মৃত্যুদন্ড নিয়ে অরুন্ধতী ও হুমায়ুন আহমেদের রায়

Dec 06, 2017 03:19 pm
অরুন্ধতী রায়, বিবিসি ও হুমায়ূন আহমেদের রায়

 

মৃত্যুদণ্ড : অরুন্ধতী রায়, বিবিসি ও হুমায়ূন আহমেদের রায়
শফিক রেহমান

অরুন্ধতী রায়ের জন্ম হয়েছিল ২৪ নভেম্বর ১৯৬১ তে, শিলং, মেঘালয়ে। ২৬ বছর বয়সে দি গড অফ স্মল থিংস (The God of Small Things) বইটি লেখার জন্য ১৯৯৮-এ তিনি ম্যান বুকার প্রাইজ পেয়ে বিশ্ব খ্যাতি পান। তারপর থেকে তিনি মানবাধিকার রক্ষায় সক্রিয় আছেন, বিশেষত কাশ্মিরিদের স্বাধিকার আন্দোলন সমর্থন এবং ইসরেলিদের দমন নীতির কড়া সমালোচনা করছেন। ইনডিয়াতে তিনি বিভিন্ন সাহসী ভূমিকা নিয়েছেন ও বক্তব্য রেখেছেন।

সাম্প্রতিক একটি রচনায় অরুন্ধতী রায় মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে লিখেছেন। এই লেখাটি তার সাহসের সর্বশেষ নিদর্শন।

নিচে লেখাটির ভাষান্তর প্রকাশিত হলো :

শিরোনাম : দি হ্যাংগিং অফ আফজাল গুরু ইজ এ স্টেইন অন ইনডিয়ান ডেমক্রেসি (The hanging of Afzal Guru is a stain on India’s democracy, আফজাল গুরুর ফাসি ইনডিয়ার গণতন্ত্রের একটি কলঙ্ক)।

সাবহেডিং : আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে মামলায় বিরাট সব ত্রুটি সত্ত্বেও ইনডিয়ার সব প্রতিষ্ঠান একজন কাশ্মিরি ‘টেররিস্ট’-কে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে ভূমিকা রেখেছে।

শনিবারে দিল্লিতে বসন্ত তার আগমন বার্তা ঘোষণা করেছে। তখন সূর্যের আলোতে দিল্লি ভাসছিল। আর আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে গেল। ব্রেকফাস্টের একটু আগে ইনডিয়ান সরকার গোপনে আফজাল গুরুকে ফাসি দিল। ডিসেম্বর ২০০১-এ ইনডিয়ার পার্লামেন্ট ভবনের বিরুদ্ধে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল সে বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন আফজাল গুরু। ফাসির পর দিল্লির তিহার জেলখানায় আফজালের মরদেহ কবর দেয়া হয়। ওই জেলে ১২ বছর যাবত আফজাল সলিটারি কনফাইনমেন্টে ছিলেন, অর্থাৎ তাকে এক যুগ নির্জন কারাবাস করতে হয়েছিল। আফজালের স্ত্রী ও তার ছেলেকে এই ফাসির বিষয়ে খবর দেয়া হয়নি। মিডিয়াকে ইনডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্পিড পোস্ট ও রেজিস্টার্ড পোস্টের মাধ্যমে আফজালের পরিবারকে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মিরের ডিরেক্টর জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তিনি যেন চেক করেন আফজালের পরিবার সেটা পেয়েছে কিনা।
তার এই নির্দেশ এমন কোনো বিগ ডিল না। তার কাছে কাশ্মিরি টেররিস্টদের মধ্যে আফজালরা আরো একটি পরিবার মাত্র।


আইনের শাসন বা Rule of Law র এই বিজয় উদযাপনে ইনডিয়ান জাতির মধ্যে, বিশেষত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেমন, কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইনডিয়া (মার্কসবাদী) প্রভৃতির মধ্যে একতা দেখা গেছে যা সচরাচর দেখা যায় না। যদিও “বিলম্ব” (Delay) এবং ‘ঠিক সময়’ (Timing) বিষয়ে এদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য ছিল। টিভি স্টুডিওগুলো থেকে সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ ব্রডকাস্টে “গণতন্ত্রের বিজয়” সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে। এসব সম্প্রচারে সাধারণত যে ধরনের মিকশ্চার থাকে তাই ছিল। অর্থাৎ, তীব্র আবেগের সঙ্গে মেশানো ছিল দুর্বল সব তথ্য। ফাসি হওয়ায় আনন্দ প্রকাশের জন্য দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মিষ্টি বিতরণ করে এবং দিল্লিতে যেসব কাশ্মিরি প্রতিবাদের জন্য সমবেত হয়, তাদের পেটায়। এই সময়ে সমবেত মেয়েদের প্রতি তাদের বিশেষ নজর ছিল। আফজালের মৃত্যু হলেও টিভি স্টুডিওতে ভাষ্যকাররা এবং রাস্তায় গুন্ডারা এমনভাবে ছিল যে মনে হচ্ছিল তারা কাপুরুষ যারা দলবদ্ধ হয়ে শিকার খুজে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদের সাহস বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক সাহায্য চাইছে।
কারণ হয়তো তারা হৃদয়ের গভীরে জানে একটা ভয়ংকর অন্যায়ের পথে তারা যোগসাজশে কাজ করেছে।

ফ্যাক্টস কি? কি হয়েছিল ১৩ ডিসেম্বর ২০০১-এ দিল্লিতে?

ওই দিন পাচ সশস্ত্র ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে গেইট পেরিয়ে ইনডিয়ান পার্লামেন্টের সামনে চলে গিয়েছিল। তাদের গাড়িতে বোমা ফিট করা ছিল। তাদের চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে গুলি ছুড়তে থাকে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর আটজন এবং একজন মালি মারা যায়। এর পরে যে বন্দুকযুদ্ধ হয় তাতে ওই পাচজনই নিহত হয়।
পরবর্তী কালে আফজালকে যখন পুলিশ হাজতে নেয়া হয় তখন সে নিহতদের, মোহাম্মদ, রানা, রাজা, হামজা ও হায়দার রূপে শনাক্ত করে স্বীকারোক্তি দেয়। তবে বাধ্য হয়ে দেওয়া এই স্বীকারোক্তির বিভিন্ন বিবরণ বেরিয়েছে যার ফলে বলা মুশকিল কোন স্বীকরোক্তিটি সত্যি।


আমরা তাদের সম্পর্কে শুধু এটুকুই জানি। ওই নিহতদের পুরো নামগুলো আমরা জানি না। ওই সময়ে বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এল কে আদভানি। তিনি একটি বিবৃতিতে বলেন, ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল ওরা পাকিস্তানি (Looked like Pakistanis)। তার অবশ্য জানা উচিত ছিল পাকিস্তানিরা দেখতে কেমন, কেননা তার নিজেরই জন্ম হয়েছিল সিন্ধু প্রদেশে, যেটা এখন পাকিস্তানে।


হাজতে আদায় করা আফজালের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তদানীন্তন ইনডিয়ান সরকার পাকিস্তান থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং পাকিস্তানি সীমান্তে পঞ্চাশ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করে। দুই দেশের মধ্যে পারমানবিক যুদ্ধ বেধে যাবে এমন কথা ওঠে। ইনডিয়াতে অবস্থানরত বিদেশি এমবাসিগুলোকে তাদের স্টাফদের চলাচল বিষয়ে সতর্ক উপদেশ দেওয়া হয়। কিছু দূতাবাস তাদের কর্মচারিদের দিল্লি থেকে স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়। পাকিস্তান ও ইনডিয়ার এই মুখোমুখি অবস্থান কয়েক মাস যাবৎ বজায় থাকে এবং এর ফলে ইনডিয়ার কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। পরে ইনডিযার সুপৃম কোটৃ আফজাল গুরুর ওই স্বীকারোক্তি নাকচ করে দেয়। সুপৃম কোর্ট বলে ওই স্বীকারোক্তিতে “ত্রুটি” ছিল এবং “পদ্ধতিগত স্বাধীনতা লংঘিত হয়েছিল।


ওই ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল (Special Cell) দাবি করে যে তারা রহস্য উদঘাটন করেছে।
এই দিল্লি পুলিশ ভুয়া “এনকাউন্টার” হত্যাকান্ডের জন্য কুখ্যাত। টেররিস্ট রূপে যাদের সন্দেহ করা হয় তাদের “এনকাউন্টারে” মেরে ফেলা হয়। ১৫ ডিসেম্বরে দিল্লি পুলিশ দাবি করে তারা এই ঘটনার পেছনের “মাস্টারমাইন্ড”, প্রফেসর এস.এ. আর গিলানিকে দিল্লিতে এবং শওকত গুরু ও তার জ্ঞাতিভাই আফজালকে শ্রীনগর, কাশ্মিরে গ্রেফতার করেছে। তারপর তারা শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকে গ্রেফতার করে। ইনডিয়ান মিডিয়া অতি উৎসাহ নিয়ে পুলিশের এই বিবৃতি বিভিন্ন রূপে প্রকাশ করে। যেমন কিছু হেডলাইন ছিল, “দিল্লি ইউনিভার্সিটি লেকচারার ছিলেন সন্ত্রাসী প্ল্যানের প্রধান ব্যক্তি”, “ভার্সিটি ডন পরিচালিত করেছেন ফিদাইনদের”, “ফৃ টাইমে ডন সন্ত্রাস বিষয়ে লেকচার দিতেন।” একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক জিটিভি ডিসেম্বর ১৩ নামে একটি ডকুড্রামা সম্প্রচার করে। এতে দাবি করা হয় “পুলিশের চার্জ শিটের ভিত্তিতে যে সত্য” সেটা নির্ভর করে এই ডকুড্রামাটি করা হয়েছে।


প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের চার্জ বা অভিযোগই যদি সত্য হয়, তাহলে আদালতের আর দরকার কি?
ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহার বাজপেয়ী বিজেপি নেতা আদভানি প্রকাশ্যে জিটিভি-র এই মুভির প্রশংসা করেন। মুভিটি দেখানোর বিরুদ্ধে আবেদন করা হলে সুপৃম কোর্ট এটি প্রদর্শনের পক্ষে রায় দেয়। সুপৃম কোর্ট বলে, বিচারকদের প্রভাবিত করতে পারবে না মিডিয়া।
কিন্তু এই মুভিটি প্রদর্শিত হবার মাত্র কয়েক দিন পরেই দ্রুতগতি সম্পন্ন আদালত, গিলানি, আফজাল ও শওকত গুরুকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরবর্তী সময়ে হাই কোর্ট গিলানি ও আফসান গুরুকে মুক্তি দেয়। সুপৃম কোর্ট এই মুক্তির আদেশ বহাল রাখে। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০০৫-এর রায়ে আফজালকে তিনটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুটি মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এই রায় বিনা বিলম্বে কার্যকরের জন্য বিজেপি ডাক দেয়। তাদের একটা শ্লোগান ছিল, “দেশ আভি শরমিন্দা হ্যায়, আফজাল আভিবি জিন্দা হ্যায়” (দেশ এখন লজ্জিত, আফজাল এখনো জীবিত)।
যেসব গুঞ্জন উঠছিল সেগুলোকে ভোতা করার লক্ষ্যে একটি নতুন মিডিয়া ক্যামপেইন শুরু হয়। এখনকার বিজেপি এমপি চন্দন মিত্র তখন ছিলেন পাইওনিয়ার পত্রিকার সম্পাদক। তিনি লেখেন, “১৩ ডিসেম্বর ২০০১-এ পালার্মেন্ট ভবন হামলাকারী নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি তিনিই প্রথম গুলি করেন এবং ধারণা করা হয় নিহত ছয় জনের মধ্যে তিনজন মারা গিয়েছিল তার গুলিতে।”
মজার কথা এই যে, পুলিশের চার্জ শিটেও আফজালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছিল না। সুপৃম কোর্টের রায়ও স্বীকার করে যে, সাক্ষ্য-প্রমাণ সব ছিল সারকমস্টানশিয়াল (Circumstancial) অর্থাৎ, পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় জোরালো ইঙ্গিত বহন করলেও প্রত্যক্ষ প্রমাণ বহন করে না। সুপৃম কোর্ট রায় স্বীকার করে, “কৃমিনাল ষড়যন্ত্র যে হয়েছে, সেটার প্রমান অধিকাংশ ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না।”
কিন্তু এটা বলার পরেই, সম্পূর্ণ বিপরীত সুরে, সুপৃম কোর্ট বলে, “এই ঘটনায় বহু ব্যক্তি হতাহত হয়েছে এবং পুরো জাতি শোকাহত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সমাজের যৌথ বিবেক (Collective cnscience of society) শুধু তখনই সন্তুষ্ট হবে যখন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে।”

প্রশ্ন হলো, পার্লামেন্ট ভবন হামলা বিষয়ে কে আমাদের যৌথ বিবেক সৃষ্টি করেছে? পত্রপত্রিকায় যেসব সংবাদের ওপর আমরা চোখ বুলিয়েছি, সেই সব? নাকি, টিভিতে যেসব প্রোগ্রাম আমরা দেখেছি সেই সব? আইনের শাসনের বিজয় উদযাপনের আগে দেখা যাক আসলে কি হয়েছিল?
আইনের শাসনের এই বিজয়ে যারা উৎসব করছেন তারা যুক্তি দেন, ইন্ডিয়ান আদালত যে গিলানিকে মুক্তি দিয়েছে এবং আফজালকে দণ্ড দিয়েছে সেটাই প্রমাণ করে যে বিচার প্রক্রিয়া ছিল অবাধ ও ন্যায়সংগত।
কিন্তু তাই কি?
দ্রুতগতি সম্পন্ন (ফাস্ট ট্রাক, Fast Track) আদালতে বিচারকাজ শুরু হয় মে ২০০২-এ। ১১ সেটেম্বর ২০০১ (নাইন-ইলেভেন)-এ নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ার এবং ওয়াশিংটনে পেন্টাগন ভবনে যে হামলা হয়েছিল তার প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্ব তখন ভুগছিল।
আমেরিকান সরকার আফগানিস্তানে তাদের “বিজয়” নিয়ে একটু আগেভাগেই নির্লজ্জ উল্লাস প্রকাশ করছিল। গুজরাট রাজ্যে হিন্দু গুণ্ডাবাহিনী যে মুসলিম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তাতে সাহায্য করেছিল পুলিশ ও রাজ্য সরকার। এর সূচনা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ২০০২-এ এবং তখনো তা বিক্ষিপ্তভাবে চলছিল। সাম্প্রদায়িক ঘৃনার বিষবাষ্পে ভরে ছিল বাতাস। আর পার্লামেন্ট ভবন হামলার বিষয়ে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছিল। কৃমিনাল কেইস বা ফৌজদারি মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, যখন সাক্ষ্য-প্রমান উপস্থাপিত হয়, সাক্ষীদের জেরা ও পাল্টা জেরা করা হয়, তখন যুক্তির ভিত্তি রচিত হয়। তারপর হাই কোর্ট ও সুপৃম কোর্টে শুধু আইন বিষয়ে তর্ক করা যায়- নতুন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না। কিন্তু বিচারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আফজাল কোথায় ছিলেন?
আফজাল তখন হাই সিকিউরিটি সলিটারি সেলে একা ছিলেন। তার কোনো উকিল ছিল না। আদালত দ্বারা তার পক্ষে নিযুক্ত একজন জুনিয়র উকিল একদিনও জেলখানায় যাননি।
আফজালের পক্ষে তিনি একজন সাক্ষীও ডাকেননি। সরকার পক্ষের কোনো সাক্ষীকে পাল্টা জেরা বা ক্রসএক্সামিন করেননি। এই পরিস্থিতি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলে বিচারক বলেন, তিনি অসমর্থ।

তা হলেও, বিচারের শুরু থেকেই মামলাটি কূপোকাৎ হয়ে যায়। অনেক উদাহরণই দেয়া যেতে পারে। এখানে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো :
আফজালের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দুটি আলামত ছিল একটি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ কমপিউটার। বলা হয়েছিল, তাকে গ্রেফতারের সময়ে এ দুটো তার কাছে ছিল এবং তখনই জন্দ করা হয়। কিন্তু আদালতে তা পেশ করার সময়ে সিল করা অবস্থায় থাকা উচিত ছিল। কিন্তু কোনোটাই সিল করা ছিল না।
শুনানির সময়ে জানা যায় যে আফজালের গ্রেফতারের পর ওই ল্যাপটপের হার্ড ডিস্কে অ্যাকসেস করা হয়েছিল। সেখানে ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢোকার ভুয়া কিছু পাস, ভুয়া কিছু আইডি কার্ড যেসব “সন্ত্রাসীরা” ব্যবহার করেছিল পার্লামেন্ট ভবনে ঢোকার জন্য এবং পার্লামেন্ট ভবনের একটি জিটিভি ভিডিও কিপ।
পুলিশের মতে তাহলে ওই ল্যাপটপে কি ছিল? আফজাল অন্য সব কিছু ডিলিট করে দিয়ে তার বিরুদ্ধে যেসব তথ্য ব্যবহৃত হতে পারে শুধু সেসবই রেখেছিল!
পুলিশের পক্ষে একজন সাক্ষী বলে, যে গুরুত্বপূর্ণ সিম কার্ড দ্বারা সব অভিযুক্তরা আফজালের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল, সেটা সে বিক্রি করেছিল ৪ ডিসেম্বর ২০০১-এ। কিন্তু সরকার পক্ষের পেশ করা কল রেকর্ডে দেখা যায় এই সিম ৬ নভেম্বর ২০০১ থেকে কার্যকর হয়েছিল।


আফজালের কাছে কিভাবে পুলিশ পৌছেছিল? তারা বলে গিলানি তাদের নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আদালতের রেকর্ডে দেখা যায়, গিলানিকে ধরার আগে আফজালকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বলে এটা গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য (material contradiction) কিন্তু এর বেশি আর কিছু করে না।
অ্যারেস্ট মেমো সই করেছিলেন দিল্লিতে গিলানির ভাই বিসমিল্লা। সিজার (Seizure) মেমো সই করেছিলেন জম্মু ও কাশ্মির পুলিশের দুই সদস্য। এদের মধ্যে একজন রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে আফজালকে আগেই হয়রানি করতেন।


মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য প্রমাণের পাহাড় এভাবেই গড়ে তোলা হয়। আদালত এসব লক্ষ্য করেছে কিন্তু পুলিশকে শুধু মৃদু তিরস্কার করেছে। আর কিছু নয়।
পার্লামেন্ট ভবন হামলার রহস্য উদঘাটনে যদি কেউ সত্যই উৎসাহী হতো তাহলে তারা সব সাক্ষ্য প্রমাণ তন্ন তন্ন করে বিচার বিবেচনা করতো। কেউ সেটা করেনি। আর তার ফলে এই ষড়যন্ত্রের প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হবে না এবং তাদের বিষয়ে তদন্তও হবে না।


আফজালের সত্য কাহিনী ও ট্র্যাজেডি অনেক বিশাল। সেটা আদালতের রুমে সীমিত রাখা সম্ভব নয়। সত্য কাহিনীটা আমাদের নিয়ে যাবে কাশ্মির উপত্যকায় যেখানে যে কোনো মুহূর্তে একটা পারমানবিক যুদ্ধ বেধে যেতে পারে, যে এলাকায় এখন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সৈন্য রেডি হয়ে আছে, যেখানে পঞ্চাশ লক্ষ ইনডিয়ান সৈন্য আছে (অর্থাৎ, প্রতি চার বেসামরিক ব্যক্তির জন্য এক সামরিক ব্যক্তি), শত শত আর্মি ক্যাম্প এবং এমন সব টর্চার চেম্বার যা ইরাকের আবু গ্রাইবকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। এ সবই করা হয়েছে কাশ্মিরি জনগণেও কাছে ধর্ম নিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র পৌছে দেয়ার জন্য। ১৯৯০ থেকে কাশ্মিরে স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে আন্দোলন উগ্র রূপ নিয়েছে। ফলে ৬৮,০০০ নিহত হয়েছে, ১০,০০০ গুম হয়েছে এবং অম্ভতপক্ষে ১০০,০০০ ব্যক্তি নির্যাতিত হয়েছে।


তবে যে হাজার হাজার মানুষ জেলে মারা গিয়েছে তাদের তুলনায় আফজাল হত্যাটি ভিন্ন। আফজালের জীবন-মৃত্যুর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে চোখ ধাধানো দিনের আলোতে যেখানে ইনডিয়ান গণতন্ত্রের সকল প্রতিষ্ঠানই তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে অংশ নিয়েছে।
এখন তো আফজালের ফাসি হয়েছে। আশা করি আমাদের যৌথ বিবেক তুষ্ট হয়েছে। নাকি আমাদের পেয়ালার মাত্র অর্ধেক ভর্তি হয়েছে রক্তে?

বিবিসিতে ডেথ অফ এ পৃন্সেস
কাহিনী সারাংশ

বিবিসি-র একটি টেলিভিশন প্রোগ্রাম, ডেথ অফ এ পৃন্সেস আশির দশকে আন্তর্জাতিক ঝড় তুলেছিল। অনুষ্ঠানটি সৌদি আরবের এক পৃন্সেসের মর্মান্তিক পরিণতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। তাই দর্শকের কৌতূহল যেমন ছিল যথেষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের আপত্তি তেমনি ছিল অনেক। বৃটিশ সরকারকে এ নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল।

১৯৭৭-এ একটি খোলা মাঠে পৃন্সেস মিশাল এবং তার প্রেমিকের প্রাণ বধ করা হয়। লোহিত সাগরের তীরে জেদ্দাতে কিং ফয়সল স্টৃটের পাশে এই খোলা মাঠ সাধারণত গাড়ি পার্ক করার জন্য ব্যবহৃত হয়। মাঠে প্রাণ দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয় না। আর এই কারণেই ধারণা করা হয় ঊনিশ বছর বয়স্কা পৃন্সেসের প্রাণ বধের আদেশ দিয়েছিলেন ব্যক্তিগতভাবে তারই পিতামহ পৃন্স মোহাম্মদ অর্থাৎ বাদশাহ খালেদ ওই আদেশটি দেননি।


প্রাণ বধের কয়েক মাস পরে ঘটনাটি দেশের সাধারণ জনগণ জানতে পারে। বিদেশীরা এ বিষয়টি জেনেছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস থেকে। অনেকে এতে প্রচণ্ড শক পেয়েছিলেন এবং খবরটা বিশ্বাস করতে চান নি। তবে সঠিক যে কি ঘটেছিল সেটা আবিষ্কার করা দুষ্কর ছিল। সবাই কিছু কিছু জানতেন কিন্তু পুরো ঘটনাটা কেউ জানতেন না। এর ফলে প্রায় বিশ ত্রিশটা ভিন্ন বিবরণ চালু হয়েছিল।
যেসব বিবরণ বিষয়ে সবাই একমত ছিলেন তা হলো পৃন্সেস তরুণী ছিলেন। তিনি এক তরুণ সৌদির প্রেমে পড়েছিলেন এবং সমুদ্র তীরে নিজের পোশাক ফেলে গিয়ে, ডুবে মরার ভান করেছিলেন। তরপর তিনি এবং তার প্রেমিক জেদ্দায় প্রায় ত্রিশ মাইল উত্তরে ওভোর নামে একটি সমুদ্র তীরবর্তী শহরে কয়েক দিনের জন্য বসবাস করেন।
এরপর পৃন্সেস পুরুষের বেশে জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে প্লেনে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে তিনি এবং তার প্রেমিক ধরা পড়ে যান।


বাদশাহ খালেদ পৃন্সেসের প্রাণ বধে রাজি হননি। কিন্তু পৃন্সেসের পিতামহ বাদশাহর ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেই প্রাণ বধের আদেশ দেন। পিতামহ পৃন্স মোহাম্মদ যার আদেশে তার দৌহিত্রীর প্রান হরণ করা হয়, তিনি বাদশাহ খালেদের বড় ভাই। গরম মেজাজের জন্য পৃন্স মোহাম্মদের নাম আছে। জেদ্দাতে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে পৃন্স মোহাম্মদ একাই এই প্রাণ দণ্ডের আদেশ দেন। সৌদি আরবের রেডিও-টেলিভিশনে প্রাণ বধের সংবাদটি দেওয়া হয়নি। জেদ্দা থেকে যে দুটি মাত্র ইংরেজি ভাষায় পত্রিকা প্রকাশিত হয় তাতেও খবরটি ছিল না।


এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে যে বিতর্কিত টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি বৃটেনে প্রচারিত হয়। তার স্কৃপ্ট কনসালটেন্ট ছিলেন উপন্যাস লেখিকা পেনেলোপ মার্টিমার।
পাঠক কল্পনা করতে পারেন সেই তরুণী রাজকুমারীর কথা? তার অন্তিম মুহূর্তগুলো? কিভাবে তাকে বধ্য ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? তার পরণে কি পোশাক ছিল? হয়তো তার হাত বাধা ছিল না। হয়তো তার প্রেমিকের হাত বাধা ছিল। ওদের দুজনকে কি একই স্থানে বধ করা হয়েছিল? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কার শিরচ্ছেদ আগে করা হয়েছিল? যদি প্রেমিক যুবকটির শির আগে কর্তন করা হয় তাহলে সেই দৃশ্যটি রাজকুমারী দেখেছিলেন কি না? নাকি তার চোখ বাধা ছিল? আর ঘাতকের তলোয়ার ঘাড়ে এসে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তগুলোতে তিনি কি ভেবেছিলেন?

হুমায়ূন আহমেদের গল্প

বাংলাদেশের প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদও (১৩.১১.১৯৪৮ - ১৯.১২.২০১২) মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। তার একটি বই এই আমি-তে লাল চুল রচনাটির শেষাংশ নিচে প্রকাশিত হলো :

ভদ্রলোক নামাজ পড়ার জন্য সময় নিলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এসে বসলেন। হাসিমুখে বললেন, ‘সরি, আপনাকে বসিয়ে রাখলাম। তাহলে আবার ডিসকাশন শুরু করা যাক’ তিনি আবারো কথা বলা শুরু করলেন। কথার মূল বিষয় হচ্ছে ধর্ম মানুষের তৈরি, আল্লাহ মানুষ তৈরি করেননি। মানুষই আল্লাহ তৈরি করেছে।
আমি বললাম, ‘আপনি ঘোর নাস্তিক। কিন্তু একটু আগে নামাজ পড়তে দেখলাম। নামাজ পড়েন?’
‘হ্যা পড়ি। গত পচিশ বছর যাবত পড়ছি। খুব কমই নামাজ কাজা হয়েছে।’
‘রোজাও রাখেন?’
‘অবশ্যই।’
‘পচিশ বছর ধরে রাখছেন?’
‘হবে, তবে দু’বার রাখতে পারিনি। একবার গল ব্লাডারের জন্যে অপারেশন হলো তখন, আরেকবার হার্নিয়া অপারেশনের সময়। দুটোই পড়ে গেল রমজান মাসে।’
‘ঘোর নাস্তিক একজন মানুষ নামাজ-রোজা পড়ছেন এটা আপনি ব্যাখ্যা করবেন কিভাবে? আপনি তো মন থেকে কিছু বিশ্বাস করছেন না। অভ্যাসের মতো করে যাচ্ছেন। তাই না-কি!’
ভদ্রলোক জবাব দিলেন না। আমি বললাম, ‘না-কি আপনার মনে সামান্যতম হলেও সংশয় আছে?’
‘না, আমার মনে কোনো সংশয় নেই। আমার নামাজ-রোজার পেছনে একটি গল্প আছে। শুনতে চাইলে বলতে পারি।’
‘বলুন।’

আমি জজিয়তি করতাম। তখন আমি বরিশালের সেশন ও দায়রা জজ। আমি কঠিন প্রকৃতির মানুষ। খানিকটা বোধহয় নির্দয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে কম শাস্তি দেয়ার মানসিকতা আমার ছিল না। অপরাধ করেছে, শাস্তি ভোগ করবে। এই আমার নীতি। দয়া যদি কেউ দেখতে চায় তাহলে আল্লাহ বলে যদি কেউ থাকে সে দেখাবে। আল্লাহ দয়ালু। আমি দয়ালু না।
এই সময় আমার কোর্টে একটি মামলা এল। খুনের মামলা। সাত বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে খুন হয়েছে। পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তারপর সে আর তার স্বামী মিলে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। জমিজমা নিয়ে শত্রুতার জের। সাক্ষ্য-প্রমাণ সবই আছে। আমার মনটা খারাপ হলো। শত্রুতা থাকতে পারে। তার জন্যে বাচ্চা একটা মেয়ে কেন প্রাণ হারাবে? মেয়েটার বাবা সাক্ষ্য দিতে এসে কাদতে কাদতে কাঠগড়াতেই অজ্ঞান হয়ে গেল।
মামলা বেশি দিন চলল না। আমি মামলার রায় দেয়ার দিন ঠিক করলাম। যেদিন রায় হবে তার আগের রাতে রায় লিখলাম। সময় লাগল। হত্যা মামলার রায় খুব সাবধানে লিখতে হয়। এমনভাবে লিখতে হয় যেন আপিল হলে রায় না পাল্টায়। আমি মৃত্যুদণ্ড দেব, আপিলে তা খারিজ হয়ে যাবে, তা হয় না।
আমি স্বামীটিকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। তার স্ত্রীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ইচ্ছা ছিল। এই মহিলাই বাচ্চা মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে এসেছিল। প্রধান অপরাধী সে। আইনের হাত সবার জন্যেই সমান হলেও মেয়েদের ব্যাপারে কিছু নমনীয় থাকে। আমি মহিলাকে দিলাম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

রায় লেখা শেষ হলো রাত তিনটার দিকে। আমি হাত-মুখ ধুয়ে নিজেই লেবুর শরবত বানিয়ে খেলাম। খুব কান্ত ছিলাম। বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়লাম। গভীর ঘুম। এমন গাঢ় নিদ্রা আমার এর আগে কখনো হয়নি।
আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের অংশটি মন দিয়ে শুনুন। স্বপ্নে দেখলাম, সাত-আট বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। কোকড়ানো চুল। মেয়েটি আমার কাছে এসে দাড়িয়েছে। সে তার নাম-টাম কিছুই বলল না। কিন্তু মেয়েটিকে দেখেই বুঝলাম এ হলো সেই মেয়ে, যার হত্যার জন্যে আমি রায় লিখছি। একজনের ফাসি এবং অন্যজনের যাবজ্জীবন। আমি বললাম, ‘কি খুকি, ভালো আছ?’
মেয়েটি বলল, ‘হু।’
‘কিছু বলবে খুকি?’
‘হু।’
‘বলো।’
মেয়েটি খুব স্পষ্ট করে বলল, ‘আপনি ভুল বিচার করছেন। এরা আমাকে মারেনি। মেরেছে আমার বাবা। বাবা দা দিয়ে কুপিয়ে আমাকে মেরে দা’টা ওদের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রেখেছে। যাতে ওদেরকে মামলায় জড়ানো যায়। ওদের শাস্তি দেয়া যায়। আমাকে মেরে বাবা ওদের শাস্তি দিতে চায়।’
‘তুমি এসব কি বলছ? অন্যকে শাস্তি দেয়ার জন্য কেউ নিজের মেয়েকে মারবে?’
মেয়েটি জবাব দিল না। সে তার ফ্রকের কোনা দিয়ে চোখ মুছতে লাগল।

আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল। দেখলাম ভোর প্রায় হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফজরের আজান হলো। আমি রান্নাঘরে ঢুকে নিজেই এক কাপ চা বানিয়ে খেলাম। স্বপ্নের ব্যাপারটিকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না। স্বপ্ন গুরুত্ব দেয়ার মতো কোনো বিষয় না। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ এসবই স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। আমি মামলাটা নিয়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছি। স্বপ্ন হচ্ছে সেই চিন্তারই ফসল। আর কিছু না।
স্বপ্নের উপর নির্ভর করে বিচার চলে না।

রায় নিয়ে কোর্টে গেলাম। কোর্ট ভর্তি মানুষ। সবাই এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় শুনতে চায়।
রায় প্রায় পড়তেই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কি মনে হলো বলে বসলাম, এই মামলার তদন্তে আমি সন্তুষ্ট নই। আবার তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছি।
কোর্টে বিরাট হৈচৈ হলো। আমি কোর্ট এডজর্নড করে বাসায় চলে এলাম। আমার কিছু বদনামও হলো। কেউ কেউ বলতে লাগল, আমি টাকা খেয়েছি। আমি নিজে আমার দুর্বলতার জন্যে মানসিকভাবে খানিকটা বিপর্যস্তও হলাম। আমার মতো মানুষ স্বপ্নের মতো অতি তুচ্ছ একটা ব্যাপার দ্বারা পরিচালিত হবে, তা হতে পারে না। আমার উচিত জজিয়তি ছেড়ে দিয়ে আলুর ব্যবসা করা।

যাই হোক, সেই মামলার পুনঃতদন্ত হলো।
আশ্চর্যের ব্যাপার, মেয়েটির বাবা নিজেই হত্যাপরাধ স্বীকার করল। এবং আদালতের কাছে শাস্তি প্রার্থনা করল। আমি তার ফাসির হুকুম দিলাম। বরিশাল সেন্ট্রাল জেলে ফাসি কার্যকর হলো। ঘটনার পর আমার মধ্যে সংশয় ঢুকে গেল। তাহলে কি পরকাল বলে কিছু আছে? মৃত্যুর পর আরেকটি জগৎ আছে? ঘোর অবিশ্বাস নিয়ে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা শুরু করলাম। নামাজ-রোজা আরম্ভ হলো।

আশা ছিল, এতে আমার সংশয় দূর হবে। যতই পড়ি ততই আমার সংশয় বাড়ে। ততই মনে হয় God is created by man (ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে মানুষ)। তারপর নামাজ পড়ি এবং প্রার্থনা করি। বলি, হে মহাশক্তি, তুমি আমার সংশয় দূর করো। কিন্তু এই সংশয় দূর হবার নয়।
‘নয় কেন?’
কারণ আমাদের পবিত্র গ্রন্থেই সুরা বাকারার সপ্তম অধ্যায়ে বলা আছে,

"Allah hath set a seal
On their hearts and on their hearing
And on their eyes is a veil."


‘আল্লাহ তাদের হৃদয় এবং শ্রবণেন্দ্রিয়কে ঢেকে দিয়েছেন,
এবং টেনে দিয়েছেন চোখের উপর একটি পর্দা।”

আমি তাদেরই একজন। আমার মুক্তি নেই।

ভদ্রলোক চুপ করলেন। আমি বিদায় নেয়ার জন্যে উঠলাম। তিনি আমাকে বাড়ির গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
আমি বললাম, ‘আপনি আসছেন কেন? আপনি আসবেন না।’
তিনি মুখ কুচকে বললেন, ‘আমাদের নবীজীর একটা হাদিস আছে। নবীজী বলেছেন, কোনো অতিথি এলে তাকে বিদায়ের সময় বাড়ির গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিও।’
এই বলেই তিনি বিড়বিড় করে নবী সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর কিছু কথা বলে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। সম্ভবত এশার নামাজের সময় হয়ে গেছে।


০৭ আগস্ট ২০১৪