ইসরাইল যেভাবে সমরাস্ত্র রফতানিকারী দেশে পরিণত হলো

Nov 21, 2017 03:24 pm
ইসরাইল বিশ্বের বৃহৎ ড্রোন রফতানিকারক দেশ


হামিম উল কবির


ইসরাইল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার ঠিক দুই বছর পর প্রথম বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে সফর করেন। দেশটির দুর্বল অর্থনীতিকে কিছুটা সচল করার জন্য বিদেশে পণ্য রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনে বানিজ্যিক প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়। দেশটির অর্থনীতির গতি সচল রাখার জন্য তখন ছিল না কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ, ছিল না মাটির নিচের তেল বা খনিজ পদার্থ। বলতে গেলে কিছ্ইু ছিল না নতুন ইহুদি রাষ্ট্রটির।


প্রতিনিধিদলটি দক্ষিণ আমেরিকায় বেশ কয়েকটি মিটিং করার পর হাস্যরসাত্মক মন্তব্য ছাড়া বাণিজ্যের কিছুই অর্জন করতে পারেনি। ইসরাইলিরা সেখানে কমলা, কেরোসিনের স্টোভের ওপরের অংশ ও নকল দাঁত বিক্রির প্রস্তাব দেয়। দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে আর্জেন্টিনা নিজেই কমলা উৎপাদন করত। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল জাতীয় বৈদ্যুতিক গ্রিডের সাথে সংযুক্ত ছিল। কেরোসিনের স্টোভের ওপরের অংশ তাদের প্রয়োজন ছিল না, নকল দাঁতও না। প্রথম বাণিজ্যিক মিশনটি ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে ফিরে আসে।


এটা কল্পনা করা কষ্টকর যে ৬৭ বছর আগে এসবই রফতানি করার ক্ষমতা ছিল ইসরাইলের। কিন্তু আজ ইসরাইল বিশ্বের অন্যতম উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী একটি সুপার পাওয়ার এবং উচ্চপ্রযুক্তির শীর্ষ অস্ত্র রফতানিকারক দেশ। ইসরাইল এখন বছরে প্রায় ৬৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র রফতানি করে থাকে।


১৯৮৫ থেকেই ইসরাইল বিশ্বের বৃহৎ ড্রোন রফতানিকারক দেশ। দেশটি বৈশ্বিক বাজারে ৬০ শতাংশ ড্রোন বিক্রি করে থাকে, এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ২৫ শতাংশ ড্রোন বিক্রি করে বিশ্ববাজারে। ইসরাইলি ড্রোনের ক্রেতা রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানী, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ৯/১১’র পর আফগানিস্তানে হামলায় ইসরাইলের তৈরী ড্রোন ব্যবহার করেছিল।


৭০ বছর বয়স হয়নি এমন একটি দেশ কি করে বিশ্বের সবেচেয়ে অগ্রসরমান প্রযুক্তির সামরিক শক্তির অধিকারী হয়ে গেল, এটা সবার কাছে বিস্ময়। গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইহুদিবাদী দেশটি আধুনিক যুদ্ধের গতিই কিভাবে পরিবর্তন করে দিলো। এটা কি শুধু সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের কারণে হয়েছে? সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সম্ভব হয়েছে ইসরাইলি জাতির কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে। শুধু মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্যই দেশটি বিপুল সামরিক শক্তির অধিকারী হয়ে যায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্তকেও মানে না, এমনকি জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্তও না। মার্কিন সিদ্ধান্ত না মানার মানে হলো মার্কিনিদের ওপর ইহুদিরা নির্ভরশীল নয়। এটা সম্ভব হয়েছে দেশটি নিজের শক্তি বৃদ্ধির কারণেই। মার্কিনিরা খুব ভালো করেই অবগত ইহুদি এ দেশটির শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে। যদিও মুসলিম দেশগুলো ইসরাইল নিয়ে অনেক বেশি অন্ধকারে আছে।


জেরুসালেম পোস্টের সম্পাদক ইয়াকুব খাটজের মতে, ইসরাইল খুব ছোট হলেও দেশটি মোট জিডিপির ৪.৫ শতাংশ ব্যয় করে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে। এটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের’ (ওইসিডি) গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ। অন্য দিকে গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশই ইসরাইলিরা ব্যয় করে সামরিক সরঞ্জাম আবিষ্কার ও উন্নয়নে। অপর দিকে সামরিক গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করে জিডিপির ১৭ শতাংশ।
ইয়াকুব খাটজ বলেছেন, ইসরাইলিদের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের একটা নেশা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য জাতির চেয়ে ইসরাইলিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি নিতে ভালোবাসে। তরুণ বয়সে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় এরা নতুন কিছু আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা পায়। ওদের যে শিক্ষাটা দেয়া হয়, সেটাই ওদের এ কাজে অনুপ্রাণিত করে। এমনকি মারাত্মক ফল অপেক্ষা করছে এমন কাজেও এরা পিছিয়ে না গিয়ে ঝুঁকিটা নিয়ে থাকে। ঝুঁকি নেয়ার এ প্রবণতা ইসরাইলিদের নতুন আবিষ্কারের ইচ্ছাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।


১৯ বছর বয়সী একজন ইসরাইলি যখন দেশটির পূর্ব অংশে ফিলিস্তিনিদের সাথে যুদ্ধরত, তখন তাদের পশ্চিমাংশের কলেজবন্ধুরা তাদের ডরমিটরিতে নিরাপদে থাকে। এ সময়টাই প্রশিক্ষকেরা তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে। এ ছাড়া এর পেছনে আরেকটি কারণ হলো ইসরাইল রাষ্ট্রটি জন্মের পরই একটি সঙ্ঘাত ও যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বিতর্কিত জন্মের পর থেকেই সে সঙ্ঘাতে লেগেছিল ফিলিস্তিনিদের সাথে। সে আক্রমণ করেছে লেবানন, দখল করেছে সিরিয়া ও মিসরের ভূমি। তাবৎ বিশ্ব ইসরাইলিদের এ আগ্রাসী নীতি ঘৃণার চোখে দেখলেও ইসরাইলিরা নিজেরা এটাকে বাস্তবতা হিসেবে নিয়েছে। আর এটাই ইসরাইলিদের মন ও মস্তিষ্ককে নাকি ধারালো করেছে। ইসরাইলিদের ভাষায় এ বাস্তবতাই টিকে থাকার জন্য অস্ত্র বানাতে সহায়তা করেছে। এটাই নাকি ওদের আবিষ্কারের নেশার বাস্তব গল্প।

 

সীমান্তে রোবোটিক টহল

সীমান্ত প্রহরায় ইসরাইলই প্রথম রাষ্ট্র যে তার বাহিনীকে সরিয়ে নিয়ে সেখানে আনম্যানড গ্রাউন্ড ভেহিকলস বা ইউজিভি (মনুষ্যবিহীন স্থলযান) মোতায়েন করেছে। প্রকৃতপক্ষে এই ইউজিভি হলো রোবোটিক সোলজার। ইসরাইলিরা এর নাম দিয়েছে ‘গোয়ারডিয়াম’। ইতোমধ্যে ইহুদি রাষ্ট্রটি উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে গাজা স্ট্রিপে গোয়ারডিয়াম মোতায়েন করেছে।


গোয়ারডিয়াম সেন্সর, ক্যামেরা ও মারাত্মক অস্ত্র বসানো একধরনের যান। অনেক দূরে স্থাপন করা কমান্ড সেন্টারে বসে একজন সৈনিক গোয়ারডিয়াম চালাতে পারে। ইসরাইলিরা আগে স্থির করা রাস্তায় গাড়িটিকে চালিয়ে নিতে পারে কমান্ড সেন্টার থেকে।
নিজেদের বাহিনীর সৈনিকদের ঝুঁকি কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই ইসরাইলের নিরাপত্তাবাহিনীতে রোবট ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া সৈনিকদের বিশ্রাম, খাদ্য ও পানীয় বিরতির সময়ও রোবট ব্যবহার করা হয়। ট্যাংকভর্তি একটি গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে গোয়ারডিয়াম চালানো যায়। এর জন্য ইসরাইলিরা ফোর্ড এফ-৩৫০ মডেলের (ব্রিটেনে তৈরি গাড়ি) পিকআপ ব্যবহার করে।


টানেল হয়ে ফিলিস্তিনের গাজা থেকে আসা গেরিলাদের শনাক্ত করতে ইসরাইল ইউজিভির ওপর নির্ভরশীল। ইউজিভির রোবোটিক সাপ মাটির নিচের রাস্তা খুঁজে বের করে তাদের ঘাঁটিতেও চলে যেতে পারছে। রোবট টানেলের কাঠামোটির মানচিত্র তৈরি করে ইসরাইলি সৈন্যদের সঠিক চিত্র সরবরাহ করে অ্যাকশন নেয়ার আগে। সাগরেও একই কাজ করতে পারে ইউজিভির রোবোটিক সাপ। কৌশলগত বন্দর রক্ষা করার জন্য ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ঠিকাদার রাফায়েল মনুষ্যবিহীন টহল জাহাজের উন্নয়ন করেছে এবং এ জাহাজে করে ভূমধ্যসাগরের দীর্ঘ উপকূল পাহারা দেয়া হয়।

 

অ্যারো অ্যান্টি মিসাইল কর্মসূচি

২০০০ সালে ইসরাইলি বিমানবাহিনী প্রথমবারের মতো অপারেশনাল মিসাইল ব্যাটারি পায়। বিশ্বের মধ্যে এই অ্যারো মিসাইল ব্যাটারি ইসরাইলকে বিশ্বে প্রথম হিসেবে পরিচিত করে। এ মিসাইল শত্রুপক্ষের মিসাইলকে গুলি করে নামাতে পারে।
১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময় স্টারওয়্যার (তারকাযুদ্ধ) পরিকল্পনার সময় ধারণাটি আসে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত মিসাইল প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে রিগ্যান তখন তার মিত্রদের আহ্বান করেছিলেন স্টারওয়্যার সিস্টেমকে উন্নয়ন করার জন্য। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে এ আহ্বানে সাড়া দেয় এবং মিসাইল উন্নয়নে লেগে যায়। ফল স্বরূপ অ্যারো মিসাইলের মতো অত্যাধুনিক ও নিখুঁতভাবে কার্যকর মিসাইল নিজেদের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসে। অ্যারো মিসাইলের ধারণাটি এরই বৈপ্লবিক রূপ। এ মিসাইলটি আবিষ্কারের পর ক্ষুদ্র ইসরাইল এসব ব্যালিস্টিক মিসাইল সিরিয়া, ইরাক ও ইরানি অঞ্চলে যেন আঘাত হানতে পারে সেভাবে মোতায়েন করে রেখেছে।


ইসরাইলের নির্মিত অ্যারো মিসাইল ব্যাটারি ১৯৯১ সালে উপসাগর যুদ্ধের পর তৈরি করা হয়েছে। উপসাগর যুদ্ধে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ইসরাইলে ৩৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। সাদ্দামের মিসাইল ইসরাইলকে প্রায় অচল করে ফেলেছিল। লাখ লাখ ইসরাইলি তখন গ্যাস মাস্ক পরে ‘বম্ব শেল্টারে’ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।


তখন থেকেই নিজস্ব তৈরি অ্যারো ব্যাটারির শুরু। আজকে ইসরাইল লং রেঞ্জের মিসাইল আক্রমণকে বাঁচার জন্য অ্যারো মোতায়েন করেছে। অ্যারো মিসাইল দূর থেকে ছোড়া মিসাইলকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে শত্রুপক্ষ যে ধ্বংসাত্মক ইচ্ছা নিয়ে মিসাইল ছোড়ে তাদের সে উদ্দেশ্য সফল হয় না। এ ব্যাটারি ব্যালিস্টিক মিসাইল, মিডিয়াম রেঞ্জের রকেটকেও নিষ্ক্রিয় করতে পারে। ইতোমধ্যে গাজা থেকে ছোড়া শত শত কার্তুসা রকেটকে নিষ্ক্রিয় করে ইসরাইলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে।


ইসরাইলই বিশ্বের একমাত্র দেশ যে যুদ্ধের সময় তার প্রতিরক্ষা সিস্টেম ব্যবহার করতে পেরেছে সফলভাবে। অ্যারো মিসাইলের কারণে ইসরাইলে রকেট আক্রমণের আগে আক্রমণকারীকে চিন্তা করতে যে রকেটটির উদ্দেশ্য হাসিল হবে কি না। অন্যান্য দেশও মিসাইল সিস্টেম উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে কিন্তু কেউই ইসরাইলের মতো বহুমাত্রিক ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করতে পারেনি।

 

মিনি স্পাই স্যাটেলাইট

মহাশূন্যে ইসরাইল ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো গোয়েন্দা কাজের জন্য উপগ্রহ পাঠায়। এর আগে গোয়েন্দা উপগ্রহের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশ সাতটি দেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৮৮ সালে ইসরাইল সে ক্ষমতা অর্জন করে অষ্টম দেশ হিসেবে নিজেকে সদস্যভুক্ত করে। শুরুর দিকে অন্যরা সন্দিহান ছিল যে ইসরাইল গোয়েন্দা উপগ্রহ পাঠাতে পারবে কি না। কিন্তু ৩০ বছরের কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই ইসরাইল উপগ্রহ নির্মাণে সুপার পাওয়ারের পর্যায়ে এসেছে। ইহুদি দেশটি এখন মহাশূন্যে ভিন্ন প্রকৃতির আটটি গোয়েন্দা উপগ্রহ পাঠিয়ে তাবৎ বিশ্বের প্রতি গোয়েন্দাগিরি করছে। প্রায় সব ধরনের তথ্যই এখন দেশটির কাছে মজুদ থাকছে। কোনো কিছুই গোয়েন্দা উপগ্রহের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এটা একটি সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করছে ইসরাইল। দেশটি ইরান থেকে যে হুমকি আশা করে তা সে গোয়েন্দা উপগ্রহ দিয়ে প্রত্যক্ষ করতে পারছে। ইসরাইল তার গোয়েন্দা উপগ্রহ দিয়ে ইরানের পারমাণবিক প্ল্যান্টের দিকে কড়া নজর রেখেছে।

 

উপগ্রহে র‌্যাডারযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার

বেশির ভাগ ইসরাইলি উপগ্রহের ক্যামেরায় অ্যাডভান্সড হাই রিসলিউশন ক্যামেরা ওএফইকে-৯ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের একটি ২০১০ সালে পাঠানো হয়। এ ক্যামেরা শত শত মাইল দূর থেকে ৫০ সেন্টিমিটারের (২০ ইঞ্চি) বস্তুকেও শনাক্ত করতে পারে।
এ ধরনের একটি উপগ্রহের নাম উপগ্রহ টেকসার (টিইসিএসএআর)। এ উপগ্রহে ইমেজ বিশ্লেষণ করতে পারে এমন সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। এটাও প্রচলিত ক্যামেরার মতোই হাই রিসলিউশনযুক্ত। টেকসার ইসরাইলকে বিশাল সুবিধা এনে দিয়েছে। ক্যামেরা সাধারণত মেঘ অথবা কুয়াশা ভেদ করে কোনো ছবি তুলতে পারে না। কিন্তু ইসরাইলের টেকসারে সেট করা র‌্যাডার ক্যামেরা প্রকৃত চেহারা পাল্টে দিলেও নির্দিষ্ট বস্তুর নিখুঁত ছবি নিতে পারে। এটা সব আবহাওয়ায় উপযোগী। এ উপগ্রহের মাধ্যমে ইসরাইল শত্রুর গতিবিধি শনাক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাহিনী মোতায়েন করতে পারে। বর্ষার দিন হোক অথবা আকাশে ভারী মেঘ অথবা কুয়াশা চাদরে ঢাকা থাকা এ ক্যামেরার সাহায্যে নির্ভুল ছবি নিতে পারে।
অবশ্য ২০০৫ সালেই গোয়েন্দা উপগ্রহ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করায় ইসরাইল অন্য দেশগুলোর দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। এর ফলস্বরূপ ফ্রান্স ২০১২ সালে একটি ইসরাইলি কোম্পানির সাথে অংশীদারির ভিত্তিতে উপগ্রহ উন্নয়নের কাজে হাত দেয়। একই বছর ইতালি ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার মূল্যের এ ধরনের একটি উপগ্রহ কেনার অর্ডার দেয়। এর মধ্যেই সিঙ্গাপুর ও ভারত ইসরাইলের নির্মিত গোয়েন্দা উপগ্রহ কিনে নিয়েছে।

 

ড্রোন আবিষ্কার

বলা হয় যে, একমাত্র ইসরাইলের ড্রোনই ইরান পৌঁছতে পারে। ইহুদি দেশটির তৈরি ড্রোন বৃহৎ আকারের। হিরণ টিপি নামক এ ড্রোন ৮৫ ফুট লম্বা। এটা ৭৩৭ বিমানের সমান। ড্রোনটি একটন ওজন নিয়ে আকাশে ২৪ ঘণ্টা অবস্থান করতে পারে। ইসরাইলের তৈরি এই ড্রোন নিয়ে ইসরাইলিরা বেশ গর্বই করে থাকে। কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে ইসরাইল স্বীকার না করলেও হিরণ টিপি আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল বহনে সক্ষম। কমব্যাট অপারেশনে ইসরাইল বিশ্বের প্রথম দেশ যে ড্রোন ব্যবহার করে। ১৯৬৯ সালেই ইসরাইল ড্রোন ব্যবহার করতে শিখে। সে সময় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বিভাগ মিসরের সুয়েজ খালের তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে খেলনা বিমানের নিচে আঠা দিয়ে ক্যামেরা ফিট করে সুয়েজ খালের ছবি নিয়ে আসে। তবে ১৯৮২ সালে ইহুদিরা প্রথম স্কাউট নামক কমব্যাট ড্রোন উড়ায় লেবাননে। লেবাননে ইসরাইল ড্রোনের সাহায্যে সিরিয়ার অ্যান্টি এয়ার ক্রাফট মিসাইল খোঁজে বের করে ফেলে এবং সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
ড্রোন আবিষ্কারের পর ইসরাইল বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে হাইটেক সমরাস্ত্র উৎপাদনে ইসরাইল কত দূর এগিয়ে গেছে। এরপর ইসরাইল ১৯৮৬ সালে ইউএস নৌবাহিনীকে প্রথমবারের মতো ‘পাইওনিয়ার’ নামক ড্রোন সরবরাহ করে। কয়েক বছর পর উপসাগরীয় যুদ্ধে একটি পাইওনিয়ার ড্রোন একদল ইরাকি সৈন্যদের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। ইরাকি সৈন্যরা এটা দেখে তাদের গায়ের জামা আকাশে ছুড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। সামরিক বাহিনীর একটি ইউনিট একটি রোবটের কাছে আত্মসমর্পণের এটা ছিল ইতিহাসে প্রথম ঘটনা।


আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে জায়নবাদী ইসরাইলের তৈরি ড্রোন। বৈমানিক পরিচালিত যুদ্ধবিমান উৎপাদনের সামান্যই খরচ হয় ড্রোন তৈরিতে। ঠিক কত খরচ হয় এ তথ্য তো ইসরাইল কেন কাউকে দেয় না, তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার লাগে স¤পূর্ণ একটি ড্রোন তৈরিতে। একটি ফাইটার জেট বিমানের খরচের এটা খুবই সামান্য।
গাজা ভূখণ্ডে ইসরাইল কোনো ভবন উড়িয়ে দিতে চাইলে প্রথমে ড্রোন দিয়ে পরীক্ষা করে নেয় আক্রমণের কোনো আশঙ্কা আছে কি না। অবশ্য জেরুসালেম পোস্টের সম্পাদক ইয়াকুব খাটজের ভাষায়, ইসরাইল আগে ড্রোন পাঠিয়ে দেখে নেয় ওই ভবনে কোনো বেসামরিক মানুষ আছে কি না। লেবাননে হেজবুল্লাহ যোদ্ধাদের গতিবিধি শনাক্ত করার জন্য প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইল ড্রোন পাঠিয়ে থাকে। ইয়াকুব খাটজ বলছেন, হিজবুল্লাহর কাছে এক লাখ ৩০ হাজার মিসাইল রয়েছে যেগুলো ইসরাইলে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ইসরাইলের ড্রোন লেবাননে হিজবুল্লাহর এসব ড্রোন খুঁজে থাকে।
ইসরাইল যে কেবল ড্রোন তৈরি করেছে তা নয় এরা অ্যান্টি ড্রোন লেজারও আবিষ্কার করেছে। লেজারের সাহায্যে ইসরাইলে আকাশে শত্রুপক্ষের ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতিও তাদের আয়ত্তে রয়েছে। ইতোমধ্যে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির ঠিকাদার রাফায়েল দক্ষিণ কোরিয়ায় অ্যান্টি ড্রোন লেজার সিস্টেম বিক্রি করেছে। সোয়া মাইলের মধ্যে আসলে অ্যান্টি ড্রোন লেজার ড্রোন নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।

 

টপ সিক্রেট ট্যাংক

মারকাভা ট্যাংক তৈরির প্রকল্প আজকের দিনে ইসরাইলের অন্যতম শীর্ষ গোপন প্রকল্প। বলা হয়ে থাকে যে এ প্রকৃতির ট্যাংক আজকের দিনে বিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ট্যাংক। যুক্তরাজ্য ঠিক একই ধরনের ট্যাংক ইসরাইলের কাছে বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ১৯৭০ দশকে ইহুদিরা এ ট্যাংক তৈরিতে মনোযোগ দেয়। মারাকাভা নামক ট্যাংকটি অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইলের মধ্যেও অপারেশন করতে পারে। ২০১২ সালে এতো ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাযুক্ত মারাকাভা ট্যাংককেও আধুনিকায়ন করেছে ইসরাইল। এতে ‘ট্রফি’ নামক র‌্যাডারযুক্ত নতুন সিস্টেম যোগ করা হয়েছে। বিপরীত দিক থেকে অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল আসতে থাকলে ট্রফি তা শনাক্ত করে মেঘের মতো অন্ধকার করে গোলা নিক্ষেপের পরামর্শ দেয় এবং অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল অকার্যকর করে দেয়। মারকাভার প্রতিটি গোলা ধাতুর আবরণযুক্ত। ফলে অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল মারকাভার কাছেই আসতে পারে না। শত্রুর মিসাইল আসতে থাকলে ট্রফি ট্যাংককে দ্রত প্রতি উত্তর দেয়ার জন্য সঙ্কেত দেয় এবং তা একেবারে সঠিক সময়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে এ ট্যাংকের কোনো পার্টস নষ্ট হলে ট্যাংকের ক্রু যুদ্ধক্ষেত্রেই তা মেরামত করতে পারে। ইসরাইলের অভ্যন্তরে ট্যাংকের ওয়ার্কশপে পুরো ট্যাংকটিকে নিতে হয় না।