বিশ্বের দূর্গম ও নিকৃষ্টতম স্থানটি যেভাবে আকর্ষনীয় এলাকায় পরিনত হলো

Nov 13, 2017 12:03 pm
বিজনভূমি ছিল সাইবেরিয়া

 

[কাদাময় মাটি, দুর্গম ঘন বন আর তীব্র হাড় কাঁপানো শীত সব মিলে এক সময় পৃথিবীর ‘নিকৃষ্টতম’ বিজনভূমি ছিল যে সাইবেরিয়া, মাটির নিচে তেল খুঁজে পাওয়ার পর সেই নিকৃষ্ট জায়গাটিই হয়ে উঠেছে বহু মানুষের আরাধ্য গন্তব্য। সেই বদলে যাওয়ার গল্প বলেছেন পল স্ট্যারোবিন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকা অবলম্বনে লিখেছেন জুলফিকার হায়দার]


মধ্যরাত। প্যালেস রেস্টুরেন্টের বলরুম। ধীরলয়ের একটা মিউজিকের সাথে নাচের ঢঙ বদলাচ্ছিল ড্যান্স ফ্লোরের জুটিরা। গায়কদের কণ্ঠে গান ‘জা নাস, জা নেফ্ট’ (আমাদের কাছে, তেলের কাছে...)।

জীবন আমাদের যেখানে এনেছে
আমাদের কাছে, তেলের কাছে
গ্লাসগুলো আমাদের ভরে ওঠে ঠিক...

পশ্চিম সাইবেরিয়ার খান্টি-মানসি প্রদেশে ‘নেফটিয়ানিকি’ উৎসব হচ্ছে। রক্ত পানি করে তেলের জোগান দেয় যারা, সেই তেল শ্রমিকদের সম্মানে এই উৎসব। প্রতি বছরই ভ্যাপসা গরমের মৌসুমের পরে তুষারপাতের আগ দিয়ে এই আয়োজন জমে ওঠে। সূর্যাস্তের ঘণ্টাকয়েক আগে পড়ন্ত আলোয় কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে খোলা মাঠে। স্টেজ বানানো হয়েছে। পেছনে গহিন ঘন সবুজ বন। বেলুন ওড়ানো হলো, মশাল জ্বলে উঠল আর বেজে উঠল সেই গান :


একটা সুখই শুধু আমাদের
আর কিছু চাই না তো আর
তেলের ফোয়ারায় মুখ ধুই মোরা
পাশে ওই খননের হাতিয়ার

রাশিয়ায় তেলের মাখামাখি অবস্থা দেখে ভিরমি খাওয়ার কিছু নেই। সুদিন এখন তাদেরই। আটানব্বই থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত তেলের দাম বেড়েছে প্রায় দশ গুণ। আর এ দিকে সৌদি আরবের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে এখন রাশিয়া। ক্রেমলিনের বাজেট তো ফুলে কলাগাছ। স্কুল, রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা সব খাতেই এখন মোটা বরাদ্দ। মস্কোর ধনাঢ্যরাও এখন নতুন ফ্যাশনের প্রাসাদ নির্মাণে ব্যস্ত।


রাশিয়ার এই প্রাচুর্যের জোগান দিচ্ছে পশ্চিম সাইবেরিয়ার কাদা-মাটি ছাওয়া তেলকূপগুলো। দেশটির ৭০ শতাংশ তেলই আসে ওখান থেকে। দিনে উৎপাদন হয় প্রায় ৭ মিলিয়ন ব্যারেল। খান্টি-মানসির আয়তন প্রায় ফ্রান্সের সমান। নাম শুনলেই কঠিন, জনমানবহীন একটা ভূমির দৃশ্য কল্পনায় আসে।

 

মাটির নিচে তেলের খোঁজ পাওয়ার পর থেকে সেটাই এখন হয়ে উঠছে অনেকের আরাধ্য জায়গা। তেলের অর্থে নতুনভাবে গড়ে উঠছে খান্টি-মানসির আঞ্চলিক রাজধানী। এখন সেখানে বিমানবন্দর হয়েছে, আর্ট মিউজিয়াম হয়েছে। ১৯ শতকের রাশিয়ান শিল্পীদের নামীদামি কাজ দিয়ে সাজানো হয়েছে মিউজিয়ামটি। বোর্ডিং স্কুল হয়েছে কয়েকটা। যন্ত্রপাতিতে একেবারে ভর্তি স্কুলগুলো। গণিত আর আর্ট পড়ানো হচ্ছে সেখানে। রাজধানী কেন, সুরগুটের কথায় ধরুন। কয়েক দশক আগেও এই শহরটি বন্যার পানির নিচে থাকত অধিকাংশ সময়। এখন নিত্যনতুন শহরতলি গজিয়ে উঠছে সেখানে। রাস্তায় রীতিমতো গাড়ির জ্যাম পড়ে থাকে।


তবে তেলের এই রমরমা অবস্থা নাও থাকতে পারে। প্রচুর উৎপাদন হচ্ছে ঠিক, কিন্তু গেল বছরগুলোতে পশ্চিম সাইবেরিয়ায় উৎপাদন ঠিক বাড়েনি। ২০০৪ থেকে ২০০৭ এই সময়টাতে উৎপাদন বলতে গেলে একই রয়েছে। ক্রেমলিনের কর্তারা বড় বড় বণিকদের থেকে তেলকূপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ার পর থেকেই এই দশা চলছে। আগের শাসকরা নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করতেন। কিন্তু তেলকূপে তারা বিনিয়োগও করেছিলেন অঢেল। ক্রেমলিনের বর্তমান কর্তাদের আগ্রহ অন্যখানে। সম্পদ শুধু নয়, তেলকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে আবারো সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তারা। তাদের নীতির কারণে হতাশ হচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। খান্টি-মানসির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নটাও সে কারণেই একটু থিতিয়ে গেছে বৈকি।


পশ্চিম সাইবেরিয়া এক সময় ছিল রাশিয়ার রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসন কেন্দ্র। এক মার্কসবাদী এটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা বলেছিলেন। সেই নিকৃষ্টতম জায়গার দিকেই এখন পৃথিবীর বহু দেশ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দুর্গম এই অঞ্চলটি মূলত লম্বা বার্চ, সিডার আর পাইনের গভীর ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সবখানে কাদার মধ্যে জমে আছে পিট। বছরের বেশির ভাগ সময়ই জমে থাকে ওগুলো। মাঝে মাঝে ফোকর গলে মিথেনের বুদবুদ ওঠে। কোনো পর্বত নেই কোথাও। পাহাড় আছে অল্প কয়েকটা। তবে লেক নদী আর ঝরনা আছে অসংখ্য।


তেল উত্তোলন শুরু হয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে। ভূ-তাত্ত্বিকরা বললেন, বড় ধরনের রিজার্ভ আছে ওখানকার মাটির তলে। শুনেই সামরিক স্টাইলে একটা দল সেখানে পাঠিয়েছিল ক্রেমলিনের মালিকরা। পরে দেখা গেল পশ্চিম সাইবেরিয়ার মাটির নিচেই কালো সোনার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। পরিমাণটা কারো কল্পনাতেও ছিল না তখন। ৪০ বছরে ওখান থেকে উত্তোলন হয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল।


‘শুরুতে সাইবেরিয়া ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের মতো’, বললেন খান্টি-মানসির গভর্নর আলেকজান্ডার ফিলিপেনকো। ভদ্রলোকের বয়স ৫৮। যদিও একটু বেশিই বৃদ্ধ দেখাচ্ছিল তাকে। পাকা চুল, ভাসা ভাসা চোখ আর নাকে ফোঁটা ফোঁটা দাগ তুষারপাতের চিহ্ন। সত্তর দশকের শুরুর দিকে খান্টি-মানসি এসেছিলেন ফিলিপেনকো। ওব নদীর ওপর একটা সেতু নির্মাণের দায়িত্ব দিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছিল। ১৯ শতকের শেষ দিকে ওই পথেই নির্বাসনে নিয়ে আসা হতো বন্দীদের। ব্রিজটি বানাতে কঠিন অবস্থার মধ্যে চার বছর অমানুষিক খাটতে হয়েছে। তবু সেই গল্প যখন বলেন ফিলিপেনকো, মনে হয় যেন তরুণ বয়সের প্রেমের গল্প বলছেন।

 

ফিলিপিনকোর নতুন কাজ খান্টি-মানসিকে নতুন করে সাজানো। এ কাজ নিয়েও আশাবাদী তিনি। ৬০ হাজারের মতো মানুষ আছে এখানে। বিনির্মাণের প্রত্যেকটা ছোটখাটো দিক পর্যন্ত নিজে নজরদারি করেন তিনি। সুবিধা হলো, পছন্দের মতো করে শহর গড়তে ফান্ডের অভাব নেই তার। তেল খাত থেকে বছরে রেভিনিউ আসে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এখান থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয় খান্টি-মানসির উন্নয়নে। বাকিটা পাঠানো হয় মস্কোতে।
ফিলিপেনকোর দলীয় পরিচয় খুব বড় নয়। নির্মাণকাজেও সোভিয়েত স্টাইলের দিকে আগ্রহ নেই তার। শহরের সবচেয়ে বড় স্থাপনাটি একটি প্রকাণ্ড শপিং অ্যাম্পোরিয়াম। এর ওপর বসানো হয়েছে বিরাট সবুজ এক গম্বুজ। এই অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী খান্টি, মানসি কিংবা অন্যরা তাঁবুর মাথায় যেমন গম্বুজ বানাত তার সাথে মিল রেখে বানানো হয়েছে এটি। সোভিয়েত আমলে এটা কল্পনাও করা যেত না। দেশজুড়ে শুধু ‘শ্রমিক’ ছিল তখন। স্থানীয় সংস্কৃতির সব গুরুত্বই পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল সে সময়।


সাইবেরিয়ার তেল অধ্যুষিত জায়গায় যখন উন্নয়ন শুরু হলো, স্থানীয়দের তখন জোর করে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হলো। উৎখাত করা হলো শিকারের আর মাছ ধরার জমি থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যাযাবর মানুষরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তেলক্ষেত্রগুলোতে বিচরণের অধিকারও দেয়া হয় তাদের। এই স্বীকৃতি আর রাজধানীর ব্যাপক উন্নয়নের পরও তাদের অনেকের অবস্থারই তেমন উন্নতি হয়নি। সংখ্যায় তারা বেশি না, সাকুল্যে ৩০ হাজারের মতো। ভাষাও প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাদের ঘাড়েও চেপে বসেছে আধুনিক রাশিয়ার তিন অভিশাপ এইডস, মাদকাসক্তি আর যক্ষ্মা। তেল রেভিনিউয়ের কিছু অর্থ এখন যদিও চিকিৎসার কাজেও লাগানো হচ্ছে। মাঝে মাঝে নদীপথে মেডিক্যাল জাহাজ আসে বৈকি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা রোগ চিহ্নিত করে চলে যায়, চিকিৎসার কোনো হদিস দেয় না।


খালি হয়ে যাচ্ছে রাশিয়ার গ্রাম্য এলাকা। তরুণ প্রজন্ম গ্রাম ছেড়ে মস্কো কিংবা বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমায়। তাদের ফেরাতে উচ্চাভিলাস পরিকল্পনা রয়েছে ফিলিপেনকোর। খান্টি-মানসিকে এমনভাবে বদলে দিতে চান তিনি, যাতে তরুণরা এখানেই থেকে যায়। গর্বের সাথে জানালেন, তার পরিকল্পনায় কাজ হচ্ছে। জন্মহারের দিক থেকে পুরো রাশিয়ায় খান্টি-মানসির অবস্থান এখন তৃতীয়। পুরো রাশিয়ার যেখানে জনসংখ্যা কমছে, সেখানে ১৯৮৯ সাল থেকে খান্টি-মানসির জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন জন্ম নেয়া শিশুদের পাশাপাশি অভিবাসীরাও রয়েছে।


রাজধানীর অর্থনীতির ৯০ শতাংশই গড়ে উঠেছে তেল বাণিজ্যকে ঘিরে। এতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তেলের দামও সেই সাথে বেড়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির একটা সীমাবদ্ধতা আছে। এক সময় তাদের সম্পদ ফুরিয়ে যাবে। তখন নতুন উৎসের খোঁজ করতে হবে। ভবিষ্যতের ভাবনা তাই এখনই ভাবতে শুরু করেছেন ফিলিপেনকো। ‘আকাদেমগোরোদোক’ থেকে ৮০ শীর্ষ গবেষককে খান্টি-মানসিতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। দক্ষিণ সাইবেরিয়ার বিখ্যাত বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই আকাদেমগোরোদোক। সোভিয়েত আমলে গড়া হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। খান্টি-মানসিতে নতুন ইনস্টিটিউট গড়তে বলা হয়েছে গবেষকদের। এই প্রতিষ্ঠান তেল কোম্পানিগুলোতে পরামর্শ দেবে। পাশাপাশি ন্যানোটেকনোলজির মতো আগামী দিনের প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করবে এই প্রতিষ্ঠান।


“একটা ‘সিলিকন টাইগা’র এটা শুরু”, বললেন ৬০ বছর বয়সী গণিতবিদ আলেকজান্ডার শেরবাকোভ। বললেন, সহজ তেলের দিন তো ফুরিয়ে আসছে, এখন নিজেদের বিশেষজ্ঞ নিজেরাই তৈরি করব আমরা। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে তরুণদের। তেলের পাশাপাশি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়লে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যাবে। সেই সাথে মজবুত হবে আঞ্চলিক অর্থনীতির ভিত আর মানুষের ভবিষ্যৎ।

 

ড. পুসটোভিটকে বললাম, রাশিয়ার তেলশিল্প নিয়ে অনেক দুর্নীতির কথা শোনা যায়। তীক্ষèদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন তিনি। ধাত্রী ওয়ার্ডের চার দিক দেখিয়ে বললেন, ‘এ সবই তেল। তেল ব্যবসায়ীরাই এই হাসপাতাল গড়েছে। এই শহরের প্রতিটি টুকরো, চওড়া সুন্দর রাস্তাঘাট সবই তেলের টাকায় বানানো।’ তার দৃষ্টিতে যেন আকুতি ঝরে পড়েছিল : আমাদের এত কঠিন করে ভাববেন না। জীবন এখনে কখনোই এতটা মধুময় ছিল না আর।