বিন সালমান যেভাবে নিজের ক্ষমতা সংহত করছেন

Nov 08, 2017 04:19 pm
মোহাম্মদ বিন সালমান


আলফাজ আনাম


সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে এখন নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির সাথে আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা তীব্রতর হচ্ছে। ইতোমধ্যে মোহাম্মদ বিন সালমান রাষ্ট্রের পূর্ণনিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। একই সাথে তিনি ইরানের সাথে উত্তেজনাকর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। যার সূচনা হয়েছে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরবে এসে পদত্যাগের ঘোষণার মাধ্যমে। এক দেশের প্রধানমন্ত্রী আরেক দেশে এসে পদত্যাগ করার এমন বিস্ময়কর ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আগে কখনো ঘটেনি। অপর দিকে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে পরিবর্তনের ধাক্কা দেশটির অর্থনীতিতে যেমন পড়তে যাচ্ছে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। আসলে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে। এমনকি নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।


বাদশাহ সালমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর ৩২ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান যে দেশটির ভবিষ্যৎ কর্ণধার হবেন তাতে কোনো রাখঢাক ছিল না। কিন্তু রাজপরিবারে এই পরিবর্তন কোন প্রক্রিয়ায় ঘটবে তা নিয়ে ছিল প্রশ্ন। সালমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ২০১৫ সালে মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে তার ক্ষমতার বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত জুনে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা হয়। নায়েফ ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে। তাকে সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে আসে। কিন্তু সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হচ্ছে ন্যাশনাল গার্ড। যার প্রধান ছিলেন প্রিন্স মুতাইব বিন আবদুল্লাহ। নায়েফের মতো মুতাইবকেও মোহাম্মদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবা হতো।


দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যে ১১ জন প্রিন্স, ৩৮ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সাবেক মন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার মধ্যে মুতাইব রয়েছেন। ন্যাশনাল গার্ডের নিয়ন্ত্রণ বিন সালমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। সৌদি বিভিন্ন গোত্র থেকে বাছাই করা তরুণদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত। বিশেষ করে মুতাইব ও উতাইবা এই দুই গোত্রের প্রভাব ন্যাশনাল গার্ডে সবচেয়ে বেশি। আর এই গার্ডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। মুতাইব বাদশাহ আবদুল্লাহর পুত্র। মোহাম্মদ বিন সালমান এ ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। মুতাইবকে সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর পূর্ণনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো।


এই অভিযানে আরো যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে ধনকুবের প্রিন্স ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন এমন ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ওয়ালিদ বিন তালাল। যিনি সারা বিশ্বে ধনকুবের ও মিডিয়া টাইকুন হিসেবে পরিচিত। ওয়ালিদের গ্রেফতারের সাথে অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিন সালমান সৌদি আরবে যে নতুন শহর গড়ে তুলছেন তাতে ওয়ালিদকে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে রাজি ছিলেন না ওয়ালিদ।


এ ছাড়া সৌদি আরবের রোতনা মিডিয়া গ্রুপ এবং মার্কিন ও ব্রিটিশ মিডিয়ায় তার বিনিয়োগ আছে। ফলে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য তাকে বাগে আনা প্রয়োজন ছিল। একই কারণে বাদশাহ ফাহাদের শ্যালক ও ব্যবসায়ী ওয়ালিদ আল ইব্রাহিমকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি সৌদি আরবের আরব রেডিও ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক (এআরটি ) এবং মিডল ইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার (এমবিসি) মিডিয়া গ্রুপের প্রধান। এদের গ্রেফতারের মাধ্যমে মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো। এ ছাড়া সৌদি আরবের বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লাদেন গ্রুপের প্রধান বাকর বিন লাদেন ও আল বারাকা গ্রুপের চেয়ারম্যান সালেহ কামেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। বিপুল সম্পদের মালিক এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করা হবে তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে।


এ ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মধ্যে দু’জন প্রিন্সের মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরা হলেন সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মুকরিন বিন আবদুল আজিজের পুত্র মনসুর বিন মুকরিন এবং বাদশাহ ফাহাদের ছেলে আবদুল আজিজ বিন ফাহাদ। এর মধ্যে মনসুর মারা যান রহস্যজনক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় অপর দিকে আবদুল আজিজের মৃত্যুর খবর অস্বীকার করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।


অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মোহাম্মদ বিন সালমানের একক ক্ষমতাচর্চার বিরুদ্ধে রাজপরিবারের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। সম্ভবত তার বিরুদ্ধে যেসব প্রিন্স ও প্রভাবশালী ব্যক্তি অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুধু আইওয়াশ। এখন মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান, সব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে মিডিয়াও তার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কার্যত বিন সালমানকে এখন কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা রাজপরিবারের সবার মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতির বিলোপ ঘটেছে। একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


ইতোমধ্যে বিন সালমান সৌদি আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন। বড় বড় রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। সৌদি আরামকোর শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে। একই সাথে তিনি সৌদি আরবকে মধ্যপন্থী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। নারীরা আরো বেশি স্বাধীনতা পাবে। সিনেমা, থিয়েটার, নারী ও পুরুষের একসাথে খেলা দেখার অনুমোদন দেয়া হবে। পর্যটন খাতকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করা হবে। ধর্মীয় আবহে ঐতিহ্যবাহী সৌদি সমাজব্যবস্থায় এর বিরূপ প্রভাবও আছে। প্রকৃতপক্ষে বিন সালমান সৌদি আরবকে ধীরে ধীরে সেকুলার সমাজব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে চান। তার এসব সংস্কারে সৌদি আরবের তরুণদের বিপুল অংশের সমর্থন আছে বলে মনে করা হয়। একই সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ধাক্কা সামলাতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাজপরিবারে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তিনি অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন।


আটক হওয়া প্রভাবশালীরা


প্রিন্স ওয়ালিদ বিন তালাল
বিশ্বজুড়ে ধনকুবের ও মানবসেবামূলক কাজের জন্য পরিচিত প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল। ওয়ালিদের দাদা সৌদি আরবের প্রথম বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। আবার লেবাননের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রিয়াদ আল সোলাহ তার নানা। ফোবর্স ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রিন্স তালালের সম্পদের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন ডলার। যিনি কিংডম হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান। প্রিন্স ওয়ালিদের সিটি গ্রুপ, ফক্স নিউজ করপোরেশন এবং টুইটারে বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ওয়ালিদ ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি অভিযানের সমালোচনা করেছেন এবং ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়াকে মর্যাদাহানিকর বলে উল্লেখ করেছিলেন।

 

প্রিন্স মুতাইব বিন আবদুল্লাহ
প্রিন্স মুতাইব বিন আবদুল্লাহ সৌদি আরবের ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান। আরব গোত্র থেকে বাছাই করা তরুণদের নিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছে। তার বাবা বাদশাহ আবদুল্লাহ পাঁচ দশক এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন মুতাইব। তিনি ব্রিটেনের স্যান্ডহার্স্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাকে ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার বলা হলেও এটি তার নিজস্ব মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল। তিনি মন্ত্রীর মর্যাদায় ছিলেন। মুতাইব ফ্রান্সের বিখ্যাত হোটেল ডি ক্রিলনের মালিক। যেটি ২০১০ সালে ৩৫৪ মিলিয়ন ডলারে তিনি কিনে নেন বলে ফ্রান্সের পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

 

খালিদ আল তুয়াজিরি
প্রিন্স না হয়েও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন খালিদ আল তুয়াজিরি। বাদশাহ আবদুল্লাহর সময় থেকে তিনি সৌদি রয়্যাল কোর্টের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। তুয়াজিরির জন্ম ১৯৬০ সালে। সৌদি আরবে তিনি আইনের ওপর লেখাপড়া করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন। ইসলামি অপরাধ আইনের ওপর তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি বাদশাহ আবদুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে মনে করা হয়। তাকে অক্টোপাস নামে ডাকা হতো। সৌদি পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম নির্ধারক ছিলেন তুয়াজিরি। মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে অপসারণ ও বাহরাইনে বিক্ষোভ দমনে সৌদি সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১৫ সালে বাদশাহ সালমান ক্ষমতা গ্রহণের পর তাকে অপসারণ করা হয়।

বাকর বিন লাদেন
সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লাদেন গ্রুপের চেয়ারম্যান বাকর বিন লাদেন। ১৯৪৫ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন বাকর। ফ্লোরিডার মিয়ামি ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেন। প্রচারবিমুখ হিসেবে তিনি পরিচিত। সৌদি রাজপরিবারের অন্দরমহলে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। তিনি ওসামা বিন লাদেনের বড় ভাই। লাদেন গ্রুপের বাণিজ্য সম্প্রসারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সালেহ কামেল
মধ্যপ্রাচ্যের বড় বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দালাহ আল বারাকাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান সালেহ কামেল। তিনি সৌদি আরবের শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন কোম্পানির চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্য। ফোবর্স ম্যাগাজিনের তথ্য অনুয়ায়ী তার সম্পদের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার। তাকে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করেন। এমনকি জার্মান চ্যান্সেলর অ্যানজেলা মার্কেলকেও ইসলামি ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী করে তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি আইন বিষয়ে একটি ইনস্টিটিউট খোলার জন্য অনুদান প্রদান করেন।

আল ওয়ালিদ আল ইবরাহিম
মধ্যপ্রাচ্যর ব্যবসায় সফল গণমাধ্যম মিডল ইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার (এমবিসি) প্রধান নির্বাহী আল ওয়ালিদ আল ইবরাহিম।
১৯৯১ সালে এই টেলিভিশন চালু করার পর তিনি আরো বেশ কয়েকটি চ্যানেল চালু করেন। এর মধ্যে আলজাজিরার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি আল অ্যারাবিয়া নামে আরেকটি চ্যানেল চালু করেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মিডিয়া টাইকুন হিসেবে আবির্ভাবে চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হয়। তিনি বাদশাহ ফাহাদের শ্যালক।