জেরুসালেমে যা দেখেলেন এক বাংলাদেশি

Dec 07, 2017 04:52 pm
অত্যুজ্জ্বল স্বর্ণমন্দিরকে চুমু খেয়েছি


বপ্নভ্রমণ -১ : জেরুসালেম

বু ল বু ল স র ও য়া র

 

চোখে পড়ামাত্র আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম, কিন্তু আমার অজ্ঞতা আমায় বোবা করে দিলো। লক্ষবার দেখা এই ডোম-অব-রককেই আমি ভাবতাম মসজিদুল আকসা। কত আবেগভরা চোখের জলে স্নাত হয়ে আমি এই অত্যুজ্জ্বল স্বর্ণমন্দিরকে চুমু খেয়েছি আর ইজরাইলি বর্বর-শৃঙ্খল থেকে এর মুক্তি চেয়েছি! আর আজ, যখন আমি এর সামনে উপস্থিত, আমার এই সুন্দর দেহের অভ্যন্তরে ঘৃণাপূর্ণ হৃদয় দেখে আমি নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এ তো তীর্থ; এতে অসুন্দরের স্থান কোথায়?


তাজমহল দেখেও প্রথমবার প্রশ্ন করেছিলাম : বড়, বুঝলাম; কিন্তু কত বড়? যা আমার সমুদয় কল্পনা ও চিন্তার বিশালতাকে ছাপিয়ে যায় তত বড় তো? ছিয়াত্তরের সেই মন্বন্তর এবার আমায় পুরোপুরি পঙ্গু করে দিলো। বিশাল, বুঝলাম; কিন্তু কত বিশাল? সেই ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে নবী মুহাম্মদ সা:-এর মৃত্যুর মাত্র ৫৮ বছর পরেই খলিফা আবদুল মালেক কী করে এই নির্মাণ সম্পন্ন করেছিলেন যা দেড় হাজার বছরের সমস্ত দম্ভ ও সহিংসতাকে ম্লান করে শৌর্যে-বীর্যে-ঔদার্যে-বিশালতায় আজো পৃথিবীর গৌরব হয়ে জ্বলজ্বল করছে? আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে শুধু তাজমহল আর ইস্তাম্বুলের নীল মসজিদই বারবার ফিরে এলো এবং বিস্ময়াভূত আমি এই ডোমের নিখুঁত জ্যামিতি ও নিপুণ সৌন্দর্যে ডুবে যেতে বাধ্য হলাম।

 
তেরো শ’ বছর বা তারও আগের পৃথিবীর এরকম নির্মাণ আর কী কী আছে? স্মৃতির পাতা হাতড়ে আমি কেবল ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়াকেই খুঁজে পেলাম যা তার অনুপম নির্মাণশৈলী নিয়ে এখনো গৌরবের রাজটিকা হয়ে টিকে আছে। অবচেতন মন আমার হায় হায় করে উঠল দুটোই যে ধর্মস্থান! আহা-রে, আমার অতিপ্রগতিশীল বন্ধুদেরকে আমি আর কোন রেনেসাঁসে নিয়ে যাই? যাই হোক, সেই আয়া সোফিয়ার সৌন্দর্য কিন্তু এই ডোমের ধারেকাছেও না। আমি বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলাম কেন্দ্রীয় গম্বুজের সোনালি শরীরে যা নির্মাণ করা হয়েছে ৮০ কেজি খাঁটি সোনার আস্তরে জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে; চৌকো চৌকা মোজাইক-মেটালের অসংখ্য আশ্চর্য সজ্জায়নে। জেরুসালেমবাসীর দাবি, একমাত্র পিরামিড ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো নির্মাণে এত রহস্য নেই। আমি তাদের সেই আশ্চর্য যুক্তির কিছু কিছু আগেই শুনেছি, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারিনি। এখন নিজের চোখে দেখে অবিশ্বাস করার তো উপায় নেই যে আটকোনা-ইমারতটি গণিতের স্বতঃসিদ্ধ নিয়মই শুধু মানেনি, ধর্ম ও অদৃশ্য জগতের বহু রহস্যকেও ধারণ করে আছে। নাহলে এর গম্বুজের উচ্চতা, ব্যাস এবং প্রতি পাশের দৈর্ঘ্য নিখুঁত ৬৭ ফুট হওয়ার প্রশ্নই উঠত না। সাধে কি আর এটা ফ্রি-ম্যাসনদের তীর্থভূমি!


গতকাল রাতে আমি ডোম-অব-রকের নানা-রহস্য এবং ‘ম্যাজিক’ নিয়ে বন্ধুদের কথা বলতে শুনেছি। এই টেম্পল মাউন্টেন নয় ডিগ্রি বাঁকা, কারণ তাহলেই নাকি এর দিকগুলো দক্ষিণে মক্কা, উত্তরে ইস্তাম্বুলকে ভেদ করে। পশ্চিম দিক ছুঁয়ে যায় গিজার পিরামিড আর পূর্ব দিকে সূর্যের জাগরণে যেদিকে জাগে স্বর্গের অনাবিল আশ্বাস অপেক্ষা করে গেট-অব-হ্যাভেন যে পথ ধরে এই টেম্পলে প্রবেশ করবেন মাসিহ্; তার শেষ বিজয়ের নিশান উড়িয়ে। তিনটি সেমেটিক ধর্মানুসারীরাই এ বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করে আছে।


আমার পূর্ব আন্দাজ ছিল, ইজরাইলিদের এই দেশে টেম্পল মাউন্টেন নিশ্চয়ই ইহুদিদের প্রচণ্ড ভিড় থাকবে। ব্যাপারটা মোটেই সে রকম দেখছি না। ইসলামি ওয়াকফ্ ট্রাস্ট এই মাউন্টের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে যাদের সদর দফতর জর্ডানে এবং তারা সবাই মুসলিম। এখানে এই টেম্পল মাউন্টে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া ইহুদিদের প্রবেশাধিকারই নেই। কারণ, এটি তাওরাত বা মিসনাহ্ অনুসারে মহাপাপ। ‘পরম পবিত্রতা’ ছাড়া এখানে কোনো ইহুদি প্রবেশ করতে পারবে না যার ব্যতিক্রম হবেন কেবল প্রধান রাব্বি আর সেই প্রত্যাশিত মাসিহ্। তারপরও দু-একজন যে ঢোকে না, তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায় না; তবে সেসব ঘটে কালেভদ্রে। নিউ ইয়র্ক-লন্ডন-ঢাকায়ও যেমন আসল ধর্মকে হৃদয়ে ধারণ করা লোকের সংখ্যা বাস্তবিকই কম, এখানেও তেমনি, গাইডের চাদরে কিংবা পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়া দু-চার জন ছদ্মবেশী ইহুদি হয়তো থেকেই যায়! এ নিয়ে ‘বিপ্লবী’ ইহুদি তরুণদের মধ্যে ক্ষোভও কম নয়। আরো আশ্চর্যের বিষয়, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মতো এখানেও ‘পাণ্ডাদের’ মোটেই কমতি নেই যদিও ধর্মে তারা ভিন্ন!


দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের গেটের মুখে দাঁড়িয়ে প্রথমেই আমি চোখ বুলালাম চার দিকে। সাগরের মতো বিশাল এলাকার মাঝখানে প্রায় এগারো-বারো ফুট উঁচু প্লাটফর্মে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ডোম-অব-রক যার চূড়া এতটা সোনালি যে এখান থেকেই চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। এই ডোম সম্ভবত এ কারণেই ইসরাইলিদের ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়েছে যে, এই নির্মাণ নতুন করে তৈরি করা অসম্ভব। নকল হয়তো করা সম্ভব, তবে তা যে আসলেরই অধিক গুণকীর্তন হবে, সে বুঝি শিশুরাও বোঝে! হয়তো, এই বোধবুদ্ধি থেকেই তারা এটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে এই ভরসা ও স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস-কুয়ো) কদ্দিন টিকবে, বলা মুশকিল। যেমন সাতষট্টির যুদ্ধজয়ের পরপরই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর জেনারেল গোরেন এই নিয়ম ভাঙতে উদ্যত হয়েছিলেন এবং ডোম-অব-রককে ধূলিসাৎ করে নিজেই ‘ইতিহাস’ হতে উঠে এসেছিলেন এই মার্চেন্ট গেট পর্যন্ত যেখানে আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি। যদিও তার সেই পাশবিক ইচ্ছাকে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন চিফ অভ স্টাফ জেনারেল উজি নারকিস; যিনি টেম্পল-মাউন্ট সংলগ্ন সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন। ভাবলাম : দু’জনই জেনারেল। দু’জনই ইহুদি। একজন ধ্বংস চেয়েছে; অন্য জন রক্ষা। যেন সৃষ্টির আদি-দ্বন্দ্ব : হাবিল ও কাবিল।


বিশালায়তনের পশ্চিম সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমি উত্তর-দক্ষিণে তাকালাম। এই পশ্চিম বর্ডার ১৪৬৪ ফুট লম্বা। চওড়া, উত্তর পাশে ৯৪৫ ফুট এবং দক্ষিণ পাশে ৮৪০ ফুট। দক্ষিণ বর্ডারের প্রায় মধ্যেখানে রয়েছে আল আকসা; একতলা এ মুহূর্তে খেজুর গাছের আড়ালে প্রায় ঢাকা পড়ে গেলেও যার রূপালি গম্বুজটি ঠিকই অনুজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। আশ্চর্য এই দুই ভাই আমি অবাক হয়ে দেখি একই খলিফার হাতে গড়া দুই রকম গম্বুজ; একটি সোনার দ্যুতিতে সমুজ্জ্বল, অন্যটি রুপালি জ্যোৎস্নায় স্নিগ্ধ; একটি উঁচুতে, যেন মর্যাদা ও মহত্ত্বকে তুলে ধরতে চায় ধর্ম-বর্ণ-বিভেদ-জাতিত্বের অনেক ওপরে, অন্যটি পাশেই দাঁড়িয়ে সাম্য-মৈত্রীকে সগৌরবে ঘোষণা করে বলছে : অধিকার নেই আরবের কোনো অনারবের ওপর; কিংবা মানুষ মাত্রেই আশরাফুল মাখলুকাত; একটির নাম আল-কুদ্স বা পবিত্র শহর; অন্যটি আল-আক্সা বা দূরবর্তী মসজিদ।

 


আমি বারবার ডানে-বামে ঘাড় ঘুরিয়ে অনুভব করতে চাই এই অসাধারণ সম্প্রীতির মাহাত্ম্য এবং মাপি আমার অস্বাভাবিক-মূর্খতা। কিন্তু এটা মানা সত্যিই কঠিন যে, আল্লাহর সব সৃষ্টিরই সমান অধিকার দুনিয়ায় সে মক্কী হোক বা বাংলাদেশী যতই আমি নিজেকে সাচ্চা দাবি করি না কেন। সুলতান সালাউদ্দীন আইউবি তো হজরত ওমরকে অনুসরণ করেই জেরুসালেমের সব দুয়ার সবার জন্য খুলে দিয়েছিলেন সব সময়ের জন্য; তবু আমাদের বেশির ভাগ উচ্চারণই কত অনুচিত রকম ধৃষ্ট; কী বর্বরসুলভ অধার্মিক! যেমন রাব্বি-গোরেন চেয়েছিলেন তার নাম ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকুক এই মহিমাময় স্থাপনাগুলোর ধ্বংস আর সর্বনাশের বিনিময়ে! এ এক আশ্চর্য উন্মাদনা। মাত্র ৪৪ মাইল চওড়া যে দেশ লম্বায়ও ২৬৩ মাইলের অধিক নয়, সে দেশটির মানুষ কেন এত প্রান্তিকীয় হলো, ভেবে আমি কূল-কিনারা পাই না। নিজের দেশকে নিয়ে যে বেদনা আমায় সারাক্ষণ বিষন্ন করে রাখে যে, দেশের আয়তন ছোট হলে মানুষের মনও ছোট হয়ে যায় হয়তো সেই সঙ্কীর্ণতাই এখানে বিন্দুর ক্ষুদ্রতা নিয়েও স্ফুলিঙ্গ হতে চাইছে।

আমি পা বাড়ালাম সিঁড়ির দিকে। বারো-চৌদ্দটি ধাপের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে কান্তির। চতুষ্কোণ এই প্রাঙ্গণের প্রতিটি বর্ডারে দু’টি করে কান্তির। দুই পাশে ভারী স্তম্ভের মজবুত স্থাপনার মাঝে তিনটি অন্তস্থ সরু খুঁটির সমন্বয়ে গড়া গথিক-নির্মাণের পাঁচটি বড় ফোকর মানে দরোজার মতো বিশাল বিশাল গহ্বর যার কলামগুলো চমৎকার ধূসর কারুকার্যময় এবং দু’দিকের স্তম্ভ ও ওপরের আড়ায় নীল টাইলসের আল্পনার ইন্দ্রজাল যা হবে শেষ বিচারের দাঁড়িপাল্লা রাখার ভরদণ্ড বলে বিশ্বাস করে জেরুসালেমবাসী তারই নাম কান্তির। এই আশ্চর্য গভীর বিশ্বাসের প্রতি মুসলিম-খ্রিষ্টান-ইহুদি সবারই পরম নির্ভরতায় আমি মুগ্ধ ও হতভম্ব। কারণ আমি আগে কখনো এসব কথা-কাহিনী শুনিনি। পরকাল সম্পর্কে বস্তুবাদী কল্পনায় বরাবরই আমার ক্লান্তি লাগে। এক বিদ্রোহী আরব কণ্ঠ একবার লিখেছিল : যা বলা হয়েছে, তা আমি এখানেই পাই; যা বলা হয়নি, তা আমার চাই না। আমি কী করে তা দেখব, যা আমার জ্ঞানের অগোচর? রহস্য দিয়ে আমাকে প্রতারিত করার চেয়ে আমি বরং নিদ্রাকেই বেছে নেই...!


কান্তিরগুলো বিশাল এবং রাজকীয় প্রায় তিন-মানুষ সমান উঁচু। কেউ বলতে পারে না, এগুলো কার হাতে তৈরি। ঐতিহাসিকদের বেশির ভাগের ধারণা, মিসরীয় ধারার নির্মাণ এগুলো। তবে যে বা যিনিই এর প্রতিষ্ঠাতা হোন না কেন, ক্রুসেডীয় টালমাটালের দুই-আড়াই শ’ বছরের ধ্বংসলীলার পরও যে এগুলো এমন অটুট-অক্ষত আছে, দেখে আমি আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না।


কান্তিরের নিচে দাঁড়িয়ে সত্যিই আমার দেহ কেঁপে উঠল। জীবনের নানা স্মৃতির মনছবি দেখে জিজ্ঞাসা জাগল কী হবে আমার, যদি সত্যিই আমাকে তোলা হয় এই কান্তিরের পাল্লায়? কোনো কোর্টে অভিযোগ বা বিচার না হলেও, আমার নিজের মন তো নিজের ব্যর্থতা ও পরাজয়গুলোকে জানে। এই চরম উপলব্ধি ছিল বলেই তো বিদ্রোহী নজরুলও মিনতি জানিয়েছেন করুণ কণ্ঠে : রোজ হাশরে আল্লাহ আমার, করো না বিচার, আল্লাহ করো না বিচার...। আমি কি এই মহান সাধককে গুরু না মেনে পারি?
আলতো হাতে আমি কান্তির ছুঁয়ে দেখি। প্রচণ্ড রোদেও কলামগুলোর গা বরফ-শীতল। পাথরকে এই আশ্চর্য সহনশীলতা দিয়েই তৈরি করা হয়েছে; কখনো সে ভূখণ্ডের পেরেক, কখনো সভ্যতার পিরামিড।

 


কান্তিরের নিচে দাঁড়াতেই যেন ডোম-অব-রক বাঙময় হয়ে উঠল। আট-কোনা ঘরটির তিন দিক পুরোপুরি, আর এক দিক আংশিক দেখা যাচ্ছে। অষ্টভূজের এই আশ্চর্য নির্মাণ মুসলিম সভ্যতায় যা প্রথম বানিয়েছিলেন সিরিয়ান স্থপতি রাজা ইবনে হাইওয়ান এবং জেরুসালেমের প্রকৌশলী ইয়াজিদ বিন সালমান। তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা আর দক্ষ ম্যাসনদের অন্তহীন শ্রমের ছয়টি বছর লেগেছিল একে এই গঠনে আনতে। ‘মরিয়া-পাহাড়’ বরাবরই বিশ্বাসীদের তীর্থভূমি সেই নবী সোলেমানের যুগ থেকেই নতুন ডোম-অব-রক যাকে করে তুলল নবসৃষ্টির নতুন ধারা। সৌন্দর্য, শিল্পবোধ, পরিমিতি, বিশালতা এবং নিপুণ-ত্রিকোণমিতির এই গম্বুজ হয়ে উঠল পর্যটকদের নতুন চুম্বক! কথিত হলো জেরুসালেমকে জানা মানে পৃথিবীকে জানা!


সেই জেরুসালেমের মূল আকর্ষণ এখন মাত্র দু’টি সেপালসার চার্চ এবং ডোম-অব-রক। পশ্চিম দিকে ঘুরে আমি দেখতে চেষ্টা করলাম গলগা থাকে যেখানে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল বলে দাবি খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের যার রুপালি ধাঁচের গির্জা ও গম্বুজ নিয়ে শত-সহ¯্র গল্পগাথা কিন্তু দেখা গেল না।


ডোম-অব-রকের আশপাশেও ছোট-বড় অনেক ক’টি ডোম। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ডোম-অব-চেইন রকের সামান্য পূর্বেই। পশ্চিম উত্তর-কোণের গা ঘেঁষে রয়েছে ডোম-অব-প্রফেট এবং ডোম-অব-অ্যাসেনশন। আমার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে সামার পালপিট (মিম্বার-ই সাইফ) সাদা মর্মরে বাঁধানো খোলা ডোম। ক্রুসেড জয়ী সালাদীন এটি তৈরি করেছেন বলে এর আরেক নাম মিম্বার আদ-দীন। দক্ষিণ পাশের বর্ডারের পশ্চিম পাশ ঘেঁষা কান্তির সংলগ্ন এই পালপিটের নানা রহস্য কৌতূহলী মানুষকে আরো বিভ্রান্ত করে দেয়।

এর পাশেই আছে ডোম-অব-জোসেফ (কুব্বাত-ই-ইউসুফ) যার পেছনের মিম্বার আধখোলা-ঝিনুকের মতো; সামনে মাত্র দু’টি খুঁটি আর পেছনের দিক (যেখানে মিম্বার) দেয়াল বন্ধ। নবী ইউসুফের নামানুসারে এর নাম কেন হলো, বোঝার উপায় নেই। কারণ উল্লেখযোগ্য নবীদের মধ্যে একমাত্র হজরত ইউসুফই এই ডোমে কখনো এসেছেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। তবে মতান্তর আছে অনেক। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যটি হলো এটি সুলতান সালাদীনের স্মরণে নির্মিত যার আসল নাম ইউসুফ সালাউদ্দিন।


আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ডোম-অব-রকের পশ্চিম দেয়ালের উত্তর কোনায়। প্রায় তিরিশ ফুট দূরেই দাঁড়িয়ে আছে কুব্বাত আল-নবি। ডোমটি ছোট এবং চার দিকে খোলা। নয় পা’র মতো চওড়া। আটটি খুঁটির ওপর দাঁড়ানো ডোমটির ওপরের গম্বুজ নীলচে-সবুজ টাইলস ঢাকা। এই রঙটুকুই ডোমটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। দিয়েছে মসজিদে নববীর স্মরণ। বলা হয়, এখানেই সব নবী নবীশ্রেষ্ঠ মুহাম্মদের নেতৃত্বে নামাজ আদায় করেছেন মিরাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর!


এই নামাজ মিরাজের আগে না পরে তা নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। যেহেতু নবীদের সাথে তার দেখা হয়েছিল একেক আসমানে একেক জনের সাথে তাই ফিরে আসার পরই জামাত হওয়া স্বাভাবিক। যদিও কাল রাতে আমি এ নিয়েও জোর বিতর্ক শুনেছি হোটেলের লবিতে এবং তাতে শরিক হয়েছিল মুসলমানদের চেয়ে খ্রিষ্টান-ইহুদিরাই বেশি। এ শুধু জেরুসালেমেই সম্ভব আমি কফি খেতে ভাবছিলাম কারণ, বাকি পৃথিবী যখন বাহাসে মত্ত, জেরুসালেম তখন আলো বিলিয়েছে তিন ধর্মেরই সুতরাং মিলন ও বিরহই তার নিয়তি!
উত্তর-পশ্চিম কোনায় প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে আরেকটি মাঝারি ডোম ডোম-অব অ্যাসেনশন। কথিত যে, এটি ক্রুসেডারদের পবিত্র স্থান। যদিও মুসলমানদের অনেকেই বিশ্বাস করে যে, এখান থেকেই রাসূল মুহাম্মদ মেরাজে যান। এটাও আমাকে দ্বিধায় ফেলেছিল। কিন্তু পরে নিজেই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, এটিও অসম্ভব। ডোম-অব-রক থেকেই তার উড্ডয়ন সব যুক্তিতেই টেকসই।

অ্যাসেনশন ডোম-এ দাঁড়িয়ে রকের মূল গম্বুজটি দেখতে গিয়ে আমার চোখ আবারো ধাঁধিয়ে গেল। বিস্ময়কর এই গম্বুজ ১৬ বৃত্তের শত-শহ¯্র চৌকো খণ্ড দিয়ে ঢাকা যা আসলে ব্রোঞ্জ এবং রুপার অ্যালয়ের ওপরে সোনার প্রলেপ ছাওয়া ১৯৬৪ সালে কিং হুসেন তার লন্ডনের প্রাসাদ বিক্রির ৮২ লাখ মার্কিন ডলারের পুরোটা দিয়েছেন যে নির্মাণের জন্য! আমি জেনারেল গোরেন আর বাদশাহ হুসেনকে পাশাপাশি মেলাতে চাইলাম। হোসেন ক্লিন্ড শেভ্ড, প্রগতিশীল এবং বেসামরিক রাষ্ট্রপ্রধান; আর গোরেন দাড়িওয়ালা, রাব্বি, সামরিক জেনারেল এবং দরিদ্র। জেরুসালেমের ইতিহাস কাকে মনে রাখবে? কে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস হয় ধ্বংস না সৃষ্টি? মহাভারতের যুক্তি মানলে অবশ্য আমার এই সরল ব্যাখ্যা টেকে না। কারণ, অর্জুন যখন আপন ভাই, গুরু ও নিকটাত্মীয়দের হত্যা করতে বিভ্রান্ত ও অপারগ, তখন কৃঞ্চের যুক্তি ছিল এ রকম : এ তো খুন নয়; এ হলো নতুনকে জায়গা ছেড়ে দেয়া। পুরাতনকে বিদায় নিতেই হবে ঈশ্বরের এই অভিপ্রায় তোমার হাতেই বাস্তবায়িত হবে। ধনুকে তীর পরাও, পার্থ!


হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমি এগিয়ে গেলাম পূর্ব দিকে। পুরো চত্বরের কেন্দ্রভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বড় গম্বুজ ডোম-অব-চেইন। নানা জনশ্রুতি এর : গোলাবারুদ রাখার জায়গা, নামাজের জায়গা, মূল্যবান রত্ন রাখার জায়গা, কিয়ামত শুরু হওয়ার জায়গা। তবে যে বিশ্বাস সর্বাধিক বিস্তৃত তা এর কেন্দ্রে ঝুলানো চেইনটিকে ঘিরে যেটি এখন না থাকলেও ইতিহাস বলে সেটি ধরে কোনো মিথ্যাবাদী শপথ করলে সাথে সাথে বজ্রপাত হওয়ার আশ্চর্য ঘটনা ঘটত। বহু গ্রন্থেই এই কাহিনীর বর্ণনা পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকেরা বলেন, চেইন-ডোমটি ডোম-অব-রকেরও আগে তৈরি; সুলতান আবদুল মালেকের হাতেই। তিনি যখন এই বিশাল ‘জাহাজের’ ওপর এত ক্ষুদ্র নির্মাণ দেখেন সাংঘাতিক অসন্তুষ্ট হয়ে ডোম-অব-রক নির্মাণ করেন সব স্থাপত্যবিদ্যা ও টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে যা আজো পৃথিবীর বিস্ময় হয়ে বিরাজমান।


যাই হোক, ডোম-অব-চেইনও নিখুঁত জ্যামিতিক মাপে সুসজ্জিত। অনেকটা ছাতার মতো দেখতে এই আদি মসজিদ আগে কুড়িটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। তেরো শতাব্দীর মামলুক সুলতান বেইবারস একে পুনর্নির্মাণ করেন সতেরো স্তম্ভে। অতিন্দ্রীয়বাদী অনেকেরই বিশ্বাস এটিই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল। তবে যার নামে এর নাম সেই শিকল কিন্তু এখন আর নেই। মানুষের অতিবিশ্বাস যে, কুসংস্কারে ঠাঁই নেয় তা রুখতেই সুলতান সালাদিন কেন্দ্রে ঝুলানো চেনকে খুলে নেন এবং এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার শত বছরের ঐতিহ্য বন্ধ করে দেন।
ইতিহাসকে ধন্যবাদ জানাতেই আমি পূর্ব দিকে হাঁটতে শুরু করি। বেশিদূর যাওয়া গেল না। সিকিউরিটি দৌড়ে এলো এবং ভয়ঙ্করভাবে রুখে দাঁড়াল।
‘দিজ ইজ প্রহিবেটেড, ম্যান; ইউ কান্ত্ গো এহেদ’।
আমার বলতে ইচ্ছে হলো, ‘প্রহিবিশন বাই হুম?’
কিন্তু যুদ্ধের এই কেন্দ্রভূমিতে দাঁড়িয়ে আমার সে কথা বলার সাহস হলো না। বরং যে উদ্দেশ্যে এদিকে এসেছিলাম ‘গোল্ডেন গেট’ বা গেট-অভ-হেভেন দেখব বলে তা পূর্ণ হওয়ায় হেসে বললাম, ‘থ্যাংক্যু, স্যার। মেনি মেনি থ্যাংকস ফর গাইডিং মি রাইট্লি। মেনি মেনি থ্যাংকস।


জবাবে সে শুধু তার উজি রাইফেলের বাঁটে সশব্দে থাবড়া মেরে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। বোঝা গেল না, সেটি আমার কথার প্রতি সম্মান; না চূড়ান্ত সতর্কতা দেখানো। তার দুর্বোধ্য চেহারার দিকে পেছন ফিরতেই আবার আমার চোখ অত্যুজ্জ্বল আলোয় অন্ধ হয়ে গেল। ডোম-অব-রকের সোনার গম্বুজে সরাসরি প্রতিফলিত আলো যেন আমার দুঃসাহস ও বেয়াদবিকে আছাড় মেরেছে! আমি একাই হেসে উঠলাম। ইকবালের একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি মনে পরে গেল আমার


কিষান মজুর পায় না যে মাঠে শ্রমের ফল
সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও
স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মাঝে কেন আড়াল?


(চলবে)