বাংলাদেশ যেভাবে বন্ধুহীন রাষ্ট্রে পরিনত হচ্ছে

Nov 25, 2017 03:44 pm
বেনুর কার্টুন


আলফাজ আনাম

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মিয়ানমারের নাগরিক ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বোঝা এখন বাংলাদেশের কাঁধে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের ওপর বড় ধরনের কোনো চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের বন্ধুদেশ হিসেবে পরিচিত সব দেশ মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আসলে স্বাধীন রাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী বন্ধু থাকে না তা সম্ভবত বাংলাদেশের মানুষ এবার খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে।

সরকার বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে বলে পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের যে বেলুন ফুলিয়েছিল, তা ফুটো হয়ে গেছে। মিয়ানমারে জাতিগত নির্মূল অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা যখন বাংলাদেশে ঢুকতে থাকে, তখন দেখা গেল বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভারত, রাশিয়া ও চীন কেউ বাংলাদেশের পাশে নেই। যেসব দেশের সাথে শীতল সম্পর্ক সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ ও তুরস্ক নিপীড়ত রোহিঙ্গাদের নিয়ে কথা বলছে। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগে সেনাকর্মকর্তাদের বিচার ও অস্ত্রনিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করেন। তবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় সমর্থন পেয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছ থেকে।


সর্বশেষ জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে গত ১৭ নভেম্বর ১৩৫-১০ ভোটে গৃহীত প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত সামরিক তৎপরতা বন্ধ এবং তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য মানবাধিকার কাউন্সিলের একটি তথ্যানুসন্ধানী দল প্রেরণ এবং মিয়ানমার প্রশ্নে একজন বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও বন্ধু কয়েকটি দেশের সমর্থন না পাওয়ায় ঢাকার মিয়ানমার নীতি বা কৌশল নিয়ে আবারো প্রশ্ন উঠেছে। ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারত ও রাশিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ের বন্ধুদেশ চীন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দেয়ায় বাংলাদেশকে হতাশ করেছে। অন্য দিকে এই ভোটাভুটিতে সার্কভুক্ত দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান বিরত ছিল। ভারতের প্রভাববলয়ে থাকা এসব দেশের এই ভূমিকা দেশটির ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে আবারো সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। অপর দিকে চীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাকিস্তান ভোট দিয়েছে বাংলাদেশের পক্ষে।


থার্ড কমিটি জাতিসঙ্ঘের সামাজিক, মানবিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক ফোরাম। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নেও কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। বিশ্বসভার বেশির ভাগ দেশের মতামত হিসেবে এই প্রস্তাবের নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং আরো ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। ২২টি দেশ অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ ৫৮টি সদস্যদেশ ওআইসি উত্থাপিত প্রস্তাব সমর্থন করেনি। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকাকে অনেকে দেখছেন বাংলাদেশের আরেকটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে।


এমন পরিস্থিতির মধ্যে চীন আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চীন রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে যে তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তার মধ্যে রাখাইনে অস্ত্রবিরতি, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন এবং রাখাইন অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্যোগ নেয়া। চীনের এই প্রস্তাবে জাতিসঙ্ঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি যেমন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তেমনি কফি আনান কমিশনের সুপারিশ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। চীনের এই প্রস্তাব মিয়ানমারের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


এর আগে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির দফতরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকা আসেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এরপর মিয়ানমার সফরে যান বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি মিয়ানমার সফর করে এসে জানান, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। এমনকি তার সাথে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের নাগরিকদের রোহিঙ্গা না বলে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের ফল ছিল শূন্য। অথচ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা আগেই সতর্ক করেন দ্বিপক্ষীয়-পর্যায়ে মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে আলোচনায় কোনো ফল হবে না। বরং মিয়ানমার বিষয়টিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমস্যা হিসেবে তুলে ধরবে।
মিয়ানমার বরাবর এই আলোচনায় জাতিসঙ্ঘকে সম্পৃক্ত করতে রাজি হয়নি। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো অসম্ভব। কারণ মিয়ানমার আগেই জানিয়েছে যাদের নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র আছে তারা শুধু ফেরত আসবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আগেই নাগরিকত্ব হরণ করা হয়েছে। তারা গণহত্যার মুখে এ দেশে চলে এসেছে, ফলে তাদের কাছে তেমন কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এ ছাড়া বৈঠকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ইস্যু যে বড় করে দেখানো হয়েছে, তা সহজে অনুমান করা যায়।


বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তার এক নম্বরে ছিল রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ করা। এই অভিযান বন্ধ হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সফরে গিয়ে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফলে নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এনে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার দিকটি আগের মতো হিমাগারে পাঠানোর কৌশল নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের ফাঁদে পা দিয়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য এখন আবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।


ঘটনার শুরুতেই লাখ লাখ মানুষকে দেশছাড়া করতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার পক্ষে প্রবল সমর্থন জানিয়ে দিয়েছে চীন, ভারত ও রাশিয়া। রোহিঙ্গারা যখন নাফ নদী পাড়ি দিয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে ঢুকছে, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে যান। সেখানে তিনি মিয়ানমারের সেনা অভিযানের পক্ষে ভারতের অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে ভারত টুঁ শব্দও করেনি। মিয়ানমারের পক্ষে চীনের অবস্থান অস্বাভাবিক ছিল না। এ দেশের মানুষ মিয়ানমারের পক্ষে চীনের অবস্থানে খুব অবাক হয়নি যতটা বিস্মিত হয়েছে ভারত ও রাশিয়ার অবস্থানে। এর মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকা সফর করে গেছেন। কিন্তু ভারতের অবস্থানের তেমন কোনো হেরফের হয়নি। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া কিংবা গণহত্যা বা জাতিগত নির্মূল অভিযান নিয়ে টুঁ শব্দটিও করা হয়নি। বরং রাখাইনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে ভারত মনে করে। শুধু তা-ই নয়, এখন ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক বলে মিয়ানমার যে বক্তব্য রাখছে, তাকে সমর্থন দিচ্ছে ভারত।


রাশিয়া শুরু থেকে মিয়ানমারের পক্ষে শুধু জোরালো সমর্থন দিচ্ছে না, রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে চীনের চেয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চীনের প্রতিনিধি উ হাইতাও যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে তিনি বলছেন, ‘এই বিরোধ বহু দিন ধরে দানা বেঁধে উঠেছে এবং রাখাইন পরিস্থিতি শান্ত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মিয়ানমার সরকারকে যে অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে দেখতে হবে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর গণপ্রস্থানের কারণ চিহ্নিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনায় সহযোগিতা করতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। রাখাইনের পরিস্থিতি ক্রমেই স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে।’ রাশিয়ার প্রতিনিধি ভাসিলি এ নেবেনজিয়া চীনের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘সমাধানের অতীত অবস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে পরিস্থিতি। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বেসামরিক লোকজনকে হত্যার অপরাধে অপরাধী এবং কট্টরপন্থীরা মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকেও বাড়িঘর ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। কোনো কিছুকে গণহত্যা বা জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই সাবধান হতে হবে।আমরা সব পক্ষের প্রতি সহিংসতা ও সহিংসতা উসকে দেয়া বন্ধের আহ্বান জানাই।’ দেখা যাচ্ছে রাশিয়া সরাসরি এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের নামে কথিত সশস্ত্র সংগঠন আরসাকে। একই সাথে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থীরা হিন্দুদের হত্যা করছে অভিযোগ করে পুরো পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছে।


রাশিয়া, চীন ও ভারত কেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এর কারণ হিসেবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এই তিন দেশের বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে মিয়ানমারে। রাখাইন প্রদেশে ভারতের ৪৮৪ মিলিয়ন ডলারের কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপ্রজেক্টের কাজ চলছে। আর চীনের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক অনেক পুরনো এবং দেশটিতে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। চীনের একটি তেলের পাইপলাইন চলে যাবে রাখাইন প্রদেশ হয়ে। এ ছাড়া রাশিয়া এখন মিয়ানমারে শীর্ষ অস্ত্র বিক্রেতা দেশের অন্যতম। রাখাইন প্রদেশটি জ্বালানি ও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ। এই প্রদেশে নিরাপত্তা সমস্যা দূর করতে মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে এমন কথা বলা হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে কি ভারত, রাশিয়া ও চীনের কোনো স্বার্থ নেই? মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে বিপুল অস্ত্র কিনে থাকে। কিন্তু এই দুই দেশ থেকে বাংলাদেশের অস্ত্র কেনার পরিমাণ কম নয়।

চীনের শীর্ষ সমরাস্ত্র ক্রেতার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই প্রথম দিকে। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফরের সময় ১০০ কোটি ডলার বা ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনার চুক্তি হয়েছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক দি ইকোনমিক টাইমসের (৩০ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে পারমাণবিক স্থাপনায় ভারত বড় ভূমিকা রাখছে। যদিও রাশিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রথম ভারত কোনো বিদেশী মাটিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলছে।বাংলাদেশে রূপপুর আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ভারতীয় ফার্মগুলো রাশিয়া এবং বাংলাদেশী অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল সূত্র বলেছে, ঢাকার কাছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভারত ‘ম্যানুফ্যাকচার ইকুইপমেন্টস’ সরবরাহ করবে।’


রূপপুরে মোট ২৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের জন্য সই করা চুক্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ১২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। এর বাইরে আমরা ইতোমধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন (৫৫ কোটি) ডলার ব্যয় করে ফেলেছি। এটা যুক্ত করলে হবে ১৩২০ কোটি ডলার। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কতটা সাশ্রয়ী হবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু ভারত ও রাশিয়ার যে বিপুল বাণিজ্য হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ছাড়া ভারতের পারমাণবিক বাণিজ্যের পরীক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যেখানে বড় ধরনের ঝুঁকি তো রয়েছেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে চীন, রাশিয়া ও ভারতের কোনো স্বার্থ বাংলাদেশে নেই তা নয়। এ ছাড়া ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থসহ সব ধরনের চাওয়া-পাওয়া বাংলাদেশ অনেক আগেই পূরণ করেছে।


কূটনীতি হচ্ছে ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার প্রথম লাইন। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মহল জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এই ইস্যুতে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমার যে কূটনৈতিকভাবে অনেক বেশি তৎপর ও স্মার্ট, ভারত ও রাশিয়ার ভূমিকা তা প্রমাণ করে। ২৫ আগস্টের ঘটনার পর সরকার যেন হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। রোহিঙ্গা ইসু্যুতে সম্ভবত বাংলাদেশ প্রথম দিকে ভারতের দিকে তাকিয়েছিল দেশটির মনোভাব বোঝার জন্য। কিন্তু ভারত যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে তখন আমাদের কিছুটা হুঁশ ফিরে আসে। ভারতের কাছে মিয়ানমার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল তার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের। বাংলাদেশ ১০ বছর ধরে ভারতের ইচ্ছা পূরণের কূটনীতি গ্রহণ করেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের অবস্থানের প্রতিধ্বনি করেছে বাংলাদেশ। সার্কের উদ্যোক্তা হওয়া সত্ত্বেও ভারতের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সার্ক সম্মেলন পর্যন্ত বর্জন করেছিল। ভারতের সাথে দেনদরবার করার মতো কার্ড এখন বাংলাদেশের হাতে নেই। এখন ভারতের লিপ সার্ভিসের জন্য সরকারকে অপেক্ষা করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক বা বৃহৎ শক্তি ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের পাশে থাকার মৌখিক গ্যারান্টির কানাকড়ি মূল্য নেই তা আবারো প্রমাণ হলো।


বাস্তবতা হচ্ছে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিকি হ্যালি রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযানের শুধু অভিযোগই আনেননি, এ অপরাধে মিয়ানমারের সেনাকর্মকর্তাদের বিচার ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। ফ্রান্সও একই সূরে কথা বলেছে। অপর দিকে রোহিঙ্গাদের নির্মূল অভিযানের পর প্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠে তুরস্ক। বলা যায় ইস্যুটির আন্তর্জাতিকীকরণে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্পষ্টত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরো শক্ত হচ্ছে।

ইতোমধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন মিয়ানমার সেনাপ্রধানের সাথে কথা বলেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। তবে এ কথা সত্য যে চীন, রাশিয়া ও ভারতের প্রভাবের তুলনায় মিয়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রভাব খুবই সামান্য। এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে দেশটির সেনাবাহিনীকে চাপে রাখতে চাইছে এসব দেশ। যার মূল্য লক্ষ হচ্ছে মিয়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অস্ত্র বিক্রি ও বিনিয়োগ বাড়ানো। বাংলাদেশের উচিত ছিল পশ্চিমা নীতির সাথে সমন্বয় রেখে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করা। কিন্তু বাংলাদেশ কথিত বন্ধুরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে।


রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রমাণ হয়েছে কোনো স্বাধীন দেশের স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না। ভারত ও চীনের ওপর নানামাত্রিক নির্ভরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পাশে এই দুই দেশ দাঁড়ায়নি। একইভাবে রাশিয়াও জাতিসঙ্ঘসহ আর্ন্তজাতিক ফোরামে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন বন্ধুহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ডেনিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাংবাদিক আরলিং বিজল ছোট দেশগুলো বড় রাষ্ট্রগুলোর গ্রাস থেকে টিকে থাকার উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের কৌশল হবে পাইলট ফিশের মতো, শার্কের গ্রাসে পতিত না হয়েই কিভাবে শার্কের কাছাকাছি অবস্থান করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ নিজেই যেন হফুরের পেটে ঢুকে পড়েছে।