সৌদি আরবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ইসরাইল কানেকশন

Nov 07, 2017 05:19 pm
ইসরাইলের জড়িত থাকা নিয়েও অনেক কথা শোনা যাচ্ছে

 

জামাল আল শাইয়াল

শনিবার দিনটি কি সৌদি আরবের জন্য ভয়াবহ এক দিন ছিল? রিয়াদে যা ঘটেছে, তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে চার দিকে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এসব ঘটনার সূত্রপাত। হারিরির পদত্যাগের নেপথ্যেও রয়েছে রিয়াদের কর্তারা- যারা হারিরির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষকও। সৌদি আরবের মালিকানাধীন রিয়াদভিত্তিক একটি চ্যানেলে সাদ হারিরি লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে প্রকাশ্যে যে কারণটির কথা তিনি বলেছেন, তা ছিল প্রাণহানির শঙ্কা। একই দিন সন্ধ্যায় খবর পাওয়া যায়, রিয়াদের কিং খালিদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের কাছে বিস্ফোরণের।

জানা যায়, সেটি ছিল ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ভূূপাতিত করার ঘটনা। ইরান সমর্থিত হাউছিরা বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এটি আরেকটি বিষয় নির্দেশ করে- ইয়েমেনে ‘চূড়ান্ত ঝড়’ নামে যে যুদ্ধ সৌদি আরব দুই বছর আগে শুরু করেছিল তা সহসাই শেষ হচ্ছে না। আর এদিন মাঝরাতে খবর আসে, আরেকটি ভয়াবহ ‘বিস্ফোরণের’- যেটি সৌদি শাসকদের নিজেদের হাতেই ঘটেছে। এক রাজকীয় ফরমানে বেশ কয়েকজন যুবরাজ, ধনকুবের ও উল্লেখযোগ্য কয়েক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। বরখাস্ত করা হয় কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে। এদের মধ্যে কয়েকজন আছেন সাবেক বাদশাহ আবদুল্লাহর পুত্র, আছেন সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান।

এই তিনটি ঘটনাই প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে সৌদি আরবসহ গোটা অঞ্চলকে। সাদ হারিরির পদত্যাগ কিংবা সৌদি আরব তাকে ‘অপসারণ’ ওই অঞ্চলের সে দেশগুলোর জন্য একটি সতর্ক সঙ্কেত যারা যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চায়। ইসরাইলের জড়িত থাকা নিয়েও অনেক কথা শোনা যাচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরেই ইসরাইল যে তাদের উত্তর সীমান্তে মহড়া চালাচ্ছে, সেটি আর গোপন নেই। হিজবুল্লাহ যখন দামেস্কে বাশার আল আসাদ সরকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত, তেলআবিব তখন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করছে। যুক্তি বলছে, এখন হোক কিংবা আরো পরে- ইসরাইল চাইবে তাদের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি বাস্তব ক্ষেত্রে পরীক্ষা করতে (আর এ জন্য চাই একটি যুদ্ধ)।

হারিরিকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা হয়তো ইসরাইলকে ইরানের ছায়াশক্তি লেবাননের বিরুদ্ধে একটি আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ করে দেবে। ফাতাহ আন্দোলনের সাথে সমঝোতার অংশ হিসেবে গাজার ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে হামাস। তাই ইসরাইল হয়তো এই সময়টিকেই আঘাত হানার উপযুক্ত সময় ভাবতে পারে। এমন একটি সঙ্ঘাত হয়তো পশ্চিমা শক্তিগুলোকেও সুযোগ করে দেবে সৌদির বর্তমান নেতৃত্বের ‘উদারতার’ পরিচয় যাচাই করতে। ইসরাইলও কি খুশি হবে না এতে?

ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের হাজার হাজার কোটি ডলার খরচ হয়েছে। সানার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারকে প্রতিষ্ঠিত এবং ইরানকে যাচাই করতে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। যদিও তার দুটি উদ্দেশ্যের কোনোটিই পূরণ হয়নি। মাঝখান থেকে এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ, উদ্বাস্তু হয়েছে কয়েক লাখ আর তেহরান নিজেদের পরিচিত করেছে মধ্যপ্রাচ্যের নিপীড়িত মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে। রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা হয়তো তরুণ ক্রাউন প্রিন্সকে আরো আগ্রাসী করে তুলবে ইয়েমেন যুদ্ধে। রোববার সকালের এই গণগ্রেফতার ও অপসারণের ঘটনার নেপথ্য কারণ কী তা এখনো স্পষ্ট নয়। ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান ও একসময়ের সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপসারণ করার ঘটনা মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি কৌশল।

ধনকুবের প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালালের গ্রেফতারের ঘটনাটি রহস্যজনক। আলওয়ালিদ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে- দুজনেই সৌদি আরবে একটি সেক্যুলার সমাজের প্রচলন চাচ্ছেন। দুজনেই গণতন্ত্র ও উদারপন্থার ঘোর বিরোধী এবং সৌদি আরবের সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে আগ্রহী। ধুনকুবের প্রিন্সের হয়ে কাজ করতেন এমন একজন আমাকে বলেছেন, আলওয়ালিদের গ্রেফতারের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটাতে অর্থ না দেয়া। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছ থেকে এটি হয়তো দেশটির ধনকুবেরদের প্রতি একটি বার্তা : অর্থ দাও, নয়তো কারাগারে যাও।

ক্ষমতা নিয়ে লড়াইয়ের এই সৌদি সংস্করণে ৩২ বছর বয়সী ক্রাউন প্রিন্স দেখিয়ে দিচ্ছেন যে- ক্ষমতার একক অধিপতি হওয়ার জন্য তিনি পুরো অঞ্চলকেও যুদ্ধের ঝুঁকিতে ফেলতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। তার কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যেই উপসাগরীয় সহযোগী পরিষদ (জিসিসি) ধ্বংস হয়েছে। ইয়েমেনকে এখন আর কার্যকর রাষ্ট্র বলার কোনো সুযোগ নেই। মিসরকে একটি বোম বলা যায়- যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। লেবাননে বিশৃঙ্খলা শুরু হতে পারে যেকোনো সময়। কাজেই এই বিষয়গুলো নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ