বিখ্যাত রুশ লেখক টলস্টয় কী ইসলাম গ্রহন করেছিলেন

Nov 30, 2017 03:08 pm
 টলস্টয়

 

গোলাপ মুনীর

১৯১০ সালের ২৮ অক্টোবর, নতুন রীতির ৯ নভেম্বর, মধ্যরাতে টলস্টয় স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রিয়েভনাকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দুশান পেট্রোভিচ ম্যাকোভিটস্কিকে সাথে নিয়ে যান তিনি। এর দশ দিন পর ৭ নভেম্বর নতুন রীতির ২০ নভেম্বর ভোর ৬টা ৫ মিনিটে টলস্টয় মারা যান। তার জন্ম রাশিয়ার তুলা প্রদেশের ইয়াসনায়া পোলিয়ানায়। জন্মদিন ১৯২৮ সালের ২৮ আগস্ট, নতুন রীতির ৯ সেপ্টেম্বর।


কাবা কাউন্ট নিকোলাই ইলিচ টলস্টয়। মা কাউন্টেস মারিয়া ওলকোসকি। টলস্টয় তিন বছর বয়সে মাকে ও নয় বছর বয়সে বাবাকে হারান। অতি সম্প্রতি পাভেল বেসিনস্কি টলস্টয়ের ওপর একটি নতুন ও প্রভাব সৃষ্টিকর বই লিখেছেন। বইটির নাম : Tolstoy : Escape from Paradise। বইটি ডিসেম্বরের (২০১০) মাঝামাঝি রাশিয়ায় ‘২০১০ বিগ বুক’ পুরস্কার লাভ করেছে। বইটিতে বিশদ বর্ণনা আছে টলস্টয়ের জীবনের শেষ ক’টি দিনের। এতে উদঘাটন করা হয়েছে তার স্ত্রীর প্রতি সন্দেহপ্রবণতার বিষয়টিও। শিগগিরই বইটির ইংরেজিতে ভাষান্তরিত সংস্করণ বাজারে পাওয়া যাবে। তবে রাশিয়ার Rossiyskaya Gazeta দায়িত্ব নিয়ে এর অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করেছে।

ভ্লাদিমির চেটকভ নামে একজন দীর্ঘ দিন কাজ করেন টলস্টয়ের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে। তিনি টলস্টয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন বটে। তিনি ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি মস্কো থেকে প্রকাশ করেন লাস্ট ডেইজ অব লিও টলস্টয় শিরোনামের একটি বই। সেখানে টলস্টয়ের শেষ জীবনের একটা চিত্র পাওয়া যায়। তা ছাড়া ইন্টারনেটে প্রকাশিত নানাধর্মী লেখালেখিতে টলস্টয়ের মৃত্যু ও শেষ দিনগুলোর বর্ণনা পাওয়া যায়। এসবের ওপর ভিত্তি করে টলস্টয়ের মৃত্যুর পূর্ববর্তী দশ দিনের ওপর এ লেখায় আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো।

শত বছর পেরিয়ে কয়েক মাস কয়েক দিন আগে ১৯১০ সালের ২৮ অক্টোবরের মাঝ রাত। টলস্টয় আস্তে করে স্ত্রীর কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিলেন। আটচল্লিশ বছর বয়সী স্ত্রী সোফিয়া তখন নিজ কক্ষে ঘুমে। স্ত্রীকে ঘুমে রেখে ব্যক্তিগত চিকিৎসক পেট্রোভিচ ম্যাকোভিটস্কিকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান টলস্টয়। আগেই বলা হয়েছে, এর মাত্র দশ দিন পর তার মৃত্যু হয়। যেনো এক টাইটানিকের ডুবে যাওয়া। তার মৃত্যু ছিল গোটা পৃথিবীতে একটা ঝাঁকুনি। আটাশি বছর বয়সে তার মৃত্যুর আগের অনেক আগেই লিও টলস্টয় অমর সাহিত্যিকে পরিণতি লাভ করেন। তার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রবল। ফলে তিনি অভিহিত হতে থাকেন রাশিয়ার ‘দ্বিতীয় জার’ অভিধায়। তার প্রভাবে উত্থান ঘটেছিল বিশ্বব্যাপী। তার জীবনের শেষ দশ দিনেও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রুশ রাজনীতি, ধর্ম ও প্রাত্যহিক জীবন সম্পর্কে। এবং দাবি করেন এ সম্পর্কিত কনভেনশন আহ্বানের।

মানুষের সাথে ধর্ম, বিজ্ঞান ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে নিজের মতাদর্শ উন্মোচন করে গেছেন টলস্টয়। চৈতন্যের যে স্তরে আমাদের যাবতীয় ভোগান্তি, তা থেকে উত্তরণের পথ তিনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন, যে পথে নিহিত রয়েছে সর্বপ্রাণীর মঙ্গল। নিজের সততা সূত্রে টলস্টয় তার প্রতিদিনের জীবনে সে মঙ্গলটাই জারি রেখেছেন। সে সূত্রেই তিনি অপরের উদ্দেশ্যে প্রচার করেছেন : ন্যূনতম জাগতিক চাহিদা, নিজের সেবা এবং জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য সে ভালোবাসারই সেবা করে চলা। এক কথায়, ভালোবাসা বেঁচে থাকে আজকের এই মুহূর্তের মধ্যে, ভবিষ্যতের মাঝে নয়। প্রতি মুহূর্তের কাজের মধ্যেই এর চিরকালীন বসবাস। টলস্টয়ের স্থির বিশ্বাস : প্রেমই ভালোবাসাকে নিশ্চিত করে, আর এ প্রেমের মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায় মানবজীবন।


ধর্ম সম্পর্কে টলস্টয় তার কনফেশন বইটিতে লিখে গেছেন। এই বইটিতে ষোলোটি অধ্যায় রয়েছে। বইটির প্রথম অধ্যায়ের শুরুতেই লিখেছেন : ‘আমাকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দেয়া হলো। আমি বেড়ে উঠেছি অর্থোডক্স খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মাঝে। আমার শৈশব ও যৌবনজুড়ে আমাকে তাই শেখানো হয়েছে। কিন্তু যখন আঠারো বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড কোর্স ছেড়েছুড়ে আসি, তখন এসব শেখানো কিছুতেই আর বিশ্বাস অবশিষ্ট নেই। যত দূর মনে পড়ে, কখনোই আমি গুরুত্বের সাথে এসব বিশ্বাস করতাম না। বরং বলা যায়, শেখানো এসবের ওপর নির্ভর ছিলাম মাত্র, নির্ভর করতাম সেগুলোর ওপর যা আমার চার পাশের মানুষ সত্য বলে দাবি করেছিল। এবং এই নির্ভরতা ছিল খুবই অস্থিতিশীল।


কেউ কেউ টলস্টয়ের জীবনকে দু’টি পর্যায়ে ভাগ করতে চেয়েছেন। প্রথম পর্যায়ে অযথার্থ ও দেহধর্মী জীবনচেতনা সম্পর্কে তিনি হয়ে পড়েন নিরাশ ও বিরক্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে তিনি একান্তভাবে রহস্যজনক ও অপ্রকাশ্য মানসিক অভিজ্ঞতাকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত যুক্তিবাদী মতবাদে রূপ দিতে প্রয়াসী হন। তার এই মানসিক বিবর্তন ও চিন্তাধারার প্রতিফলন দেখতে পাই তার এ কনফেশন, এ মেমোয়ার্স অব এ ম্যাডম্যান, দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ এবং মাস্টার অ্যান্ড ম্যান শীর্ষক রচনায়। প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি একটি ধর্মমতের সূচনা করেন, কিন্তু এই ধর্মমত প্রচার ও প্রসারের কোনো চেষ্টাও তিনি করেছেন এমনটি জানা যায়নি, তবে তার এ ধর্মমত ‘টলস্টয়ইজম’ নামে পরিচিতি পায়। কেউ কেউ তার এই ধর্মমতকে ‘নৈতিক খ্রিষ্টধর্ম’ বলে আখ্যায়িত করেন। হোয়াট আই বিলিভ-এর এ শর্ট এক্সপোজিশন অব দ্য গসপেল-এ টলস্টয় তার এ ধর্মমতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার এ ধর্মমতে অধিবিদ্যার চেয়ে মানবকল্যাণ চিন্তাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।


তার মৃত্যুর চল্লিশ বছর আগে থেকে ধর্মচিন্তা তাকে বেশ পেয়ে বসে। প্রচলিত খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে জানতে সচেষ্ট হন ইসলাম ধর্মমতকে। ১৯০৯ সালের ১৫ মার্চে লেখা এক চিঠিতে টলস্টয় লিখেন : ‘... অতএব দয়া করে আমাকে মোহামেডান (মোহাম্মদের অনুসারী বা মুসলিম) হিসেবে বিবেচনা করো, তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি শেষ জীবনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন কি না, তার নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তার কোরআন-হাদিস নিয়ে পড়াশোনা, কাউকে কাউকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আহ্বান, মৃত্যুর সময়ে তার কাছে হাদিস সঙ্কলন কিংবা তার কোটের পকেটে কোরআন শরিফ পাওয়া ইত্যাদি ঘটনা বিবেচনায় দাবি করা হয়, জীবনের শেষ দিকে টলস্টয় ইসলাম ধর্মকেই তার ধর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, আমরা ফিরে যাবো টলস্টয়ের মৃত্যুর আগের কয়দিনের কথায়। টলস্টয় যে দিন স্ত্রীকে না বলে রাতের বেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে যান, সেই সময়ের বর্ণনা রয়েছে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ম্যাকোভিটস্কির জার্নালে। তিনি তার জার্নালে এর বর্ণনা তুলে ধরেছেন এভাবে : ‘তখন ভোর ৩টা (অক্টোবর ২৮, ১৯১০)। এল এন টলস্টয় তার ড্রেসিং গাউন গায়ে খালি পায়ে স্লিপার পরে আমাকে এসে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। তার মুখে দুর্ভোগের পরিপূর্ণ ছাপ। আছে ক্ষোভ আর সেই সাথে দৃঢ়তার ছাপও। তিনি বললেন, ‘আমি বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি অবশ্যই আমার সাথে যাবে। কিন্তু সোফিয়া আন্দ্রিয়েভনাকে জাগাবে না। আমরা সাথে করে বেশি কিছু নেবো না, শুধু অপরিহার্য জিনিসপত্রগুলো নেবো।’


বেচারা ম্যাকোভিটস্কি বুঝতে পারেননি, টলস্টয় চিরদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডাক্তার ভাবলেন, তারা হয়তো কোচেটি যাচ্ছেন তার নাতি সুখোটিনের এস্টেটে। এমনটি ভেবে ডাক্তার তার সব টাকা পর্যন্ত সাথে নেননি। তিনি এ-ও জানতেন না, সে রাতে টলস্টয়ের মানিব্যাগে আছে মাত্র কয়েকটি কয়েন, আর ব্যাংকে আছে মাত্র ৫০ রুবল।...


ম্যাকোভিটস্কি লিখেছেন : ‘আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেনের বগিতে করে শেকিনো থেকে গর্বাচেভো গেলাম। কিন্তু গর্বাচেভো থেকে কোজিয়লস্ক যেতে টলস্টয় বেছে নেন তৃতীয় শ্রেণী, সাধারণ মানুষের সাথে। সেখানে তিনি যখন একটি কাঠের বেঞ্চিতে বসেন, তখন বলে ওঠেন 'How nice and free!'


ম্যাকোভিটস্কি এবার বিপদের আশঙ্কাটা আঁচ করতে পারলেন। সুখিনিকি কোজিয়লস্কি ট্রেনটি মালবাহী ও যাত্রীবাহী দুই-ই। এর ছিল ভয়ানকভাবে ধোঁয়াময় থার্ড কাস বগি, যাত্রীতে ঠাসা। শিগগিরই টলস্টয় হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিলেন, যেনো দম ফুরিয়ে তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। তিনি পশুর লোমের তৈরি কোট পরেন। মাথায় দেন পশুর লোমের সাহেবি টুপি। পায়ে দেন তার হাই উইন্টার বুট জুতা। এবং নেমে পড়েন প্লাটফর্মের দূর প্রান্তে। কিন্তু ধূমপায়ীরা তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে। তিনি তখন চলে যান সামনের প্লাটফর্মে। জোরে জোরে বাতাস বইছিল। প্লাটফর্মটি প্রায় ফাঁকা শুধু এক মহিলা, তার বাচ্চা ও একজন কৃষক ছাড়া তেমন কেউ নেই। এই হিমশীতল প্ল্যাটফর্মে টলস্টয়কে কাটাতে হয় ৪৫ মিনিট। দুর্ভাগ্য, এ সময়টা তার ঠাণ্ডা লাগার মতো যথেষ্ট সময়।


ট্রেনের গতি ছিল ধীর। এক শ’ মাইলের সামান্য ওপরের পথ পাড়ি দিলো সাড়ে ছয় ঘণ্টায়। ‘রুশ রেলপথের ওপর এই ধীরগতির ভ্রমণ এল এন টলস্টয়কে মারতে সহায়তা করেছিল’ বলে ম্যাকোভিটস্কি মন্তব্য করেছেন তার লেখায়।


২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় এরা পৌঁছান শ্যামারদিনো কনভেন্টে। সেখানে টলস্টয়ের বোন মারিয়া নিকোলেয়েভনা দুই দশক আগে সন্ন্যাসিনীর ব্রত গ্রহণ করেন। টলস্টয় সোজা তার কক্ষে চলে যান। সেখানে বোনকে পান। সাথে তার কন্যা এলিজাবেথা ভ্যালোবিয়েনভনা অরোলেনিস্কায়। টলস্টয় বোনের কাঁধে মাথা রেখে কান্না করলেন স্মরণ করেন ইয়াসনায়া পলিয়ানায় তার সাম্প্রতিক জীবন। কিভাবে তার স্ত্রী তার প্রতিটি মুহূর্তের ওপর নজর রেখেছে, কী করে টলস্টয় তার গোপন ডায়েরি লুকিয়ে রেখেছেন তার বুট জুতায় এবং কী করে পরদিন সকালে তা হারিয়ে গেল। তিনি তার বোন ও ভাগনীকে জানালেন তার গোপন ইচ্ছের কথা। তিনি বললেন, কী করে সোফিয়া আন্দ্রিয়েভনা তার রাতের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটাত এবং তার কাগজপত্রের ওপর অনুসন্ধান চালাত। যদি সোফিয়া দেখত টলস্টয় তখনো জেগে আছেন, তখন সোফিয়া তার কাছে আসত এমনভাবে যেনো তিনি কেমন আছেন, কেমন অনুভব করছেন তা দেখার জন্যই আসা।


এলিজাবেথা তার মামাকে দেখলেন করুণ বৃদ্ধাবস্থায়। পরদিন টলস্টয়ের কন্যা শাশা শ্যামারদিনো পৌঁছে বাবার দুরবস্থাই দেখলেন। তিনি তার জ্ঞাতি বোন লিজা অরোলনেস্কয়াকে বলেন, পাপা বাড়ি ছাড়ার জন্য এরই মধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।


অনেক একগুঁয়ে জেদি মানুষের মতো মানসিক দিক থেকে টলস্টয় ছিলেন চরম উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন, চটপটে প্রাণবন্ত ও আবেগপ্রবণ। পৃথিবী সম্পর্কিত তার ধারণা পাল্টানো কার্যত ছিল অসম্ভব। সে জন্য প্রয়োজন বছরের পর বছর ঐকান্তিক কর্মপ্রয়াস। কিন্তু তার মনের অবস্থা পরিবর্তন করা যেত সহজেই। সে যা-ই হোক, ৩১ অক্টোবর তিনি শ্যামারদিনোর থেকে পালিয়ে যান। অ্যাস্তাপোভা রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে ডা. ম্যাকোভিটস্কি গেলেন স্টেশনমাস্টারের কাছে। তিনি স্টেশনমাস্টারকে জানান, ‘লেভ টলস্টয় ট্রেনের মধ্যে আছেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার বিশ্রাম প্রয়োজন। তাকে বিছানায় রাখা দরকার।’ স্টেশনমাস্টার ইভান ইভানোভিচ ওজোলিন জন্মগতভাবে একজন লাটভিয়ান ও ধর্মবিশ্বাসে লুথারান ইভানজেলিস্ট। তিনি প্রবল শ্রদ্ধা রাখতেন টলস্টয়ের প্রতি। টলস্টয়ের সব কাজে `do good' আহ্বানের প্রতিও ছিল তার তেমনি শ্রদ্ধা। তিনি টলস্টয়কে ঘরে নিতে সম্মত হলেন। ওজোলিনের ঘরটি ছোট্ট দেখে টলস্টয় সোজা বিছানায় গিয়ে শুতে আপত্তি জানান। কিছুটা সময় বসে থাকেন আর্মচেয়ারে। পরদিন ১ নভেম্বর টলস্টয় কিছুটা ভালো অনুভব করেন। তিনি ওই দিন আলেক্সান্দ্রার মাধ্যমে তার কন্যা শাশার উদ্দেশে একটি চিঠিতে লিখেন : ‘ঈশ্বর অনন্ত অসীম। সবার মাঝে মানুষ নিজেকে মনে করে ঈশ্বরের সসীম অংশ। সত্য শুধু ঈশ্বরের মাঝেই বিরাজমান। মানুষ নিজেকে সময়, স্থান ও বস্তুর মধ্যে প্রকাশ করে।


ভ্লাদিমির গ্রেগরিথেভিচ চের্টকভ ছিলেন একজন প্রকাশক ও টলস্টয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি তার লাস্ট ডেজ অব টলস্টয় রচনায় লিখেন : টলস্টয় আমাকে দেখতে চাচ্ছেন এ কথা জানার পর আমি প্রথম ট্রেনেই তুলা ছাড়ি। ১৯১০ সালের ২ নভেম্বর সকাল ৯টা আস্তপোভা পৌঁছি। স্থানীয় স্টেশনমাস্টার ইভান ইভানোভিচ ওজোলিন স্টেশনে আমার সাথে দেখা করেন। তিনি চমৎকার আর সদাশয় এক মানুষ। কায়মনোবাক্যে লিও টলস্টয়ের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি। প্রথমে তিনি টলস্টয়ের জন্য দু’টি ঘর ছেড়ে দিলেও পরে গোটা বাড়িই তার জন্য খালি করে দেন। নিজের পরিবারের সদস্যদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেন ওজোলিন।


আমি তার সাথে টলস্টয়ের শয্যাপাশে যাই। তাকে খুবই দুর্বল লাগছিল। তবে পুরো হুঁশে ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন। এগিয়ে দিলেন তার দু’টি হাত, আমি খুব সতর্কতার সাথে তাকে চুম্বন করলাম। অশ্রুসজল চোখে তিনি আমার পরিবারের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। কথা বলার সময় তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল, আর কিছুটা গোঙাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আবার কথা বলতে শুরু করলেন। যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন, তা ওই মুহূর্তে তাকে পীড়া দিচ্ছিল। তবে অস্বাভাবিক ধরনের প্রাণবন্ততা নিয়ে বলছিলেন, যেকোনোভাবে তার স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রিয়েভনাকে এখানে আসা থেকে নিবৃত্ত করতে হবে। উত্তেজিত হয়ে বারবার জিজ্ঞেস করলেন তার পরিকল্পনাটা আসলে কী। তখন তাকে জানালাম, তিনি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করবেন না, তিনি তখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ওই দিন সে আশঙ্কার ব্যাপারে আর কিছুই বললেন না। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তানিয়াকে (তাতিয়ানা লিভোন্না টলস্টয়, তার বড় মেয়ে) দেখেছি কি না। তিনি আস্তাপোভায় তার আসার সংবাদ ম্যাকোভিটস্কির কাছ থেকে জেনেছিলেন। বললেন, আমি ওর কাছ থেকে সোফিয়ার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চাই। তানিয়া কেমন করে ইয়াসনায়া ছেড়ে এলো। মনে হয় সে সোফিয়াকে বলেছে, সে কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে, আর সে এখানে এসে হাজির হয়েছে।


বিকেলে টলস্টয় তাতিয়ানাকে আনতে পাঠালেন। তাদের মধ্যকার সমস্যাটা ছিল খুবই মর্মন্তুদ। এর কারণ ছিল, বড় মেয়ের দেখা পাওয়া আর সোফিয়ার স্বাস্থ্যের জন্য তার অন্তরছোঁয়া উদ্বেগ। টলস্টয় ভেবেছিলেন, সোফিয়া ইয়াসনায়াতেই রয়ে গেছেন অথচ তিনি তার কাছ থেকে সামান্য দূরে আস্তাপোভা স্টেশনেই রেলের একটা কামরায় আসীন ছিলেন। মা কোথায় আছেন, তা প্রকাশ করে তাতিয়ানা বাবাকে উদ্বিগ্ন করতে চাননি। অতএব টলস্টয়ের প্রশ্নগুলো যখন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে তখন তাতিয়ানা বলেন, এ প্রসঙ্গে পরে কথা বলাই ভালো। পরে তাতিয়ানা বলেন, যদি সব দিক থেকে পাকাপোক্ত থাকতেন, তবে তার সাথে সব কিছু নিয়ে আলাপ করা যেত। তাতিয়ানা কেন সব কিছু খুলে বলতে চাইছেন না, তা বুঝতে অপারগ টলস্টয়। তুমি বুঝতে পারছ না, আমি কতটা উদ্বেগের মধ্যে আছি। আমার নিজের জন্য, আমার আত্মার শান্তির জন্য সব কিছু জানা দরকার।’ তখন তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। এসব দেখে তাতিয়ানা বুঝল, এখন আর বেশিক্ষণ বসে থাকা ঠিক হবে না।


মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে ৬ নভেম্বর বিছানার ওপর বসেন। তাতিয়ানাকে এক টুকরা কাগজ আনতে বললেন এবং তাকে লিখতে বললেন : ‘আমি তোমাদের সবাইকে একটা পরামর্শ দিতে চাই : লিও টলস্টয় এ দুনিয়াতে একমাত্র মানুষ নয়। তার পরও আমি তোমাদের সবাইকে লিও টলস্টয়ের কথাই বলতে শুনেছি।’


যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি কী চেয়েছিলেন? টলস্টয়ের জবাব : আমি চাই আমাকে কেউ জ্বালাতন না করুক?’
তখন শাশা বলল, ‘তিনি ঠিক একটা শিশুর মতো।’


মস্কো থেকে আসা এক ডাক্তার বললেন, তার মতো রোগী আর দ্বিতীয়টি কখনোই দেখিনি। মৃত্যুর আগে টলস্টয়ের কাছে সবচেয়ে জ্বালাতনকর বিষয় ছিল তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তা কেউই বোঝে না। তিনি মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে যে বুদ্ধিভিত্তিক কথাটি বলে যান তা বলে যান তার বড় ছেলের কাছে : ''Seryozha.... the truth.... I love many things, I love all people...'


এক সময় তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। ৭ নভেম্বর রাত তিনটায় সংজ্ঞা ফিরে পান। চোখ খোলেন। কেউ একটা মোমবাতি ধরলেন তার চোখের সামনে। তিনি অন্য দিকে চোখ ফেরান, ম্যাকোভিটস্কি পানি খেতে দেন। টলস্টয় এক ঢোক পানি খেলেন। এরপর তার একবার শ্বাস নেয়ার শব্দ শোনা গেল, সকাল ৬টা ৫ মিনিটে টলস্টয় মৃত্যুবরণ করেন।