পিরামিড আসলে কেমন

Dec 06, 2017 03:11 pm
পিরামিড সমাধিসৌধ হিসেবেই পরিচিত

 

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

ভরা পূর্ণিমা! ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশে চোখ রাখলে জ্বলজ্বলে তারার বাতি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। চাঁদ তার ধার করা আলোর ছটা ছড়িয়ে তৃপ্তি পায়। কারো কারো ইচ্ছা হতে পারে তারাগুলো গুনে দেখার। কিন্তু কই! এক, দুই তিন .... খেই হারিয়ে ফেলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। ইচ্ছা হয় ইস্ ছাদটা যদি আরো অনেক উঁচু হতো তাহলে হয়তো গুণে ফেলা যেত সব। লক্ষ করা যেত নক্ষত্ররাজির গতিবিধি।

এ রকম সুপ্ত ইচ্ছা কেবল ছোটদেরই হয় তা না, বড়দের মনেও এ আবেগ ভর করতে পারে। হ্যাঁ, প্রাচীন মিসরীয় ফারাও রাজাদের মধ্য থেকে একজনের ইচ্ছা হয়েছিল নক্ষত্রমণ্ডলীর গতিবিধি লক্ষ করার। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সষ্টাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার জন্য গোয়ার্তুমি করে ফারাও রাজা বানিয়ে ফেললেন পর্বতের মতো উঁচু এক স্থাপত্য। যা তারাদের সাথেই কেবল কিছু দূরত্ব কমায়নি বরং অনেকের ধারণা এ স্থাপত্যটি চাঁদের বুক থেকেও দেখা পাওয়া সম্ভব।
এ স্থাপত্যটিই হলো পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি ‘দ্য গ্রেট পিরামিড গিজা’। মিসরের পিরামিডের সংখ্যা ১০০টিরও বেশি, এর মাঝে সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ পিরামিড হলো গিজা। মিসরের গিজা ব-দ্বীপে অবস্থিত পিরামিডগুলোর মাঝে এটি সর্ববৃহৎ এবং সর্বাধিক পরিচিত। তাই এ পিরামিডকেই বলা হয় গিজা। গিজাতে উল্লেখযোগ্য আরো তিনটি পিরামিড রয়েছে, এগুলো হলো গ্রেট পিরামিড অব খেফরান, গ্রেট পিরামিড অব মেনকিউর এবং ফিনিক্স। ফিনিক্সের আকৃতি এক বিশাল মানবপশুর মতো। সিংহের দেহ ও মানুষের চেহারার আকৃতিতে এটি নির্মিত।

পিরামিড সমাধিসৌধ হিসেবেই পরিচিত। সত্যিকার অর্থেই তা। এ সৌধগুলোই হলো স্লাভ সৈন্যদের শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। প্রাচীন মিসরীয় ফারাও রাজারা মারা গেলে তাদের জন্য গ্রেট পিরামিড গিজার আদলে পিরামিড নির্মাণ করা হতো এবং এর ভেতর সংরক্ষণ করে রাখত তাদের লাশ। প্রাচীন মিসরীয়দের ধারণা ছিল পিরামিডের ভেতরই রাজার পরবর্তী জীবন অতিবাহিত হবে। আর পরবর্তী জীবন সুখে শান্তিতে অতিবাহিত করার জন্য এগুলোর ভেতর রাখা হতো রত্নাগার। পিরামিডের ভেতর লাশ রেখে আসার সময় অনেক ধনরত্ন ও দিয়ে আসত রত্নাগারে। নিয়মিত সেখানে খাবার দেয়া হতো লাশের জন্য। ফরাওদের স্মৃতিস্তম্ভগুলো পৃথিবীর ওপর এমন সমাধিস্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যেগুলোতে খাবার দেয়া এবং ভক্তি করা পুণ্য কাজ বলে মনে করা হতো।

পিরামিড বলতে পৃথিবীব্যাপী যেটি পরিচিত সেটি হলো, মিসরের গিজায় অবস্থিত সবচেয়ে উঁচু পিরামিড গিজা। অন্যগুলোর মতো গিজার ভেতর কোনে ফারাও রাজার মৃতদেহ নেই। আর স্বাভাবিকভাবেই এ কারণে কোনো রতœাগারও নেই। কিন্তু অনেক চোরের ধারণা ছিল গিজার ভেতরও রয়েছে অঢেল রতœ ভাণ্ডার। এ কারণে বিভিন্ন সময় কাক্সিক্ষত সে রত্ন গুলোকে সরিয়ে ফেলার জন্য গিজার ভেতর ঢুকত তারা। কিন্তু গিজার ভেতরকার সুড়ঙ্গগুলোর বিন্যাস ও গতিপথ ছিল খুবই জটিল। ফলে চোরেরা পথ হারিয়ে ফেলত, গিজাকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় নেয়ার আগে বহু চোর এবং কৌতূহলীদের লাশ হতে হয়েছে এর ভেতর।

‘পিরামিড’-এর শাব্দিক অর্থ খুঁজতে গেলে দেখা যায় ইংরেজি পিরামিড শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ পিরামিস থেকে। মিসরীয়রা এ ক্ষেত্রে ‘মের’ দস (ব)ৎ' শব্দটি ব্যবহার করত। পিরামিস বা মের শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো আরোহণের স্থান । পিরামিড চারকোনা ভূমির ওপর স্থাপিত বিশাল আকৃতির স্থাপনা। এটি পাহাড়ের মতো আরোহণযোগ্য বলে হয়তো একে আরোহণের স্থান বলা হতো। প্রাচীন মিসরীয়রা পিরামিডকে বেহেশতের পথ বলে মনে করত। আর বেহেশতের পথকে আরোহণের স্থান বা পিরামিড বলাটাই স্বাভাবিক।

 

কে নির্মাণ করেছিলেন গিজা!
সব মহলেই এ কথা স্বীকৃত যে, ফারাও রাজাদের মাঝে কেউ গিজা নির্মাণ করেছিলেন। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত অনেক গবেষণা হয়েছে পিরামিড নিয়ে। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থেও এর কথা রয়েছে। পবিত্র কুরআন ও বাইবেলেও পিরামিডের ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো ফারাও রাজাদের মাঝে কে এই পিরামিড নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন এবং কে-ইবা এর স্থপতি। ধারণা করা হয় এ সৌধটি ৪ হাজার ৬০০ বছরেরও আগে নির্মিত। ফারাও রাজাদের সংখ্যা হিসাব করলে ১৭০ জন বা এর কাছাকাছি কোনো সংখ্যা হবে। বিভিন্ন মুসলিম চিন্তাবিদ কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী সাল গণনা করে ধারণা করছেন ফারাও রাজা খুফু-ই ছিলেন কুরআনে বর্ণিত সেই ফিরাউন ও খুফুর সভাসদদের মাঝে খুব কাছের লোক এবং তার চাচাত ভাই হামান ছিলেন গ্রেট পিরামিড গিজার প্রকৌশলী। আবার ধারণা করা হয় হামান ছিলেন খুফুর প্রধানমন্ত্রীও।

 

নির্মাণশৈলী
১৩.৬ একর জমির ওপর ভিত নির্মিত হয়েছে ‘দ্য গ্রেট পিরামিড ডগজার। এর প্রতিটি দিক বর্তমানে পাঁচ একর জমি দখল করে আছে, ৭৫৬ ফুট প্রশস্ত ও ৪৫৭ ফুট উঁচু। এর সমগ্র অবয়ব কম্পাসের পয়েন্ট দিয়ে ওরিয়েন্টেড। ১৯ শতকের আগে এটিই ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম স্থাপত্য। ধারণা করা হয় গিজার বয়স ৪ হাজার ৬০০ বছরেরও বেশি।

গ্রিক ভ্রমণকারী হেরোডোটাস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০-এ মিসর ভ্রমণ করে পিরামিড সম্বন্ধে লিখেন, পিরামিড তৈরি করতে ১ লাখ স্লাভ সৈন্যকে ২০ বছর কাজ করতে হয়েছিল। অনেকে আবার মনে করছেন, পিরামিড নির্মাণকারী শ্রমিকরা স্লাভ বা বিদেশী ছিলান্ এরা মিসরের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল না, এদের মাঝে অনেকেই ফারাও রাজাদের স্থায়ী কর্মচারী ছিলেন, যাদের একমাত্র কাজ ছিল পিরামিড নির্মাণ। আর অন্য অনেকেই পিরামিড নির্মাণের কাজে খণ্ডকালীন সময় দিত। গ্রামের বাসিন্দা পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি ছিল অনেক মহিলাও।
১৬৩৮ সালে ইংরেজ গণিতবিদ জন গ্রেভস পিরামিড পরিদর্শন করে দেয়ালের ভেতর একটি সরু গলিপথ আবিষ্কার করেন যা ৮ ফুট প্রশস্ত। এটি গ্রান্ড গ্যালারির সাথে সংযুক্ত। গ্যালারির ওপরের দিকে অর্থাৎ শেষ অংশ এবং নিচের প্রবেশমুখটি ছিল কঠিনভাবেব সিল করা। পিরামিডের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ ফাঁকা স্থান হলো কিংস চেম্বার। উত্তর দিক থেকে কিংস চেম্বারে প্রবেশ করার জন্য অনেক করিডর ও গ্যালারি রয়েছে। প্রকৌশলীদের ধারণা এই সরু পথগুলো ফারাও রাজারা সমাধিসৌধ থেকে বেরোনোর জন্য ব্যবহার করত। অনেকে মনে করেন গিজা নির্মাণ করা হয়েছিল কেবল জ্যোতিষ্কমণ্ডলী পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে। রিচার্ড প্রক্টরের মতে, সরু গলিপথের ওপর দিক থেকে তারাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো। তা ছাড়া ওপরের গ্রান্ড গ্যালারি নির্মাণ করা হয়েছিল একই উদ্দেশ্যে।

পিরামিড পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে একটি উঁচু স্তম্ভ। এটি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম অক্ষে সমান্তরালভাবে আছে। গ্রেট পিরামিড গিজা ২৩ লাখ পাথরের ব্লক দিয়ে ঢাকা রয়েছে। যেগুলোর প্রতিটির ওজন ২.৫ টন। এ পর্যন্ত এর ওপর যত গবেষণা হয়েছে এর মাঝে ১৯২৫ সালে সঠিক একটি গবেষণায় পিরামিডের বিভিন্ন দিকের যে পরিমাপ উঠে এসেছে, সেগুলো হলো :
দক্ষিণ দিক -২৩০.৪৫৪ মিটার (+৬ মিলিমিটার),
উত্তর দিক = ২৩০.২৫১ মিটার (+১০ মিলিমিটার),
পশ্চিম দিক = ২৩০.৩৫৭ মিটার,
পূর্ব দিক = ২৩০.৩৯১ মিটার,
চার দিক মিলিয়ে এর আয়তন ৯২১.৪৫৩ মিটার ৩০২৩.১৪ ফুট। পিরামিড যখন তৈরি হয়েছিল তখন এর উচ্চতা ছিল ৪৮০.৯৪ ফুট (১৪৬.৫৯ মিটার)। বর্তমানে সেটি আগের অবস্থানে নেই। এখন এর উচ্চতা ৯.৫ মিটার (৩১ ফুট) কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৭ ফুট (১৩৭.৫ মিটার) এ। ধারণা করা হয় এর ওপরের অংশটি চুরি হয়ে গেছে। কারো মতে চূড়ার পাথর ছাড়াও আরো কিছু পাথর চুরি হয়েছে, আবার অনেকে মনে করছেন, বাকি সব এখন পর্যন্ত অক্ষত অর্থাৎ আগের অবস্থায় রয়েছে।
এত বছর পরও যে স্থাপত্যশৈলীটি এখনো নিজস্ব অবস্থানেই টিকে রয়েছে, তার উপাদান নিয়ে কৌতূহল জাগাটাই স্বাভাবিক। কী দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো এটি?
পবিত্র কুরআন, বাইবেল এবং বিভিন্ন গবেষকদের সূত্র হিসেবে ধরে তার সমন্বয় করলে এ সিন্ধান্তে আসা যায় যে, পিরামিড তৈরির প্রাথমিক উপাদান হলো কাঁদামাটি।
ফারাও রাজা খুফুর জন্য পিরামিড নির্মাণ করতে গিয়ে নীল নদের পানি এবং নীলের ব-দ্বীপ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন হামান। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এত টেকসই স্থাপনা তৈরি করতে কেবল মাটি যথেষ্ট নয়। ধর্মীয় গ্রন্থ এবং শিল্পীদের আঁকা বিভিন্ন ছবি থেকে বুঝা যায় মাটিকে শুকিয়ে কিংবা আগুনে পুড়িয়ে ইটের মতো করে এর প্রাথমিক অবয়ব দাঁড় করানো হয়। এরপর চুনাপাথর দিয়ে এর ওপর একটি নান্দনিক খোল তৈরি করা হয়। ১০০ ইঞ্চি পুরো এ খোলটিই প্রকৃতির বৈরী উপাদান থেকে রক্ষা করে পিরামিডকে।

 

মাঝে এবং সীমান্তে
পিরামিডকে অবস্থানগতভাবে বলা হয় ভূমির মাঝে এবং সীমান্তের উপাসনাবেদি । প্রশ্ন থেকে যায় একই সাথে মাঝে এবং সীমান্তে এর অবস্থান হয় কিভাবে? গ্রেট পিরামিডের অবস্থান মিসরের গিজায়। এ কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে গিজা। আরবি ‘গিজা’ শব্দের অর্থ ‘সীমান্ত’। নীল নদের সৃষ্ট ব-দ্বীপে এটির অবস্থান। এটি উচ্চতম এবং নিম্নতম মিসরের সীমান্ত। এ কারণে মানুষের তৈরি অন্য যেকোনো স্থাপত্যের চেয়ে অবস্থানগতভাবে পিরামিড গুরুত্বপূর্ণ। পিরামিডের অবস্থান যে ব-দ্বীপে সেই ব-দ্বীপটির অবস্থান আবার গাণিতিকভাবে মিসরের মাঝখানে। তাই গ্রেট পিরামিড গিজাকে অবস্থানগতভাবে বলা হয় মাঝে এবং সীমান্তে।

 

পিরামিড এবং বাইবেল
বর্তমানে খ্রিষ্টানদের অনেকেই তাদের বিশ্বাসকে পোক্ত করতে ধর্মীয় নিদর্শন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। যিশুখ্রিষ্টের অস্পষ্ট ছবি এবং ঈশ্বরের বার্তাবাহক এঞ্জেলার নিদর্শনেই তারা সন্তুষ্ট নন। স্বাভাবিকভাবেই কোনো একটি সূত্র পেলে তাকে ঘিরে অনেক কল্পনা তৈরি করা মানুষের বৈশিষ্ট্য। যদিও বাইবেল এসব বিষয় সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে।

তবে খ্রিষ্টানদের নিদর্শন প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা বেশ ভালোভাবেই মিটিয়েছে গ্রেট পিরামিড গিজা। বাইবেলে এ সম্বন্ধে যেসব ভাষ্য রয়েছে সেগুলো খুব নাটকীয়। খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থ অনুযায়ী যিশুকে পিরামিডের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের পাথরের সাথে তুলনা করা হয়। পিরামিডের সবার ওপরের পাথরের অনুরূপ অন্য পাথরগুলো। স্বাভাবিকভাবেই এ পাথরটি এর ভিত। পিরামিডের পুরো অবয়ব দেখতে ওপরের পাথরটির মতো। ঈশ্বর জগতকে সার্থক করেছেন যিশুর মাধ্যমে। অপরদিকে পিরামিডের শৃঙ্গের পাথরটি গৌরবময়। জগতের জন্য গৌরবময় যিশু আর পিরামিডের জন্য শৃঙ্গ পাথর। সে কারণেই এ শৃঙ্গ পাথরকে যিশুর সাথে তুলনা করা হয়। এটি কেবল খ্রিষ্টের জন্য যথার্থ প্রতীক-ই নয় বরং সব নবী ও ধর্মপ্রচারকদের প্রতীক।

ইসায়ী ২৮:১৬ তে খ্রিষ্টকে ‘মূল্যবান শৃঙ্গের পাথর’ এর সাথে তুলনা করা হয়েছে।
জাকারিয়া ৪:৭ এ বলা হয়েছে ‘সে শৃঙ্গের পাথরের ওপর অবস্থান করবে.....’। যিশুখ্রিষ্ট গিজা’র শৃঙ্গের পাথর যখন ত্যাগ করেছেন, তখন থেকে পাথরটিও তার স্থান ত্যাগ করেছে, এরকম বিশ্বাসই খ্রিষ্টানদের। এ বিশ্বাসকে খ্রিষ্টানরা সত্য বলে বিশ্বাস করেন, কারণ গ্রেট পিরামিডের শৃঙ্গ পাথর বর্তমানে এর জায়গায় নেই এবং এটির সন্ধানও পাওয়া যায়নি।

‘আমি তোমাকে বলছি, যদি তারা (জনগণ) তাদের শান্তি ভঙ্গ করে, তৎক্ষণাৎ অবশ্যই পাথরগুলো প্রতিবাদী হবে (লোক: ১৯:৪০)। ইসায়ি ১৯-এর বর্ণনা অনুযায়ী গ্রেপ পিরামিড সদা প্রভুর প্রমাণ হিসেবে বিস্ময়কর একটি পাথর।

 

পিরামিড এবং পবিত্র কুরআন
পিরামিড সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে সরাসরি কোনো ভাষ্য নেই। কিন্তু এমন আয়াত রয়েছে, যেখানে ফিরাউন তার সভাসদদের উঁচু একটি ইমারত নির্মাণ করার আদেশ দিয়েছিলেন।

‘আর ফিরাউন বলল : ‘হে সভাসদবৃন্দ! আমি তো নিজেকে ছাড়া তোমাদের আর কোনো রবকে জানি না। হে হামান! আমার জন্য ইট তৈরি করে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করে দাওতো! সম্ভবত আমি এতে আরোহণ করে মুসার রবকে দেখতে পাব, আমি তো তাকে মিথ্যা মনে করি।’ (সূরা আল কাসাস-৩৮)
এ ভাষ্য মতে বুঝা যায়, ফিরাউন নিজেকে ছাড়া আর কোনো খোদার অস্তিত্ত্ব স্বীকার করতে চাননি। তাই মুসা আ:-এর খোদার অস্তিত্ব নেই ঘোষণা করে মুসা আ: কে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে চাইছিলেন। আর এ কারণেই হামানকে এমন একটি সুউচ্চ ইমারত তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে আরোহণ করে মুসার আ: খোদাকে দেখার চেষ্টা করা যায়। এ ভাষ্যমতে বুঝা যায় যে, হামান ছিলেন ফিরাউনের প্রধানমন্ত্রী বা আরো কাছের কেউ এবং এ হামানই ছিলেন তার প্রধান প্রকৌশলী। আর হামান পোড়ানো মাটি দিয়ে তেরি ইট বসিয়ে নির্মাণ করেছিলেন পিরামিড। এর ওপরে দিয়েছিলেন পাথরের আস্তরণ। কোনো ঐতিহাসিকদের মতে ফিরাউনই প্রথম ইট ও পাথরের ব্যবহার করেছিলেন।

পবিত্র কুরআনে রয়েছে “ফিরআউন বলল : ‘হে হামান আমার জন্য একটি সুউচ্চ ইমারত বানাও, যেন আমি (ঊর্ধ্বলোকের) পথগুলো পর্যন্ত পৌঁছতে পারি আকাশ মণ্ডলের পথগুলো পর্যন্ত এবং মুসার ইলাহকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার চোখে তো এই মুসাকে মিথ্যাবাদী বলে মনে হয়।” (সূরা মুমিন ৩৬-৩৭)
এ বিষয়ে ইমাম বাদাবি লিখেন, ফিরাউন সম্ভবত এমন একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন যেখান থেকে নক্ষত্রমণ্ডলী এবং তারাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়। যেন তিনি সেচ ও কৃষির সঠিক সময় হিসাব করতে পারেন। তা ছাড়া এতে আরোহণ করে মুসা আ: কী সত্যিই আল্লাহর নবী ছিলেন কি না তা জানার আগ্রহ ছিল ফিরাউনের। তিনি নিজেকে যেহেতু একমাত্র স্রষ্টা বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তাই তিনি চেয়েছিলেন রাজ্যের জনগণকে জানিয়ে দিতে, তিনি সঠিক ও মুসা আ: ভুল। বর্তমানে গবেষকরা পিরামিডের ভেতর অনেক সুড়ঙ্গ আবিষ্কার করেছেন। এসব সুড়ঙ্গের গন্তব্য যেখানে, সেখান থেকে খুব ভালোভাবে তারা পর্যবেক্ষণ করা যায় পবিত্র কুরআনে যে উঁচু ইমারতের কথা বলা হয়েছে, যা নির্মাণ করার আদেশ দিয়েছিলেন ফিরাউন, গবেষকও ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে গ্রেট পিরামিডই সেই স্থাপত্য। একমাত্র গিজার সাথেই সঠিক সময় সঠিক উচ্চতার দিক দিয়ে কুরআনের ভাষ্যের মিল রয়েছে
বিশিষ্ট মুফাচ্ছিরে কুরআন ইমাম বাগবি লিখেছেন ‘সুউচ্চ ইমারত নির্মাণ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ জনগণকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। ফিরাউন ও তার সৈন্যদল ইমারতের চূড়ায় আরোহণ করে বেহেশতের উদ্দেশে তীর নিক্ষেপ করলেন। তারপর তীরগুলো রক্তমাখা অবস্থায় যখন ফিরে এলো, তখন ফিরাউন জনগণের কাছে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল ‘আমি মুসা আ: এর খোদাকে হত্যা করেছি।’
কুরআনের ভাষ্যমতে একথাটি ইসলামিক পণ্ডিতরা পরিষ্কার করেছেন যে পিরামিড তৈরি করতে প্রথমে ব্যবহার করা হয়েছিল মাটি। পরবর্তী সময়ে চুনাপাথর দিয়ে তা ঢেকে দেয়া হয়। আর এটিও গবেষকরা বের করেছেন যে, খুফু হলো সেই মিসরের রাজা বা ফিরাউন, যার কথা পবিত্র কুরআনে রয়েছে এবং খুফুর ভাই হামান ছিলেন পিরামিডের স্থপতি।

 

ফিনিক্স
ফিনিক্স হলো মিসরের গিজা এলাকার অভিবাবকতুল্য একটি পিরামিড। খুফু নির্মিত গিজার সর্বোচ্চ পিরামিডটির আয়ত্তের মাঝেই এটির অবস্থান। এর বিপরীতেই রয়েছে খাফরে পিরামিড। পূর্ব দিকে মুখ করা এ স্থাপনাটিকে দেখলে মনে হবে এক বিশাল সিংহ মানব সামনে পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে। ফিনিক্সের নিচের অংশ দেখতে সিংহের মতো এবং ওপরের অংশ বা মাথা তৈরি করা হয়েছে মানব নারীর চেহারা দিয়ে। পাশাপাশি এটির ঈগলের মতো ডানা রয়েছে। ফিনিক্স নামে একটি পাখিও রয়েছে। ফিনিক্স শব্দটি গ্রিক শব্দ ফিনিক্স থেকে এসেছে। এর ইংরেজি অর্থ হলো "ও ঝঃৎধহমষব"। আর "ঝঃৎধহমষব" বলতে বুঝায় শ্বাসরুদ্ধ করাকে। ফিনিক্সের আকৃতি যেমন ভয়ঙ্কর মায়াবী, এর অর্থটাতেও লুকিয়ে রয়েছে তেমনি মায়াবী রহস্য।
এটি নির্মাণ করতে চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। ফিনিক্স ৫৭ মিটার (১৮৫ ফুট) লম্বা এবং প্রশস্ত ৬ মিটার (২০ ফুট)। এর উচ্চতা ২০ মিটার (৬৫ ফুট)।
দুই পা ছড়িয়ে নখরবিশিষ্ট থাবা মেলে রাখা এ সিংহ মানবের মূর্তিটির গভীর অভ্যন্তরে রয়েছে মন্দির। প্রবেশ করতে হয় মেলে রাখা দুই পায়ের মাঝ দিয়ে।
বর্তমানে ফিনিক্সের নাক অক্ষত অবস্থায় নেই। ধারণা করা হয় নেপোলিয়নের সৈন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নাক হারা হয়েছে সিংহমানব।

 

স্টেপ পিরামিড অব ডিজুজার
ডিজুজার ছিলেন ফারাও খুফুর দাদা। স্টেú পিরামিডটি তৈরি করেন তিনি এবং তার মমি-ই উদ্ধার করা হয় এ পিরামিড থেকে।
পিরামিড ডিজুজার মূলত ছয়টি ধাপ বিশিষ্ট। একবারে খাড়া হয়ে এটি উঠে যায়নি। এ কারণেই একে স্টেপ পিরামিড বলা হয়। এর অবস্থান মিসরের সাক্কারাতে। ফারাও ডিজুজার এটি নির্মণ করেন ২৬৩০ খ্রিষ্টপূর্বে। এর উচ্চতা ২০৪ ফুট (৬২ মিটার)। তখনকার সময় এটিই ছিল পৃথিবীর বৃহৎ স্থাপনা। ডিজুজারের মমি চেম্বারটি মাটির নিচে। সেখানে পৌঁছতে হলে পাড়ি দিতে হয় একটি সুড়ঙ্গের জটিল পথ।

 

ফারাও নেফরুর তিনটি পিরামিড
নেফরু ছিলেন ফারাও ডিজুজারের ছেলে ও ফারাও খুফুর বাবা। তিনি রেড পিরামি­ বেল্ট পিরামিড ও মাইদুস পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। এ তিনটি পিরামিড থেকেই তিনটি মমি পাওয়া গেছে। এগুলোর মাঝে কোনোটি ফারাও নেফরুর, তা আলাদা করা যায়নি। কেউ মনে করেন রেড পিরামিড থেকে প্রাপ্ত মমিটিই নেফরুর, আবার কেউ বলেন বেল্ট পিরামিড থেকে প্রাপ্ত মমিটিই তার।
রেড পিরামিড নির্মিত হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ তে। মিসরের দুসুর এ অবস্থিত এ স্থাপনাটির উচ্চতা ৩৪১ ফুট (১০৪ মিটার)। নেফরু জীবদ্দশায় এটি নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেননি। তার পুত্র খুফু এসে অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।
বেল্ট পিরামিডটিও দাসুরে অবস্থিত। এর উচ্চতা ৩৪৪ ফুট (১০৫ মিটার)। মাইদুস পিরামিডটি মিসরের মাইদুসে অবস্থিত। এর উচ্চতা ৩০৬ ফুট (৯২ মিটার)। বেল্ট, মাইদুস ও রেড এ তিনটিই নির্মিত হয়েছে সমসাময়িক সময়ে। ধারণা করা হয় তিনটি পিরামিড থেকে প্রাপ্ত মমিগুলোর একটি তার এবং অপরগুলো তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের।

 

খুফুর মমি
ফারাওদের মাঝে সবচেয়ে আলোচিত এবং ক্ষমতাধর ছিল খুফু। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও খুফুর কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত। সে কারণেই অসংখ্য মমির মাঝে খুফুকে আলাদা করার কৌতূহল সবার মাঝেই বেশি। তা ছাড়া তার দেহ কী আদৌ মমি করা হয়েছে কি না সেটাও একটা বিষয়। অধিকাংশ পণ্ডিতদের মতে, জাদুঘরে সংরক্ষিতে একটি মমিকেই নির্দেশ করা হয় খুফুর মমি হিসেবে। নীল নদ থেকে উদ্ধার করে দেহটিকে মমিতে পরিণত করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ফেরাউনের মৃত্যু হয় হজরত মুসা আ: সহ তাঁর অনুসারীদেরকে তাড়া করতে গিয়ে। নীল নদের পানি ভাগ হয়ে যে পথ তৈরি হয়েছিল তা দিয়ে মুসা আ:-এর অনুসারীদেরকে অনায়াসে চলে যেতে দেখে। ফেরাউনও সে পথ অনুসরণ করল। পথের মাঝামাঝি তা মিলিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় খুফু ও সৈন্য দল। পবিত্র কুরআনে রয়েছে ‘আমি বনি ইসরাইলকে সাগর পাড় করালাম। আর ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী শত্রুতা করে ও ন্যায়ের সীমা লঙ্ঘন করে তাদের পাছে ধাওয়া করল। অবশেষে পানিতে যখন সে ডুবে যাচ্ছে তখন সে বলল, ‘আমি বিশ্বাস করলাম যে, বনি-ইসরাইল যাঁর ওপর বিশ্বাস করে তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আর তাঁর কাছে যারা আত্মসমর্পণ করে আমি তাদের একজন।’

আল্লাহ বললেন, ‘এখন! এর আগে তুমি তো অমান্য করেছ, আর তুমি ছিলে এক ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী! আজ আমি তোমার দেহকে সংরক্ষণ করব যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের নিদর্শন হয়ে থাক। অবশ্য মানুষের মধ্যে অনেকেই আমার নিদর্শন সম্বন্ধে খেয়াল করে না।’ (সূরা ইউনুস : ৯০-৯১)
এ কারণেই ধারণা করা হয়, নীল থেকে উদ্ধারকৃত সেই বিশেষ দেহটিই খুফু অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত ফেরাউনের। আর পবিত্র কুরআনে দেহটিকে সংরক্ষণ করে রাখার ঘোষণা রয়েছে বলেই অনেক বৈরিতা অতিক্রম করে আজো প্রদর্শিত হচ্ছে খুফুর মমি।

 

খাফরে, মেনকাউরে এবং পেপি-২ নির্মিত পিরামিড
খাফরে ও মেনকাউরে ছিল খুফুর অধঃস্তন। আর পেপি-২ ছিলেন একজন দুর্দান্ত শাসক। যদিও তার শাসনামলে পুরাতন ফারাওদের ক্ষমতা কমে এসেছিল। কিন্তু খাফরের মমি যে পিরামিডে সংরক্ষিত ছিল সেটির অবস্থান গিজাতে। খাফরেও খুফুর পিরামিডের আয়ত্তের ভেতরে এবং ফিনিক্সের বিপরীতে। এটি ফারাও খাফরে নির্মাণ করেন ২৫২০ খ্রিষ্টপূর্বে। উচ্চতা ৪৭১ ফুট (১৪৪ মিটার)
মেনকাওরের মমির ধারক পিরামিড অব মেনকাউরের অবস্থানও গিজাতে। ২৪৯০ খ্রিষ্টপূর্বে গিজাতে এটি নির্মাণ করেন মেনকাউরে। উচ্চতা ২১৩ ফুট (৬৫ মিটার)। ১৮০০ সালে মেনকাউরের মমিটি সেখান থেকে উদ্ধার করে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়।

পিরামিড অব পেপি-২ নির্মাণ করেন ফারাও পেপি-২। মিসরের সাক্কারাতে ২২৫০ খ্রিষ্টপূর্বে নির্মিত এ পিরামিডটির উচ্চতা ১৭২ ফুট (৫২ মিটার)। এর মমি চেম্বারে পেপি-২ এর মমিকে রক্ষা করার জন্য একটি কালো রঙের পাথর ছিল।

 

কিভাবে করা হতো মমি
পিরামিড যেমন একটি বিস্ময়ের বিষয় তেমনি পিরামিডের ভেতরে মমি রয়েছে। তাও আধুনিক কালের মানুষকে বিস্মিত করে তুলেছে। মমি, এক আশ্চর্যের নাম। কিভাবে করা হতো মমি, আর এটি করার চিন্তাই বা এল কিভাবে?
মমি বলতে বোঝায় পিরামিডের ভেতর সংরক্ষিত লাশ। মিসরীয় মমি বিখ্যাত হলেও চীন দক্ষিণ আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সন্ধান পাওয়া গেছে মমির।

মমি হলো কোনো ব্যক্তি বা পশু-পাখির মৃত্যুর পর তার সংরক্ষিত দেহ। মানুষ মারা যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে লাশ রাখলে তাতে ব্যাক্টেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু আক্রমণ করে। নষ্ট করে দেয় নরম চামড়াকে। মমি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন লাশকে ব্যাক্টেরিয়ামুক্ত রাখার। আর ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম হয় পানির উপস্থিতিতে। তাই মৃতের দেহকে যদি দ্রুত পানিমুক্ত করা যায় তবে ব্যাক্টেরিয়া ভিড়তে পারে না। সেটা হোক শুকিয়ে বা বিভিন্ন ক্যামিকেল ব্যবহার করে।

প্রাচীন মিসরিয়রা দেহতে এক ধরনের ক্যামিকেল দিয়ে রোদে শুকাত এবং ধোঁয়ার মাধ্যমেও পানি শুকিয়ে নিত। এ কাজে তারা সুগন্ধিও ব্যবহার করত।
মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল যে, তারা মারা যাওয়ার পর যদি তাদের লাশ মমিতে পরিণত হয়, তবে পরবর্তী সময়ে জীবন হবে শান্তির। তাই নিজেকে মমিতে রূপান্তরের ব্যাপারে আগ্রহী হয়েই তারা ক্ষান্ত হতো না, বরং চাইত মৃত্যুর পরও ধন-সম্পদের মাঝে ডুবে থাকার মতো নিরাপদ আশ্রয়। এসব কারণেই মমি প্রক্রিয়াকরণ ছিল ব্যয়বহুল। সবার সামর্থও ছিল না। তাই ফারাও রাজা, রানী ও তাদের উচ্চপদস্থ দাফতরিক কর্মকর্তাদের মমি প্রক্রিয়া এবং সমাধিস্থ করণ হতো জাঁকজমকভাবে।

মমি করার পদ্ধতিটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুগন্ধি ক্যামিক্যাল দিয়ে একটি দেহ মমি করতে ৭০ দিন লেগে যেত। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো অনেক ধাপে। প্রথমে দেহকে ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা হতো। দ্বিতীয় ধাপে দেহের বাম দিকে চেরা হতো লম্বালম্বিভাবে এবং অভ্যন্তরীণ নাড়ীভুঁড়িগুলো বের করে কেবল হার চামড়া অবশিষ্ট রাখত। মাথার মগজ বের করা হতো নাকের ভেতর হুক ঢুকিয়ে। এরপর যত্ন সহকারে তা ব্যাক্টেরিয়ারোধক স্থানে শুকানো হতো। পরবর্তী সময়ে দেহের প্রতিটি অঙ্গকে আলাদা আলাদাভাবে গুছিয়ে সরু ফালির মাধ্যমে সোজা করে রাখা হতো। সরু ফালিগুলো লাশের অবয়ব ঠিক রাখার কাজ করত।

এরপর এগুলোকে একটি ধারক বা জারে রাখা হতো। মমি করার জন্য চার ধরনের কেনো পিক জার ছিল। এগুলো হলো কেবিসেনুয়েফ, দুয়ামুটেফ, হেপি ও ইমসেটি। কেবিসেনুয়েফের ওপরের অর্থাৎ মাথার অংশ ছিল বাজপাখি আকৃতির, দুয়ামুটেফ ছিল শিয়ালের মতো, হেপি বেবুনাকৃতির এবং ইমসেটি মানবাকৃতির। কেনো পিক জারে কিছুদিন রাখার পর সুগন্ধি ক্যামিকেল লাগানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নেয়া হতো। সেখানে দেহটাকে কাপড় জাতীয় সরু ফালি দিয়ে ভালোভাবে ব্যান্ডেজ করার কাজ করা হতো। ব্যান্ডেজে অনেক ভাঁজ দেয়া হতো। এসব ভাঁজের ফাঁকে ফাঁকে সুগন্ধি তো থাকতই, পাশাপাশি স্বর্ণ দিয়ে ঢেকে দিত দেহ অক্ষত রাখার জন্যে। প্রতিটি আঙুলে লাগানো হতো স্বর্ণের ক্যাপ।

স্বর্ণ, সুগন্ধি ও ব্যান্ডেজ করা হয়ে গেলে কিছুদিন সেখানে সুরক্ষিতভাবে লাশ রেখে দেয়া হতো। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় গড়িয়ে এলে কেনুপিক জারের ভেতর রাখা দেহকে স্লেডের ওপর রেখে তা টেনে নেয়া হতো পিরামিড বা এর জন্য নির্বাচিত সৌধে। সেখানে লোকজন জড়ো হয়ে কান্নাকাটি করে ধর্মীয় যাগযজ্ঞের মাধ্যমে বিদায় জানাত মরদেহকে।

এ পদ্ধতিতে মমি মমিকরণকে মিসরীয়রা মনে করত মুখ্য লাভের উপায়। তাই এর চাহিদা ছিল ব্যাপক এবং কিছু নির্দিষ্ট লোক এ প্রক্রিয়াকরণে সবসময় ব্যস্ত থাকত। মানুষ যেমন মারা যেত তেমনি মমিও করা হতো প্রচুর। ৩ হাজার বছরে ৭০ মিলিয়নের মতো মমি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এসব মমি গেল কোথায়?

এর পেছনে দায়ী মানুষের সম্পদের লোভ। বিভিন্ন পিরামিড ও সমাধিসৌধগুলোতে ঘুরঘুর করত রতলোভকারীরা। তারা সৌধগুলোতে সংরক্ষিত রত্ন লুট করার পাশাপাশি মমির দেহের ব্যান্ডেজ উল্টেপাল্টেও খোঁজ করত স্বর্ণ। হাতের আঙুল মোড়ানো স্বর্ণও লুট করে নিয়ে যেত তারা। পরবর্তী সময়ে লোপাট হয়ে যাওয়া মমি চেম্বারগুলোর মমি পচে যেতে লাগল ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণে। তারপর নিঃশেষ হয়ে গেল এসব। এমনকি মমির গায়ের ব্যান্ডেজগুলো খুলে এনে কাগজ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হতো এবং দেহকে ব্যবহার করা হতো জ্বালানি হিসেবে। এভাবেই ধ্বংস হয়ে যায় মিলিয়ন মিলিয়ন মমি।

কিন্তু ফারাও রাজা ও অভিজাতদের মমি সংরক্ষিত ছিল যেসব জায়গায়, সেগুলো ছিল খুব সুরক্ষিত। সেসব স্থানে পৌঁছার পথ জটিল। তাই হাতে গোনা কয়েকটি মমি এখনো রয়ে গেছে।