সৌদি আরব কী ইরানের কাছে হেরে যাচ্ছে

Nov 15, 2017 05:59 pm
সালমান ও রুহানী

 

আলফাজ আনাম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর লেবানন নিয়ে একই ধরনের সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে সৌদি আরব। দেশটির ৩২ বছর বয়সী ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর শক্তি প্রয়োগের কূটনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। ইসরাইলের সমর্থন নিয়ে সুন্নি বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে। সৌদি আরবের আগ্রাসী নীতি এ অঞ্চলে ইরানের প্রভাব ও শক্তি বাড়িয়ে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক দখলের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে রেজিম চেঞ্জের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে যুদ্ধের পর ইরাকে শিয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব মূলত দেশটি নিয়ন্ত্রণ করছে।

ইরাকে আইএসবিরোধী যুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর সাথে শিয়া মিলিশিয়ারা অংশ নেয়। শিয়া ধর্মীয় নেতারা ছাড়াও দেশটির প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত। ইরাক একমাত্র দেশ ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমান সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। অপর দিকে সৌদি আরবের সাথে রয়েছে ইরাকের ৮ শ’ কিলোমিটার সীমান্ত। ফলে ইরাকের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে সৌদি আরবকে উৎকণ্ঠায় থাকতে হচ্ছে।


লেবাননে ইরানপন্থী রাজনৈতিক ও মিলিশিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ সুন্নি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সাথে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছে। দেশটিতে অব্যাহতভাবে ইরানের প্রভাব বাড়ছে। ইরানের সবচেয়ে বিশ^স্ত মিত্র সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে উৎখাতে ব্যর্থতার পর তিনি ক্ষমতাসীন থাকছেন। লিবিয়া আর ইয়েমেন হয়ে পড়েছে যুদ্ধক্ষেত্র। এ যুদ্ধের যেন কোনো শেষ নেই। অপর দিকে কাতারের সাথে বিরোধের কারণে দেশটি এখন ইরানের প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আরব লিগের মতো সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট (জিসিসি) ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।


এমন পরিস্থিতিতে সৌদি রাজপরিবারে ক্ষমতার লড়াই তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে একাধিক প্রিন্স, সাবেক মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীকে আটক করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতার মধ্যে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য লেবাননে হিজবুল্লাহবিরোধী তৎপরতা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেন। এর অংশ হিসেবে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব ডেকে এনে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। লেবাননে সরকার গঠনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকে, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায় থেকে, আর পার্লামেন্টের স্পিকার হন শিয়া সম্প্রদায় থেকে। সাদ হারিরিকে পদত্যাগ করানোর উদ্দেশ্য ছিল লেবাননে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। কারণ লেবাননে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিজবুল্লাহ। এর আগে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলেও তিনি তাতে রাজি হননি।

লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তৎপরতায় সৌদি আরবকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে ইসরাইল। কারণ হিজবুল্লাহর সশস্ত্র যোদ্ধারা ইসরাইলের জন্য বড় হুমকি। সাদ হারিরি সৌদি আরব এসে পদত্যাগ করলেও হিজবুল্লাহ দেশটির সুন্নি প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাচ্ছে। এমনকি লেবাননের সব রাজনৈতিক দল সৌদি নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাকে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টির সৌদি কৌশল কার্যত ব্যর্থ হয়ে পড়ছে।


এমন পরিস্থিতির মধ্যে ইয়েমেনের শিয়া হুতি বিদ্রোহিরা সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সৌদি আরব হুতিদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র দেয়ার জন্য ইরানকে দোষারোপ করছে। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে হুতিরা গোপনে উত্তর কোরিয়া থেকে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পেয়ে থাকতে পারে। ইয়েমেনের সাথে সৌদি আরবের ১৮ শ’ কিলোমিটারের সীমান্ত আছে। যদি হাউছিরা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পেয়ে থাকে তাহলে সৌদি আরবের জন্য তা হবে বড় ধরনের বিপদের কারণ। এ ছাড়া বৃহৎ কোনো শক্তি বিশেষ করে রাশিয়ার নীরব সমর্থন ছাড়া হাউছি যোদ্ধাদের হাতে এমন সমরাস্ত্র আসার কোনো কারণ নেই।
সম্প্রতি সৌদি বাদশাহ রাশিয়া সফর করলেও দেশটির সিরিয়া নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সিরিয়ায় রাশিয়ার বেশ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা এর আগে নিহত হয়েছে।

২০১১ সালের মার্চ মাস থেকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে রাশিয়া বাশার আল আসাদের পক্ষে কথিত আইএসবিরোধী যুদ্ধে যোগ দেয়। একই সময় ইরান ও হিজবুল্লাহ সিরিয়ায় সৈন্য পাঠায়। সৌদিসমর্থিত যোদ্ধাদের হাতে রাশিয়ান সেনাকর্মকর্তারা নিহত হন। ফলে হুতিদের হাতে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে রাশিয়ার সমর্থন অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে রাশিয়া বেশি সক্ষমতা দেখাতে পারছে। রাশিয়া জোরালোভাবে ইরানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো সংগঠনের সাথে রাশিয়া যোগাযোগ রাখছে। কয়েক বছর আগে হামাস নেতা খালিদ মিশাল রাশিয়া সফর করেন। হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজা মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু হামাস নেতাদের ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে সৌদি আরব। বাস্তবতা হচ্ছে বেশির ভাগ আরব দেশে যেমন শিয়া প্রভাব বাড়ছে, তেমনি সুন্নি মুসলিম দেশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশের সাথে ইরান কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। অপর দিকে ইরানকে সামনে রেখে মধ্যপ্রাচ্য নীতি গ্রহণ করেছে রাশিয়া। আরব বসন্তের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নীতির একটি পর্বের অবসান হয়। এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে থাকে। এখন সৌদি আরব ও ইসরাইলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সৌদি আরব ও দেশটির উপসাগরীয় মিত্ররা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। লেবানন বা কাতারের মতো ছোট দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে পড়ছে।


আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের স্বার্থের সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও তুরস্কের কুর্দিদের নিয়ে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু ইরাক, ইরান ও তুরস্ক স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্রের ঘোরবিরোধী। তুরস্কের কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ওয়াইপিজির বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে ইরান তুরস্ককে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া মাসুদ বারজানির নেতৃত্বে ইরাকের কুর্দিস্থানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারেও কঠোর অবস্থান নেয় তুরস্ক। এ ক্ষেত্রে ইরাক সরকারকে সমর্থন দিয়েছে দেশটি। ফলে গণভোটের পরও স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগোতে পারেনি ইরাকের কুর্দিস্থান।


মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নানামুখী স্বার্থের সম্পর্কের মধ্যে ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্কের সাথে রাশিয়ার সামরিক সম্পর্ক বাড়ছে। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ মিসাইল কেনার চুক্তি করেছে তুরস্ক। এই প্রথম কোনো ন্যাটো সদস্যদেশ রাশিয়ার সাথে সামরিক চুক্তি করল। তুরস্কে মার্কিন সমর্থনে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর থেকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করে তুরস্ক। এ সপ্তাহেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠকে বসেছে রজব তাইয়েব এরদোগান। এই বৈঠকে লেবানন ও সিরিয়া ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। ক্রেমলিনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, পুতিন-এরদোগান বৈঠকে এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা হবে, যা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
লক্ষণীয় দিক হচ্ছে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সৌদি আরবকে একটি মধ্যপন্থী ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার যে ঘোষণা দিয়েছেন তার সমালোচনা করেছেন রজব তাইয়েব এরদোগান। তিনি বলেছেন, ইসলামের পরিচয় ইসলাম। একে মধ্যপন্থী বা উদার বলে উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আসলে সুন্নি মুসলিম বিশে^র নেতা হিসেবে সামনে চলে এসেছে তুরস্ক।

বেশ কিছু দিন থেকে তুরস্কের সাথে সৌদি আরবের শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছে। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের পর দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। কাতারের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে দেশটির আমিরের আহ্বানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে তুরস্ক। প্রায় ২০ হাজার তুর্কি সৈন্য এখন কাতারে অবস্থান করছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।


এমন সম্ভাবনায় সবচেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে ইসরাইল ও সৌদি আরব। সম্প্রতি ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাঁস হওয়া কিছু তারবার্তার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে তেলআবিব দেশটির কূটনীতিকদের নির্দেশনা দিয়েছেন সৌদি আরবকে যেন সুন্নি মুসলিম বিশে^র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তারা প্রভাব বিস্তার করেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সামনের দিনগুলো সৌদি আরবের জন্য হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ অঞ্চলে সৌদি আরবের চাপ প্রয়োগের কূটনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা দেশটিকে বন্ধুহীন করে তুলছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান প্রভাব বিস্তার করছে। বৃহৎ শক্তি রাশিয়ার সাথে ইরান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এখন প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।