কাতারের স্বাধীনতা ও আল জাজিরা নিয়ে যা বললেন আমীর

Nov 25, 2017 03:51 pm
শেখ তামিম ও চার্লি রোজ


কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল সানি। গত ৫ জুন থেকে দেশটির ওপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে অবরোধের পরও দৃঢ়তার সাথে শাসনকাজ চালিয়ে আসছেন ৩৭ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রনেতা। সম্প্রতি রাজধানী দোহায় আমিরের কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টিভি চ্যানেল সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিট’ অনুষ্ঠানকে দেয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে শেখ তামিম কথা বলেছেন আরোপিত অবরোধ, তার দেশের অবস্থান, আঞ্চলিক পরিস্থিতি, পশ্চিমা সরকারগুলোর ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে।
সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন আহমেদ বায়েজীদ

চার্লি রোজ : সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধের পর আপনার দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলুন।
শেখ তামিম : আমাদের খাদ্য, পণ্যসামগ্রী, ওষুধের ৯০ শতাংশের বেশি আসে স্থলপথে। সেই পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওই সব দেশ থেকে আমাদের ছাত্রদের বের করে দেয়া হয়েছে। এমনকি তাদের হাসপাতালগুলো থেকেও বের করে দেয়া হয়েছে আমাদের দেশের রোগীদের।
চার্লি রোজ : উপসাগরীয় ওই সব দেশে যে কাতারি নাগরিকেরা ছিল তাদের অবস্থা?
শেখ তামিম : তাদেরও দেশে ফিরে আসতে বলা হয়েছে।
চার্লি রোজ : এ রকম একটি অবরোধ আসতে পারে তা কখনো ভেবেছেন?
শেখ তামিম : এটি একটি আঘাত হয়ে এসেছে আমার কাছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও আমরা একসাথে মিটিং করেছি ডোনাল্ড ট্রাম্পও ছিলেন সেই মিটিংয়ে। আমরা সেখানে সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করেছি। সে সময় ওই সব দেশের কোনো কর্মকর্তাই আমার দেশের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। কেউ আমাকে কিছু বলেনওনি।


চার্লি রোজ : কেউ বলেননি যে আপনার বিরুদ্ধে আগ্রাসী হওয়ার মতো কারণ রয়েছে তাদের কাছে?
শেখ তামিম : কিছুই না। বরং পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আমরা সেখানে একে অন্যের প্রশংসা করেছি। হাসি-তামাশা করেছি। সন্ত্রাসবাদ ও বিশ্বে এর ঝুঁকি কিভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেছি।
চার্লি রোজ : এটি এমন একটি দ্বন্দ্ব যা এই অঞ্চলকে যেকোনো রাজনৈতিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কেন তারা এটি করছে? তাদের এই অবরোধের কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
শেখ তামিম : আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের মতপ্রকাশের ধরন এবং এই অঞ্চল নিয়ে আমাদের ভিশন তাদের পছন্দ নয়। আমরা এই অঞ্চলের লোকদের স্বাধীনতা চাই, তারা তাতে খুশি নয়। তারা এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে তাদের জন্য হুমকি বলে মনে করে।


চার্লি রোজ : তাদের অভিযোগ কাতার সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে। আপনি যে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন করছেন, তারা ভাবছে এটি তাদের বিরোধিতা। তাদের অভিযোগ ইরানের সাথে আপনাদের সম্পর্ক বন্ধুত্ব্পূর্ণ, আপনাদের মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল আলজাজিরা এই অঞ্চলে ‘সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে’, সিরিয়ার ইসলামপন্থীদের অর্থ দিচ্ছেন, দোহায় হামাস ও তালেবানের অফিস আছে। সব পক্ষের সাথেই আপনাদের সম্পর্ক রয়েছে, তারা চায় দ্রুত তা বন্ধ করতে।
শেখ তামিম : ইরান আমাদের প্রতিবেশী, তাই স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক বিষয়ে ইরানের সাথে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে, সেটি ওই দেশগুলোর চেয়ে বেশিই। কিন্তু আপনাকে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দেই উপসাগরীয় ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলো যখন আমাদের দেশে খাদ্য, ওষুধ পাঠানো বন্ধ করে দিলো আমাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল ইরান। তারা কখনোই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বলে না। আমরা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করি না।


চার্লি রোজ : তারা অনেকগুলো দাবি জানিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে আলজাজিরা বন্ধ করা, ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোকে সমর্থন না দেয়া। আপনারা কি সেসব দাবি মানবেন?
শেখ তামিম : আমাদের সার্বভৌমত্ব হলো আমাদের স্বাধীনতার সীমারেখা। এখানে কারো হস্তক্ষেপ আমরা মেনে নেবো না। আপনি কেন আমাকে আলজাজিরার মতো একটি চ্যানেল বন্ধ করতে বলবেন? ৫০, ৬০ কিংবা ৭০ বছর পরে ইতিহাসে হয়তো লেখা হবে কিভাবে চ্যানেলটি এই অঞ্চলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকেই পাল্টে দিয়েছে।
চার্লি রোজ : তাহলে কি আপনারা আলজাজিরা বন্ধ করবেন না?
শেখ তামিম : না, আমরা কখনোই আলজাজিরা বন্ধ করব না।


চার্লি রোজ : কাতার ধর্মীয় বিষয়ে অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে উদার। এখানে খ্রিষ্টানদের গির্জা রয়েছে। সৌদি আরবে নারীরা মাত্র কয়েক দিন আগে গাড়ি চালানোর অনুমতি পেয়েছে, কিন্তু কাতারে কয়েক দশক ধরেই সেই অনুমতি আছে। আবার রাজনৈতিকভাবেও সব পক্ষের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করছে কাতার। এটি তারা পছন্দ করে না। তারা এসব আচরণ বন্ধ করার দাবি করেছে।
শেখ তামিম : আসলে তারা যা বলছে সংক্ষেপে তা হচ্ছে, ‘তোমাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দাও’। আমরা তালেবানকে দোহায় অফিস খুলতে আমন্ত্রণ জানাইনি। অন্যদের আগ্রহে তারা এসেছে এখানে ...


চার্লি রোজ : সেই অন্যদের মধ্যে কি যুক্তরাষ্ট্র আছে?
শেখ তামিম : হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্রেরও আগ্রহ ছিল।
চার্লি রোজ : যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে তালেবান দোহায় অফিস খুলুক!
শেখ তামিম : তারা চেয়েছে তালেবানের সাথে সংলাপ করতে। তাই আমাদের বলেছে, আপনারা যদি তালেবানকে আশ্রয় দেন, তাহলে এখানে সংলাপ হতে পারে। তাই আমরা তাদের অফিস খোলার সুযোগ দিয়েছি। সে কারণেই তারা এখানে এসেছে।
চার্লি রোজ : আরব বিশ্বের একনায়কদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে সংঘটিত আন্দোলন ‘আরব বসন্ত’কে সমর্থন দিয়েছে কাতার। সেটিও আরব শাসকদের পছন্দ নয়।
শেখ তামিম : আরব বসন্তের সময় তাদের সাথে আমাদের যে পার্থক্য হয়েছে তা হলো আমরা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছি।


চার্লি রোজ : আর তারা সরকারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে?
শেখ তামিম : তারা সরকারগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। আমরা কেন জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছি? কারণ, জনগণের চাওয়া ছিল স্বাধীনতা ও মর্যাদা এবং আমার মনে হয় জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি।
চার্লি রোজ : নাইন ইলেভেনের পর সৌদি আরব থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে তারা কাতারে ঘাঁটি করেছে। আপনারাই তাদের সেই প্রস্তাব দিয়েছেন। কাতারের ঘাঁটি থেকেই প্রতিদিন মার্কিন বিমান ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে।
শেখ তামিম : আমরা তাদের দোহায় স্বাগত জানিয়েছি। আপনার দেশের সাথে আমাদের একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। আমরা এটিকে মজবুত করতে চাই। আমরা বন্ধু, তাই আপনাদের দোহায় স্বাগত জানিয়েছি।


চার্লি রোজ : আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন অবরোধের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) বলেছেন, ‘এটি হতে পারে না’।
শেখ তামিম : আমি শুনেছি। তিনি বলেছেন, ‘এই অবরোধ চলতে পারে না। এটি বন্ধ হওয়া উচিত’।
চার্লি রোজ : আরো বলেছেন, ‘আমাদের এক বন্ধুরাষ্ট্রের ওপর আরেক বন্ধুরাষ্ট্রের অবরোধ আমরা সহ্য করব না’।
শেখ তামিম : তিনি আমাকে স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আামদের বন্ধুরাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবে তা আমি মেনে নেবো না’।
চার্লি রোজ : তার পরও প্রতিবেশীদের আচরণ নিয়ে আপনি ভীত ছিলেন?
শেখ তামিম : আমার ভয় ছিল যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। এই ঘটনা যদি সামরিক পদক্ষেপ পর্যন্ত যায় তাহলে এই অঞ্চলে চরম বিশৃঙ্খলা হবে।
চার্লি রোজ : শোনা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আপনাকে ক্যাম্প ডেভিডে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন? আপনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন?
শেখ তামিম : হ্যাঁ গ্রহণ করেছি। কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে নিউ ইয়র্কে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে।
চার্লি রোজ : জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে?
শেখ তামিম : হ্যাঁ, প্রেসিডেন্ট এই সঙ্কটের অবসান করতে তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি আমাদেরও অগ্রসর হতে বলেছেন। আমি তাকে বলেছি, ‘আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত’। আমি প্রথম দিন থেকেই সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে আসছি।
চার্লি রোজ : অন্য দেশগুলো কী বলছে?
শেখ তামিম : ধারণা করেছিলাম দ্রুতই এই ইস্যুতে সংলাপ হবে। কিন্তু তাদের কোনো আন্তরিকতা পাইনি।


চার্লি রোজ : অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি বলেছেন, আপনার কখনোই কাতারের আমির হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। আপনি চাইতেন টেনিস খেলোয়াড় হতে। আপনার বড় ভাই, যার উত্তরাধিকারী হওয়ার কথা ছিল, তিনিই নাকি আপনাকে এই প্রস্তাব দিয়েছেন?
শেখ তামিম : হ্যাঁ, এক রাতে বড় ভাই জসিম আমাকে ডেকে বলেন, তুমিই আমির পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য। আমার চেয়ে তুমি ভালো করবে। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বড়ভাইকে বললাম, জসিম এ তুমি কী বলছো!
চার্লি রোজ : তখনই কি আপনি প্রথম ভেবেছেন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন?
শেখ তামিম : তখনই প্রথম জেনেছি আমি উত্তরাধিকারী হতে যাচ্ছি।


চার্লি রোজ : পিতার অবসরের পর ২০১৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আপনি আমির হয়েছেন। আপনার জন্য উপসাগরীয় অবরোধ একটি কঠিন পরীক্ষা। মার্কিন কূটনীতকেরা আপনার দক্ষতা ও দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন আমার অনুষ্ঠানে। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে উপসাগরীয় দেশগুলো কাতারে সরকার পরিবর্তন করতে চাইছে?
শেখ তামিম : হ্যাঁ, তারা কাতারের ক্ষমতায় পরিবর্তন চায়। ইতিহাস বলছে, তারা অতীতেও একই চেষ্টা করেছে। ১৯৯৬ সালে আমার বাবা আমির হওয়ার পর তারা তাকে সরাতে চেয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে তারা সেটি আরো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে।


চার্লি রোজ : এমন কী ঘটেছে গত কয়েক সপ্তাহে?
শেখ তামিম : তারা সংবাদ মাধ্যমে বলেছে, কাতারের সরকার প্রতিবেশীদের পছন্দসই হতে হবে। তারা বোঝাতে চাইছে, আমরা যেন স্বাধীনচেতা না হয়ে তাদের অনুসরণ করি। এগুলোই তারা বারবার বেঝাতে চেষ্টা করেছে।
চার্লি রোজ : তারা কি আপনাকে অবজ্ঞা করছে?
শেখ তামিম : আমার মনে হয় তারা কাতারের জনগণকে অবজ্ঞা করছে। আমি এই জনগণের জন্য গর্বিত।
চার্লি রোজ : গত জুনের পর থেকে কাতারের অর্থনীতি ডুবে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু উল্টো তা আরো প্রসারিত হয়েছে। দুধের ঘাটতি মেটাতে মাত্র তিন মাসেই মরুভূমিতে পূর্ণাঙ্গ খামার গড়ে উঠল। নতুন চালু হওয়া বাণিজ্য রুটগুলোতে বাড়তে থাকল পণ্য আমদানি-রফতানি। কাতারজুড়েই অবরোধের হুমকি মোকাবেলায় ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার একটি মানসিকতা গড়ে উঠেছে।
শেখ তামিম : ৫ জুনের আগের আর পরের কাতার এক নয়। আমাদের এই মানসিকতা নিয়ে আমরা গর্বিত। আগে আমরা আমাদের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করতাম। কিন্তু ৫ জুনের পর বর্তমানেও আমরা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছি।


চার্লি রোজ : কিন্তু এই সঙ্কটের শেষ কিভাবে হতে পারে?
শেখ তামিম : আমরা এর অবসান চাই। বিশ্বাস করুণ আমরা আন্তরিকভাবেই চাই এই সঙ্কট দ্রুত শেষ হোক; কিন্তু মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। আমি সব সময়ই সঙ্কট সমাধানের কথা বলে আসছি। তারা যদি আমাদের দিকে এক মিটার অগ্রসর হয়, আমি তাদের দিকে ১০ হাজার মিটার এগিয়ে যেতে প্রস্তুত আছি।