কী চায় কুর্দিরা , কার বিরুদ্ধে তাদের লড়াই

Nov 14, 2017 05:54 pm
কুর্দিদের  স্বপ্ন ও সম্ভাবনার গল্প

 

কুর্দিরা বাস করে ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে। তারা চায় একটি স্বাধীন আবাসভূমি। যদিও এই চাওয়ায় আছে অনেক অস্পষ্টতা। তবে সামনে যা-ই থাকুক, তারা লড়াই করেই যাবে। কুর্দিদের এই স্বপ্ন ও সম্ভাবনার গল্প বলেছেন ঐশী পূর্ণতা


কুর্দিদের আছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। আছে সুইজারল্যান্ডের সমান আয়তনের ভূখণ্ড (যদিও এর বিরাট অংশই পাহাড়ি এলাকা)। তবু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, তারা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ভোগ করেছে খুব কম সময়ই। বেশির ভাগ সময়ই তাদের থাকতে হয়েছে পারসিক, আরব, ওসমানীয় ও তুর্কিদের অধীনে। অথচ তাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক ও ইরানে বসবাসরত কুর্দির সংখ্যা আড়াই কোটির মতো হবে বলে ধারণা করা হয়, যদিও সত্যিকার সংখ্যাটা এখনো অজানা।


ইরাকি কুর্দিস্তানের কথাই বলা যাক। সাদ্দামের পতনের পরও কুর্দিস্তান ইরাকের অধীনেই ছিল, কিন্তু সেই থাকাটা না থাকার মতোই। এ সময় সেখানে বিপুল হারে বিদেশী বিনিয়োগ আসতে থাকে। তেল রফতানির অর্থ দিয়ে হতে থাকে চোখধাঁধানো উন্নয়ন। ‘কুর্দিস্তানের প্যারিস’ নামে পরিচিত স্লেমানি নগরীতে উঠতে থাকে একের পর এক আকাশছোঁয়া ভবন। রাজধানী হিউলারে চোখের পলকে গজিয়ে ওঠে অনেক শপিং মল, বিলাসবহুল গাড়ির দোকান এবং ক্যাফে। প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আসে ব্যাপক উন্নতি। পর্যটক ও ব্যবসা আকর্ষণের জন্য স্লোগান ওঠে : ‘কুর্দিস্তান, আরেক ইরাক’। এ সময় অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় ৫০ লাখ কুর্দি চলে আসে কুর্দিস্তানে। সব মিলিয়ে এই ক’টি বছর যেন ছিল কুর্দিস্তানের স্বর্ণযুগ সাদ্দাম আমলের মতো ভয় নেই, বরং চার দিকে নতুন কিছু করার বিপুল সম্ভাবনা। ঠিক এই সময়টায় কুর্দিস্তানে বেড়ে উঠছিল তরুণ প্রজন্ম। বোতান শারবারঝেরি যাদের একজন।

 

কেমন ছিল সময়টা
সেই দিনগুলোর কথা ভুলতে পারে না শারবারঝেরি। তার কথা : কী সব দিন যে ছিল! মনে হতো, সবই সম্ভব। জীবন বয়ে চলছিল। আমি তখন নেহাত এক কিশোর। কিন্তু মা-বাবাকে দেখতাম, আশপাশের সবাইকেও। কী নিঃশঙ্ক জীবন!
তারপর? তারপর আইএস নামের এক জঙ্গিগোষ্ঠী ঢুকে পড়ল ইরাকে। শুরু হলো গৃহযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল পশ্চিমা দেশগুলোও। ইরাক ও সিরিয়ান কুর্দিদেরও জড়িয়ে ফেলল তারা। তাদের অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইল, এ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পাবে তারা। এ ক্ষেত্রে তাদের বড় অনুপ্রেরণা ইসরাইল। চার দিকে শত্রুবেষ্টিত ছোট ইসরাইল রাষ্ট্রটি যদি টিকে থাকতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? এই ধারণা ও বিশ্বাস অসংখ্য কুর্দির। তারা বলেও, ‘আমেরিকা, ইসরাইল, কুর্দিস্তান এই তিন এক হলে আমরা অবশ্যই জয়ী হবো।’


‘জয়ী হবে? কিন্তু কার বিরুদ্ধে?’ প্রশ্ন করা হলে জবাবও তৈরি, ‘সবার বিরুদ্ধে, সবকিছুর ওপর। বিশেষ করে আরবদের বিরুদ্ধে।’
কেন? বক্তার জবাব, আমি সাদ্দাম ও আইএসের মধ্যে কোনো তফাৎ দেখি না। আর আইএসে তো সাদ্দাম বাহিনীর অনেক অফিসার আছে।

 

স্বাধীনতার দুর্গম পথ
পৃথিবীর যেকোনো জাতির পক্ষেই স্বাধীনতা অর্জনের পথটি দুরূহ। কিন্তু কুর্দিদের জন্য পথটি দুরূহতর। কারণ, কুর্দিরা যেসব অঞ্চলে বসবাস করে, অঞ্চলভেদে তাদের ভাষাটি কিছুটা ভিন্নতর হয়ে যায়। আর তারা অসংখ্য দল-উপদলে বিভক্ত। তাই বলা হয়ে থাকে, সুযোগ দেয়া হলেও কুর্দিরা বৃহত্তর কুর্দি রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে না। তাদের সমস্যা হচ্ছে তাদের হীনম্মন্যতাবোধ এবং বিয়োগান্তক অতীত কাহিনীতে মজে থাকার অভ্যাস।


তারপরও কিছু কিছু দল স্বাধীনতা চাচ্ছে। ইরাকি কুর্দিস্তানের স্বাধীনতাকামী দলগুলোর এমনকি পার্লামেন্ট আছে, প্রেসিডেন্ট আছে, আছে সামরিক বাহিনীও। কিন্তু তারপরও তাদের ইরাকের অধীনেই থেকে যেতে হচ্ছে। কেননা, পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা চায় না কুর্দিস্তান স্বাধীন হোক। চায় না নিকট প্রতিবেশী কয়েকটি দেশও। তাই সাদ্দামের পতনের পর কুর্দিস্তান যখন আভাস দেয় যে, তারা ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন ক্ষিপ্ত হয় শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক ও ইরান এবং দক্ষিণের ইরাকি আরবরা।

 

চলে এলো যুদ্ধ

আগেই বলা হয়েছে, সাদ্দাম শাসন অপসৃত হওয়ার পর কুর্দিস্তানে হঠাৎ যেন স্বর্ণযুগ চলে আসে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সুদিনের অবসান ঘটে। ইরাকে রাতারাতি আবির্ভাব ঘটে এক নব্য জঙ্গিগোষ্ঠীর। আইএস নামের এই জঙ্গি দল জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে থাকে চার পাশ। খুন, ধর্ষণ, অপহরণের ভয়াল রাত নেমে আসে ইরাকে।


এ অবস্থায় অসংখ্য ইরাকি ও কুর্দি তরুণ যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। তাদেরই একজন শারবারঝেরি। তাদের আবাস ‘কুর্দিস্তানের প্যারিস’ নামে খ্যাত স্লেমানি শহরে। সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আর অবসরে মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের তালিম নেয়। স্বপ্ন দেখে, একদিন নামকরা সঙ্গীতজ্ঞ হবে, তার রেকর্ড বেরোবে। ছেলের স্বপ্ন শুনে শিক্ষক-বাবা হাসেন। বলেন, ‘ওসব স্বপ্নটপ্ন বাদ দে তো বাপ! তুই হবি ইঞ্জিনিয়ার, বাড়ি বানাবি, সেতু বানাবি...।’


কিন্তু নিজের বা বাবার, কারো স্বপ্নই বাস্তবায়ন হয় না শারবারঝেরির জীবনে। ২৪ বছর বয়সে একদিন সে পথে বেরিয়ে পড়ে। সমমনাদের নিয়ে গঠন করে একটি যোদ্ধাদল। সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে পরিকল্পনাও করে ফেলে যুদ্ধই করবে তারা। তবে ইরাকের হয়ে নয়, মাতৃভূমি কুর্দিস্তানের জন্য। কিন্তু লড়তে হলে তো অস্ত্র লাগে, অস্ত্র কোথায়? শারবারঝেরি তার প্রিয় বাদ্যযন্ত্রটি বিক্রি করে কিনল একটি একে-৪৭ রাইফেল। তার কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিল না, সুতরাং কে তার পথ আটকাবে? মা ও বাবা অনেক যুক্তি দেখালেন, কান্নাকাটি করলেন, বোঝালেন। কিন্তু মানুষের জীবনে বুঝি এমন একটা সময় আসে, যখন কোনো কিছুই তার পথ আটকাতে পারে না। অতএব, শারবারঝেরি যুদ্ধে চলে গেল।


উল্টো পথের আরেক জন

শারবারঝেরি এবং তার মতো আরো অনেক কুর্দি তরুণ যখন যুদ্ধে গেল আইএসের বিরুদ্ধে, তখন প্রতিপক্ষ দলের (আইএস) হয়েও যুদ্ধে যোগ দেয় ইরাকি তরুণদের একটি অংশ। এরকম একজন সামি হুসেইন। বয়স কত হবে আর, ২২ কী ২৩! বাড়ি তার কিরকুকে, যেখানে আছে বিরাট তেলখনি বাবা গুরজুর।


উজ্জ্বল গায়ের রঙ, মুখে মানানসই দাড়ি, অল্প বয়স এ তরুণ কেন গেল যুদ্ধে? তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সে তার মসজিদের ইমামের কথায় প্রভাবিত হয়ে ‘জেহাদে’ যোগ দিতে প্রলুব্ধ হয়েছে। কিন্তু এটাই কি সব? তার চেয়েও বড় কথা, এই তরুণ তার সামনে কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিল না। সত্যি বটে, সাদ্দাম-পরবর্তীকালে কুর্দিস্তানে একটা সোনালি সময় গেছে কুর্দিদের। কিন্তু তার সুফল কিছুই পায়নি ইরাকি আরবরা। বরং অনেক স্থানে তাদের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে।


একপর্যায়ে সরকারি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে তরুণ এই যোদ্ধা। এক বিদেশী সাংবাদিক এ সময় তার সাথে কথা বলার সুযোগ পান। তাকে অনেক কথা বলে সামি। বলে, ফেসবুক এবং অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়ার প্রচারণা এবং স্থানীয় ইমাম-আলেমদের কথায় তার বিশ্বাস জন্মে যে, ইসলাম বিপন্ন। তা ছাড়া অ্যাডভেঞ্চারিজম তো ছিলই। অতএব, একদিন মাকে কিছু না বলেই যুদ্ধে চলে যায় সে। কয়েক মাস পর মাকে দেখতে এসে ধরা পড়ে যায়।


অবশ্য আইএস জঙ্গিদের দলে ভিড়ে যা দেখে তাতেই মাথা ঘুরে গিয়েছিল সামি হুসেইনের। সে এসেছিল শত্রুর হাতে আক্রান্ত ইসলামকে রক্ষা করতে। অথচ আল্লাহর নাম ব্যবহার করে ওই জঙ্গির দল করছে কি না খুন, ধ্বংস, ধর্ষণ ও নিপীড়ন।

 

কিরকুকের যুদ্ধ

অথচ এমন পরিবেশ তো কখনোই দেখেনি, ভাবেনি সামি! তার শহর কিরকুক ছিল কুর্দি, আরব, তুর্কমেন এবং শিয়া, সুন্নি ও খ্রিষ্টানদের বসতভূমি। ঠিক যেন ‘মিনি ইরাক’। এখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ও মত-পথের মানুষেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস করেছে তাদের বৈচিত্র্য, প্রেম ও সৌন্দর্যের মধ্যে। এখানে তাদের দিগন্তবিস্তৃত গমের ক্ষেত মিশেছে তেলক্ষেত্রের প্রান্তে।


এই শান্তির নগরে ২০১৪ সালের জুন মাসে ঘটল এক অভাবিত ঘটনা। আইএসের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ইরাকি বাহিনী ঢুকল শহরে এবং সব বেসামরিক মানুষকে শহর ছাড়তে হলো। অথচ এই কিরকুক শহরটিকে কুর্দিরা মনে করত নিজের শহর বলে। স্বৈরাচারী শাসক সাদ্দাম কতবার চেষ্টা করেছে কুর্দিদের এই শহরছাড়া করতে। পারেনি। আর আজ, আজ তা-ই হলো!


তবে কাজটি সহজে হয়নি। ইরাকি বাহিনী ও আইএস জঙ্গি এই দু’ধারী তরবারির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল কুর্দিস্তানের নিজস্ব সেনাবাহিনী এবং শারবারঝেরির মতো তরুণদের নিয়ে গড়া স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধার দল। ওদিকে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসছে আইএস জঙ্গিরা। তারা প্রথমে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নিলো। কচুকাটা করল এক হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিককে। তারপর একদিন ভোরে পৌঁছে গেল কুর্দিস্তানের রাজধানী হিউলারের (আরবিতে এরবিল) দোরগোড়ায়।


কুর্দিরা তৈরি হয়েই ছিল কেউ পালানোর, কেউ বা প্রতিরোধের জন্য। সাহসী কিন্তু অসংগঠিত সৈন্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা খণ্ড খণ্ড লড়াই শুরু করল আগুয়ান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। সৈন্যদের অনেকে রণাঙ্গনে এলো ট্যাক্সিতে চড়ে। তাদের গায়ে বেমানান ছদ্মবেশ, হাতে পুরনো ও অচল রাইফেল। পশ্চিমা বিমানগুলো অবশ্য এ সময় তাদের কভার দেয়। এখানে আইএস জঙ্গিদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায় কিরকুক। কুর্দিরা পরিচিতি হয় আইএস ঠেকানো অল্প ক’টি বাহিনীর অন্যতম হিসেবে।


তবে নগর রক্ষা পেলেও নগরীর বাইরে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতেই থাকে। এসময় একদিন কিরকুক নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিমে সাইয়িদ খালাফ গ্রামে আইএস ঘাঁটিতে হামলা চালাতে যাচ্ছিল কুর্দি সেনাবাহিনীর একটি দল। তাদের কভার দিতে পেছনে যাচ্ছিল শারবারঝেরির নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধাদের দলটি। এ সময় জঙ্গিদের গুলিতে আহত হয় শারবারঝেরি। তখনই কুর্দি সৈন্যদের দলটি পিছু হটে। শারবারঝেরিকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।


খবর পেয়ে হাসপাতালে ছেলেকে দেখতে আসেন শারবারঝেরির মা ও বাবা। তার মা শুধুই কাঁদছিলেন আর বাবা এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তার মুখ দিয়ে কথাই সরছিল না। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘কিসের জন্য, বীরত্ব দেখাতে? দেশপ্রেম? আরে, আমাদের তো দেশই নেই!’


শারবারঝেরির বাবা মোহাম্মদ পরে স্বীকার করেন, হাসপাতালে তিনি যতই রাগারাগি করুন না কেন, ছেলের জন্য তিনি আসলে গর্বিত। তিনি বলেন, ‘কুর্দিস্তান বলে কোনো দেশ কোনো দিন আদৌ হবে একথা আমরাই সবসময় বিশ্বাস করি না। তারপরও কুর্দিস্তানের জন্য লড়ব আমরা সবাই।’
এটাই কুর্দি চরিত্র। এটাই কুর্দিস্তান। কুর্দিস্তান লড়ে যাবে, সামনে যা-ই থাক।