মরুভুমিতে পথ হারিয়ে ফেলার পর যা হলো এক দম্পতির

Dec 04, 2017 03:48 pm
মরুভূমির আদিগন্ত বালুকারাশি

 


মূল : ক্যাথি ফ্রে
ভাষান্তর : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

 

পশ্চিম টেক্সাসের চিহুয়াহুয়ান মরুভূমির সাথে আমার ‘প্রেম’ সেই ১৯৯৬ সাল থেকে, যখন আমি ‘ওডেসা অ্যামেরিকান’ পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। আমার কাজের একটা ক্ষেত্র ছিল বিগ বেন্ড এলাকা। রিও গ্র্যান্ড নদী ওখানে একটা বাঁক নিয়েছিল, তাই ওই এলাকার এই নামকরণ। তা নাম যা-ই হোক, আসল কথা হলো আমি ভালোবাসতাম নির্জনতা। এখানে রাতের আকাশ কখনো এমন সুচিভেদ্য অন্ধকার, কখনো আয়নার মতো পরিষ্কার দেখেই বিস্ময়ে বাকহারা হয়ে যেতাম।

মরুভূমির আদিগন্ত বালুকারাশির এখানে-ওখানে কিছু কিছু লতাগুল্মের ঝোপ, তাতে ফুটে আছে একটা-দুটো নাম না-জানা ফুল এটাও কম অবাক করে না আমাকে। আমার স্বামী রিক ম্যাকফারল্যান্ডও আমার মতোই এই এলাকার প্রেমে মুগ্ধ। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, ২০০১ সালে আমরা বিয়েও করেছিলাম এই বিগ বেন্ড ন্যাশনাল পার্কের একটি ট্রেইলের ওপর।
বিয়ের ১২ বছর পর আবার আমরা আসি এই এলাকায়। উদ্দেশ্য : পার্শ্ববর্তী বিগ বেন্ড র‌্যাঞ্চ স্টেট পার্কের ফ্রেসনো ওয়েস্ট রিমের ট্রেইলগুলোতে হাইক করতে অর্থাৎ পায়দল হেঁটে বেড়াতে। এই পার্কটির একটা মজার ডাকনাম আছে দ্য আদার সাইড অব নোহোয়্যার। এখানকার হাইকিং এরিয়া হলো আট কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথে হাইক করতে করতে চোখে পড়বে নির্জনতার অপূর্ব সৌন্দর্য, ঘুমিয়ে থাকা ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতির খাড়া পাথুরে পাহাড়। যেতে যেতে পথে পড়বে একটি পরিত্যক্ত র‌্যাঞ্চ। পুরো পথটি ঘুরে আসতে লেগে যাবে এক দিনের মতো।

 

প্রথম দিন
নতুন পথের সন্ধান

সেদিন ছিল ২ অক্টোবর, বুধবার। রিক ও আমি পার্কিং এরিয়া থেকে যাত্রা শুরু করলাম। ট্রেইল তখনো এক কিলোমিটার দূরে। তাপমাত্রা তখনো ২২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, তবে এটা ৩৩ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আমরা পানিভর্তি দুটো ক্যানটিন এবং আটটি বোতল, কিছু শুকনো খাবার ও কলা নিয়েছি সাথে। মরুভূমির দিকে তাকাতেই দেখি, কাঁটাগুল্মের ঝোপেঝাড়ে ফুটে আছে ছোট-ছোট গোলাপি ফুল। দেখেই মনটা অন্য রকম হয়ে গেল। ভাবলাম, এই নতুন ট্রেইলটাও এখন থেকে আমার প্রিয় হবে।
আমরা ফ্রেসনো ক্যানিয়নের দিকে নামতে শুরু করতেই টের পাই, পথটা হয়ে গেছে ঢালু ও পাথুরে। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাকে চলতে হলো লাঠি ঠুকে ঠুকে। তারপরও ঠিক থাকতে পারি না। হোঁচট খাই, ঘুরে পড়ে যেতে চাই। পুরো পথটি এভাবেই গেল।


ক্যানিয়নের গোড়ার দিকে আমরা দেখলাম একটি চার চাকার গাড়ি চলে যাওয়ার চিহ্ন। আমরা সেই চিহ্ন ধরেই এগোতে থাকলাম এবং চলতে চলতে হঠাৎই দেখলাম র‌্যাঞ্চটি। তার সামনে একটি জিপ দাঁড়ানো। আমরা ওটির ছায়ায় জিরাতে বসলাম। ইতোমধ্যেই আমরা তিন বোতল পানি গিলে ফেলেছি, এবার তাই হাত লাগালাম ক্যানটিনে।


‘আমার মনে হয়, এই গাড়ির লোকগুলো আসা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারি। ওরা এলে বলব, আমাদের একটু পৌঁছে দিতে।’ বললাম আমি, ‘কারণ, আমার মনে হচ্ছে না এই খাড়া পথ বেয়ে আমি ফিরতে পারব। তা ছাড়া আমাদের পানিও শেষ হয়ে এলো বলে।’


তখন দুপুর গড়িয়ে দেড়টা, দিনের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। ক্যানিয়ন পর্যন্ত নেমে আসতেই আমাদের অনেক সময় লেগে গেছে। এখন ফিরতে আরো সময় লাগবে। আমরা ফেরার আগেই দিনের আলো নিভেও যেতে পারে। রিক চোখ রাখল ম্যাপে, ‘মনে হচ্ছে আমরা একটা আধা পথের চক্করে পড়ে গেছি। এখন হাঁটা ছাড়া উপায় নেই।’


এর পরের কয়েক ঘণ্টা সূর্য নির্দয়ভাবে আমাদের মাথার ওপর কেবলই তাপ বর্ষণ করল। প্রচণ্ড গরমে শ্রান্ত আমরা একটু হাঁটি তো একটু বসি আর ক্যানটিন ঝাঁকি দিয়ে এর পানির শেষ বিন্দুটিও শুষে নিতে চাই।
মনে হচ্ছে, আমরা যেন অনন্তকাল ধরে হেঁটেই চলেছি। পাথরের স্তূপ বানিয়ে ট্রেইলের যেসব পথনিশানা বানানো হয়েছে, আমরা সেসবও আর খুঁজে পাই না। ফিরে গিয়ে যে সেসব খুঁজব, তাও তো সময় ও শক্তির অপচয়।


চলতে চলতে আমরা যেখানটায় এসে পৌঁছলাম সেখান থেকে সামনে এগোনোর আর কোনো পথ নেই। সেটা হলো ক্যানিয়নের প্রান্ত। হায় খোদা, কী হবে এখন? রাত তখন ৮টা। আমরা প্রায় ১৪ ঘণ্টার মতো হেঁটেছি।


‘হেল্প!’ আমাকে চমকে দিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল রিক। এবার আমিও যোগ দিলাম ওর সাথে, ‘হেল্প! আমরা হারিয়ে গেছি। আমাদের পানি দরকার।’
আমাদের আর্তচিৎকারের জবাব দেয়ার মতো কোথাও কেউ নেই, তাই ক্যানিয়নের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমাদের আর্তস্বর আমাদের কানেই ফিরে এলো প্রতিধ্বনি হয়ে।


রিক এবার তার ফোন বের করল। কোনো সিগন্যাল নেই। তবে ফোনসেটের আলোয় আমরা চার পাশটা বেশ দেখে নিতে পারলাম। রিক ভয় পেতে থাকল বন্যপ্রাণীর সিংহ, সাপ এবং আরো কত হিংস্র প্রাণী আছে এখানে! সে একটি পাথুরে খোলা জায়গা খুঁজে পেল। আমরা ওখানেই শরীর এলিয়ে দিলাম। রিক বলল, ‘উফ! খুব শীত লাগছে।’ এবার আমরা আমাদের ছোট-বড় যত রকমের কাপড়চোপড় ছিল, সব বের করে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তাও কি শীত মানে? একটু উষ্ণতার জন্য একজন অন্যজনকে কষে পেঁচিয়ে ধরলাম আর চেষ্টা করতে থাকলাম ঘুমানোর।

 

দ্বিতীয় দিন
আশার আলো

ভোর হয়ে এলো। আমরা শেষবার পানি পান করেছি ১৩ ঘণ্টা আগে। আমরা দু’জন এবার আধা কিলোমিটার হেঁটে ট্রেইলের পাথুরে পথনিশানার কাছে গেলাম, গত রাতেই আমরা ওটা দেখেছিলাম। ওখানে দাঁড়িয়ে মেক্সিকানো জলপ্রপাত দেখা যাচ্ছে। রিক বলল, ‘কী হয়েছে বুঝতে পারছো তো? আমরা ট্রেইলে না-থেকে এসব পথনিশানা অনুসরণ করেছি আর এখানে এসে পড়েছি।’


মানচিত্রে দেখা গেল, আমাদেরকে পেছন দিকে আরো আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।
তবে তা-ই হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের পেছন ছাড়ল না। আমরা আবার আমাদের পথনিশানা হারিয়ে ফেললাম। তার খোঁজে এক পথ দিয়ে কত বার হাঁটলাম, হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লামÑ কে তার হিসাব রেখেছে! আমি আর্তনাদ করলাম, ‘এই চক্কর থেকে কবে ছাড়া পাবো?’
‘কক্ষনো না’, বলল রিক। আমরা দু’জনই বললাম যে, আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে ফিরে যাওয়া আমাদের খুব দরকার। ১০ বছর বয়সী অ্যামান্ডা ও আট বছরের ইথানকে নর্থ লিটল রকে ওদের নানীর কাছে রেখে এসেছি।


পানি খেতে না পেয়ে আমাদের গলা বসে গেছে। এর মধ্যেও আমরা আরো চার ঘণ্টা হাঁটলাম। বেলা যখন ২টা এবং তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আমি বললাম, এবার কোথাও একটু ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিতে হবে।


ছায়ায় জিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি আমার মাথায় এলো অনেক দিন আগে পড়া একটি বইয়ের কথা মনে পড়ায়। ‘বিগ বেন্ডে মৃত্যু’ নামে ওই বইয়ে মরুভূমিতে পথ হারিয়েও এক নারী কিভাবে প্রাণে বেঁচে যান, সেই কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। ওই নারী দুপুরে কোথাও ছায়ায় বসে থাকতেন আর রাতের বেলা হাঁটতেন।
এদিক-ওদিক তাকাতেই আমি একটি ছোট পাথুরে পাহাড় দেখতে পেলাম। ওটির যে-ছায়া পড়েছে, তা আমরা দু’জন বিশ্রাম নেয়ার জন্য যথেষ্ট। ঠিক তখনই চোখে পড়ল একটি সবুজ ক্যাকটাসের ঝোপ। নানা রোগে ক্যাকটাসের জুস পান করে মানুষ। কাজেই ওই কাঁটাযুক্ত গুল্মের ভেতরে আমাদের জন্য পান করার মতো কিছু পেতেও পারি ভাবলাম আমি।


আমি ক্যাকটাসের দু’টি পুরু পাতা কেটে আনলাম। রিকের ছুরি দিয়ে একটার নিচের অংশ টুকরো করলাম, তারপর তার রস বের করলাম। রসগুলো আলাদা করে রেখে দিয়ে পাতাটা চিবালাম। এর সূক্ষ্ম, চুলের মতো আঁশগুলো আমার মুখে, ঠোঁটে ও জিহ্বায় জড়িয়ে গেল। তা যাক। কিন্তু এই অতি সামান্য আঁশের রসে আমার বিপুল তৃষ্ণা যে মেটে না!


আঁশগুলো গিলতে গিলতে রিক বলল, ‘দূর! কী এসব?’
‘আরে, ওগুলো গিলছো কেন? চিবিয়ে রস যা পাও, তা খাও।’
আমরা পাথুরে পাহাড়ের ছায়ায় শুয়ে পড়লাম। একটু পরেই অনুভব করলাম আমার গায়ে যেন পিন ফোটানো হচ্ছে আর চামড়া ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে। আমার ঠোঁট বেঁকেচুরে যেতে লাগল, জিহ্বা এমন ভারী হয়ে এলো যে তাকে আর নাড়ানোই যাচ্ছিল না। এসবই শরীরে তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণ।
‘বেবি, আমার ভয় হচ্ছে আমরা বুঝি আর ফিরতে পারব না’ কথাটা আমি বললাম এই আশায় যে রিক আমার সাথে একমত হবে না এবং আশার বাণী শোনাবে। কিন্তু আমাকে হতভম্ব করে সে বলল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে।’


কয়েক ঘণ্টা পর সূর্য অস্তগামী হতেই উঠে দাঁড়াল রিক। বলল, ‘আমাদের এখন চলতে শুরু করা দরকার।’ তা-ই হলো। আমরা ট্রেইল ধরে, অনেকটা উদ্দেশ্যবিহীন পথ চলার মতো করে, হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতেই নিচে ক্যানিয়নে রিক দেখতে পেল কটনউড গাছ। কোনো মরুভূমিতে কটনউড গাছ মানেই পানি। সে প্রথমে খুশিতে ছোট একটা দৌড় দিলো, তারপর চেঁচিয়ে উঠল, ‘পানি, পানি!’ বলেই একটা শুকনো নালা পেরিয়ে কটনউড গাছের ঝোপের ভেতর হারিয়ে গেল। আমি কাতর গলায় বললাম, ‘আমার জন্যও একটু এনো।’


দূর থেকে আমি দেখলাম, বিশাল চুনাপাথরের স্তূপের নিচ দিয়ে প্রবহমান একটি ঝর্ণা থেকে উবু হয়ে পানি তুলছে রিক। সে আমার জন্যও ক্যানিন ভরে পানি নিয়ে এলো। আমি প্রাণভরে সেই পানি পান করলাম।
সন্ধ্যা নেমে এলো। তার মানে আমাদেরকে আরো একটি শীতের রাত খোলা আকাশের নিচে মাটিতে শুয়েই কাটাতে হবে। তা নিয়ে খুব বেশি ভাবছি না আর। পানি পেয়েছি, এতেই আমরা খুশি।


তৃতীয় দিন
ছাড়াছাড়ি

সকালে ঘুম থেকে জেগেই রিক প্রথম যে-কথাটি বলল, তা হলো : ‘আমাদের ট্রেইলে ফিরতে হবে।’
সন্দেহ নেই যে, ওই ঝর্ণার পানি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে, কিন্তু তাই বলে এখানে বসে থাকলে তো চলবে না। রিকের কথাই ঠিক। আমাদের ট্রেইল খুঁজে বের করতে হবে। আর পানি পেয়েছি বটে, কিন্তু আমরা দু’জনের জন্য সে আর কতটুকু! তা ছাড়া শুধু পানিতে কি হয়? কিছু খেতে না পেয়ে আমাদের শরীর দুর্বল হয়ে আসছে। কেউ জানে না যে আমরা এখানে, তাই কেউ আমাদের খুঁজছেও না। কাজেই আমাদের ফেরার পথ আমাদেরকেই খুঁজে নিতে হবে।


আমরা ক্যানটিনগুলো পানিভর্তি করে নিলাম, তারপর ক্যানিয়ন থেকে ওপরে উঠে এলাম। উঠেই ট্রেইল পেয়ে গেলাম। এবং তারপর গত দুই দিনের মতো এটাও হারিয়ে ফেললাম। রাগে, ক্ষোভে রিক চেঁচালো, ‘ধুত্তুরি!’ এবার বললো, ‘ওই পথে গেলেই আমরা ট্রেইল খুঁজে পাবো।’
রিক ভুল বলেনি। তার দেখানো পথে আমরা ট্রেইলে পৌঁছে গেলাম, কিন্তু দু’জনের একজনও চিনতে পারলাম না এটাই সেই ট্রেইল কি না। আমরা ওটি পেরিয়ে গেলাম এবং হাঁটতে থাকলাম।
সময়ের দিকে তীক্ষè নজর রেখেছিল রিক। ট্রেইলের গোড়ার দিকটা খুঁজে পেতে আমাদের বেলা ২টা পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। অন্যথায় কোথাও ছায়ায় বসে সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে হবে।


দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি ছোট মেসকুইট গাছের দেখা পেলাম। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীরটাকে কোনোমতে টেনে ওটার ছায়ায় নিয়ে গেলাম। রিককে বললাম, ‘আমি শেষ! তুমি যাও। আমি এখানে বসে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।’


রিক তার ক্যানটিনে যে দুই ঢোক পানি ছিল তা খেয়ে নিলো। আমার ক্যানটিনটা আমার কাছে এনে রাখল। তারপর আমার দুই হাত নিজের মুঠোয় নিলো বলল, ‘আই লাভ ইউ।’
‘আই লাভ ইউ, টু।’ বললাম আমি।
এবার একটু মজা করল রিক, ‘আসার সময় তোমার জন্য কিছু আনতে হবে?’
‘হুম! দুই বোতল পানি আর এক ক্যান বিয়ার।’
রিক অদৃশ্য হতেই আমার জন্য যেটুকু পানি ছিল, সবটা খেয়ে নিলাম আমি।

 

সন্ধ্যা এলো নেমে

সন্ধ্যা নামতেই তাপমাত্রা অনেকটা কমে এলো। পরে জেনেছি, ঠিক এই সময়টায় রিকও তার অভীষ্ট লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। সারা দিন পেটে কিছু পড়েনি তার। শুধু এক ঢোক করে পানি পান করেই পথ চলছে। পথ চলেছে বটে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তা তার জানা ছিল না। এই অনির্দিষ্ট পথ চলার চেয়ে সহজ ছিল সব ছেড়েছুড়ে শুয়ে পড়া, লড়াই করার চেয়ে সহজ ছিল মৃত্যু। তা-ই করত রিক। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ে যায় যে, আমি একটি মেসকুইট গাছের তলায় অসহায় হয়ে শুয়ে আছি। রিক ভাবল যে সে মারা যাওয়া মানে তো আমিও মারা যাওয়া।


এসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতেই রিকের চোখে পড়ে দূরে একটি আলোর ছটা। একটি ট্রাক। ট্রেইল যেখানে শুরু তার পাশেই ছিল একটি পার্ক। সেখানেই গাড়িটি দাঁড় করানো হয়েছে। তার মানে এক কিলোমিটার দূরেই ত্রাণকর্তা!


ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই রিক পৌঁছে গেল পার্কের সদর দফতরে। সে জোরে জোরে ট্রাকের হর্ন বাজাতে শুরু করল। প্রচণ্ড শব্দ শুনে ছুটে এলেন পার্কের অ্যাসিসট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট ডেভিড ডটার, ‘কী ব্যাপার?’
‘আমি ও আমার স্ত্রী মরুভূমিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে চলে রিক, ‘ও এখনো মরুভূমিতেই পড়ে আছে।’

 

যখন ভাঙল ঘুম

আমার ঘুম এসে গিয়েছিল। মাথার ওপর হেলিকপ্টারের তীব্র গর্জনে ঘুম ভেঙে গেল। সার্চলাইটের তীব্র আলো এসে আমার চোখেমুখে পড়ল। মুক্তি আসন্ন জেনে অপূর্ব এক সুখের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল আমার সারা শরীরে, মনে।
‘রি-ই-ক!’ আমি চেঁচালাম। তারপর আবার বললাম, ‘মা, বাবা! আমাকে সাহায্য করো।’
আমার দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না। তাই হাত-পা নেড়ে প্রাণপণ শক্তিতে বলতে থাকলাম, ‘আমি এখানে, আমি এখানে!’
শেষ পর্যন্ত কিছুই কাজে এলো না। হেলিকপ্টারের সার্চলাইটও আমি কোথায় শুয়ে আছি, তা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো।

 

চতুর্থ দিন
একা

ক্ষুধা-তৃষ্ণায় শরীর শুকিয়ে গিয়েছিল, তাতে কোন ফাঁকে যেন আঙ্গুল গলে হারিয়ে যায় আমার বিয়ের আংটিটিও। তা যাক, এই মরুভূমি তো আমার কত কিছুই কেড়ে নিয়েছে, আর একটি আংটি!
এদিকে দিনের গরম যত বাড়তে লাগল ততই আমার হ্যালুসিনেশন হতে থাকল। একটিতে দেখলাম, আমি একজন বেবিসিটার আর আমার এক প্রতিবেশী এসেছেন তার শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে, আমি যেন তাকে একটু দেখেশুনে রাখি। বাস্তবে কিন্তু ছেলেটি আমারই। সে তার হাত ও পা নাড়াতে পারে না।
আমার শরীরের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকল। আমার কিডনি, হার্ট, লিভার ও লাংস তীব্র গরম ও তীব্র শীতের প্রতিক্রিয়ায় এবং পাশাপাশি অনাহার ও পানিশূন্যতার কারণে অচল হয়ে পড়তে থাকল। আমার শরীর থেকে রস বের হতে থাকল।
এদিকে সামান্য বিশ্রাম শেষে ২৪ জন উদ্ধারকর্মীকে সাথে নিয়ে আমাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল রিক। আগের দিন কোথায় আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়, সেই পথের সন্ধানে তারা পুরো দিনটা ব্যয় করে। রিক খুঁজতে থাকে একজোড়া বোল্ডারের কাছে একটি একটি মেসকুইট গাছ। কিন্তু সে রকম পাওয়া যায় না। রিক ক্রমেই হতাশায় ভেঙে পড়তে থাকে, ও গেল কোথায়? আমি মনে করতে পারছি না কেন?

 

পঞ্চম দিন
শেষ দিন

রোববার সকাল ৬টার মধ্যে আরো উদ্ধারকর্মী কাজে নেমে পড়েন। ২৪ থেকে বেড়ে এবার তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-এ। তবে সবার ধারণা ছিল আমাকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না, পাওয়া যেতে পারে একটি লাশ। তাই উদ্ধারকর্মীরা অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেও পার্কের অ্যাসিসট্যান্ট সুপারভাইজার ডেভিড ডটার এটা-ওটা বুঝিয়ে রিককে তার অফিসেই আটকে রাখতেন। কারণ, তারা কেউই চাইতেন না, রিক আমার হাড়গোড় দেখুক।


মরুভূমিতে এলোমেলোভাবে আমাকে খুঁজেই ফিরছিল অনুসন্ধানকারীরা। এর মধ্যে দু’জন আমার নাম ধরে বার বার ডেকে চলছিল। এদিকে স্টেট পার্কের পুলিশ অফিসার ফ্রেনি রিনকন ও ওয়ার্ডেন আইজাক রুইজ একটি উপত্যকায় ঢুকে পড়েছেন। দূর থেকে তারা ওই দুই স্বেচ্ছাসেবীর ডাক শুনতে পেলেন, ‘ক্যাথি, তুমি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছো?’


‘বাঁচাও!’ আমি কঁকিয়ে উঠে বলি। আমার ক্ষীণ গলার স্বর শুনতে পেয়ে রিনকন তাকান রুইজের দিকে। পরক্ষণে তারা আবার কথার শব্দ শুনতে পান, ‘আমাকে বাঁচাও!’
আমার গলার স্বর অনুসরণ করে রিনকন ও রুইজ দৌড়ে একটি পাথুরে পাহাড়ের কাছে চলে আসেন এবং এদিক-ওদিক দেখতে থাকেন। তারপর দু’জনই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ‘পেয়েছি, পেয়েছি! বেঁচে আছে!’


ওরা যখন আমার কাছে এসে পৌঁছালেন তখন শীতে ও দুর্বলতায় থরথর করে কাঁপছি আমি। ধুলো-কাদামাখা আমাকে দেখাচ্ছে বন্যপ্রাণীর মতো। আমি তখন আবোলতাবোল বকছি, বলছি ১২ বছর আগে রিকের সাথে বিগ বেন্ড পার্কে আমার বিয়ের কথা। রিনকন আমার কথার মাঝখানে বাধা দিলেন, ‘বলুন তো, আপনার নামটা কী?’


তার প্রশ্নে আমার একটুখানি হুঁশ ফিরে এলো। বললাম, ‘ক্যাথি। আমার স্বামী কোথায়, সে কেমন আছে?’
‘ভালো আছেন। নইলে আমরা আপনার খোঁজ পেলাম কী করে?’

 

শেষ কথা
আমাদের ভালোবাসা

আমাকে দ্রুত নেয়া হলো এল পাসো মেডিক্যাল সেন্টারে। ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, উদ্ধারে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা দেরি হলেই আমাকে আর জীবিত পাওয়া যেত না। আমার হার্ট, লাংস, লিভার সব অচল হয়ে গিয়েছিল। রেনাল ফেইলুরও সাথে। কিডনিও অচল হওয়ার মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিল। শরীরের তাপমাত্রা পাগলের মতো ওঠানামা করছিল। মোটের ওপর, শরীরের একটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ভালো চলছিল না।
সব মিলিয়ে আমি ছিলাম ভয়াবহ একটা ঘোরের মধ্যে। কিন্তু যেই মাত্র রিক আমাকে দেখতে এলো, হঠাৎ যেন একটা স্বস্তির হাওয়া আমার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে গেল।


রিক সারা দিন আমার পাশে থাকার পর রাতে ফেরার উদ্যোগ নিতেই নার্স তাকে বললেন, ‘পেশেন্টের কাছে আছে এমন কোনো মূল্যবান জিনিস কি আপনি নিয়ে যেতে চান?’ রিক একটু ভেবে বলল, ‘হ্যাঁ, আমাদের বিয়ের আংটি।’
আমি বললাম, ‘ওটা আমার আঙুল থেকে কখন খুলে পড়ে গিয়ে মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে। আর খুঁজে পাইনি।’
রিক আমার দুই হাত তার হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল, ঠিক যেভাবে মরুভূমিতে আমাকে রেখে চলে আসার আগে বসে ছিল।
মরুভূমি আমাদের ভালোবাসার প্রতীক আংটিটি চুরি করে নিয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের ভালোবাসা ছিনিয়ে নিতে পারেনি। হ