গনতন্ত্রের প্রবক্তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়

Dec 03, 2017 05:21 pm
আব্রাহাম লিঙ্কন আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট

আদেল বেগ

আব্রাহাম লিঙ্কন। আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন ১৮৬১ সালের মার্চে। নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ পদে আসীন ছিলেন। গুলির আঘাতে নিহত হন ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল সকাল ৭টা ২২ মিনিটে। এর আগে ১৪ এপ্রিল রাত সোয়া ১০টায় তাকে গুলি করা হয়। এ সময় তার বয়স ছিল ৫৬ বছর।

আমেরিকার বড় ধরনের সাংবিধানিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সঙ্কটের সময়ে তিনি তার দেশকে সফলভাবে নেতৃত্ব দেন। এসব সঙ্কটের সূত্রে সৃষ্ট আমেরিকার গৃহযুদ্ধ মোকাবেলা করে সাফল্যের সাথে রক্ষা করেন আমেরিকা ইউনিয়ন। অবসান ঘটান দাসপ্রথার। দেশে আনেন আর্থিক কর্মকাণ্ডে ও অর্থায়নে আধুনিকতা। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের এক গরিব পরিবারের সন্তান লিঙ্কন প্রধানত ছিলেন সুশিক্ষিত। তিনি ছিলেন একজন কান্ট্রি লয়ার, ইলিনয়ে রাজ্যের লেজিসলেটর। এক মেয়াদে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হন দুইবার। ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। ১৮৬৪ সালে এ পদে পুনঃনির্বাচিত হন।

 

নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে তিনি ১৮৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলীয় মনোনয়ন পান। এবং নির্বাচনে জয় পান। ১৮৬১ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি রাজ্য ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করে একটি কনফেডারেসি গঠন করে। ১৮৬৯ সালের ১২ এপ্রিল কনফেডারেট ফোর্ট সামটার হামলা করলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। লিঙ্কন এই বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে আমেরিকা ইউনিয়ন সমুন্নত রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি মনোযোগ দেন গৃহযুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক মাত্রার ওপর। তিনি ব্যাপকভাবে যুদ্ধক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সন্দেহভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিনা বিচারে আটক ও কারাগারে বন্দী রাখার উপায় অবলম্বন করেন। তিনি ১৮৬১ সালে দক্ষতার সাথে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ঠেকিয়ে দেন কনফেডারেসির প্রতি ব্রিটিশ স্বীকৃত।

গৃহযুদ্ধ চলার সময় ১৮৬৩ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ‘এমানসিপেশন প্রক্লেমেশন’ নামে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে প্রথমে ১০টি রাজ্যে ও পরে বিদ্রোহী রাজ্যগুলোতে দাসদের মুক্ত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ লাখ দাসের মধ্যে তখন ৩১ লাখ দাস মুক্তিলাভ করে। এ জন্য দাস মালিকেরা কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। তারই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র দাসপ্রথা অবৈধ ঘোষণা করা হয় সে দেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এবং তা কার্যকর হয় ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বরে।
লিঙ্কন সামগ্রিক গৃহযুদ্ধ পরিচালনা করেন। জেনারেলদের নিয়োগ থেকে শুরু করে কমান্ডিং জেনারেল উলিসিস এস গ্রান্টকে বাছাই করেন তিনি নিজে। দলের বিভিন্ন বিবদমান অংশ থেকে নেতা নির্বাচন করে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন। তাদের ওপর চাপ দেন সহযোগিতা করতে। তার নেতৃত্বে ইউনিয়ন নৌ-অবরোধ গড়ে তুলে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে স্বাভাবিক ব্যবসায়-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া হয়।

যুদ্ধের শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয় বর্ডার স্লেভ স্টেটগুলোর ওপর।গানবোট দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের নদীব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কয়েকবার চেষ্টা চালান কনফেডারেসির রাজধানী রিচমন্ড দখল করতে। যে জেনারেলই তা দখলে ব্যর্থ হয়েছেন, তাকেই সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে নতুন জেনারেল। শেষ পর্যন্ত উলিসিস গ্রান্ট তাতে সফল হন। তিনি ১৮৬৫ সালে রিচমন্ড দখল করেন।


রাজ্যগুলোর অধিকার বনাম ফেডারেল কর্তৃত্ব ও দাসপ্রথা নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে টানাপড়েনের জের ধরে ১৮৬১ সালে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সূচনা। ১৮৬০ সালে দাসপ্রথাবিরোধী রিপাবলিকান প্রার্থী আব্রাহাম লিঙ্কনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি রাজ্য ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করে একটি কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেয়। এরপর তাদের সাথে যোগ দেয় আরো চারটি রাজ্য। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ। এটা ছিল রাজ্যের বিরুদ্ধে রাজ্যের যুদ্ধ। বলা হয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীর যুদ্ধ, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের যুদ্ধ। ১৮৬৫ সালে কনফেডারেটদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। এটা ছিল আমেরিকার মাটিতে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমেরিকার ২৪ লাখ সৈন্যের মধ্যে মারা যায় ৬ লাখ ২০ হাজার। আহত হয় আরো কয়েক লাখ।

 

লিঙ্কন হত্যা
প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যা করা হয় গুড ফ্রাইডেতে। সে দিন ছিল ১৪ এপ্রিল, ১৮৬৫। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের অবসানের শেষ পর্বে এসে আমেরিকাবাসী হারালো তাদের ষোলতম প্রেসিডেন্টকে। তার মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে ৯ এপ্রিল কনফেডারেটদের আর্মি অব নর্দার্ন ভার্জিনিয়ার কমান্ডিং জেনারেল রবার্ট ই. লি. আত্মসমর্পণ করেন ইউনিয়ন আর্মির জেনারেল উলিসিস এস গ্রান্ট এবং আর্মি অব পটোম্যাকের কাছে। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের ইস্টার্ন থিয়েটারের প্রধান ইউনিয়ন আর্মি ছিল এই পটোম্যাক আর্মি। লিঙ্কন হচ্ছেন প্রথম প্রেসিডেন্ট, যাকে হত্যাকারী সাফল্যের সাথে হত্যা করতে সমর্থ হয়। এর ৩০ বছর আগে ১৮৩৫ সালে আমেরিকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল।


আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন জন উইলকেস বুথ। তিনি ছিলেন একজন সুপরিচিত অভিনেতা। কনফেডারেট পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই লিঙ্কন হত্যার পরিকল্পনা তৈরি হয়। বুথের সহযোগী ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন লুই পাদুয়েল এবং ডেভিড হ্যারল্ড। তাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সেওয়ার্ডকে হত্যা করার। আরেক সহযোগী ষড়যন্ত্রকারী জর্জ অ্যাটজেরোদতের ওপর দায়িত্ব ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনকে হত্যার। উইলকেস বুশ ও তাহার সহযোগীরা মনে করেছিলেন, একসাথে এই তিন শীর্ষ ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারলে ফেডারেল সরকার বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। কারণ তখন কে হবেন প্রেসিডেন্টের উত্তরসূরি সে ব্যাপারে সৃষ্টি হবে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের। উইলকেস বুথ ফোর্ড’স থিয়েটারে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেন আব্রাহাম লিঙ্কনকে। তারা সে দিন এ থিয়েটারে ‘আওয়ার আমেরিকান কাজিন’ নামের নাটক উপভোগ করতে গিয়েছিলেন। বাকি সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের হত্যা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। লুই পাওয়েল সে দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেওয়ার্ডকে আহত করতে পেরেছিলেন মাত্র। আর অ্যাটজেরোদত ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসনকে হত্যা করতে পারেননি। কারণ স্নায়বিকভাবে দুর্বল হয়ে তিনি ওয়াশিংটন ছেড়ে পালিয়ে যান।

 

মূল পরিকল্পনা : অপহরণ
১৯৬৪ সালের মার্চে ইউনিয়ন আর্মির কমান্ডিং জেনারেল উলিসিস এস গ্রান্ট সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধবন্দী বিনিময় বাতিলের। এ সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষের যুদ্ধবন্দীর জন্য ছিল এক ক্ষোভের কারণ। গ্রান্ট মনে করতেন বন্দী বিনিময় গৃহযুদ্ধকেই প্রলম্বিত করছেন। জন উইলকেস বুথ ছিলেন একজন সাউদার্নার ও কনফেডারেটদের খোলাখুলি সমর্থক। বুথ পরিকল্পনা করেন আব্রাহাম লিঙ্কনকে অপহরণ করে কনফেডারেটদের হাতে তুলে দেবেন। আর এভাবে তাকে বন্দী করে রাখা হবে, যতক্ষণ না উত্তরের ইউনিয়ন সরকার বন্দী বিনিময় আবার শুরু করা হয়। সোজা কথা লিঙ্কনকে জিম্মি হিসেবে আটক রেখে কনফেডারেট বন্দীদের মুক্ত করা হবে। বুথ তার উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তার দলে ভেরান স্যামুয়েল আরনল্ড, জর্জ অ্যাটজেরোদত, ডেভিড হেরল্ড, মাইকেল ও লাফলেন, লুই পাওয়েল (লুই পেইন নামেও পরিচিত) ও জন সুরাটকে। তারা চলে যান ওয়াশিংটন ডিসির এক বাড়িতে। বুথ ঘন ঘন এ বাড়িতে যেতেন।
১৮৬০ সালের শেষ দিকে বাল্টিমোরে গড়ে তোলেন প্রো-কনফেডারেট গোপন সমিতি ‘নাইটস অব দ্য গোল্ডেন সার্কেল’ তথা কেজিসি। তিনি লিঙ্কনের দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও যোগ দেন ১৮৬৫ সালের ৪ মার্চ। সেখানে তিনি ছিলেন একজন আমন্ত্রিত অতিথি। আমন্ত্রণটি এসেছিল তার গোপন বাগদত্তা লুসি হেইলের কাছ থেকে। লুসি হেইল ছিলেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের আইনবিদ ও আমেরিকান রাজনীতিবিদ জন পার্কার হেইলের কন্যা। বুথ পরবর্তী সময়ে তার ডায়েরিতে লিখেছেন কী চমৎকার সুযোগই না ছিল, যদি আমি সে দিনের উদ্বোধনী দিনটায় প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে চাইতাম : 'what an excellent chance I had, if I wished, to kill the president on inauguration day.


১৮৬৫ সালের ১৭ মার্চ বুথ তার সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের জানান, লিঙ্কন ক্যাম্পবেল সামরিক হাসপাতালে ‘স্টিল ওয়াটার রানস ডিপ’ নামে একটি নাটক দেখতে যাবেন। বুথ তার লোকজনকে শহরের এক প্রান্তের একটি রেস্তোরাঁয় জড়ো করেন। পরিকল্পনা ছিল পথে একটি বিস্তৃত সড়কে তারা প্রেসিডেন্টকে আটক করে পাকড়াও করবেন। প্রেসিডেন্ট ক্যাম্পবেল হাসপাতাল থেকে ফিরবেন, তখন এ হামলা চলবে এমনটিই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দেখা গেল লিঙ্কন সেখানে যাননি। এর বদলে তিনি গেছেন ন্যাশনাল হোটেলে। সেখানে তিনি যোগ দেন ১৪২তম ইন্ডিয়ানা ইনফেন্ট্রির এক অনুষ্ঠানে। এ অনুষ্ঠানে গভর্নর ওলিভার মর্টনকে উপহার দেয়া হয় গৃহযুদ্ধে আটক করা একটি কনফেডারেট ব্যাটল ফ্ল্যাগ। বুথ তখন বসবাস করছিলেন এই ন্যাশনাল হোটেলেই। যদি তখন বুথ ক্যাম্পবেলে হাসপাতালে না যেতেন তবে হয়তো ন্যাশনাল হোটেল প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনকে হত্যার একটা সুযোগ হাতে পেয়েও যেতেন।


এ দিকে পতনের মুখোমুখি কনফেডারেসি। ৩ এপ্রিল ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডের অর্থাৎ কনফেডারেট রাজধানীর পতন ঘটে ইউনিয়ন আর্মির হাতে। কনফেডারেসির মূল সামরিক বাহিনী ছিল নর্দান ভার্জিনিয়া আর্মি। এ বাহিনী ৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে অ্যাপামেটক্স কোর্ট হাউজে পটোম্যাক আর্মির কাছে। কনফেডারেট প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিস এবং তার সরকারের বাকি সবাই তখন দ্রুত পালাচ্ছিল। সাউদার্নারদের অনেকেই কনফেডারেটের ব্যাপারে নিরাশ হলেও বুথ সে আশা ছাড়েননি। তিনি যেন লড়েই যাচ্ছিলেন কনফেডারেসি পুনরুদ্ধারে।


লির বাহিনী গ্রান্টের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দুই দিন পর ১৮৬৫ সালের ১১ এপ্রিল বুথ হোয়াইট হাউজে লিঙ্কনের এক বক্তৃতায় যোগ দেন। সে ভাষণে লিঙ্কন সাবেক দাসদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার দেয়ার কথা বলেন। বুথ তাতে ক্ষুব্ধ হন এবং প্রেসিডেন্টকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। বলা হয় তখন বুথ বলেছিলেন : 'That means nigger citizenship. Now, by God, I'll put him through. That is the last speech he will ever give.'

 

লিঙ্কনের দুঃস্বপ্ন
ওয়ার্ড হিল ল্যামন। লিঙ্কনের বন্ধু ও জীবনীকার। লিঙ্কন নিহত হওয়ার তিন দিন আগে ল্যামনের ও অন্যদের সাথে তার কিছু স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। ল্যামনের মতে, লিঙ্কন তার সেসব স্বপ্নের কথা তাদের কাছে প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন : ‘দশ বছর আগে বেশ দেরিতেই আমি বিশ্রামে যাই। তখন ফ্রন্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরের অপেক্ষায় ছিলাম। নিশ্চিন্তে আরামে ঘুমুতে পারছিলাম না। কারণ দেহ-মনে ক্লান্ত ছিলাম। শিগগিরই স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। আমি যেন মরার মতো স্থবির হয়ে গেলাম। তখন শুনলাম, চাপা ফুঁপিয়ে কান্নার স্বপ্ন। যেন বেশ কয়েকজন একসাথে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভাবলাম বিছানা ছেড়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে যাই। সেখানেও নীরবতা ভেঙে করুণ ফোঁপানো কান্নার শব্দ। কিন্তু যারা শোকে কাঁদছেন তাদের কাউকে দেখা গেল না। আমি এ কক্ষ থেকে ওই কক্ষে গেলাম, কোনো প্রাণীকে দেখা গেল না। যখন চলাফেরা করছিলাম একই ধরনের শোকের কান্নার শব্দ আমাকে বিচলিত করে তোলে। সব কক্ষেই আলো দেখলাম। সব বস্তুই আমার পরিচিত। কিন্তু হৃদয়ভাঙা কাতরতা নিয়ে যারা কান্না করছিল, ওরা সব কোথায়? আমি ধাঁধায় পড়ে গেলাম এবং সতর্ক হলাম। এসবের অর্থ কী হতে পারে? এ রহস্যময় অবস্থার কারণ জানতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে আমি চলতে চলতে পূর্ব দিকের কক্ষে এসে থামলাম। পূর্ব দিকের কক্ষটি হোয়াইট হাউজের সবচেয়ে বড় কক্ষ। সেখানে দেখলাম ভয়াবহ অবাক করা কিছু। আমার সামনে ছিল একটি শবাধার রাখার জন্য মঞ্চ বা ক্যাটাফ্লেক। সেখানে রাখা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পোশাকে জড়ানো একটি লাশ। এর চার পাশে ছিল সৈনিকেরা। এরা গার্ড হিসেবে কাজ করছিলেন। ছিল একদল জনতা। লাশের ওপর পড়ে এরা শোক প্রকাশ করছে। লাশটির মুখ ঢাকা ছিল। অন্যরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। হোয়াইট হাউজের কে মারা গেল? একজন সৈনিকের কাছে জানতে চাইলাম। ‘প্রেসিডেন্ট’ এই ছিল তার জবাব। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। এর জন্যই জনতার উচ্চস্বরে কান্না। আমি জেগে উঠলাম। এখানেই স্বপ্নের শেষ। সে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। যদিও এটি ছিল একটি স্বপ্ন মাত্র, তবুও এর পর থেকে আমি ভীত হয়ে পড়লাম।’

 

হত্যার দিন
১৪ এপ্রিল উইলকেস বুথের সকালটা শুরু হয় মধ্যরাতে জেগে ওঠার মধ্য দিয়েই। ন্যাশনাল হোটেলের বিছানায় শুয়েই মায়ের কাছে লিখেন সব কিছু ঠিকই আছে। তার ডায়েরিতে লিখেন, ‘আমাদের লড়াইয়ে আমরা প্রায় হেরে গেছি। চূড়ান্ত ও বড় ধরনের একটা কিছু করতেই হবে।’
বেশ কিছু দিন পর আব্রাহাম লিঙ্কনকে সকালবেলা বেশ খোশমেজাজেই দেখা গেল সে দিন। নতুন ট্রেজারি সেক্রেটারি হাফ ম্যাককুলুচ বলেছেন, সেদিন সকালে লিঙ্কনকে দেখে মনে হয়েছে, এর আগে তিনি এতটা হাসিখুশি ছিলেন না। যে কেউ এই পার্থক্যটা ধরতে পারতেন। বেশ কয়েক মাস প্রেসিডেন্টকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল চোখগুলো যেন বসে গেছে। লিঙ্কন নিজে অনেকের কাছে বলেছেন, তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এ নিয়ে ফার্স্টলেডি ম্যারি টড লিঙ্কন কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। সেদিন লিঙ্কন তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে মিলিত হন। এরপর সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের সাথে।


দুপুরের দিকে ফোর্ড থিয়েটারে গিয়ে তার চিঠিগুলো খুলে পড়ে দেখেন। এই থিয়েটারে বুথের একটি স্থায়ী ডাকবাক্স ছিল। সেখানে এ থিয়েটারের মালিক জন ফোর্ডের ভাইয়ের কাছে বুথ জানতে পাবেন প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল গ্রান্ট আজ রাতে ফোর্ড থিয়েটারে ‘আওয়ার অ্যামেরিকান কাজিন’ নাটক উপভোগ করবেন। বুথ স্থির সিদ্ধান্ত নিলেন এটাই মোক্ষম সুযোগ, এ সুযোগ হারানো যাবে না। এ রাতেই চূড়ান্ত একটা কিছু করে ফেলতে হবে। তিনি থিয়েটারের লেআউট সম্পর্কে ভালো করেই জানেন। এ থিয়েটারে বেশ কয়েকবার অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন। এই আগের মাসেও এ থিয়েটারে অভিনয় করেছেন, ওই দিন বিকেলে ওয়াশিংটন ডিসির ম্যারি সুররাতেস বোর্ডিং হাউজে যান। বোর্ডিং হাউজের মালিক ম্যারি এলিজাবেথ জেনকিন সুররাতকে বলেন, তার ম্যারিল্যান্ডের সুররাতসভিলি পানশালার একটি প্যাকেজ দিতে। তিনি সুররাতের টেনেন্টকে এ-ও জানাতে অনুরোধ করেন যে, সেখানে রাখা বন্দুক ও গুলি তৈরি রাখতে, যাতে সন্ধ্যায় বুথ তা নিয়ে আসতে পারেন।

তিনি বুথের অনুরোধ রক্ষা করেন এবং তার বর্ডার ও পুত্রের বন্ধু লুই জে ওয়েকম্যানের সাথে সেখানে যান। উল্লেখ্য, ম্যারি সুররাতকে লিঙ্কন হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তাকে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল সরকারের প্রথম মহিলা, যাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তার ছেলে জন এইচ সুররাত জুনিওরও এ ষড়যন্ত্রের জন্য অভিযুক্ত ছিলেন, তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তার বন্ধু লুই জে ওয়েকম্যান ছিলেন লিঙ্কন হত্যা মামলায় সরকারপক্ষের প্রধান সাক্ষী। প্রথম দিকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে দায়ী বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। কারণ, সুররাত পরিবারের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল।
সে দিন সন্ধ্যা ৭টায় জন উইলকেস শেষবারের মতো তার অন্যান্য সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে দেখা করেন। বুথ লুই পাওয়েলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইড সেওয়ার্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব দেন। বলা হয় তাকে তার বাড়িতে হত্যা করা হবে। আর জর্জ অ্যাটজেরোদতকে বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসেনকে তার কির্কউড হোটেলের আবাসস্থলে হত্যা করতে। আর ডেভিড ই হ্যারল্ডকে বলা হয়, পাওয়েলকে গাইড করে সেওয়ার্ডের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বুথের পরিকল্পনা ছিল সিঙ্গলশুট ডেরিঞ্জার পিস্তল দিয়ে গুলি করে লিঙ্কনকে হত্যা করবেন। এরপর ছুরি মেরে হত্যা করবেন গ্রান্টকে। তাদের হত্যা করা হবে ফোর্ড থিয়েটারে। এরা সবাই রাত ১০টা বাজার ঠিক পরপর এই হত্যাকাণ্ড ঘটাবে একযোগে এমনটি ছিল তাদের পরিকল্পনা। আবজেরোদতের আসলে এখানে কিছু করার ছিল না। কারণ সে সম্মত ছিল ভাইস প্রেসিডেন্টকে অপহরণের জন্য।


খবর ছিল জেনারেল ও মিসেস গ্রান্ট লিঙ্কন ও মিসেস লিঙ্কনের সাথে ফোর্ড থিয়েটারে নাটক দেখতে যাবেন। কিন্তু মিসেস গ্রান্ট ও মিসেস লিঙ্কনের মধ্যে তখন খুব একটা সুসম্পর্ক ছিল না। তাই জেনারেল গ্রান্ট নাটক দেখার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। আরো অনেককেই সে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মেজর হেনরি বাথবোন এবং তার বাগদত্তা ক্লারা হ্যারিস (নিউ ইয়র্ক সিনেটর ইবা হ্যারিসের কন্যা) এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।


লিঙ্কন পার্টি একটু দেরি করে ফোর্ড থিয়েটারে গিয়ে পৌঁছেন। বসেন প্রেসিডেন্ট বক্সে। এটি আসলে ছিল একটি-দু’টি কোনাওয়ালা বক্সসিট। সিট দু’টির মাঝখানে বিভাজন দেয়াল সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। মিসেস লিঙ্কন প্রেসিডেন্টের সাথে ফিসফিস করে কথা বলছিলেন। মিস্টার লিঙ্কন তার হাত ধরে ছিলেন। মিসেস লিঙ্কন বললেন : ‘আমাদের এভাবে দেখতে পেয়ে মিস হ্যারিস কী ভাববে’। প্রেসিডেন্ট জবাব দিলেন : ‘এ নিয়ে তিনি কিছুই ভাববেন না’। এটাই ছিল আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনের শেষ উচ্চারিত বাক্য। তখন ঘড়িতে সময় রাত সোয়া ১০টা।


সে দিন সম্ভবত প্রেসিডেন্ট বক্স গার্ড দিচ্ছিলেন জন ফ্রেডারিক পার্কার নামের পুলিশ। সব সময় তার রহস্যজনক আগ্রহ ছিল বডিগার্ড হওয়ার জন্য। মধ্যবিরতির সময় ফ্রেডারিক কাছের একটি পানশালায় গেলেন লিঙ্কনের ফুটম্যান ও কোচম্যানকে সাথে করে। এটা স্পষ্ট নয়, তিনি আর থিয়েটারে ফিরে এসেছিলেন কি না। তবে বুথ যখন বক্সে ঢুকেন, তখন জন ফ্রেডারিক নিশ্চিত তার পোস্টে ছিলেন না। তা ছাড়া একজন সেলিব্রিটি অভিনেতা হিসেবে বুথের প্রবেশ নিয়ে কোনো দর্শক-শ্রোতাও কোনো প্রশ্ন তোলেননি। মনে করা হচ্ছিল তিনি প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে আসছেন। প্রেসিডেন্ট বক্সে প্রবেশের প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকে একটি কাঠের কাঠি দিয়ে তার পেছনের ইনওয়ার্ড সুইংগিং ডোরটি ব্যারিকেড দেন। এরপর দরজা ও দেয়ালের মাঝখানটা উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখলেন। এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট সঙ্কীর্ণ ছিদ্র দিয়ে তাকালেন। দ্বিতীয় দরজায় এই ছিদ্রটি করা হয়েছিল আগের দিন। এ দরজাটি পার হলেই ঢোকা যায় প্রেসিডেন্ট বক্সে। তখন নাটকের ২ নম্বর অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্য চলছিল।


বুথ নাটকটিকে ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি অপেক্ষায় ছিলেন মোক্ষম সময়টার জন্য। যখন অভিনেতা হ্যারি হক (‘কাজিন’-এর মুখ্য অভিনেতা) একা মঞ্চে থাকবেন, নাটকটির সবচেয়ে মজার দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য, তিনি অপেক্ষা করছিলেন সে সময়টার জন্যই। মোক্ষম সে সময় এলো। বুথ দরজা খুলে একদম প্রেসিডেন্টের পেছনে চলে গিয়ে কাছ থেকে গুলি করেন। বাম কানের নিচটায়। লিঙ্কন মারাত্মক আহত হয়ে তার চেয়ারে পড়ে গেলেন। ম্যারি টড ক্লিনটন এসে প্রেসিডেন্টকে ধরলেন। এরপর আর্তনাদ করে উঠলেন।


গুলির শব্দ শুনে রাথবোন তার আসন থেকে লাফিয়ে উঠে বুথের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইলেন। বুথ তখন তার ছুরি বের করে মেজর বাথবোনের হাতে আঘাত করেন। বাথবোন আবার উঠে চেষ্টা করেন বুথকে ধরে ফেলতে। তখন বুথ তৈরি হচ্ছিল বক্সসিটের চৌকাঠ থেকে লাফিয়ে পড়ার জন্য। বুথ আবার ছুরি দিয়ে বাথবোনকে আঘাত করেন। এরপর বুথ ১২ ফুট নিচে মঞ্চে বক্স থেকে লাফিয়ে পড়েন। এ সময় শরীরের নানা অংশে আঘাত পান। তিনি কোনোমতে উঠে দাঁড়ান এবং মঞ্চ অতিক্রম করেন এভাবে, যেন দর্শকেরা মনে করেন তিনিও অভিনেতাদেরই একজন। বুথ তখন তার রক্তমাখা ছুরিটি উপরে তুলে উচ্চারণ করেন ভার্জিনিয়া রাজ্যের মটো : ‘সিক সেম্পার টাইরেনিস’, যার অর্থ ‘ডাউন উইথ টাইরেন্টস’। অন্য বর্ণনায় আছে তখন তিনি বলেছিলেন : ‘দ্য সাউথ ইজ অ্যাভেঞ্জড’।


ম্যারি লিঙ্কন ও ক্লারা হ্যারিসের আর্তনাদ ও বাথবোনের ‘লোকটাকে ধরো’ বলে চিৎকার শুনে দর্শকেরা শেষ পর্যন্ত বুঝল এটি তো নাটকের কোনো অংশ নয়। মানুষ জেনে গেল লিঙ্কন হত্যার এই ঘটনার কথা। বুথ এই নকল অভিনয় করে মঞ্চের বাইরে গিয়ে অপেক্ষারত ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। কেউ কেউ তার পিছু নিলেও বুথ পালাতে সক্ষম হন। তিনি নেভি ইয়ার্ড ব্রিজ দিয়ে চলে গেলেন হেরল্ড ও পাওয়েলের সাথে দেখা করতে।

 

প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের মৃত্যু
চার্লস লিয়ানি। তিনি একজন আর্মি সার্জন। সে রাতে তার কোনো ডিউটি ছিল না। তিনি লিবার্টিতে ছিলেন। ওই রাতে তিনিও ফোর্ড থিয়েটারে এসেছিলেন নাটক দেখতে। ঘটনার পর তিনি ভিড় ঠেলে প্রেসিডেন্ট বক্সের দরজার কাছে চলে যান। কিন্তু দেখলেন দরজাটি খুলছে না। শেষে দেখলেন দরজায় একটি খাঁজ কেটে একটি কাঠি দিয়ে দরজাটি পেছন থেকে জ্যাম করে দেয়া হয়েছে। বাথবোন চিৎকার করে লিয়ালি বলছেন দরজাটি খোলার ব্যবস্থা করতে। তখন লিয়ালি দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন। যা-ই হোক লিয়ালির সহায়তায় বাথবোন দরজাটি খুলেন। লিয়ালি প্রেসিডেন্ট বক্সে ঢোকেন। লিয়ালি দেখলেন বাথবোনের বাম হাত থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে। তা সত্ত্বেও তিনি বাথবোনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান লিঙ্কনের দিকে। তিনি পড়ে আছেন তার সিটে। তাকে ধরে রেখেছেন ম্যারি টড লিঙ্কন। ম্যারি তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছিলেন। লিঙ্কনের শিরা তখন চলছিল না। লিয়ালি মনে করলেন, তিনি আর নেই। লিয়ালি প্রেসিডেন্টকে মেঝেতে নামিয়ে আনেন। দর্শকদের মধ্যে দ্বিতীয় আরেকজন ডাক্তার ছিলেন। তার নাম চার্লস ম্যাবিন ট্যাফট। রেলিং বেয়ে মঞ্চ থেকে তিনি ওপরে উঠে এলেন। ট্যাফট ও লিয়ালি লিঙ্কনের রক্তমাখা শার্টের কলার কেটে শার্ট খুলে ফেলেন। লিয়ালি হাত লাগিয়ে দেখলেন গুলি লেগেছে তার বাম কানের দিকে মাথায়। লিয়ালি বুলেট বের করে আনতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আঘাতের স্থানে জমাটবাঁধা রক্তের কারণে বুলেটের অবস্থান বোঝা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে লিঙ্কনের শ্বাস-প্রশ্বাস পরিস্থিতির উন্নতি দেখা গেল। লিয়ালি জানতেন, জমাটবাঁধা রক্ত একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরাতে পারলে শ্বাস-প্রশ্বাস পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যাবে। এরপর লিয়ালি দেখলেন, গুলি মগজের ভেতর ঢুকে পড়েছে। তিনি ঘোষণা দেন, তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি অবশ্যই মারা যাবেন।


দর্শকদের মধ্যে অ্যালবার্ট কিং নামে তৃতীয় এক ডাক্তার ছিলেন। তারা তিনজন দ্রুত নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেন, প্রেসিডেন্টকে দ্রুত এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এবড়ো-খেবড়ো সড়কপথে হোয়াইট হাউজে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পিটার টলেটাভোলসের ‘স্টার স্যালুন’ ছিল ফোর্ডস থিয়েটারের কাছেই। সিদ্ধান্ত হলো সেখানেই প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেয়া হবে। এই তিন ডাক্তার ও দর্শকদের মধ্যে থাকা সৈনিকেরা তাকে নিয়ে যান থিয়েটারের প্রবেশপথে। সারা পথে একটি মানুষ হাতে হারিকেন ধরে যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন : ‘ব্রিং হিম ইন হেয়ার! ব্রিং হিম ইন হেয়ার’। লোকটির নাম হেনরি স্যাফোর্ড, তিনি ফোর্ডস থিয়েটারের বিপরীত দিকের উইলিয়াম পিটারসনসের বোর্ডিং হাউজের একজন বর্ডার। সারা পথ লোকটি ছিলেন ভয়ে উত্তেজিত। লোকটি লিঙ্কনকে বোর্ডিং হাউজে নিয়ে গেলেন দ্বিতীয় তলার একটি বেডরুমে। সেখানে বিছানায় কোনাকোনি তাকে শোয়ানো হলো। কারণ তার সুদীর্ঘ দেহ ছোট বিছানায় লম্বালম্বি ঠাঁই হচ্ছিল না। পিটারসন হাউজে তাকে পর্যবেক্ষণ শুরু হলো। এ তিনজন ডাক্তারের সাথে এসে যোগ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সার্জন জেনারেল জোসেফ কে বার্নস, ত্রয়োদশ সার্জন জেনারেল চার্লস হেনরি ক্রেস, এন্ডারসন বাফিন অ্যাবেটে এবং রবার্ট কে স্টোন প্রমুখ চিকিৎসক। ক্রেস ছিলেন একজন মেজর এবং বার্নসের সহকারী। স্টোন ছিলেন লিঙ্কনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক।


নেভি সেক্রেটারি গিডিওন ওয়েলেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমরমন্ত্রী এডউইন এম স্টেনটন পরিস্থিতি মোকাবেলার দায়িত্ব নেন। ম্যারি লিঙ্কন এই হত্যা ঘটনা দেখে এতটাই এলোমেলো হয়ে পড়েছিলেন যে, স্টেনটন চিৎকার করে তাকে কক্ষের বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন, ‘এ মহিলাকে এখান থেকে বাইরে নিয়ে যাও, তাকে এখানে আবার আসতে দিও না।’


কিন্তু প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের তখন কিছুই করা সম্ভব হলো না। ১৫ এপ্রিল, ১৮৬৫ ভোর ৭:২২ মিনিটে তিনি মারা গেলেন। তার বয়স তখন ৫৬। মৃত্যুর সময় কাছে ছিলেন না ম্যারি লিঙ্কন। তার মৃত্যুশয্যার চার পাশে জড়ো হওয়া লোকজন হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা শুরু করেন। প্রার্থনা শেষ হলে স্ট্যানটন বলেন : ‘নাউ হি বিলংগস টু অ্যাজেস’। লিঙ্কনের মৃত্যুর পর স্ট্যানটনের এই বক্তব্য প্রশ্নে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বাক্যের শুরুটা সম্পর্কে সবাই একমত। তবে শেষ শব্দটি ‘অ্যাজেস’ না ‘অ্যাজ্ঞেলস’ ছিল, মতপার্থক্যটা সেখানে।


লিয়ালি লিঙ্কনের শেষ সময়ের চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। বলা হয়, তার চিকিৎসার ফলেই তাকে সকাল ৭:২২ মিনিট পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। নইলে ফোর্ডস থিয়েটারেই সে রাতেই লিঙ্কন মারা যেতেন।

 

পাওয়েলের হামলা
বুথ লুই পাওয়েলকে দায়িত্ব দিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সেওয়ার্ডকে খুন করার জন্য। ৫ এপ্রিলে সেওয়ার্ড গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যান। এতে চোয়াল দুই জায়গায় ভেঙে যায়। ডান হাতের এক জায়গা ভেঙে যায়। ডাক্তার তার চোয়াল মেরামত করে দেন। লিঙ্কনের হত্যার দিনেও সেওয়ার্ড বেড রেস্টে ছিলেন, তার ওয়াশিংটনের ল্যাকায়েদি পার্কের বাড়িতে। হেরল্ড গাইড করে পাওয়েলকে সেওয়ার্ডের বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়িটি হোয়াইট হাউজ থেকে বেশি দূরে নয়। পাওয়েলের কাছে ছিল একটি ‘১৮৫৮ হুইটনি রিভলভার। এটি ছিল আকারে বড়, ওজনে ভারী। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় এটি ছিল জনপ্রিয় অস্ত্র। তা ছাড়া তার কাছে ছিল মিলভারের হাতলওয়ালা একটি ছুরি।


পাওয়েল সামনের দরজায় টোকা দেন। তখন রাত ১০টা। সেওয়ার্ডের খানসামা উইলিয়াম বেল এর জবাব দেন। পাওয়েল বলেন, ডাক্তার ভেরডি সেওয়ার্ডের জন্য একটি ওষুধ দিয়েছেন। ওষুধটা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা তাকে দেখিয়ে দিতে হবে। ঘরে ঢোকার পর পাওয়েল সিঁড়ি ভেঙে তিন তলায় সেওয়ার্ডের শোবার ঘরে যেতে শুরু করলেন। সিঁড়ির শেষ মাথায় তাকে থামানো হলো। সেওয়ার্ডের পুত্র ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রেডারিক ডব্লিউ সেওয়ার্ড তাকে থামালেন। পাওয়েল একই কথা বললেন ফ্রেডারিককে, যা তিনি বলেছিলেন বেলকে। ফ্রেডারিকের সন্দেহ হলো পাওয়েলের সম্পর্কে। ফ্রেডারিক বললেন তার বাবা ঘুমুচ্ছেন।


হলে এসব কথাবার্তা শুনে সেওয়ার্ডের কথা ফ্যানি সেওয়ার্ডের কক্ষের দরজা খোলেন এবং বলেন : ‘ফ্রেড, বাবা এখন জেগে আছেন’। এরপর দরজা বন্ধ করে দেন। এভাবে পাওয়েল জেনে গেলেন কোথায় এখন সেওয়ার্ড অবস্থান করছেন। প্রথমে পাওয়েল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। হঠাৎ পেছন ফিরে রিভলবার তুলে ফ্রেডারিকের কপালে নিশানা করেন। এরপর ট্রিগার টানেন, কিন্তু বন্দুকটি মিসফায়ার করে। আবার ট্রিগার না টেনে ভীত হয়ে রিভলবার দিয়ে ফ্রেডারিকের কপালে আঘাত করেন। ফ্রেডারিক আঘাতের পর অচেতন হয়ে মেঝেতে পড়ে যান। কিন্তু পাওয়েলের রিভলবার এতটাই নষ্ট হয়ে গেল যে, মেরামতের উপায় নেই। ফ্যানি বাইরে এই গণ্ডগোলের শব্দ শুনে দরজা দিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকান। দেখলেন, তার ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় সংজ্ঞাহীন হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন। আর পাওয়েল দৌড়ে তার দিকেই ছুটে আসছেন। পাওয়েল ধাক্কা মেরে ফ্যানিকে এক দিকে সরিয়ে সেওয়ার্ডের বিছানার দিকে এগিয়ে যান। এরপর সেওয়ার্ডের ঘাড়ে ও মুখমণ্ডলে বারবার ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। প্রথম আঘাত ব্যর্থ হয়। তৃতীয় আঘাতটা গালে লাগে। অল্পের জন্য গলার নিম্নাংশে ছুরি ঢুকতে পারেনি।


সার্জেন্ট রবিনসন ও সেওয়ার্ডপুত্র অগাস্টাস চেষ্টা করেছিলেন পাওয়েলকে তাড়াতে। অগাস্টাস তার কক্ষে ঘুমে ছিলেন। কেনিচের আর্তচিৎকারে তিনি জেগে ওঠেন। বাসার বাইরে ডেভিড হেরল্ডও ফেনির আর্তনাদের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। ভয়ে পাওয়েলকে ফেলে হেরল্ড দৌড়ে পালিয়ে যান। পাওয়েলের জানা ছিল না, কোন পথে শহর ছেড়ে পালাতে হবে। যা-ই হোক পাওয়েলের মুষ্টাঘাতে সেওয়ার্ড বিছানার পেছন দিকে মেঝেতে পড়ে যান, পাওয়েল সেখানে আর যেতে পারেনি। পাওয়েল হামলা চালায় রবিনসন, অগাস্টাস ও ফ্যানির ওপরও। এদের সবার ওপর ছুরিকাঘাত করে।


অগাস্টাস যখন তার পিস্তল আনতে যান, তখন পাওয়েল সিঁড়ি দিয়ে নেমে সামনের দরজার দিকে যায়। ঠিক তখন এমেরিক হ্যানসেল নামের এক মেসেঞ্জার সেওয়ার্ডের একটি টেলিগ্রাম নিয়ে এলেন। পাওয়েল তার পিঠেও ছুরি দিয়ে আঘাত করে। হ্যানসেল মেঝেতে পড়ে যান। এই আঘাতে এমেরিক হ্যানসেল চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। বাইরে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ‘আমি পাগল, আমি পাগল’ বলে প্রলাপ বকছিল। হেরল্ড যেখানে গাছে বাঁধা ঘোড়া ফেলে গিয়েছিল। সে ঘোড়া নিয়ে একা পালিয়ে যায় পাওয়েল।


ফ্যানি আর্তনাদ করছিল : ‘ওহ মাই গড! মাই ফাদার ইজ ডেড!’ রবিনসন সেওয়ার্ডকে মেঝে থেকে তুলে বিছানায় শোয়ান। সেওয়ার্ড থুথু দিলে মুখের ভেতর থেকে রক্ত বের হয়। তিনি বলেন : ‘আমি মরিনি, ডাক্তার ডাকো, পুলিশ ডাকো।’ বাড়িতে লোকজনের যাতায়াত বন্ধ করে দাও।’ সেওয়ার্ড রক্তাক্ত হলেও বড় ধরনের কোনো আঘাত লাগেনি। অন্ধকারে পাওয়েল এলোপাতাড়ি ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিল বলেই রক্ষা।

 

অ্যাটজেরোদত ব্যর্থ
কথা ছিল অ্যাটজেরোদত হত্যা করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনকে। বুথ তাকে সে দায়িত্বই দিয়েছিলেন। অ্যাটজেরোদত থাকতেন ওয়াশিংটনের কির্কউড হোটেলে। কথা ছিল অ্যাটজেরোদত ভাইস প্রেসিডেন্টের কক্ষে যাবেন রাত সোয়া ১০টায়। তখন তাকে গুলি করে মারা হবে। ১৪ এপ্রিল অ্যাটজেরোদত কির্কউডের ১২৬ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। এই রুমটি ঠিক সেই কক্ষটির ওপরে, যেটিতে জনসন থাকছিলেন। নির্বাচিত সময়ে কির্কউডে পৌঁছে নিচে যান। সাথে ছিল তার ব্যক্তিগত একটি গান ও ছুরি। অ্যাটজেরোদত বাবটেন্ডার মাইকেল হেনরির কাছে ভাইস প্রেসিডেন্টের স্বভাব-প্রকৃতি ও আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে চান। হোটেল সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে অ্যাটজেরোদত নেশা পান করেন। এরপর ওয়াশিংটনে রাস্তায় ঘোরাফেরা করেন। রাস্তায় ছুরিটি কয়েকবার খোলাখুলি করে উপরে ছুড়ে মারেন। রাত ২টায় পেনসিলভানিয়া হাউজ হোটেলের পথ ধরেন। সেখানে একটি কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ওই দিন আরো আগে বুথ কির্কউড হোটেলে এসে জনসনের উদ্দেশে একটি নোট রেখে যান। তাতে লেখা ছিল : ‘আই ডোন্ট উইশ টু ডিস্টার্ব ইউ। আর ইউ অ্যাট হোম? জে উইলফেস বুথ’। জনসনের একান্ত সচিব উইলিয়াম ব্রাউনিং এই মেসেজ কার্ডটি হাতে নেন সে রাতেই। বছরের পর বছর ধরে এই কার্ড নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলেছে। একটি তত্ত্ব ছিল বুথ শঙ্কিত ছিলেন, অ্যাটজেরোদত জনসনকে হত্যায় সফল হবেন না, কিংবা শঙ্কিত ছিলেন, অ্যাটজেরোদত ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসনকে খুন করার মতো সাহস দেখাতে পারবেন না। আরেকটি ব্যাখ্যা হচ্ছে এর মাধ্যমে বুথ জানতে চেয়েছিলেন ওই দিন ওই রাতে জনসন কির্কউড হোটেলে থাকবেন কি না।

 

ষড়যন্ত্রকারীদের ধরার লড়াই
ঘটনার আধঘণ্টার মধ্যে ফোর্ডস থিয়েটার থেকে ঘোড়ায় চড়ে বুথ নেভি ইয়ার্ড ব্রিজ দিয়ে ওয়াশিংটন ছেড়ে চলে যান রিল্যান্ড রাজ্যে। ডেভিড হেরল্ড এক ঘণ্টার ভেতর একই সেতু পার হয়ে বুথের সাথে গিয়ে মেলেন। সুররাতভিলিতে আগেই মজুদ করে রাখা অস্ত্র পুনরুদ্ধার করে এরা মেরিল্যান্ডের স্থানীয় ডাক্তার স্যামুয়েল এ মাডের কাছে যান। এ ডাক্তার নিশ্চিত করেন বুথের একটি পা ভেঙে গেছে। এ ডাক্তার একটি কাঠের ফলক দিয়ে তা পা ব্যান্ডেজ করে দেন। পরে স্যামুয়েল মাড এ খুনির জন্য একজোড়া ক্র্যাচ তৈরি করে দেন। স্যামুয়েল মাডের বাড়িতে এক দিন থাকার পর বুথ ও হেরল্ড একজন লোক ভাড়া করেন। ভাড়া করা লোকটি তাদের পথ দেখিয়ে কর্নেল স্যামুয়েল ফক্সের বাড়িতে নিয়ে যাবেন। উল্লেখ্য, মেরিল্যান্ডে বেল অ্যান্টনের কাছে রিখ পর্বতে গৃহযুদ্ধের সময়ে কর্নেল স্যামুয়েল কক্স একটি বাড়ির মালিক হন। তিনি গৃহযুদ্ধের সময়ে এ বাড়িতে কনফেডারেটদের থাকতে দিতেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহামকে হত্যার পর বুথ ও তার সাথী হেরল্ডকে সে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় সেখানে লুকিয়ে থাকার জন্য। রিখ পর্বতের কাছের জলাভূমিতে এরা লুকিয়ে থাকবেন এমনটিই কথা ছিল। বুথ ও হেরল্ড ২১ এপ্রিল এ স্থান ছেড়ে একটি ছোট্ট নৌকায় করে পটোম্যাক নদী পার হয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর বুথ যখন ধরা পড়লেন, তখন বুথকে সহায়তা করার জন্য কর্নেল স্যামুয়েল ফক্সের বিচার হয়, তাকে এ জন্য লঘু শাস্তি দেয়া হয়।


২৪ এপ্রিল বুথ ও হেরল্ড রিচার্ড এইচ গ্যারেট নামের জনৈক তামাকচাষির খামার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান। গ্যাবেটকে বুথ বলেন, তিনি একজন আহত কনফেডারেট সৈনিক। এরা দু’জন গ্যাবেটের বাড়িতে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপর এ খামার বাড়িতে এলো ষোড়শ নিউ ইয়র্ক ক্যাডলেরি থেকে ইউনিয়ন সৈনিকেরা। সৈনিকেরা গোলবাড়ি ঘেরাও করে। এই গোলাবাড়িতেই ছিলেন বুথ ও হেরল্ড। হেরল্ড আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু সৈনিকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান সত্ত্বেও বুথ সাহসের সাথে বলেন : ‘আই উইল নট বি টেকেন এলাইভ আমাকে জীবিত নেয়া যাবে না।’ তার এ ধরনের কথা শুনে সৈনিকেরা গোলাবাড়ির দিকে গুলি ছুড়তে লাগলেন। এরপর বুথ পা টেনে টেনে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। এক হাতে আন্দোলিত এক রাইফেল, অপর হাতে একটি পিস্তল। কিন্তু রাইফেল বা পিস্তল থেকে একটি গুলিও তিনি ছোড়েননি।


বোস্টন ফরবেট নামের একজন সৈনিক গোলাবাড়ির পেছন থেকে এসে বুথের ঘাড়ে গুলি করেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মেরুদণ্ড। বুথকে গোলাবাড়ির বাইরে বয়ে আনা হয়। একজন সৈনিক তার মুখে পানি ছিটাচ্ছিলেন। বুথ ওই সৈনিকটিকে বললেন : ‘টেল মাই মাদার, আই ডাই ফর মাই কান্ট্রি’। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর বুথ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াতে অক্ষম। বুথ একজন সৈনিককে তার দু’টি হাত মুখের সামনে তুলে ধরতে বলেন। হাত দু’টির দিকে তাকিয়ে বুথ বিড় বিড় করে বলেন : ‘ইউজলেস...ইউজলেস’। এই ছিল তার মুখের শেষ কথা। ফরবেটের গুলির দুই ঘণ্টা পর গ্যাবেট ফার্মের বারান্দায় ২৬ এপ্রিল মারা যান বুথ।


পাওয়েলের কাছে ওয়াশিংটন ছিল অপরিচিত। ডেভিড হেরল্ডকে না পেয়ে ওয়াশিংটনের রাস্তায় তিন দিন ঘোরাফেরার পর ১৭ এপ্রিল ফিরে যান সুররাত হাউজে। তিনি দেখতে পান গোয়েন্দা সেখানে উপস্থিত। পাওয়েল বলে ম্যারি সুরবাত তাকে ভাড়া করেছেন পরিখা খননের জন্য। কিন্তু ম্যারি সুররাত তাকে চেনেন না বলে জানান। গোয়েন্দারা এরা দু’জনকেই গ্রেফতার করে। জর্জ অ্যাটজেরোদত ম্যারিল্যান্ডের জার্মানটাউনের এক খামার বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। জার্মানটাউন ওয়াশিংটন থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে। সেখানে তিনি ধরা পড়েন ২০ এপ্রিল। শুধু জন সুররাত ছাড়া বাকি ষড়যন্ত্রকারী ধরা পড়েন মাস শেষ হওয়ার আগেই। জন সুররাত পালিয়ে যান কানাডার কিউবেকে। সেখানে রোমান ক্যাথলিক যাজকেরা তাকে লুকিয়ে রাখেন। ১৮৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডের লিভারপুল অভিমুখী এক জাহাজে চড়ে বসেন। সেখানে নগরীর হলি ক্রস ক্যাথলিক চার্চে থাকেন। সেখানে থেকে তিনি অলক্ষিতে গোটা ইউরোপ ঘুরে বেড়ান। এরপর প্যাপাল স্টেটসের পদাতিক বাহিনীতে যোগ দেন। ১৮৬৬ সালের বসন্তে তার এক স্কুলবন্ধু হেনরি সেন্ট ম্যারি তাকে দেখতে পান প্যাপল স্টেটসে গার্ড বাহিনীতে। সে বিষয়টি জানিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে। প্যাপল কর্তৃপক্ষ জন সুররাতকে আটক করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি পালাতে সক্ষম হন। পরে ১৮৬৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অ্যাজেন্টরা তাকে মিসরে গ্রেফতার করে।


১৮৬৭ সালের গ্রীষ্মে ওয়াশিংটনে জন সুররাতের বিচার হয়। অভিযোগ লিঙ্কনকে খুন করার। বিচারে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মুক্তভাবে জীবনযাপন করেন।

 

ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার
হত্যাকাণ্ডের পর প্রচুরসংখ্যক সন্দেহভাজন ষড়যন্ত্রকারীদের হত্যা করা হয়। তাদের কারাগারে আটক রাখা হয়। বুথ ও হেরল্ডের সাথে যাদের সামান্যতম যোগসূত্র ছিল তাদেরও জেলে পাঠানো হয়। এসব আটক লোকদের মধ্যে মিসেস সুররায়ত’স হাউজের বর্ডার লুই জে ওয়েকম্যানও আটক হন।


আরো আটক হন : বুথের ভাই জুনিয়াস (তিনি ছিলেন অভিনেতা ও মঞ্চ ব্যবস্থাপক); থিয়েটার মালিক জন টি ফোর্ড, তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন ৪০ দিন; ওয়াশিংটনের আস্তাবল মালিক জেমস পাম্পেরি, তার কাছ থেকে বুথ ঘোড়া ভাড়া করেছিলেন; জন এম লাঞ্চ, তার কাছ থেকে মিসেস সুররাত পানশালা ভাড়া নিয়েছিলেন এবং ১৪ এপ্রিল রাতে বুথ ও হেরল্ডকে ছোট্ট বন্দুক, দড়ি ও হুইস্কি সরবরাহ করেছিলেন; স্যামুয়েল ফক্স; পটোম্যাক নদী পার হতে বুথ ও হেরল্ডকে সহায়তাকারী থমাস জে জোনস। তারা ছাড়াও আরো অনেককে গ্রেফতার, আটক করা হয়েছিল। আটকের পর অনেকে ছাড়াও পান। শেষ পর্যন্ত আটজনকে সন্দেহজনক ষড়যন্ত্রকারী বিবেচনা করা হয়। এদের মধ্যে সাতজন পুরুষ ও একজন নারী। এই আটজন হলেন : স্যামুয়েল আরনল্ড, জর্জ অ্যাটজেরোদত, ডেভিড হেরল্ড, স্যামুয়েল মাড, মাইকেল ও’লকনান, লুই পাওয়েল, এডমন্ড স্প্যাংলার এবং ম্যারি সুররাত।


তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের ১৮৬৫ সালের ১ মে’র দেয়া আদেশ বলে গঠিত এক সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার হয়। নয় সদস্যদের কমিশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মেজর জেনারেল ডেভিড হান্টার। বাকি আটজন ভোটিং মেম্বার ছিলেন : অগাস্ট কাউট্জ, অ্যালবিয়ন পি হাওয়ে, জেমস এ একিন, ডেভিড ক্লেনডেনিন, লিও ওয়ালেস, রবার্ট ফস্টার, থমাস এম হ্যারিস এবং চার্লস এইচ থম্পসন। প্রসিকিউশন টিমে অর্থাৎ সরকারপক্ষে ছিলেন জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল জোসেফ হোল্ট, জন এ বিংহাম এবং এইচ এল ডানেট। বিচারের বিবরণ রেকর্ড করেন বেন পিটম্যান ও তার কয়েকজন সহকারী। এই বিবরণ প্রকাশ করা হয় ১৮৬৫ সালে। সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তখন অনেকের সমালোচনা আসে। তাদের বক্তব্য ছিল বিচার হওয়া উচিত বেসামরিক আদালতে, অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস স্পিড সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়াকে যুক্তিযুক্ত বলে অভিমত দেন। এই ট্রাইব্যুনালের জুরিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় ঘোষণা দিতে পারতেন। মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল দুই-তৃতীয়াংশ জুরির সম্মতি। প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কারো কাছে আসামিদের আপিল করারও সুযোগ ছিল না। এসব বিষয় নিয়েও তখন সমালোচনা ওঠে।
৩৬৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে ৬ সপ্তাহে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয় ৩০ জুন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া লুই ওয়েকম্যান ছিলেন মুখ্য সাক্ষী। সব আসামিই দোষী প্রমাণিত হন। ম্যারি সুররাত, লুই পাওয়েল, ডেভিড হেরল্ড আর অ্যাটজেবোদতকে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়। বাকিদের দেয়া হয় আজীবন কারাদণ্ড। স্যামুয়েল মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যান একটি মাত্র ভোটে। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে ৫-৪ ভোট পড়ে। এডমন্ড স্প্যাঞ্জারকে দেয়া হয় ৬ বছরের জেল। এ দিকে ম্যারি সুররাতকে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর পাঁচজন জুরি তার দণ্ড মওকুফের সুপারিশপত্র স্বাক্ষর করেন। কিন্তু জনসন তা প্রত্যাখ্যান করেন। জনসন পরে দাবি করেন, তিনি কখনোই এই সুপারিশপত্র পাননি।


সুররাত, পাওয়েল, হেরল্ড ও অ্যাটজেবোদতকে ওল্ড আর্সেনাল পেনিটেনশিয়ারিতে ১৯৬৫ সালের ৭ জুলাই ফাঁসি দেয়া হয়। মাইকেল ও’লকনান ১৮৬৭ সালে পীত জ্বরে কারাগারে মারা যান। মাড, আরনল্ড ও স্পেঞ্জারকে ১৮৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্ট জনসন সে ক্ষমা ঘোষণা দেন। স্পেঞ্জার মারা যান ১৮৭৫ সালে। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাবি করে গেছেন আব্রাহাম লিঙ্কন হত্যার সাথে তার বিন্দুমাত্র যোগসূত্র নেই। মাডের অপরাধের বিষয়টি রয়ে গেছে রহস্যময়। মাডের নাতি রিচার্ড মাডও তাকে নিরপরাধ দাবি করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের শত বছর পর প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও রোল্যান্ড রিগ্যানও রিচার্ড মাডের কাছে চিঠি দিয়েছেন এই বলে যে, তার দাদা কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না।