতৃত্বে কুওমিনটাং দল ১৯১১ সালে চীনা বিপ্লব সংঘটিত করে মাঞ্চু রাজবংশের অবসান ঘটায়। এর পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় চীনা প্রজাতন্ত্র। কিন্তু কুওমিনটাং দলের মূল নীতির সাথে ইউয়ান শি-কাইয়ের মতপার্থক্যের কারণে পিকিং ও ক্যান্টনে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের মধ্যবর্তী সময় চীনা যুদ্ধবাজ শাসনকর্তারা দেশটিকে ছারখার করে দেয়।


১৯২১ সালে আটজনের মতো সদস্য নিয়ে চীনা কমিউনিস্ট দল গঠিত হয়। একই বছর সাংহাইয়ে নিযুক্ত রাশিয়ার প্রতিনিধি জোফ-এর সাথে সাক্ষাতের পর ক্যান্টন সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চীনা কমিউনিস্ট দলকে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং ঘেষণা করা হয় কমিউনিস্টরা ইচ্ছা করলে ব্যক্তিগতভাবে কুওনিটাং দলের সদস্য হতে পারবে। এভাবে জাতীয়তাবাদী দল কুওমিনটাং ও কমিউনিস্টদের মধ্যে এক অদ্ভুত ও অস্পষ্টভাবে মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৪ সাল নাগাদ কমিউনিস্টরা সান ইয়াতসেনের কুওমিনটাং দলের সাথে সমানে সমানে লড়ার মতো আচরণ করতে থাকে। আরো দুই বছরের মধ্যে তারা সামরিক শাসকদের উচ্ছেদ করতে উত্তরে অভিযান চালাতে শুরু করে। ১৯২৫ সালে সান ইয়াতসেন মারা গেলে চিয়াং কাইশেক কুওমিনটাং দলের নেতা নির্বাচিত হন। চিয়াংয়ের নেতৃত্বে ক্যান্টনে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কুওমিনটাং দল চীনের উত্তরাঞ্চল দখল করতে ও যুদ্ধবাজ শাসনকর্তাদের ধ্বংস করতে অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি হতে থাকেন। চিয়াং কাইশেক বুঝতে পেরেছিলেন তার নেতৃত্বে ধনী ভূ-স্বামী ও বণিকদের সমবায়ে গঠিত কুওমিনটাং দলের সাথে কমিউনিস্ট বিপ্লবী দলের মৈত্রী দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সে জন্য তিনি ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মস্কো নিয়ন্ত্রিত ও কমিউনিস্ট নেতৃত্বে পরিচালিত এক বিপ্লবের পর কমিউনিস্টদের নির্মূল করা শুরু করেন। তিনি কমিউনিস্টদের ক্ষমতা থেকে বহিষ্কার করেন। ওই বছরের ১ আগস্ট চতুর্থ পদাতিক বাহিনীর এক দল সৈন্য নানচ্যাংয়ে বিদ্রোহ করে এবং কমিউনিস্ট অফিসারদের নেতৃত্বে লাল বাহিনী গঠন করে। যেসব কমিউনিস্ট ১৯২৭ সালের রক্তক্ষয়ী ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর বেঁচে ছিল তারা হয় আত্মগোপন করে কিংবা দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে চলে যায়। তখন থেকে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই শুরু হয় চীনের কৃষক আন্দোলন।


গত শতাব্দীর বিশের দশকের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়ন, গ্রেট ব্রিটেনসহ সবাইকে চীনের দৃষ্টিতে বিপজ্জনক সাম্রাজ্যবাদী বলে বিবেচনা করা হতো এবং চীনের নিরাপত্তার খাতিরে তাদের পরাজিত করা দরকার ছিল। ১৯৩১ সালে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করলে চীনের পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে। চিয়াং কাইশেক জাপানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ছাড়া বিশেষ সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। অন্য দিকে তিনি সামরিক শক্তির মাধ্যমে চীনকে একত্রীকরণের নীতি অনুসরণ করেন। এরূপ পরিস্থিতিতে চীনে একতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে শক্তি অর্জনের আশা সুদূরপরাহত হয়।
মাও সে তুং চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ শুরু করেন। ১৯৩০ সালে ইয়াংশি লাল বাহিনীর সহায়তায় গ্রীষ্মকালীন অভিযান শুরু করেন। এতে চিয়াং কাইশেক বিশেষ ক্রুদ্ধ হন। সঙ্কল্প নেন কমিউনিস্টদের এ বিদ্রোহকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার। তিনি এই কৃষক আন্দোলন দমাতে নিজেই নেতৃত্ব দেন। কমিউনিস্টরা চিয়াং কাইশেকের চারটি অভিযান তিনি ব্যর্থ করে দেয়। অন্য দিকে অর্জন করতে থাকে ব্যাপক শক্তি। কিন্তু ১৯৩৩ সালের অক্টোবর মাসে পঞ্চম অভিযানে চিয়াং কাইশেক কমিউনিস্টদের ঘিরে ফেলেন। এতে কমিউনিস্টরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে নদী-নালা, পাহাড়-পর্বতের ভেতর দিয়ে প্রদেশের পর প্রদেশ অতিক্রম করে এক বছর পর দীর্ঘ ৬ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে চীনের উত্তর-পশ্চিমের শেনসি প্রদেশে পৌঁছে। ১৯৩৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই লাল বাহিনীতে অধিকসংখ্যক লোক যোগদান করে।


১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে জাপানের আগ্রাসনের ফলে দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময়েও কুওমিনটাং ও কমিউনিস্টদের মধ্যে স্বার্থের সঙ্ঘাত চলতে থাকে। ১৯৪১ সালের শেষ দিকে প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে চীনের জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্টদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এ সময়ে চিয়াং কাইশেক অপ্রকাশ্যে বলেছিলেন, জাপানিরা হলো চর্মরোগ আর কমিউনিস্টরা হলো হৃদরোগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে দু’টি আত্মপ্রকাশকারী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতপার্থক্য যখন স্পষ্ট হতে থাকে তাদের চীন সম্পর্কিত নীতিতে ও তা প্রতিফলিত হতে থাকে। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন চেয়েছিলেন চীনকে দুর্বল করে রাখতে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে এশিয়ার একটি বৃহৎ, একতাবদ্ধ ও উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই জাতীয়তাবাদী সরকার বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এত দিনে কমিউনিস্টরা এত বেশি শক্তি অর্জন করে, যা জাতীয়তাবাদী ও তার মিত্র মার্কিনিদের ধারণার বাইরে ছিল। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে জাপান আত্মসমর্পণ করে। ওই সময় কমিউনিস্টরা চীনের উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব গ্রামাঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শহরাঞ্চল দখল করার জন্য জাতীয়তাবাদীদের সাথে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়।

জাপানের পরাজয়ের পর রাশিয়ানদের পরোক্ষ সাহায্যে চীনা কমিউনিস্টরা জাপানিদের পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র লাভ করে। এ সময়ে মাঞ্চুরিয়া দখলের জন্য চীনা জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্টদের প্রবল প্রতিযোগিতার কারণে ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে চীনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। ১৯৪৬ সালের জুনে জেনারেল মার্শালের সমঝোতা চেষ্টা ব্যর্থ হলে চীনে পরিপূর্ণ গৃহযুদ্ধের দ্বার খুলে দেয়। এ বছর জুলাইয়ে কমিউনিস্টরা তাদের সেনাবাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনতার মুক্তি সৈনিক’ রাখে। তারা অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করে বিজয় লাভ করতে থাকে। ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি জাতীয়তাবাদীদের সার্বিক অবস্থা যথেষ্ট খারাপ হয়ে পড়ে। জাতীয়তাবাদীরা ভূমি, জনশক্তি, যুদ্ধসরঞ্জাম ও মনোবল প্রবলভাবে হারাতে থাকে। এ বছর ডিসেম্বরে চিয়াংয়ের সরকারকে আর্থিক সাহায্য ছাড়াও মার্কিন সরকার প্রচুর পরিমাণে বিমান ও নৌ যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করে।

১৯৪৮ সালের নভেম্বরে মধ্য চীনে আধুনিক ইতিহাসের একটি অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জাতীয়তাবাদীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পরের বছর ৮ জানুয়ারি জাতীয়তাবাদী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের কাছে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানায়। ১৪ জানুয়ারি কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আটটি কঠোর শর্ত আরোপ করে। এর প্রধান শর্ত ছিল, কুওমিনটাংকে বিলুপ্ত করতে হবে এবং প্রতিক্রিয়াশীল কুওমিনটাং সরকারের সব কর্তৃত্ব করবে একটি গণতান্ত্রিক কোয়ালিশন সরকার। ১৫ জানুয়ারি ব্রিটেন ও মার্কিন সরকার জাতীয়তাবাদীদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। ১৭ জানুয়ারি মস্কোও একই কথা জানায়। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি চিয়াং কাইশেক তার ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পরের দিন জেনারেল ফু সোই কমিউনিস্টদের আরোপিত শর্তে আত্মসমর্পণ করেন। ২২ এপ্রিল জনতার মুক্তিসৈনিকরা ইয়াংসি নদী অতিক্রম করে নানকিং দখল করে। এরপর ক্রমান্বয়ে নানচ্যাং, সাংহাই ও দক্ষিণ শেন্স্কমিউনিস্টরা অধিকার করে নেয়। এপ্রিলে জাতীয়তাবাদী সরকার নানকিং থেকে ক্যান্টনে পালিয়ে যায়। ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে জাতীয়তাবাদী সরকার ডিসেম্বরে ফরমোজায় নির্বাসনে চলে যায়। ফলে দীর্ঘ ২১ বছর পর চীনে কুওমিনটাং জাতীয়তাবাদের আদলে একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে।

 

চীন-সোভিয়েত বিরোধ
মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের মতো দু’টি কমিউনিস্ট দেশের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের মিলনের ওপর ভিত্তি করেই সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে এমনটা ধারণা করাই স্বাভাবিক। কিন্তু পৃথিবীর দু’টি সর্ববৃহৎ কমিউনিস্ট দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা সত্য প্রমাণিত হয়নি। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সম্ভাবনা নিয়ে তিন ধরনের চিন্তাভাবনার সূত্রপাত হয়েছে। প্রথমত, অনেকে মনে করেন চীন-সোভিয়েত বিরোধ থাকলেও তা সাময়িক। কারণ তাদের উভয়ের একটি সাধারণ লক্ষ্য হলো পুরো বিশ্বে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করা। এ সাধারণ লক্ষ্যটিই তাদের মধ্যকার যেকোনো ধরনের মতভেদকে দূর করতে সক্ষম। কিন্তু অনেকে ঠিক এর উল্টোটা বিশ্বাস করতেন। তাদের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে ভাঙন অবশ্যম্ভাবী। এ মতের অনুসারীদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মতবাদ তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশই তার জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেয়। এ দু’টি কমিউনিস্ট প্রতিবেশীর স্বার্থ অসংলগ্ন। এ জন্য তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ফাটল অবশ্যম্ভাবী। এ দু’টি পরস্পরবিরোধী মতের অনুসারীদের বক্তব্যের সমন্বয় করে তৃতীয় এক দল পি ত মনে করেন, যেহেতু পৃথিবীব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তারা উভয়ই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তাই তাদের কোনো জাতীয় স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থাকলেও তা তাদের মাঝে কোনো চিরস্থায়ী ভাঙনের সৃষ্টি করবে না। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধের কয়েকটি উপাদান এখানে উল্লেখ করছি :


১৯৪৬ সালের বসন্তকালে একজন মার্কিন সাংবাদিক আনা লুই স্ট্রংয়ের কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লিও শাওচি বলেছিলেন, মাও সেতুং ‘মার্কসবাদের এশীয় ধরন’ আবিষ্কার করেছেন। তিনি আরো বলেন, যেহেতু মার্কস ও লেনিন উভয়ই ইউরোপের অধিবাসী, তাই তারা এশিয়ার সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে ততটা আগ্রহী অথবা সক্ষম ছিলেন না। মাওই প্রথমবারের মতো মার্কসবাদকে চীনের বিশেষ পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ান এবং তার বৈপ্লবিক তত্ত্বাবলি শুধু চীনের জন্য নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য ঔপনিবেশিক দেশের সমস্যা সমাধানেও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মাও তাই তৃতীয় বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্বদানে আকাক্সক্ষী ছিলেন। স্টালিনের মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে এ ব্যাপারে একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি মনে করতেন। কিন্তু মস্কো বিশ্বাস করত যে রাশিয়াই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সম্প্রদায়ের জ্যেষ্ঠ ও সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সদস্য। সে জন্যই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্ব ব্যাখ্যা ও কমিউনিস্ট ব্লকের মূল রণকৌশল নির্ধারণ করা, বিশেষত ধনতান্ত্রিক বিশ্বের সাথে কী রূপ আচরণ করতে হবে তার কর্তৃত্ব তার ওপর ন্যস্ত হওয়া উচিত। তিনি চীনের নেতৃত্বের আকাক্সক্ষাকে সুনজরে দেখতেন না। কারণ তিনি মনে করতেন, নবাগত হিসেবে চীনারা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বাস্তবতার সাথে সুপরিচিত নয়। অসামরিক উপায়েও যে সাম্রাজ্যবাদকে দুর্বল করা যায় তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না।


চীনাদের বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন হওয়ার কারণে তারা বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে। অন্য দিকে রাশিয়ার বলশেভিকরা গেরিলা যুদ্ধের কোনোরূপ অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাতারাতি ক্ষমতায় আসে। সেখানকার ভিন্ন পরিস্থিতি বিপ্লব সংঘটনের কাজে কলকারখানার মজুরদের সাহায্য নিয়েছে। কিন্তু চীন মূলত কৃষিভিত্তিক দেশ হওয়ার কারণে মাও সেতুং গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপন করে সেখান থেকে দুই দশকেরও অধিককালব্যাপী প্রলম্বিত গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে শহরকে ঘিরে ফেলেন এবং ক্ষমতা দখল করেন।


চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার আন্তর্জাতিক অবস্থার পার্থক্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভিন্নতার সৃষ্টি করে। যদিও উভয় কমিউনিস্ট দেশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করত। তবুও রাশিয়ানরাই মার্কিনিদের সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে যেতে পারত। এ জন্য চীনা কমিউনিস্টরা সব সময় রাশিয়ানদের সন্দেহ ও ভীতির চোখে দেখে।


উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি কী নীতি গ্রহণ করা হবে সে ব্যাপারেও মস্কো ও পিকিংয়ের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। এ দু’টি দেশই এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। ১৯৬৫ সালে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় আফ্রো-এশীয় সম্মেলনে ভারত ও অন্য কয়েকটি দেশ যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তখন চীন বৈঠকটি মুলতবি রাখার চেষ্টা চালায়। চীনের মতে, সে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর নেতৃত্বদানের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত দাবিদার। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই উন্নত বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।


চীন-সোভিয়েত বিরোধের আর একটি কারণ হলো সামরিক। ১৯৫৯ সালের পর থেকে মস্কো যখন চীনের পারমাণবিক দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধের চুক্তি স্বাক্ষর করে তখন চীন স্পষ্ট বুঝতে পারে, সোভিয়েত ইউনিয়ন চায় চীন সব সময় দ্বিতীয় শ্রেণীর সামরিক শক্তি হিসেবে মস্কোর পারমাণবিক ছত্রছায়ায় অবস্থান করুক। কিন্তু চীন ক্রুশ্চেভের ক্ষমতাচ্যুতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়।


অর্থনৈতিক কারণও তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করেছিল। একটি অনুন্নত দেশ হিসেবে চীন তার উন্নয়নের জন্য প্রথম দিকে সোভিয়েত আর্থিক সাহয্যের ওপর নির্ভর করত। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে আর্থিক সাহায্য দিত চীনের মতে তা যথেষ্ট ছিল না। এ জন্য প্রথম থেকেই চীনের ক্ষোভ ছিল। এতে ঘৃতাহুতি পড়ে যখন ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীন থেকে তার সব কারিগরকে উঠিয়ে নেয়।


রাশিয়া ও চীন অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছার ব্যর্থতার পরিচয় দিলে অন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশের কমিউনিস্ট দল হয় মস্কো না হয় পিকিংয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাদের নিজ নিজ স্বার্থ বৃদ্ধির সুযোগ পায়। এ ছাড়া এ ক্ষুদ্র কমিউনিস্ট দলগুলো তাদের মধ্যকার পরস্পর বিরোধকে একে অন্যের বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়ে লাভবান হয়। চীন-সোভিয়েত বিরোধ পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করেছে।

 

চীনের দক্ষিণ এশিয়া নীতি
দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের নতুন মাত্রা, অপর দিকে বিগত বছরগুলোতে চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, সেই সাথে আন্তঃসীমান্ত বিরোধের ব্যবধান কমিয়ে আনার প্রয়াস এবং সামরিক সম্পর্কের উন্নয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের নীতির আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ভারতের সাথে চীনের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। এশিয়ার তথা বিশ্বের এ দু’টি সবচেয়ে বর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে বিগত বছরগুলোতে ভারতের সাথে এ ক্ষেত্রে সম্পর্কের উন্নয়ন এক কথায় অভূতপূর্ব। ভারতের সাথে চীনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা ও কারিগরি ক্ষেত্রে এবং বর্তমানে দু’দেশের মধ্যে একটি ফ্রি ট্রেড সমঝোতা হওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। যদিও দু’দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রবিশেষ এখনো কণ্টকময়। অপর দিকে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের কূটনৈতিক ভিত ও উদ্দেশ্য নিয়েও যথেষ্ট সন্দিহান।

 

শেষ কথা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন বিশিষ্ট তাত্ত্বিক মরটন কাপলান অন্তর্জাতিক সিস্টেমের সম্ভাব্য গঠন সম্পর্কে ছয়টি মডেলের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কাপলানের প্রকল্পিত মডেলগুলো হলো, শক্তিসাম্য সিস্টেম, শিথিল দ্বিমেরু সিস্টেম, সুদৃঢ় দ্বিমেরু সিস্টেম, সার্বজনীন-আন্তর্জাতিক সিস্টেম, প্রধান শক্তি সংবলিত আন্তর্জাতিক সিস্টেম এবং একক ভেটো সিস্টেম। এর মধ্যে কাপলান ইতিহাস থেকে প্রথম তিনটির বাস্তব অস্তিত্ব দেখিয়েছেন। কিন্তু শেষের তিনটির কথা শুধু কল্পনা করেছেন যে এগুলোর বাস্তব ক্ষেত্রে সম্ভব হতে পারে। আন্তর্জাতিক নীতিতে চীনের পরিবর্তনশীলতা, কমিউনিস্ট শাসন ঠিক রেখে গণতান্ত্রিক চীনে পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়াসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এ জন্য চীন পরিবর্তন এনেছে তার গোয়েন্দা তৎপরতায়ও। সর্ববৃহৎ সামরিক বাহিনীর দেশ চীন পরিণত হচ্ছে অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক শক্তিতে। এ শক্তি ভাবিয়ে তুলেছে পশ্চিমা দেশগুলোকেও। এ জন্য পশ্চিমারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তৎপরতা জোরদার করেছে। চীন এ পরিস্থিতিতে গোয়েন্দাবৃত্তিতে কী পরিবর্তন আনে সেটাই এখন দেখার বিষয়।