একজন নিরক্ষর মানুষ যেভাবে বদলে দিলো একটি দেশ

Nov 17, 2017 05:53 pm
আবুধাবির ঘুমে-ঝিমোনো জীবনে

 

সিরাজুর রহমান


লোকটা প্রায় আজীবন নিরক্ষর ছিলেন, শেষ বয়সে কোনো রকমে নাম সই করতে শিখেছিলেন। কিন্তু তার স্বপ্ন আর দূরদৃষ্টির কথা সবার মুখে মুখে, তার স্মৃতি আবুধাবির সব নর-নারীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে আরো বহু যুগ। তিনি ছিলেন শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান।


আবুধাবিতে আমি প্রথম যাই ১৯৮১ সালে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের সম্বন্ধে একটা অনুষ্ঠানের মাল-মসলা সংগ্রহ করছিলাম। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইলি যুদ্ধের জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক লাফে বহু গুণ বেড়ে যায়। উপসাগরীয় দেশগুলো পেট্রো-ডলারের পাহাড় ব্যবহার করে তখন উন্নয়নের কাজে হাত দিয়েছে। তাদের নিজেদের জনবল খুবই নগণ্য। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে তারা শ্রমিক আমদানি করছে। বাংলাদেশ থেকে হাজারে হাজারে লোক আসছিল তখন এসব দেশে।
সে সময়ের আবুধাবির কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। এখানে-ওখানে নতুন কতগুলো অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হয়েছে মূলত বিদেশী বিশেষজ্ঞদের বাসস্থান হিসেবে। আদিবাসী বেদুইন আরব তখনো তাঁবুতে বাস করে। শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের পরিবার বাস করত দেয়ালঘেরা একটা জমিতে তৈরি কয়েকটা একতলা ঘরে।

 

আবুধাবির ঘুমে-ঝিমোনো জীবনে সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল তখন সড়ক-মহাসড়ক তৈরির প্রাণচাঞ্চল্য। দুই ক্যারেজবিশিষ্ট প্রশস্ত সড়কগুলোর চৌহদ্দি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সব তৎপরতা মাঝের জায়গাটুকুতে। দূর-দূরান্ত থেকে বাড়ন্ত খেজুরগাছ এনে সেখানে সমান দূরত্বে সারি করে লাগানো হয়েছে। অবশিষ্ট স্থানে লাগানো হয়েছে সবুজ ঘাসের চাপড়া। শুনলাম সেসব চাপড়া আমদানি করা হয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে। শত শত পাকিস্তানি শ্রমিক রাবারের হোজ দিয়ে সূর্যোদয়ের আগে থেকে সূর্যাস্তের অনেক পর পর্যন্ত পানি দিচ্ছে সেই ঘাসে এবং খেজুরগাছের চারায়। আরো কোথাও কোথাও সারভর্তি শত শত লরি দাঁড়িয়ে। শ্রমিকরা দুই সারি নিচু কংক্রিটের রেলিংয়ের মধ্যবর্তী স্থানে সার ঢালছে। এখানেও লাগানো হবে খেজুরগাছ আর সবুজ ঘাস। তারপর দু’পাশের সড়ক-মহাসড়ক তৈরি হবে।


আমার কিছুটা খটকা লেগেছিল তখন। স্বল্প জনসংখ্যার দেশ। ঘরবাড়িও কম। কী হবে এত সব সড়ক তৈরি করে? তখন কিছু কিছু এবং পরে আরো একাধিক সফরে বিস্তারিত শুনেছি। আবুধাবির শাসক শেখ জায়েদ তার দেশের মরুভূমিতে একটা সবুজ আর সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। খেজুরগাছ আর ঘাসের মতো আরো বহু গাছ পরে লাগানো হয়েছে। বেশির ভাগই বিদেশী। বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদরা গোড়ায় বহু আপত্তি ও নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন যে, এই গরম মরুভূমির দেশে সেসব গাছ টিকবে না। শেখ জায়েদ শোনেননি সেসব নিষেধ। গাছ আমদানি করা হয়েছে। উপসাগরের নোনা পানি লবণমুক্ত করে দেশের তখনকার চাহিদার বহু গুণ মিঠাপানি তৈরি হয়েছে। সে প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে অঢেল। সেসব গাছ আরো বড় হয়েছে এখন। এখন আর সকাল-সন্ধ্যা হোজে করে পানি দিতে হয় না, ছোট ছোট ফুটোবিশিষ্ট রাবারের নল মাটির সামান্য নিচে পুঁতে দেয়া হয়েছে, সেসব ফুটো দিয়ে প্রয়োজনমতো পানি আসে ঘাসে ও গাছে, তবে রোদের তাপে উবে গিয়ে পানির অপচয় হয় না। তা ছাড়া গাছ-গাছড়ার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বৃষ্টিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। আমাদের এবারের অবস্থানের সময় একদিন সকালে এমন ভারী বৃষ্টি হয়েছিল যে, বহু সড়কে কয়েক ইঞ্চি পানি জমে গিয়েছিল। এবারের যাত্রায় আবুধাবিকে আমার স্বপ্নপুরীর সবুজ বাগান বলেই মনে হয়েছে।


সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটার নতুন যাত্রার হ্রস্ব ইতিহাস আপনাদের আগ্রহব্যঞ্জক হতে পারে। সাতটি শেখশাসিত আমিরতন্ত্র ব্রিটিশের আশ্রিত ছিল। তাদের মধ্যে আবুধাবি আয়তনে ৮৭ শতাংশ। তার পরই আসে দুবাই। আরো পাঁচটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শেখতন্ত্র হচ্ছে শারজা, আজমান, ফুজায়েরা, রাস আল খাইমা এবং উম আল কায়াম। সাম্রাজ্য ও উপনিবেশ হারিয়ে ব্রিটেন তখন আর ধনী কিংবা শক্তিশালী দেশ ছিল না। আবুধাবির প্রতিরক্ষার জন্য সৈন্য মোতায়েন রাখা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবুধাবিতে কিছু খনিজ তেল আছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম তখন ব্যারেলপ্রতি তিন-চার ডলার। তার থেকে কতই বা আয় হবে?


ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শেখ জায়েদ তাদের বিরত করার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। এই এলাকাটার ওপর বিদেশীদের নজর আছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের। তারা যদি একে একে সাতটি শেখতন্ত্রই দখল করে নেয়? ব্রিটিশদের পরামর্শে শেখ জায়েদ সাতটি অঞ্চলকে একীভূত করে একটা ফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ নিলেন। অন্য শেখরা নানা অজুহাত দেখিয়েছিলেন। দুবাইয়ের শাসক শেখ রশিদ আল মাখতুম বললেন, তার এলাকায় মজুদ তেলের পরিমাণ সামান্য, দুবাইয়ের চলবে কী করে? শেখ জায়েদ আশ্বাস দিলেন, বললেন, দৈনিক এক লাখ ২০ হাজার ব্যারেল করে তেল তিনি দেবেন দুবাইকে। যাক, শেষ পর্যন্ত ফেডারেশন গঠিত হলো। স্থির হলো যে, আবুধাবির শাসক বরাবর প্রেসিডেন্ট হবেন। দুবাইয়ের শাসক হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী।


ব্রিটিশরা চলে গেল ১৯৭১ সালে। কিন্তু কপাল আর কাকে বলে! কিছু দিনের মধ্যেই প্রমাণ পাওয়া গেল আবুধাবিতে যে পরিমাণ তেল আছে বলে আগে হিসাব করা হয়েছিল প্রকৃত মজুদ তার বহু গুণ বেশি। আরো কী আশ্চর্য! ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে পরাজিত আরবরা তেল রফতানির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে ২৫ গুণেরও বেশি বেড়ে যায়। তখন থেকে খনিজ তেলের নতুন নাম হয়েছে ‘ব্ল্যাক গোল্ড’ কালো সোনা।


দুবাই স্থির করল তেলের আয় দিয়ে তার চলবে না। গোড়া থেকেই সে পর্যটন শিল্পের দিকে মনোযোগ দেয়। কী প্রয়োজন পর্যটক আকর্ষণের জন্য? চাই যথেষ্ট ভালো হোটেল আর শপিং মল। বিদেশী শ্রমিকদের দিয়ে দিন-রাত কাজ করিয়ে সেসব তৈরি হলো। পর্যটকদের আসা-যাওয়ার জন্য সুদক্ষ এয়ারলাইন এমিরেটস গড়ে উঠল। দুবাই বিমানবন্দর এখন আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটা প্রধান জংশন। কিন্তু কেন আসবে পর্যটকরা? পশ্চিমের ধনী দেশগুলো আবার শীতের দেশও বটে। সেসব দেশের মানুষ একটু রোদ চায়, গায়ে তাপ লাগাতে চায় এবং তারা খেলাধুলা পছন্দ করে। আমিরাতে রোদ সারা বছর পাওয়া যায় এবং মোটামুটি উষ্ণ এখানকার আবহাওয়া। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে এবং প্রায়ই কৃত্রিম উপায়ে দুবাইতে ক্রিকেট, টেনিস, ফুটবল, গলফ, ঘোড়দৌড়, মোটর রেসিং ইত্যাদি বহু খেলাধুলার চমৎকার আয়োজন করা হয়েছে। সম্প্রতি আবার সারা বছর ধরে আইস স্কিয়িং করার জন্য কৃত্রিম বরফজমা পাহাড়ের ঢালু তৈরি হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এবং পশ্চিমের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যের পুরস্কার দিয়ে এখন এসব ক্রীড়ার বিশ্ব প্রতিযোগিতা হয়। প্রতিযোগী আর দর্শক মিলে বহু হাজার পর্যটক আসে একেকটি প্রতিযোগিতায়।


আবুধাবিতে বিদেশীদের বাড়ি কিংবা সম্পত্তি কেনা নিষেধ। কিন্তু দুবাই সরকার সে বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। উষ্ণ আবহাওয়া, শপিংয়ের স্বর্গ রাজ্য, সব রকমের খেলাধুলার অফুরন্ত সুযোগÑ সবচেয়ে বড় কথা, আয়কর থেকে অব্যাহতি ইত্যাদি কারণে বহু বিদেশী দুবাইতে মোটামুটি স্থায়ীভাবে বসতি করতে শুরু করেছে। তাদের চাহিদা মেটাতে বহু সুউচ্চ আর সুদর্শন ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হয়েছে। উপসাগর থেকে জমি উদ্ধার করে খেজুরের ডালের আকৃতিতে অভিজাত বসতি এলাকা গড়ে উঠেছে। খেজুরের সবচেয়ে উঁচু পাতা যেখানে থাকার কথা সেখানে তৈরি হয়েছে অপূর্ব সুন্দর আর বিলাসবহুল প্যালেস হোটেল। পাম জুমায়েরা নামক এই নতুন বসতির বাড়ির মালিকদের মধ্যে আছেন ফুটবল তারকা ডেভিড বেকহ্যাম ও তার পপতারকা স্ত্রী পশ-স্পাইস ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম। ইদানীং আবার পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ইমারত খলিফা টাওয়ার নির্মাণের কাজও সমাধা হয়েছে দুবাইতে।
এত সব সুবিধার কারণে কালো টাকার মালিক বহু বিদেশী বসতি করেছে দুবাইতে। শুনেছি বলিউডের বহু চিত্রতারকাসহ বিত্তশালী ভারতীয়রা এখানে সম্পত্তি কিনেছেন, বসতি করছেন। সেই সাথে বহু ‘গ্যাং-স্টারও’ নাকি এসেছে। মুম্বাইয়ের সঙ্গীত তারকা আশা ভোঁশলের বাড়ি আছে এখানে। ব্যবসায়ও ফেঁদেছেন তিনি। তার দুবাইতে দু’টি এবং আবুধাবিতে একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ আছে, সবগুলোর নামই ‘আশা’। আবুধাবির আশা রেস্তোরাঁয় এক রাতে খেতে গিয়েছিলাম। ইউরোপ-আমেরিকার অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোর চেয়ে কোনোমতেই নিচু মানের নয়।


আবুধাবিতে শেখ জায়েদ কিন্তু এসব উচ্ছলতার মধ্যে যাননি। গোড়া থেকেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন : তেলের টাকা বেশি দিন থাকবে না; অতএব সে টাকার অপচয় করা চলবে না, এমনভাবে সে অর্থ ব্যয় ও বিনিয়োগ করতে হবে যাতে তেলসম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরে আবুধাবির মানুষ তার থেকে উপকৃত হতে পারে। মূলত অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য তিনি বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনেছেন চড়া বেতনে। কিন্তু দেশের ছেলেমেয়েদের সরকারি ব্যয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন উচ্চশিক্ষার জন্য। যার যেখানে খুশি এবং যে শিক্ষাক্রম খুশি উচ্চশিক্ষার জন্য কারো অর্থাভাব হয়নি।


সুউচ্চ আর নয়নাভিরাম অট্টালিকা অজস্র তৈরি হয়েছে আবুধাবিতেও। কিন্তু বেশি মনোযোগ দেয়া হয়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আর হাসপাতাল নির্মাণের দিকে। প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় আর নিউইয়র্ক বিশ্বদ্যিালয়ের শাখা তৈরি হচ্ছেÑ সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপকরাও মাঝে মধ্যে আসবেন শিক্ষা দিতে। ক্রীড়া স্টেডিয়াম আর আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও প্রদর্শনী কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ডায়াবেটিক মেডিক্যাল কলেজ আর হাসপাতাল ভবনটি আমার খুবই ভালো লেগেছিল। শুনলাম বেশ কয়েকজন বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষক নিয়োগ করা হয়েছে এ হাসপাতালে। তবে মূল সড়কের অদূরে, যেখানে বেশির ভাগ মানুষ বাস করে এবং বাজারগুলো আছে, সেখানে রাস্তাঘাট সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়নি বলেই আমার মনে হলো। পার্কিংয়ের যথেষ্ট জায়গা নেই, যানজট লেগেই আছে।


ব্যাখ্যাটাও শুনেছিলাম। শেখ জায়েদ তার স্বপ্নের নগরীর পরিকল্পনার জন্য দু’জন স্থপতি ডেকেছিলেন। একজন মিসরীয়, অন্যজন জাপানি। জাপানি স্থপতি বলেছিলেন, বিশাল পরিসরে আবুধাবির মূল ভূমিতে নগরীর ভিত্তি স্থাপন করা হোক। অন্য দিকে মিসরীয় স্থপতি পরামর্শ দিলেন, কতই আর বড় হবে এ নগরী? মূল ভূমিসংলগ্ন দ্বীপটার (বর্তমানে আবুধাবি নগরী যেখানে অবস্থিত) ওপর তৈরি করাই বেশি সমীচীন হবে। শেখ জায়েদ ভেবেচিন্তে মিসরীয় স্থপতির পরামর্শ শোনাই বেশি যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করেছিলেন। তিনি নাকি মনে করেছিলেন যে, মিসরীয় আরব স্থপতি আরব চরিত্র এবং আরবদের মনঃস্তত্ত্ব জাপানিদের চেয়ে বেশি ভালো বুঝবেন।


শেখ জায়েদের দূরদৃষ্টিতে এখানে ভুল হয়েছিল। প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই দ্বীপে আর স্থানসঙ্কুলান হচ্ছিল না। বিদেশ থেকে বড় বড় পাথর এনে উপসাগরের কূলে ফেলা হলো। তারপর বালু আর আমদানি করা মাটি। এভাবে সাগর ভরাট করে নগরীর পরিসর বৃদ্ধি করা শুরু হলো। সেই যে শুরু হলো সেটা এখনো চলছে। এখানে-সেখানে সমুদ্রে স্থলভাগ সৃষ্টি করা হচ্ছে, নগরীর পরিসর দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শাসক ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বেশ ক’বছর আগেই সেই ছোট্ট ডেরায় বাস করা বন্ধ করেছেন। তার জন্য সুরম্য বহুতল প্রাসাদ তৈরি হয়েছে। সে প্রাসাদ দেখতে ইতোমধ্যেই বিদেশী পর্যটকদের আগমন শুরু হয়েছে। আরো একাধিক প্রাসাদ আছে বর্তমান শেখ ও প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের। তার ভাইদের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যও তৈরি হয়েছে ছোটখাটো প্রাসাদ। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের অদূরে সমুদ্র থেকে ছিনিয়ে আনা জমির ওপর তৈরি হয়েছে আবুধাবি প্যালেস হোটেলÑ মূলত বিদেশী রাজা-রাজড়া ও প্রেসিডেন্টদের জন্য। সুতরাং অত্যন্ত বিলাসবহুল। অবশ্য চৌহদ্দির মধ্যে একটা বাড়তি ভবনে বাণিজ্যিক হোটেলও আছেÑ প্রতি রাতে অন্তত আড়াই-তিন হাজার ডলার রুম ভাড়া দেয়ার সামর্থ্য যাদের আছে তাদের জন্য।


তবে সীমিত বিত্তের পর্যটকদের জন্যও চার-পাঁচতারা হোটেল অনেক হয়েছে, প্রায় প্রত্যেকটি আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনের দু-চারটি করে হোটেল আছে। তা সত্ত্বেও ২০১০-২০৩০ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরো ৪২টি পাঁচতারা হোটেল তৈরি হবে। এই ২০-সালা প্রকল্পের স্থপতি-মডেল দেখতে গিয়েছিলাম আবুধাবি প্যালেস হোটেলে এবং দেখে চোখ কপালে ওঠে আর কি! মূলত সংস্কৃতি হচ্ছে এ প্রকল্পের উপজীব্য। প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের আর নিউইয়র্কের গুগেনহাইম মিউজিয়ামের শাখা তৈরি হবে, আবুধাবির নিজস্ব জাতীয় মিউজিয়াম, অ্যাকাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস তৈরি হবে। আনুষঙ্গিক অন্যান্য ইমারত তো থাকবেই। বলাই বাহুল্য, এসবই তৈরি হবে উপসাগর থেকে উদ্ধার করা জমিতে।


শেখ জায়েদ মারা গেছেন চার বছর আগে। তারপর থেকে আবুধাবির শাসক এবং আমিরাতের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। কিন্তু তার কয়েক ভাই এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত। শেখ জায়েদের মৃত্যুর পর থেকে তারা একটু বেশি উচ্চাভিলাষী এবং উদ্যোগী হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণের অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ফেব্র“য়ারি মাসে ফর্মুলা ওয়ান মোটর রেসিংয়ের সময় পর্যটকে টইটম্বুর হয়ে গিয়েছিল আবুধাবি। নতুন একটা এয়ারলাইন (এতিহাদ) খুলেছেন তারা। এই অল্প সময়ের মধ্যেই এতিহাদ এয়ারলাইন্সের সুখ্যাতি হয়েছে দুনিয়াজোড়া। আনকোরা নতুন আবুধাবি বিমানবন্দরের তিন নম্বর টার্মিনালে নেমেছিলাম আমরা। প্রায় দুবাই বিমানবন্দরের সমান হবে। তবে আমার কাছে অনেক বেশি সুন্দর মনে হলো। প্রতি ইঞ্চি ফ্লোর-স্পেস দুধের মতো সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত। সাগরে একটা কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে তৈরি হয়েছে মেরিনা (প্রমোদতরীর বন্দর) ও অত্যাধুনিক শপিং মল।


ইতোমধ্যেই পর্যটকের ভিড় শুরু হয়েছে নগরীর অদূরে দ্রুত সমাপ্তির পথের শেখ জায়েদ মসজিদ। তারা দাবি করছে সৌদি আরবের বাইরে এটাই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ মসজিদ। ইতালীয় মার্বেলে তৈরি (যে মার্বেল দিয়ে সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিসৌধ তাজমহল তৈরি করেছিলেন) এ মসজিদ তৈরি করেছেন শেখ জায়েদের পুত্ররা তার স্মৃতিতে। ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় হয়েছে। শেখ জায়েদের সমাধিও আছে এখানে। দিবারাত্রি ২৪ ঘণ্টা সেখানে কুরআন তেলাওয়াত হয়। কিন্তু সে সমাধি নিয়ে ধর্মীয় বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরব এ মসজিদের উদ্বোধন বর্জন করেছে, সৌদিরা কারো কবর বিশেষভাবে চিহ্নিত বা সুসজ্জিত করার বিপক্ষে।


তাজমহলের স্টাইলে কয়েকটি গম্বুজ আছে এ মসজিদে। আগাগোড়া শ্বেত মার্বেলে তৈরি মসজিদে তাজমহলের অনুকরণে মূল্যবান পাথর দিয়ে লতা-পাতার কারুকার্য খোদিত হয়েছে, ভেতরে বিভিন্ন কক্ষে রঙিন মার্বেলের সিলিং আর ফ্লোরে মনোরম কারুকার্য। চার দিকের বিশাল বাগানে পূর্ণদৈর্ঘ্য বহু খেজুরগাছ এনে লাগানো হয়েছে। বাগানে ও বাইরের ফটক ইত্যাদির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু বহু বিদেশী পর্যটক দেখেছি সেখানে। কয়েকটি বাংলাদেশী পরিবারও দেখলাম। স্থানীয় আরবরা নাকি দক্ষিণ এশীয়দের জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের তাজমহল কি এত সুন্দর?’


শেখ জায়েদ তেলসম্পদের অপচয় না করার যে নির্দেশ গোড়াতেই দিয়েছিলেন সেটা পুরোপুরি মেনে চলা হচ্ছে। আবুধাবি তার তেলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ করছে। এ লক্ষ্যে মরহুম শেখ জায়েদ গোড়াতেই একটা আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (আডিয়া) স্থাপন করেছিলেন। এ অথরিটি পৃথিবীর বহু দেশে, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় বহু ব্যাংকের বন্ড, ঘরবাড়ি-ইমারত, হোটেল, বন্দর ইত্যাদিতে অঢেল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখেছিলাম যে, আডিয়ার বিদেশী লগ্নির পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন (৫০ হাজার কোটি) ডলারেরও বেশি হবে। হয়তো পত্রিকায় পড়েছেন আপনারা, আডিয়ার মহাপরিচালক প্রেসিডেন্টের ছোট ভাই শেখ মোহাম্মদ বিন খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে মরক্কোতে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।


আমার স্ত্রী আর আমি এবার আবুধাবিতে গিয়েছিলাম আডিয়ার একজন সিনিয়র ম্যানেজারের আমন্ত্রণে। সুধা রঞ্জন দত্তের জন্ম সিলেটে, তার স্ত্রী শুক্লার জন্ম কুমিল্লায়। ’৮১ সালের সফরে তাদের সাথে পরিচয় হয়। ভাগ্যিস যোগাযোগ নষ্ট হয়নি। দু’তরফে আসা-যাওয়াও হয়েছে কয়েকবার। সুধা আডিয়ার কাজে বিশ্বময় ঘুরে বেড়ান। লন্ডনেও আসেন মাঝে মধ্যে। তখনো দেখা হয়। তাদের দুই ছেলেÑ বড় ছেলে সুমিত এখন স্থায়ীভাবে কানাডার টরোন্টোতে থাকেন, ছোট ছেলে সুজিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ছাত্র।
দত্তদের ছেলেদের প্রসঙ্গ তুললাম একটা বেড়ালের কাহিনী শোনাব বলে। সুমিত আবুধাবির কোনো ইংরেজ প্রবাসীর কাছ থেকে একটা বেড়ালছানা এনেছিল, নাম দিয়েছিল হলি। সুমিত আবুধাবি ছেড়ে গেছে পাঁচ বছর আগে। হলি শুক্লা ও সুধার কাছেই থাকে। আমরা গিয়ে যখন বাড়িতে ঢুকলাম হলি এসে নিঃশব্দে আমার পায়ের সাথে মাথা থেকে লেজের আগা পর্যন্ত পূর্ণ দেহ ঘসে গেল। বুঝতে পারছিলাম আমাকে তার পছন্দ হয়েছে, আমাকে গ্রহণ করেছে সে। ভারি সুন্দর দেখতে হলি। এক নজরেই আমার চিতাবাঘের উপমা মনে এসেছিল। আকারে লম্বা, বড়সড়, কিন্তু শরীরের অনুপাতে মাথাটা খুবই ছোট এবং ভারি সুন্দর দেখতে চোখ দুটো।


যে কয় দিন ছিলাম প্রায়ই আমার পায়ে শরীর ঘষতো হলি এবং তারপর পায়ের কাছে বসত। আমাদের ফেরার দিন বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বসেছিলাম। হাতে কিছু বাড়তি সময় ছিল। গল্প করতে করতে সুমিতের প্রসঙ্গ উঠল। আমার পায়ের কাছে শোয়া হলি উঠে দাঁড়াল। সোজাসুজি সুমিতের ঘরের বন্ধ দরোজার সামনে গিয়ে শুয়ে থাকল কিছুক্ষণ। হয়তো আমাদের কথাবার্তা থেকে তার মনে হয়েছিল সুমিত ফিরে এসেছে। কিন্তু দরোজা খুলছে না, সুমিত বেরোচ্ছে না ঘর থেকে। হলির আর ধৈর্য সইছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে সে লাফ দিয়ে দরোজার হাতল ধরার চেষ্টা করল। দু’বার, তিনবার এবং কয়েকবার। আর বোধ হয় অতটা উঁচুতে লাফ দেয়ার শক্তি ছিল না। দরোজার সামনে শুয়ে পড়ল হলি। সুধা ও শুক্লা কয়েকবার ডাকাডাকি করলেন। হলি কাছে এলো না। আমরা যখন বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে এলাম হলি তখনো ওভাবেই শুয়ে ছিল।


এবার আমরা গিয়েছিলাম ছুটিতে। তবু ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। বোধহয় দত্তদের কাছ থেকে খবর পেয়েছিলেন তারা। এখানকার শেখ খলিফা বিন জায়েদ বাংলাদেশ ইসলামিয়া প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষকরা এক দিন আমন্ত্রণ জানালেন। তাদের সুরম্য ও আধুনিক ভবনে শিক্ষকদের সাথে অনেক গল্প হলো, মূলত তারা বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী শুনতে চেয়েছিলেন। এ স্কুলের যাবতীয় ব্যয় বহন করে আবুধাবি সরকার। বিভিন্ন দেয়ালে লাগানো মার্বেল ফলক থেকেও জানা গেল রাষ্ট্রপতি লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ স্কুল পরিদর্শন করেছিলেন। শুনলাম এ স্কুলে বাংলাদেশের কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষা দেয়া হয় এবং শিক্ষার মান খুবই উঁচু।
এক সন্ধ্যায় আবুধাবির বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি এম এ মান্নান এবং কয়েকজন সদস্য দেখা করতে এলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তারা শুনেছেন, তার সম্বন্ধে অনেক গল্প বলেছিলাম তাদের।


কিন্তু বলছিলাম আবুধাবির কথা। বাহ্যিক পরিবর্তনের মতো সামাজিক পরিবর্তনও অনেক লক্ষ করলাম এবার আবুধাবিতে। উচ্চশিক্ষা শেষে নতুন প্রজন্ম এখন আবুধাবিতে ফিরে এসেছে এবং আসছে। সব ক্ষেত্রের উঁচু পদগুলো এখন তারা দখল করে নিচ্ছে, চুক্তি শেষে বিদেশী বিশেষজ্ঞরা স্বদেশে ফিরে যাচ্ছেন। আবুধাবিতে এথন ‘আমিরাতকরণ’ পুরোদমে চলছে। এর প্রভাব হয়েছে বহু রকমের। সামাজিক দিকটার কথাই আগে বলি। আশির দশকে নারীদের বোরকা পরা বাধ্যতামূলক ছিল। ’৮১ সালে দেখেছিলাম কোনো কোনো বাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়ছে উপলক্ষ ছাড়াই। জিজ্ঞেস করেছিলাম এক বিদেশী বিশেষজ্ঞকে। তিনি বলেছিলেন, পতাকা উড়িয়ে জানান দেয়া হচ্ছে যে, সে বাড়িতে বিবাহযোগ্য নারী আছে। সুতরাং বিবাহের প্রস্তাব আসতে পারে। মনে মনে খুব হেসেছিলাম সে দিন।


এবার বোরকা চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না। তবে পথেঘাটে, দোকানে প্রচুর নারী দেখেছি। অনেকে বিদেশী পোশাকও পরছেন। বেশির ভাগ তরুণী নারী বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এসেছেন এবং উঁচু পদে চাকরি কিংবা নিজস্ব ব্যবসায় করছেন। নারীদের মোটরগাড়ি চালানো এখন সাধারণ দৃশ্য। দশ বছর আগেও সেটা কল্পনা করা যেত না এবং সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানো এখনো বেআইনি। তবে একটা সামাজিক সমস্যার কথাও শুনেছিলাম। যুবকদের অনেকে উচ্চশিক্ষার সাথে সাথে বিদেশ থেকে স্ত্রীও নিয়ে এসেছেন। আবুধাবির উচ্চশিক্ষিত নারী বিয়ে করার জন্য উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছেন না। আবুধাবিতে বহুবিবাহ বৈধ, কিন্তু বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত নারীরা দুই কিংবা তিন নম্বর বউ হতে আর রাজি নন